কলকাতার ভগৎ সিং

সুচেতনা চট্টোপাধ্যায়
দমদম সেন্ট্রাল জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার আগে ভগৎ সিং পাঞ্জাবিতে একটা গোপন চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠি পুলিশের হাতে পড়ে যায়। তাতেই স্পষ্ট হয় যে, বামপন্থী রাজনৈতিক কার্যকলাপে তাঁর স্থায়ী আগ্রহ ছিল। সেই সময় পাঞ্জাবের জেলে যে অনশন ধর্মঘট চলছিল চিঠিতে সেবিষয়ে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, সেই আন্দোলন সম্পর্কে কমিউনিস্ট ও সোশালিস্ট নেতাদের মতামত কী এবং অনশনকারীরা কমিউনিস্ট ও সোশালিস্ট নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন কিনা তাও জানতে চেয়েছিলেন। জেলের রেকর্ডে ভগৎ সিংয়ের যে বর্ণনা লিপিবদ্ধ রয়েছে তা এরকম, ‘গড় উচ্চতার একজন হিন্দু/শিখ’‌ (৫ ফুট ৮ ইঞ্চি), ‘ফরসা’‌, ‘স্বাস্থ্য মোটের ওপর ভাল’‌, ‘বাঁ চোখের ঠিক নীচে একটা কাটা দাগ রয়েছে’‌, এছাড়া ‘‌বাঁ হাতের তর্জনীর বাইরের দিকের একেবারে গোড়ায় আরও একটা কাটা দাগ রয়েছে’‌

ভোর তখন পাঁচটা। কলকাতার একটি এলাকায় ভাড়া নেওয়া ঘরে অঘোরে ঘুমোচ্ছিলেন হোশিয়ারপুরের ৫ জন পরিযায়ী শ্রমিক। সেদিন ঠিক সেই মুহূর্তেই বদলে গিয়েছিল তাদের গোটা জীবনটাই।

১৯৩৩ সালের মে মাসের প্রায় ভুলে যাওয়া একটি ঘটনা। বিস্মৃতপ্রায় সেই ঘটনার বিবরণ চাপা পড়েছিল বাংলা পুলিশের নথিতে। সেই নথিতে উল্লেখ রয়েছে এই শহরের পরিযায়ী শ্রমিকদের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের। সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল কলকাতা-প্রবাসী র‌্যাডিক্যাল ভাবনাচিন্তার লোকজনের। একইসঙ্গে এঘটনা হল সেই সব পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের অত্যচারের ইতিহাসও। ওই নথি থেকে দেখা যাচ্ছে,  যে সব তরুণ পরিযায়ী শ্রমিক সেদিন এই শহরে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং সাংগঠনিক যোগাযোগের কারণে তাঁদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা।

পাঞ্জাবে স্থানীয় তরুণদের নিয়ে নওজোয়ান ভারত সভা নামে একটি গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন শহিদ ভগৎ সিং ও তাঁর সঙ্গীরা। সেই গোষ্ঠীর অনেকেই ছিলেন গদর আন্দোলনের ভাবনাচিন্তায় প্রভাবিত। ১৯২০-র দশকের শেষ এবং ১৯৩০-এর দশকের গোড়ার দিকে কলকাতায় যে সব র‌্যাডিক্যাল ভাবধারায় বিশ্বাসী শিখ যুবক বামপন্থার দিকে ঝুঁকেছিলেন,  তাঁদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল নওজোয়ান ভারত সভা। শুরু থেকেই এদের কাজকর্মের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রেখেছিল পুলিশ। ১৯২৯ সালের দ্বিতীয়ার্ধে নওজোয়ান ভারত সভার কলকাতা শাখা গুরুমুখী ভাষায় ছাপা একটি সদস্যপদের আবেদনপত্র বিলি করেছিল। সেবছর ৩১ জুলাই দ্বারকানাথ মিত্র স্কোয়ারে একটি জনসভায় জড়ো হয়েছিলেন প্রায় ১০০ জন শিখ। ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে বোমা ছোড়ার জন্য ওই সভা বীরের সম্মান জানিয়েছিল ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্তকে। তবে এই র‌্যাডিক্যাল তরুণদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। পুলিশ রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, ওই বছর ৩১ ডিসেম্বর, নববর্ষের প্রাক্কালে, ৯৬ আশুতোষ মুখার্জি রোডে নওজোয়ান ভারত সভার একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে হাজির ছিলেন ১২জন সদস্য। সভায় সভাপতিত্ব করেন সুরেন সিং। বলবন্ত সিং প্রস্তাব রাখেন কংগ্রেসের মতো তাদেরও বিশ্বাসের বদল ঘটাতে হবে এবং একটা পতাকা উত্তোলন করতে হবে যাতে লেখা থাকবে ‘‌হয় স্বাধীনতা নয় মৃত্যু’‌। এরপর ‘বৈঠকে উপস্থিত সবার সম্মতির ভিত্তিতে মধ্যরাতের পর একটা লাল পতাকা উত্তোলন করা হয় যাতে হলুদ রঙে লেখা ছিল সেই শ্লোগান।’‌

রাজনৈতিক শক্তি ও সংগঠনের বিচারে ততটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও, এই গোষ্ঠীর অনুগামীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তাঁদের এই নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছিল এমন একটা আবহে যখন শ্রমিকশ্রেণি এবং বামপন্থীদের ওপর বড়সড় আকারে রাজনৈতিক দমনপীড়ন নামিয়ে আনা হয়েছিল। ১৯৩৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ‘‌সন্ত্রাসবাদী’‌ হিসাবে পাঁচজন পাঞ্জাবি শিখ শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের অভিযোগ ছিল, ধৃতদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল নওজোয়ান ভারত সভার নিষিদ্ধ বাংলা শাখার এবং যোগাযোগ ছিল কীর্তি দলের শাখার সঙ্গেও। কীর্তি দল ছিল বাংলায় পাঞ্জাব থেকে আসা কমিউনিস্টদের আরও পুরনো সংগঠন। ১৯২৯ সাল নাগাদ কীর্তি দলের সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং যখন মীরাট কমিউনিস্ট মামলা শুরু হয় তখন দলটার অস্তিত্ব লোপ পায়। নওজোয়ান ভারত সভার সমর্থকদের সংখ্যাও তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। তবুও র‌্যাডিক্যাল রাজনীতির অতি সামান্য এই অস্তিত্বটুকুকেও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব ভারী বিপজ্জনক বলে মনে করত।

ধৃত ওই ৫ জন শ্রমিক দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে ৬, গঙ্গাপ্রসাদ মুখার্জি রোডের বাড়ির চারতলায় একটি ঘরে থাকতেন। ওই জায়গায় তখন ছিল মোটর সারানোর কারখানা, গ্যারেজ এবং ট্যাক্সি কোম্পানির অফিস। সাধারণত পাঞ্জাবি শিখ পরিবহণ কর্মীরা এখানেই এসে জড়ো হতেন। ধৃতদের মধ্যে চারজন ছিলেন পেশায় ড্রাইভার। যখন ভোর পাঁচটায় পুলিশ ওই ঘরে হানা দেয়, তখন তাঁরা ঘুমিয়ে ছিলেন। পুলিশের দাবি, অন্যান্য জিনিসের মধ্যে ওই ঘর থেকে দুটি অ্যালুমিনিয়াম বোমা এবং কড়া সালফিউরিক অ্যাসিডের একটা শিশি পাওয়া যায়। ধৃতদের দাবি, ওই সব সন্দেহজনক জিনিসগুলি পুলিশই সেখানে রেখে দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খাড়া করেছিল। তবে ধৃতদের এই যুক্তি প্রশাসন খারিজ করে দেয়। অস্ত্র ও বিস্ফোরক পদার্থ আইনে (‌১৯০৮ সালের ৬ নম্বর আইন)‌ ২০ মে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ৬ বছরের কঠোর কারাদণ্ডের সাজা হয়।

পুলিশ ধরে নিয়েছিল ওই পাঁচ জনের মধ্যে ভগৎ সিংই তাদের নেতা। এবং তাদের সন্দেহ হয়েছিল যে, এই শহরে থাকা এবং পেশাগত কাজকর্ম করার ফাঁকে ওই পাঁচ জনের মধ্যে জঙ্গী বামপন্থায় দৃঢ় মতাদর্শগত বিশ্বাস ও সন্ত্রাসবাদী হিংসার একটা বিপজ্জনক সম্মিলন ঘটেছিল। পুলিশ আরও জানিয়েছে, এদের মধ্যে বিপ্লবী মনোভাব জাগিয়ে তুলেছে বাংলার কীর্তি দল ও নওজোয়ান সভা। এঁরা এসেছিলেন হোশিয়ারপুর জেলা থেকে এবং এসেছিলেন কাজের খোঁজে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে। এদের মধ্যে ভগৎ সিংয়ের জন্ম হয়েছিল ১৯০৮ কিংবা ১৯০৯ সালে মাহিলপুরে। তিনি ১৯২৩ সালে মিডল স্কুলের পরীক্ষায় পাশ করার পর কলকাতায় এসে পৌঁছান ১৯২৪ সালে। এই শহরের গোপাল মোটর ট্রেনিং স্কুল থেকে তিনি ড্রাইভারি শেখেন এবং ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত ‘বেসরকারি মালিকের’‌ অধীনে তিনি বাস চালাতেন। ৩৩ সালেই তিনি জেলে যান। ভগৎ সিংয়ের সঙ্গীদের একজন হলেন বান্টা সিং। তাঁর জন্ম ১৯১২ সালে মাহিলপুরেই এবং তিনিও ছিলেন বাস ড্রাইভার। পাক্কার সিংয়ের জন্ম ১৯০৮ সালে। তিনি গ্রামের স্কুলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছিলেন। পেশায় তিনি ছিলেন ট্যাক্সিচালক। আরেকজন হলেন অমর সিং যিনি জন্মেছিলেন ১৯০৮ সালে। এঁরা পাঁচজনেই পড়াশোনা শিখেছিলেন। এঁদের কাছে পাওয়া গিয়েছিল গুরুমুখীতে লেখা ডায়েরি, লিফলেট এবং হ্যান্ডবিল। জঙ্গী সমাজতান্ত্রিক মতবাদ প্রচার করার জন্য এর আগেও কয়েকজন শিখ যুবককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। এর মধ্যে ফিরোজপুরের আনক সিংয়ের জন্ম ১৯০৫ সালে। সম্ভবত তিনি ছিলেন হিন্দুস্তান সোশালিস্ট রিপাবলিকান আর্মি (‌এইচএসআরএ)‌–র সদস্য। তাঁকে ১৯৩০ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার করে প্রেসিডেন্সি জেলে পাঠানো হয়। পরে ১৯৩১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত হিজলি শিবিরে বন্দি করে রাখা হয়। সেবছর জুন মাসে আনক সিংকে বাংলা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ভবানীপুরে যে পাঁচজনকে ১৯৩৩ সালে গ্রেপ্তার করা হয় তাদের সকলের জন্ম একই জেলায়, এই শহরের পাঞ্জাবি অধ্যুষিত এলাকায় তাঁদের যোগাযোগ, তাঁদের পেশা, কলকাতার মতো বড় শহরে তাঁদের সামাজিক অবস্থান, পরিবহণ শ্রমিকদের মধ্যে সক্রিয় বামপন্থী কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা, দেশের যে অঞ্চল থেকে তাঁরা এসেছিলেন সেই অঞ্চলের যুবকদের নানা বিষয়ে সক্রিয় সাড়া দেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস—  সম্ভবত এসব কারণগুলিই এদের অপরাধী সাজানোর পক্ষে যথেষ্ট ছিল।  নির্দিষ্ট যে কারণ এই পাঁচজনকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল, সেগুলোকেই রাষ্ট্র কাজে লাগিয়েছিল তাদের ‘‌ষড়যন্ত্রকারী’‌ সাজানোর জন্য।

মুলতান জেলেই অমর সিংয়ের মৃত্যু হয়েছিল। ভগৎ সিং, পাক্কার সিং এবং ধন্না সিং ১৯৩৮ সালে বাংলার জেল থেকে ছাড়া পান। জেলে ভালো ব্যবহারের জন্য ৫ বছর পর তাঁরা সাজার মেয়াদে ছাড় পেয়েছিলেন। এরপর নথিতে বান্টা সিংয়ের আর কোনও উল্লেখ নেই। রাজশাহী জেলে একজন পাঞ্জাবি শিখ ওয়ার্ডারের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল পাক্কার সিংয়ের। এর ফলে ওই ওয়ার্ডারের চাকরি যায়। একজন ‘‌সন্ত্রাসবাদীর’‌ সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগে ওই ওয়ার্ডারকে ‘‌সরিয়ে দেওয়া হয়’‌ এবং এর ফলে এই দুজনকে ঘিরে আমলাতান্ত্রিক স্তরে ছোটখাটো একটা বিতর্কও তৈরি হয়েছিল। জেল গেট থেকে ধন্না সিংকে অনুসরণ করে পুলিশ পৌঁছে যায় ৩১, রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে গুরুদ্বার জগৎ সিং সুধার-এ। এই গুরুদ্বার ভবানীপুরের পাশেই কালীঘাট অঞ্চলে। এটা ছিল দক্ষিণ কলকাতায় প্রবাসী পাঞ্জাবি শিখদের স্থানীয় সংগঠন ও যোগাযোগের কেন্দ্র। এই গুরুদ্বারটি পরিচালনা করত সিং সভা। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ভগৎ সিংকে আশ্রয় দিয়ে তাঁকে পাঞ্জাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। 

দমদম সেন্ট্রাল জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার আগে ভগৎ সিং পাঞ্জাবিতে একটা গোপন চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠি পুলিশের হাতে পড়ে যায়। তাতেই স্পষ্ট হয় যে, বামপন্থী রাজনৈতিক কার্যকলাপে তাঁর স্থায়ী আগ্রহ ছিল। সেই সময় পাঞ্জাবের জেলে যে অনশন ধর্মঘট চলছিল চিঠিতে সেবিষয়ে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, সেই আন্দোলন সম্পর্কে কমিউনিস্ট ও সোশালিস্ট নেতাদের মতামত কী এবং অনশনকারীরা কমিউনিস্ট ও সোশালিস্ট নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন কিনা তাও জানতে চেয়েছিলেন। জেলের রেকর্ডে ভগৎ সিংয়ের যে বর্ণনা লিপিবদ্ধ রয়েছে তা এরকম, ‘গড় উচ্চতার একজন হিন্দু/শিখ’‌ (৫ ফুট ৮ ইঞ্চি), ‘ফরসা’‌, ‘স্বাস্থ্য মোটের ওপর ভাল’‌, ‘বাঁ চোখের ঠিক নীচে একটা কাটা দাগ রয়েছে’‌, এছাড়া ‘‌বাঁ হাতের তর্জনীর বাইরের দিকের একেবারে গোড়ায় আরও একটা কাটা দাগ রয়েছে’‌।

কলকাতা পুলিশের রেকর্ডে এই ভগৎ সিংয়ের একটা ছবিও রয়েছে যা গ্লাস নেগেটিভ থেকে ডেভেলপ করা হয়েছিল। দেখেই বোঝা যায় ছবির এই ভগৎ সিং সেই বিখ্যাত বিপ্লবী ভগৎ সিং নন যাঁকে ১৯৩১ সালে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। এই ছবিটা আরও বয়স্ক একটা লোকের। ছবিটা দেখে মনে হয় তিনি শিখদের ধর্মীয় প্রথা বিসর্জন দিয়েছিলেন। তবুও ৩১ রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের সিং সভা ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার আগে থেকেই তারা ভগৎ সিংকে দেখাশোনার দায়িত্ব নেবে। একজন অনুপস্থিত ব্যক্তিকে সভার সদস্য হিসাবে মেনে নিতে চাওয়ার মধ্যে দিয়ে সিং সভা যে ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি বোধের পরিচয় দিয়েছিল, তাতেই একজন বিদ্রোহী বা নির্যাতিতের প্রতি সভার সহমর্মিতার পরিচয় পাওয়া যায়। একই সঙ্গে একথাও মনে রাখতে হবে যে, নির্দিষ্ট এই গুরুদ্বারের ‘‌দিওয়ানস’‌-এ বলবন্ত সিং ও অন্যরা যোগ দিয়েছিলেন এবং বক্তব্য রেখেছিলেন।

ভগৎ সিং, যিনি ছিলেন বাস ড্রাইভার এবং কাজ করতেন ‘‌বেসরকারি মালিকের অধীনে’‌, তাঁর ছবিতে কোনও বিদ্রুপ কিংবা প্রতীকী প্রত্যাখ্যান লক্ষ্য করেননি ফটোগ্রাফার কিংবা পুলিশ আধিকারিকেরা। এক্ষেত্রেও হাজার হাজার লোকের ছবি ফাইলবন্দি করার কাজটা গতানুগতিকভাবে করে গেছেন তাঁরা। যেন কাউকে চিহ্নিত করাটা, সেবিষয়ে রেকর্ড রাখাটা, নেহাতই একটা তুচ্ছ কাজ মাত্র। কারাগারের সেই অন্তহীন করিডোরের মধ্যে বন্দি দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তাঁর বাঁ হাতে হাতকড়া লাগানো, শিকলটা সেই হাতেই ধরে রয়েছেন তিনি। ডান হাতটা মুক্ত। সে হাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছেন নিজের বাঁ হাত। তাঁর চোখেমুখে বেপরোয়া এবং খানিকটা তীব্র শ্লেষাত্মক অভিব্যক্তি। যদিও এই ভগৎ সিং ও তাঁর সঙ্গী রাজবন্দিদের স্মৃতি এখন ঝাপসা হয়ে এসেছে, তবু পুলিশি রেকর্ড ও ছবিতে স্পষ্ট প্রতীয়মান রয়েছে তাঁদের প্রাণোচ্ছলতা। 


ওপরের নিবন্ধটি সুচেতনা চট্টোপাধ্যায়ের বিশেষ রচনা ‘‌ভয়েসেস অফ কোমাগাতা মারু:‌ ইম্পিরিয়াল সার্ভেলিয়েন্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ফ্রম পাঞ্জাব ইন বেঙ্গল’‌ বইয়ের একটি পরিচ্ছদের সংশোধিত সংস্করণ। বইটির প্রকাশক (‌নিউ দিল্লি: তুলিকা, ২০১৮, পৃষ্ঠা ১৪৪‌–৪৯)‌। 
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস



প্রকাশের তারিখ: ২৩-মার্চ-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org