কেরালার চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ মডেল

আনন্দরূপা ধর
পশ্চিমবঙ্গে কোন প্রকল্প শুরু হওয়ার পর, কতজন তার সুবিধা পেল, কতজন পেল না, - এই সকল বিষয়ের কোন তথ্য সামনে আসে না। তাই যারা সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নয়, বেশিরভাগ সময় রাজনৈতিক ক্ষমতা খাটিয়ে, তারাই প্রকল্পগুলির সুবিধা নেয়। অপরদিকে, কেরালায়, স্বচ্ছ পদ্ধতিতে ডেটা প্রকাশ করা হয়। চরম দারিদ্র দূরীকরণ প্রকল্পের সম্পূর্ণ ডেটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যেত, এবং EPEP মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে ৬৪,০০০ এর বেশি পরিবারের অবস্থা নিয়মিত ট্র্যাক করা হতো।

৬৫ বছরের উন্নিকৃষ্ণন মালাপ্পাপুরমে থাকতেন । তার জীবন বেশ ভালই চলছিল। চার মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার। কিন্তু জমি নিয়ে শরিকি মামলা লড়তে গিয়ে সকল সঞ্চয় ফুরিয়ে ২০০৬ সালের মধ্যে তিনি একেবারে নিঃস্ব হয়ে যান। একটি ছোট, ভাঙাচোরা ঘরে একা থাকতেন, কেউ খোঁজও নিত না। অসুস্থতার ফলে, কাজ করার মতনও উপায় ছিল না। এরকম-ই অবস্থা তিরুবনন্থাপুরমের সাজি-র। ৩৫ বছর বয়সে বাসের ধাক্কায় তার চলাফেরার ক্ষমতা চলে যায়। চিকিৎসার খরচ যোগাতে নিজের বাড়ি, ঘর, জমি বেচে দিতে বাধ্য হন। তারপর একটি ঝুপড়িতে থাকছিলেন তিনি। চলাফেরা না করতে পারার ফলে, ঠিকমতন রেশন ও নিতে পারতেন না, রান্না ও করতে পারতেন না। শাহিদা বিবির গল্পটাও এক। উনি ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগতেন এবং ওনার একমাত্র কন্যা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। 

এরম অসংখ্য মানুষ আমাদের আশেপাশে থাকেন, যারা চাইলেও কোনোভাবে নিজেদের জন্য জীবিকা সংগ্রহ করে, বাঁচার মতন করে বাঁচার অবস্থায় নেই। তারা সরকারি কোনো প্রকল্পর সুবিধা পর্যন্ত নিতে পারেন না। ভোটের আখের গোছাতে গিয়ে তৃণমূল - বিজেপির মতন সরকাররা তাদের ভুলে যাওয়াই সহজ মনে করে। তবে কেরালা ঠিক তেমন না। কেরালার বাম সরকার সবথেকে পিছিয়ে পড়া মানুষটিরও সমাজে উঁচু মাথায় বাঁচার উপায় তৈরি করাটাই তাদের সঠিক কাজ মনে করে। 

দারিদ্র দূরীকরণ প্রকল্প - অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট 

রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘সুস্থায়ী উন্নয়ন লক্ষ্য’ পূরণের প্রথম দুই লক্ষ্য হল - দারিদ্র দূরীকরণ ও ক্ষুধার নিবৃত্তি। বিশ্বের অত্যন্ত শক্তিশালী পুঁজিবাদী দেশগুলির দ্বারা পরিচালিত হওয়া সত্ত্বেও, এই লক্ষ্য সমূহ পূরণ করার পথে অনেক পিছিয়ে বিশ্বের দাপুটে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র গুলি। তবে চীন ২০২১ সালেই চরম দারিদ্র মুক্ত দেশ হিসেবে নিজেদের ঘোষণা করেছে। চীনের দারিদ্র দূরীকরণ অভিযান বিশ্বের সফলতম মডেলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। চীনেও, ‘লক্ষ্যভিত্তিক’ পদ্ধতিতে, চরম দারিদ্র নির্মূল করার অভিযান চালানো হয়। প্রতিটি দরিদ্র পরিবারের তথ্য এবং সমস্যাকে তালিকাভুক্ত করা হয়, তাদের নির্দিষ্ট সমস্যার ভিত্তিতে পৃথক সমাধান করার পরিকল্পনাও হয়। কারও জন্য চাকরি, কারও জন্য পুনর্বাসন, কারও জন্য আর্থিক সহায়তা, আবার কারও জন্য প্রশিক্ষণ।  ২০১৩ সাল থেকে এই অভিযান আরও জোরদার ভাবে চালানো হয়, যার ফলে কোটি কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার ওপরে ওঠে। তবে বুঝতে হবে চীন বা ভারতের কেরালার মতো অঞ্চলে  দারিদ্র্য নির্মূল হয়েছে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, ভূমি সংস্কার ও সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে, শুধুমাত্র নগদ সহায়তার (Cash transfer) মাধ্যমে নয়। মেক্সিকোর PROGRESA বা ব্রাজিলের Bolsa Familia–র (উভয় অভিযানই দরিদ্র পরিবারগুলোকে শর্তসাপেক্ষ নগদ টাকা দিয়ে সহায়তা করার প্রকল্প) অভিজ্ঞতাও দেখায় যে নগদ সহায়তা অস্থায়ী দারিদ্র্য কমাতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক পরিকাঠামোগত উন্নয়ন ও সম্পদের বণ্টন ছাড়া বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কার এর ফলে গ্রামের দরিদ্র ভাগচাষীদের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নততর হয়। তারা আইনি সুরক্ষা পান, ও আপামর কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, এই সময় (২০২১ এর তথ্য অনুযায়ী) পশ্চিমবঙ্গে বহুমাত্রিক দারিদ্রের হার ১১.৮৯%! অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার ১১.৮৯ শতাংশ জনগণ বহুমাত্রিক দারিদ্রে আছেন ! ২০১৫ থেকে ২০২১ এর মধ্যে বহুমাত্রিক দারিদ্রের হার পশ্চিমবঙ্গে খুবই স্বল্প কমেছে; বিহার, মধ্য প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, এমনকি রাজস্থানে (BIMARU রাজ্যগুলোতে) বহুমাত্রিক দারিদ্র অনেক বেশী হারে কমেছে। 

📲 এখন এক ক্লিকেই আপনার হোয়াটস অ্যাপে মার্কসবাদী পথ

নীতি আয়োগের তথ্যানুসারে, ভারতের মধ্যে কেরালার বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার সর্বনিম্ন- ০.৫৫%।  ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এই দারিদ্র্যের মাত্রা আরও কমেছে। তবুও, কেরালা সরকারের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা এক অনন্য সিদ্ধান্ত নেয়, যে তারা সেইসব মানুষদের পাশে দাঁড়াবে, যাদের জীবন এখনো গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত।

যারা নানা প্রতিকূলতার মধ্যে প্রতিদিন লড়াই করে বেঁচে ছিল, এমনকি এই কারণে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিল, এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যারা পেতেন না, তাদেরকে সমাজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনাই ছিল সরকারের লক্ষ। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের জীবন ও জীবিকা শুধু টিকিয়ে রাখা নয়, বরং তা আরও মর্যাদাপূর্ণ ও সুন্দর করার চেষ্টা করেছে কেরালা সরকার। 

এই মডেল নিয়ে গবেষণা ঠিক এই কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রশ্ন ওঠে, কেমন করে একটি রাজ্য, যেখানে দারিদ্র্যের হার সর্বনিম্ন, সেখানে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষদের চিহ্নিত করা হল? কেমন করে তাদের জীবন ও জীবিকার মান উন্নত করা হল? এই মডেল কি আদৌ অন্যান্য রাজ্যে চলতে পারে? 

প্রথম ধাপ - সমীক্ষা

প্রথমেই চরম দারিদ্র্যে থাকা মানুষদের চিহ্নিত করার জন্য বিস্তৃত সমীক্ষা করা হয়, যার দায়িত্বে ছিল স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থাগুলো। গ্রামের পর গ্রাম, পাড়া থেকে পাড়া ঘুরে দেখা হয়, কোথায় কী অবস্থায় মানুষ বেঁচে আছে। 

প্রথম ধাপে প্রতিটি পরিবারের অবস্থা খতিয়ে দেখা হয়, তাদের খাবারের জোগান কেমন, স্বাস্থ্য পরিস্থিতি কেমন, মাসে আয় হয় কি না, মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে কি না। এই তথ্যের ভিত্তিতেই দ্বিতীয় ধাপে তৈরি হয় বিশেষ পরিকল্পনা। কারও জন্য স্বল্পমেয়াদি সহায়তা, কারও জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা । প্রতিটি পরিবারকে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে স্বাবলম্বী করে তোলা হয়। 

এই সমীক্ষা পৌঁছে গেছিল সেই সকল মানুষের কাছে যারা ‘রাষ্ট্রের’ চোখে প্রায় অদৃশ্য।  যাদের জীবনের অস্তিত্ব সরকারি নথিপত্রে নেই, কারণ তাদের জমির দলিল নেই, ঠিকানা নেই, নিরাপদ ঘরবাড়িও নেই। অর্থাৎ, যাদের কাছে ‘কাগজ’ নেই। 



স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক আর ‘কুদুম্বশ্রী’ সংগঠনের সদস্যরা ঘরে ঘরে গিয়ে খুঁজে বের করেছিলেন এই হারিয়ে যাওয়া মানুষদের। (‘কুদুম্বশ্রী’ কেরালার নারীদের একসাথে এনে, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে, বিভিন্ন কাজের সাথে যুক্ত করার একটি প্রকল্প। ১৯৯৮ থেকে ‘কুদম্বশ্রী’ সংগঠনগুলি কেরালার আপামর আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।) তারা দেখেছিলেন, কারও দীর্ঘদিনের রোগের চিকিৎসা হয়নি, কারও আয়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই, কেউ ঝুপড়িতে থাকে, কেউ আবার একেবারেই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। 

মোট ৬৪০০৬ টি চরম দরিদ্র পরিবারকে চিহ্নিত করা হয়। সর্বপ্রথম স্থানীয় স্তরের ও ওয়ার্ড পর্যায়ের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে “ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন” করা হয়। সেই আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি হয় একটি প্রাথমিক তালিকা এরপর প্রতিটি পরিবারের ব্যাপারে, বিস্তারিত তথ্য জোগাড় করা হয়, ও নিখুঁতভাবে সেটার বিচার করা হয়। কে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে ? তা বোঝার জন্য, চারটি প্রধান বিষয়কে ধরা হয়েছিল - খাদ্য, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও আয়। যেই সকল পরিবার এই এক বা একাধিক ক্ষেত্রে চরম সংকটে ছিল, তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যেহেতু প্রতিটি পরিবারের বাস্তব পরিস্থিতি আলাদা, তাই প্রতিটি পরিবারের জন্য আলাদা ধরনের ছোট ছোট পরিকল্পনা করা হয়, অর্থাৎ “মাইক্রো প্ল্যান” বানানো হয়। এটি রাজ্যব্যাপী একক পরিকল্পনা ছিলনা। পশ্চিমবঙ্গের মতন রাজ্যে, রাজ্য ব্যাপী একক পরিকল্পনা অনেক সময়তেই শুধু কাগজে কলমেই রয়ে যায়, এবং দালালদের ও তৃণমূল- বিজেপির রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দুর্নীতি করার আরও একটি করে বাড়তি জায়গা খুলে দেয়। কেরালার এই প্রকল্প ছিল ৬৪,০০৬ টি পরিবারের জন্য , ৬৪,০০৬ টি আলাদা আলাদা পরিকল্পনা। Kerala Institute of Local Administration দ্বারা সমগ্র রাজ্যে মোট চার লক্ষ জন এই গণনার কাজ করেন। তারা তৃণমূল স্তরে পৌঁছে বোঝার চেষ্টা করে কারা চরম দারিদ্র্যে রয়েছে। তারা এমন অনেকের সাথে দেখা করেন, যারা সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। (চরম দরিদ্র পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছিল কয়েকটি মূল সমস্যার ভিত্তিতে: খাদ্য, স্বাস্থ্য, বাসস্থান এবং আয়। এসব ক্ষেত্রের, যেকোনো এক বা একাধিক সমস্যায় ভুগছে এমন পরিবারকে তালিকাভুক্ত করা হয়। ) এই ৬৪,০০৬ পরিবারের মোট ১,০৩,০৯৯ জন সদস্য ছিলেন। ৪৩,৪৫০ টি পরিবারে একজনই সদস্য ছিলেন। অনেকের নাম ভোটার লিস্টে ছিল না, আবার অনেকের কাছে রেশন কার্ড কিংবা আধার কার্ড ও ছিল না।

অর্থাৎ, বর্তমানে কেরালা আজ এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে তারা চরম দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী মানুষদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যান্য অনেক রাজ্যে  দারিদ্র্যের মাত্রা এত বেশি যে, সম্ভবত তারা এই মানুষগুলিকে কোনোভাবেই শনাক্ত করতে পারবে না। বছরের পর বছর সঠিক পরিকল্পনা ও উন্নতির মাধ্যমে কেরালা এই স্তরে পৌঁছাতে পেরেছে, যেখানে অন্তত এই চরম দারিদ্র্যপীড়িত মানুষদের শনাক্ত করাটা সম্ভব হয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপ - পরিকল্পনা 

অন্যান্য রাজ্যের সরকারের কেরালার বাম সরকারের থেকে কিছু বিষয় শেখা জরুরি। যেমন, সকল সরকারি দপ্তরের সমন্বয় করে কীভাবে সরকারের পরিচালনা করা সম্ভব। আমরা জানি পশ্চিমবঙ্গে প্রকল্পগুলি ফাইলের মধ্যে লাল ফিতের বাঁধনে আটকে পড়ে থাকে, তাই আবাস যোজনায় ঘরের টাকা স্বচ্ছল পরিবারের নেতা মন্ত্রীদের পকেটেই যায়। কেরালায় তার উল্টোটা হয়। স্থানীয় স্বশাসন মন্ত্রী এম বি রাজেশ বলেন, “সিভিল সাপ্লাইস দপ্তর যেমন রেশন কার্ড পৌঁছানোর কাজে সাহায্য করেছে, তেমন রাজস্ব দপ্তর ঘর তৈরির জন্য জমি খুঁজতে সাহায্য করেছে। স্বাস্থ্য দপ্তর ওষুধ পৌঁছতে ও দরকারি চিকিৎসার প্রসঙ্গে সাহায্য করেছে। শিক্ষা দপ্তর এই পরিবারের শিশুদের প্রাথমিক ও উচ্চতর শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। পরিবহণ বিভাগ এই পরিবারের সদস্যদের বিনামূল্যে চলাফেরা করার জন্য কার্ড ইস্যু করে।” 

আমাদের মতন দেশে, ভাতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা, কিন্তু ভাতা একমাত্র বিকল্প হতে পারেনা। শুধু ভাতা দিয়েই যে উন্নতি সম্ভব নয়, সেই কথা মাথায় রেখে, কেরালা সরকার এই পরিবারের সদস্যদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করে। তাদের “উজ্জীবনম” প্রকল্পের আওতায় এনে উপযুক্ত কাজের সাথে যুক্ত করা হয়। কেউ এখন পোল্ট্রি চালায়, তো কারোর জামা কাপড়, চা, অথবা মুদির দোকান আছে। তাদের পরিবারের যুবক যুবতীরাও শিক্ষিত হয়ে উন্নততর চাকরি করার সুযোগ পেয়েছে। “উজ্জীবনম” প্রকল্পের আওতায় প্রায় চার হাজার অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারকে চাকরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, ক্ষুদ্র ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, ও ব্যবসা শুরু করতে তাদের সাহায্য করা হয়। উজ্জীবনম অভিযানের কাজ এগিয়ে নিতে কুডুম্বশ্রী পুরো রাজ্যে ২৩৬ জন কমিউনিটি রিসোর্স পারসন (CRP) নিয়োগ করে। প্রতিটি CRP এর দায়িত্ব ছিল চারটি গ্রাম পঞ্চায়েত দেখা। তাদের কাজ ছিল সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করা, যাচাই করা, এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। 

মালাপ্পুরমের উন্নিকৃষ্ণন কে যেমন একটি চায়ের দোকান চালানোর ব্যাবস্থা করে দেওয়া হয়, তিরুবনন্থপুরমের সাজির পায়ের অপারেশান করা হয়, ও তার বাসস্থানকে আরও উন্নত ভাবে গড়ে তোলা হয়। শাহিদা বিবি বলেন , “এক বছর  পর্যন্ত আমরা একটা ছোট্ট ঝুপড়িতে থাকতাম। সরকার আমাদের বাড়ি তৈরির জন্য চার লাখ টাকা দিয়েছে। দু’ বছর আগে সরকার আমাদের ‘চরম দারিদ্র্য’ কার্ড দিয়েছিল এবং লাইফ মিশন হাউজিং স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। সেই প্রকল্প থেকেই আমরা একটি পাকা বাড়ি পেয়েছি। এখনো নিয়মিতভাবে আমার ওষুধ সরকার থেকেই পাই।”

বেশ কয়েকজনের ক্ষেত্রে বাসস্থান একটি বড় সমস্যা হয়ে দাড়ায়। পরিবারসংখ্যা কম হলেও, অনেকেই ছিল ভূমিহীন বা ভাঙা-চোরা ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘরে বসবাসকারী। কারোর জন্য নতুন বাড়ি বানানো হয়েছে, কিছুজনকে জমিসহ বাড়ি দেওয়া হয়েছে, আর কিছু পরিবারকে ঘর মেরামতের সাহায্য করা হয়েছে। যেখানে দরকার ছিল, সেখানে শৌচাগার ও জলের লাইনও বসানো হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় ৪,৬৭৭টি পরিবারের নতুন ঘর দেওয়া হয়েছে, ২,০১৩টি ঘর সংস্কার করা হয়েছে, ৪,৩৯৪টি পরিবারকে জীবিকা সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, ২১,২৬৩ জনকে পরিচয়পত্র জারি করা হয়েছে, ২০,৬৪৮ জনকে খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে, ৮৫,৭২১ জন চিকিৎসা সহায়তা পেয়েছেন, ৫,৭৭৭ জনকে ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার’ (উপশম চিকিৎসা) দেওয়া হয়েছে, এবং সাতজনের অঙ্গ প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার হয়েছে।  

 স্বচ্ছ তথ্য ভাণ্ডার: প্রকল্পের অন্যতম সাফল্য

ভারতের অনেক জায়গায়, এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও, সরকারি প্রকল্প বিষয়ক তথ্য, একেবারেই স্বচ্ছ ভাবে জনগনের সামনে তুলে ধরা হয়না। ফলে গরিব জনগণ অন্ধকারের মধ্যে থাকেন, ও তাদের অজ্ঞানতার সুবিধা নিয়ে তৃণমূলের ছোট - বড় নেতা মন্ত্রিরা নিজেদের ভোট গোছায়। তারা কোন প্রকল্প শুরু হলে এক ভাগ ‘কমিশন’ হিসেবে রেখে দিয়ে, বাকি ভাগ একজন গরিব, মেহেনতি মানুষের কাছে তুলে দিয়ে, এমন ভাব করে যেন এই প্রকল্পটি একজন মেহেনতি মানুষের অধিকার নয়, বরং তৃণমূল তাকে দয়া করে পাইয়ে দিয়েছে, ও বিনিময়ে তাকে সারাজীবন তৃণমূলের কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে কোন প্রকল্প শুরু হওয়ার পর, কতজন তার সুবিধা পেল, কতজন পেল না, - এই সকল বিষয়ের কোন তথ্য সামনে আসে না। তাই যারা সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নয়, বেশিরভাগ সময় রাজনৈতিক ক্ষমতা খাটিয়ে, তারাই প্রকল্পগুলির সুবিধা নেয়।

অপরদিকে, কেরালায়, স্বচ্ছ পদ্ধতিতে ডেটা প্রকাশ করা হয়। চরম দারিদ্র দূরীকরণ প্রকল্পের সম্পূর্ণ ডেটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যেত, এবং EPEP মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে ৬৪,০০০ এর বেশি পরিবারের অবস্থা নিয়মিত ট্র্যাক করা হতো। তাছাড়াও, গ্রামসভা ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও তথ্য উন্মুক্ত রাখত। বিভিন্ন বিরোধী সংগঠন এই অভিজানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বক্তব্য রাখে। যেমন, সমীক্ষার সকল তথ্য নাকি কেরালা বাম সরকার দ্বারা নির্ধারিত কর্মীরা সংগ্রহ করেছে । এই বক্তব্য একেবারেই ভুল, কারণ এমন অনেক জায়গায় চরম দারিদ্র নির্মূল করা গেছে, যেখানের স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক বিরোধীরা ক্ষমতায় আছে, ও বিরোধী পক্ষের অনেকেই এই অভিজানের সাথে যুক্ত ছিল। যেহেতু সমগ্র তথ্য উন্মুক্ত ছিল, তাই যে কেউ, সমীক্ষা, অথবা প্রকল্প পদ্ধতি নিয়ে তার বিরোধ, প্রকল্প চলাকালীন -ই সামনে রাখতে পারত। কিন্ত সকল বিরোধী মতামত অভিযান শেষ হওয়ার পর সামনে আসছে। যেমন ‘চরম দারিদ্র’ শব্দটির ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠী আপত্তি জানিয়েছে। তবে বুঝতে হবে, চরম দারিদ্রে কারা রয়েছেন, সেটা বোঝার জন্য যা পদ্ধতি সরকার নিয়েছে, তা প্রকল্পের শুরুতেই স্বচ্ছ করে দেওয়া হয়, এবং তখন বিরোধী মতামত উঠে আসে না। তাই বোঝাই যায়, যা বিরোধী মতামত এখন উঠে আসছে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

পশ্চিমবঙ্গের সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে, যদিও বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান হতাশাজনক, তবুও পশ্চিমবঙ্গে দারিদ্র দূরীকরণের কোন প্রকল্পই নেওয়া হয়নি। তার সাথে, যেই সকল পরিকাঠামো একজনকে স্বাবলম্বি করে দারিদ্রের চক্র থেকে বেড়িয়ে আসতে  সাহায্য করে, সেই সকল পরিকাঠামো অচল হওয়ার পথে - যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান। বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যেও, অসমতা ও দারিদ্র্যের হার প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। কেরালার এই মডেল অন্য রাজ্যের জন্য শুধু উদাহরণ নয়, বরং একটি শিক্ষাও। দারিদ্র্য দূরীকরণ মানে, কেবল খাতায় - কলমে পড়ে থাকা কোনো প্রকল্প নয়, বরং মানুষের জীবন-জীবিকাকে সুস্থায়ী ভাবে পুনর্গঠন করার প্রকল্প। এই প্রকল্প দেখিয়েছে, উন্নয়ন তখনই সত্যিকার অর্থে সফল হয়, যখন সমাজের শেষ প্রান্তের মানুষটিও মাথা উঁচু করে বাঁচার সুযোগ পায়।


প্রকাশের তারিখ: ২৪-নভেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org