'৪১-এ কলকাতা আতঙ্কিত, ত্রস্ত। বিনিদ্র রাতে বেজে যাচ্ছে সতর্ক সাইরেন। জাপানী বোমার ভয়ে দলে দলে কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে লোক। বছর পনেরোর এক কিশোর তার বন্ধুকে চিঠিতে লিখছে, ‘আজ আমার ভাইয়েরা চলে গেল মুর্শিদাবাদ— আমারও যাবার কথা ছিল, কিন্তু আমি গেলাম না মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াবার এক দুঃসাহসিক আগ্রহাতিশয্যে, এক ভীতি-সংকুল, রোমাঞ্চকর, পরম মুহূর্তের সন্ধানে। তবু আমার ক্লান্তি আসছে, ক্লান্তি আসছে এই অহেতুক বিলম্বে।’ (অরুণাচল বসুকে লেখা চিঠি, ২২ চৈত্র ১৩৪৮, সূত্র: সুকান্ত সমগ্র)
মাত্র পনেরো বছর বয়সেই মৃত্যুর অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে পড়ল সে? 'বিলম্ব'-- তাও আবার 'অহেতুক বিলম্ব'— 'মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াবার' সেই 'পরম মুহূর্ত'টির জন্যে এত অধীরতা?
আট বছর বয়সে প্রিয় দিদিকে, এগারোয় মাকে হারানো নিঃসঙ্গ কিশোর; মুখচোরা, লাজুক গুমরাতো নিজেরই ভেতর। তীব্র কোনও মৃত্যুবোধ কি তবে তার মনে ঢুকে পড়েছিল ওই সামান্য বয়সেই? এরপর আর ছয় বছর বেঁচেছিল সে। তার বেশি বিলম্ব করেনি মৃত্যু।
এই চিঠি ও মৃত্যুর মাঝের সময়ে প্রচুর কবিতা লিখেছেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর অধিকাংশ কবিতাই ১৯৪১ থেকে '৪৬-এর মধ্যে লিখিত। এই সাত বছরের মধ্যেই সুকান্ত আকৃষ্ট হয়েছেন বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি, সম্পৃক্ত হয়েছেন গণআন্দোলনে। জনতার মুখরিত সখ্যে তাঁর কেটেছে দিনরাত।
এমন কথা যা কেবল তাঁরই, এমন একান্তই ব্যক্তিগত কথা লেখেননি কবিতায়। লিখেছেন সকলের কথা, সকলের বলেই যে-কথা তাঁর নিজেরও, সেই কথা। তথাকথিত কাব্যিক বক্রতায় নয়; স্পষ্ট ভাষায়, সরাসরি। যাঁদের জন্যে লিখছেন তাঁদেরই ভাষাতে। সুকান্তর কবিতা ফিরেছিল, তাই, সেই জনতারই মুখে-মুখে।
কবিতার কাছে এর অধিক প্রত্যাশা ছিল না সুকান্ত-র। ‘খ্যাতির মুখেতে পদাঘাত করি’— লিখেছেন নিজে। অন্যত্র একথাও, ‘ইতিহাস! নেই অমরত্বের লোভ / আজ রেখে যাই আজকের বিক্ষোভ।’ এ হেন সুকান্ত ভট্টাচার্য কতখানি খ্যাতি অর্জন করলেন কিংবা ইতিহাসে পাকাপাকি স্থান অর্জন করতে পারলেন কিনা সে প্রশ্ন অমূলক। স্বদেশে, স্বকালে বিপুল জনতার বুকের ক্ষোভকে ভাষা দিতে পেরেছিলেন কিনা সেটাই বিচার্য।
কবি সুকান্ত-র স্বকাল— ১৯৪১ থেকে '৪৬— ক্যালেণ্ডারের পাতার থেকেও দ্রুততায় প্রেক্ষাপট পালটে পালটে গেছে বাংলায়। ৪১-এর বোমাতঙ্কের দিন পেরিয়ে ৪২-এ ভারত ছাড়ো আন্দোলনে উত্তাল হয়েছে শহর। '৪৩-'৪৪ সালের মেজাজ আবার ভিন্নতর। মজুতদারি, ব্ল্যাকমার্কেটিং, মড়ক, আকাল। খিদের জ্বালায় আকাতরে মানুষ মরল লাখো। সুকান্ত ততদিনে কমিউনিস্ট পার্টিতে। মন্বন্তরের দিনগুলিতে কমিউনিস্ট কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন রিলিফের কাজে। লঙ্গরখানায় সুকান্তও স্বেচ্ছাসেবক। 'দুর্ভিক্ষের কবি' লিখেও রাখছেন সে সময়ের ভাষ্য।
'৪৪ পেরিয়ে '৪৫। মড়ক পেরিয়ে মহারণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানে আজাদ-হিন্দ ফৌজের বন্দী সেনাদের মুক্তির দাবিতে কল্লোলিত মিছিল-নগরী। বাম ছাত্ররা সে লড়াইয়ের সামনের সারিতে। নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্য সেসময়ে সুকান্তকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন । লিখছেন তিনি, ‘সে এগিয়ে গেল ২১শে নভেম্বরের ধর্মতলার মিছিলে শহিদ রামেশ্বর ব্যানার্জি, আবদুস সালামের পাশে। সে ছিল ১৯৪৬-এর ফেব্রুয়ারীতে রসীদ আলি দিবসে গুলি চালনা ও হত্যার প্রতিবাদে কলকাতার পথে পথে, বস্তিতে বস্তিতে ইংরেজ সৈন্যদের সাথে পথযুদ্ধের মাঝে।’ ( সুকান্ত-স্মৃতি, সুকান্ত বিচিত্রা)
পরবর্তী মার্চ, এপ্রিল, মে উত্তাল মিছিলে মিছিলে, আন্দোলনে। জুন-জুলাইতে শ্রমিক, কর্মী, এমনকী শিল্পীদেরও অসংখ্য ক্ষেত্রভিত্তিক হরতাল, একের পর এক সাধারণ ধর্মঘট। বোম্বে ও করাচিতে নৌসেনাদের বিদ্রোহ। দেশের নানা প্রান্তে ধর্মঘটে, এমনকী, পুলিশও। ‘বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে’— যদিও অভাবিত অতিনাটকীয়তায় মুহূর্তে ফের পালটে গেল প্রেক্ষাপট। জনতার সংগ্রামী ঐক্যের ছবি ফিকে হয়ে কলকাতাকে আচ্ছন্ন করে তুলল ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার বাস্তবতা। আগস্ট মাস পড়তে না পড়তেই।
আন্দোলনে সরব জুন-জুলাইয়ের কলকাতা দাঙ্গার কোলাহলে মুখর হল আগস্ট-সেপ্টেম্বরে। সুকান্ত লিখলেন, ‘অক্টোবরকে জুলাই হতেই হবে / আমরা সবাই দাঁড়াব সবার পাশে, / আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাস /এবারের মতো মুছে যাক ইতিহাসে।’
এলো অক্টোবর। তবে ততদিনে রোগ অনেকখানি কাবু করে ফেলেছে সুকান্তকে। তাঁকে ভর্তি করা হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের শুশ্রুষার জন্যে স্থাপিত 'রেড-এইড কেয়ার হোম'-এ। ১০ নং রওডন স্ট্রীটে। সেখান থেকেই বন্ধু ভূপেনকে চিঠিতে লিখেছেন সুকান্ত, ‘এক-এক সময় মনে হয় বেশ আছি— শহরের রক্তাক্ত কোলাহলের বাইরে এক নির্জন, শ্যামল ছোট্ট দ্বীপের মতো জায়গায় বেশ আছি। কিন্তু তবুও আমার শিকড় গজিয়ে উঠতে পারেনি, বাইরের জগতের রূপ-রস-গন্ধ-সমৃদ্ধ হাতছানি সকাল সন্ধ্যায় ঝলক দিয়ে ওঠে তলোয়ারের মতো। এখন আছি বদ্ধ-দীঘির জগতে; সেখান থেকে লাফ দিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে মাছের মতো, কর্মচাঞ্চল্যময় পৃথিবীর স্রোতে।’ (ভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যকে লেখা চিঠি, ৩০ অক্টোবর ১৯৪৬, সুকান্ত সমগ্র)
নিঃসঙ্গতাকে প্রত্যাখ্যান করে গত সাতটি বছর সুকান্ত ফিরেছেন জনপদ থেকে জনপদে। কেউ ঠিকানা জানতে চাইলে জানিয়েছিলেন, ‘হাজার জনতা যেখানে সেখানে আমি প্রতিদিন ঘুরি’। নিঃসঙ্গ বালকবেলার সাথে তার বেড়েছিল ব্যবধান এই সাতটি বছরে। প্রিয় মেজ বৌদিকে লেখা চিঠি তার সাক্ষ্য দেয়, ‘... আমি কবি বলে নির্জনতাপ্রিয় হব, আমি কি সেই ধরণের কবি? আমি যে জনতার কবি হতে চাই, জনতা বাদ দিলে আমার চলবে কি করে? তাছাড়া কবির চেয়ে বড় কথা আমি কমিউনিস্ট, কমিউনিস্টদের কাজ-কারবার সব জনতা নিয়েই।’ (রেণু দেবীকে লেখা চিঠি, ১৩৫১ সনের বসন্তের প্রথম দিন, সুকান্ত সমগ্র)
কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী সুকান্ত, গণআন্দোলনের শরিক। অক্লান্ত; সারাদিন কাজ। ছাত্র ফেডারেশন, কিশোর বাহিনীর খুটিনাটি সাংগঠনিক সমস্ত দিকেই নজর রয়েছে তার, কেবল নিজের দিকে ছাড়া। হয়তো খাওয়াও হয়নি ঠিকমতো, গায়ে সেই একই জামা খানিক ময়লা! কালো, রোগা, ছিপছিপে একটি তরুন ছুটে মরছে মিছিল থেকে মিছিলে। পাড়ায় পাড়ায়। সংগঠন গড়ে তুলছে। পার্টি অফিসে কেটে যাচ্ছে সারাটা দিন। ফেরার সময় সামান্য ট্রাম-ভাড়া বাঁচাতে হাঁটছে ক্লান্ত শরীরে। শরীর শুকিয়ে আসছে। পরমুহূর্তেই জনতার স্লোগান-মুখরিত মিছিলে ফিরে পাচ্ছে ফের উৎসাহ। ব্যারিকেড গড়ে তুলছে কখনও, কখনও ভেঙে ফেলতে উদ্যত হচ্ছে পুলিশের ব্যারিকেড। কখনও যা-হোক কিছু খেয়ে, কখনও না-খেয়ে আবার ছুটছে কলকাতার এ-মাথা থেকে ও-মাথা অবধি। কখনও কখনও অন্য অন্য জেলাতে অবিভক্ত বাংলার। এমন জীবনই সুকান্ত নিজেকে দিয়েছিলেন।
ঘরের ছেড়ে পরের কাছে নিজেকে বিলোতে গিয়ে দিনের পর দিন এভাবে ক্ষুধায়, ক্লান্তিতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে গিয়েছে শরীর। ক্ষয়রোগ বাসা বেঁধেছে বুকে, খেয়াল ছিল না সেই দিকে। যক্ষা ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমাগত বুক থেকে পেটে। ফুসফুসের যক্ষার চিকিৎসা ততদিনে আবিষ্কৃত হলেও পেটের যক্ষার উত্তর নেই তখনও। এমনই চিকিৎসাতীত অসুখে, জীবনের শেষ ক'টা দিন, বড় একাকী কেটেছে তাঁর। জনকোলাহল থেকে দূরে যাদবপুর টিবি হাসপাতালে।
বছর পনেরোর সেই মৃত্যুবোধ কি ফিরে এসেছিল একুশে আবার? নাকি তা ছিলই? বরাবরই। মৃত্যুচিন্তা কিংবা বিষাদ কোনও সুকান্ত কি সারাক্ষণই লুকিয়ে রেখেছিলেন গোপনে কোথাও, অতি সন্তর্পনে— এমনকী যখন মিছিলে হাঁটছেন, তখনও?
জানি না আমরা, জানার উপায় নেই। জানি শুধু এবার আর বিলম্ব করেনি মৃত়্যু। কীসের যে অধীরতা, এত তাড়াহুড়ো ছিল?
এক ক্লিকেই ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটস্যাপ চ্যানেল
প্রকাশের তারিখ: ০৬-আগস্ট-২০২৫ |