|
কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা রোধ আইনের এক দশক অতিক্রান্তঈশিতা মুখার্জী |
পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আর্থসামাজিক সমস্যাগুলিকে ব্যক্তিগত আখ্যা দিয়ে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু বিশ্বের দ্বিতীয় নারীবাদী ঢেউয়ের প্রধান সিমন দি বোভেয়ার বলেছিলেন, ‘যা কিছু ব্যক্তিগত, তাই রাজনৈতিক।’ তাই কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা একটি রাজনীতিরই ফল। তা হল লিঙ্গবৈষম্যের রাজনীতি যা আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বৈষম্যের রাজনীতির আধারে নিহিত থাকে। …সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, কোভিড অতিমারির পর থেকে হেনস্থার ঘটনা নথিভুক্ত করার সংখ্যা এবং সমাধান হওয়ার সংখ্যার মধ্যে ফারাক বেড়েই চলেছে। আরও বেশি বেশি করে ঘটনা ঘটছে, অথচ আরও কম ঘটনার নিষ্পত্তি হচ্ছে। |
আমাদের দেশে কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা রোধের জন্য যে আইন, লোকমুখে যাকে বিশাখা নির্দেশিকা বলা হয়, তা রচিত হয় ২০১৩ সালে। এক দশক হয়ে গেল। কিন্তু এই আইন কি কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পেরেছে? ভারতের সমাজকে এখনই খতিয়ে দেখতে হবে এই আইন কর্মক্ষেত্রে কতটা লিঙ্গসাম্য আনতে পেরেছে। দশটা বছর নেহাত খুব কম সময় নয়। এই আইনকে সহজ ভাষায় POSH ACT বলা হয়, যা যৌন হেনস্থার ঘটনা কমানো, ঘটলে ব্যবস্থা নেওয়া এবং তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রচিত হয়েছিল। এই আইন কার্যকর করতে হলে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে ইন্টারনাল কমপ্লেন্টস কমিটি গঠন করার কথা। রাজ্যস্তরে প্রতিটি জেলায় আঞ্চলিক বা লোকাল কমপ্লেন্টস কমিটি তৈরি করার কথা। দশ বছর পড়েও ‘কথা’ শব্দটি ব্যবহার করছি কারণ, বহু কর্মক্ষেত্রে এই কমিটি আজও গঠন হয়নি। জেলাস্তরে আঞ্চলিক কমিটির অবস্থাও তথৈবচ। দেশে মাত্র ১৮% জেলায় এই কমিটি আছে এবং সেখানেও সব ধরণের কর্মক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এখন পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার আর জি কর হাসপাতালের যে ঘটনা নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে বিচারের দাবিতে, সে ঘটনা এক বর্বরতম ধর্ষণ এবং খুন। সেখানেও কিন্তু এই ইন্টারনাল কমপ্লেন্টস কমিটি নেই অর্থাৎ যৌন হেনস্থা সম্পর্কে অভিযোগ জানানোর কোনও সুযোগই ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের এক বেঞ্চ জানিয়েছে যে, দশ বছর পরেও এই আইন চালু করার ব্যাপারে গুরুতর শ্লথতা এবং অনিশ্চয়তা রয়েছে। তা যে আছে তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল ২০১৮ সালে, যখন আমেরিকার মত আমাদের দেশেও শুরু হয়েছিল সামাজিক মাধ্যমে #মি টু আন্দোলন। মূলত সরকারি, বেসরকারি ক্ষেত্রে কর্মরতারা ছাড়াও বলিউডে কর্মরতারা এই আন্দোলনে এগিয়ে এসেছিলেন। নিজেদের কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা নিয়ে তারা সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে সরব হয়েছিলেন আসল ঘটনা ঘটার বহুদিন পরে। তাঁরা জানিয়েছিলেন যে, হয় কমপ্লেন্টস কমিটি বা ICC তাঁদের কর্মক্ষেত্রে নেই, অথবা অভিযোগ করার ৫/৬ বছর পর্যন্ত কোনও সুবিচার পাননি। তাই এভাবে সোচ্চার হওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় তাঁদের কাছে খোলা নেই। কিন্তু তার পরেও কি ঘটনার সংখ্যা কমেছে আমরা বলতে পারি? সমস্যা হল, কোনও ঘটনা ঘটলে সমাজ তাকে ‘স্বাভাবিক’ বলে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং মিটমাট করে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। এ ছাড়াও আক্রান্ত মহিলার স্বভাব, পোশাক ইত্যাদিকে ঘটনার কারণ হিসেবে দেখানো হয়। পিতৃতন্ত্র, বিশেষ করে বাজার ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করা পিতৃতন্ত্র, মহিলা এবং তাদের শরীরকে পণ্য করে তোলে। তাই এই চিন্তাধারা ধীরে ধীরে এই ধরণের সমাজের মজ্জায় মজ্জায় ঢুকে যায়। এই আইনের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৯২ সালে। সেই সময় রাজস্থানের সরকারি সামাজিক প্রকল্পের স্বাস্থ্যকর্মী ভানোয়ারি দেবী (তখনও আশা কর্মীদের প্রকল্প দেশে চালু ছিল না, চালু থাকলে ভানোয়ারি দেবী আশা কর্মী হতেন) এক কন্যাশিশুর বিয়ে রোধ করতে গিয়ে দলবদ্ধভাবে ধর্ষিতা হন। এই মামলা যখন সুপ্রিম কোর্টে উঠল, তখন দেখা গেল বিচারধারায় এরকম অপরাধ রোধ করার কোনও আইন নেই। ১৯৯৭ সালে এই আইন প্রণয়ন করার জন্য বিশাখা নির্দেশিকা জারি করা হল। ভারতের সংবিধানের ১৫ নং ধারা এবং আন্তর্জাতিক কনভেনশন CEDAW যা আসলে সব ধরণের লিঙ্গবৈষম্য নির্মূল করার এক আন্তর্জাতিক নির্দেশনামা, সেই নির্দেশনামা মেনে এই আইন তৈরি করা হয়েছে। ভারত ১৯৮০ সালে CEDAWতে চুক্তিবদ্ধ হলেও নির্দেশনামাকে সরকারি স্তরে অনুমোদন দেয় ১৯৯৩ সালে। এই আইন এখনও পর্যন্ত কার্যকর শুধুমাত্র সংগঠিত ক্ষেত্রের জন্য। স্বনির্ভর বা প্রকল্প শ্রমিকদের জন্য এখনও এই আইন কার্যকর নয়। অথচ আশ্চর্যের কথা এই যে, এক প্রকল্প শ্রমিকের অভিযোগের ভিত্তিতেই কিন্তু এই ধরণের আইনের সূচনা হয়। এই আইন যে ব্যবহার করা হয়েছে, আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থায় এরকম উদাহরণ আছে। গোয়া সরকার বনাম অরেলিয়ানো ফার্নান্ডেজের মামলার ক্ষেত্রেই সুপ্রিম কোর্ট এই আইনের নড়বড়ে দিকগুলির বিষয়ে জানিয়েছিল। আইন বলবৎ করা নিয়ে দেশের সরকার এবং সমাজের দীর্ঘসূত্রিতাও স্পষ্ট। হেনস্থা এখনও পর্যন্ত খুবই ধোঁয়াটে একটি বিষয়। বিশেষ করে আইনে হেনস্থার সংজ্ঞায় সরাসরি শারীরিক যৌন হেনস্থা ছাড়াও কথাবার্তা, পরিবেশ সৃষ্টির কথাও বলা হয়েছে যা হেনস্থার সৃষ্টি করে। মহিলাদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে যে সব আইন রচিত হয়েছে, তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমাজ এবং গণমাধ্যম থেকে প্রশ্ন উঠেছে যে, ক্ষমতাশীল মহিলারাই তো এই আইনের অপব্যবহার করে কোনও পুরুষের বিরুদ্ধে সহজেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাতে পারেন। এই ধন্দ এখনও অনেকের মনে কাজ করছে। কিন্তু এই আইনে স্পষ্ট বলা আছে যে, অভিযোগকারিণীর বক্তব্য মিথ্যা প্রমাণিত হলে তিনি শাস্তি পাবেন। এ ছাড়াও হেনস্থার এই বিস্তৃত সংজ্ঞা সমাজ পরিষ্কারভাবে গ্রহণ করেছে কি? সমাজ কি সত্যিই বিশ্বাস করে যে, ‘না মানে না’? তাই বারবার মহিলাদের সাংবিধানিক অধিকার অর্থাৎ মৌলিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনে এই স্লোগান ওঠে — ’না মানে না।’ ভারতের সমাজ এখনও এই আইনকে প্রণয়নের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেনি যদিও বহু ঘটনা ঘটে চলেছে। ২০২১ সালে জাতীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন বিভাগ এবং এক কনসাল্টিং সংস্থা একটি সমীক্ষা করে ৪০০ জন পেশাদারি মহিলার ওপর। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২১ সালের আগে মাত্র ৮% এই আইন সম্পর্কে জানতেন। ১১% বলেছেন যে, যৌন হেনস্থার মতো একটি বিষয়ে অভিযোগ জানানোর বদলে তাঁরা চাকরিই বরং ছেড়ে দেবেন। অর্থাৎ তাঁরা বিষয়টি সঙ্কোচ, লজ্জা ও ঘৃণার চোখে দেখেন এবং দুষ্কৃতীর শাস্তির বদলে মরমে মরে থাকাই শ্রেয় বলে মনে করছেন। লিঙ্গবৈষম্যের ক্ষেত্রে এরকমটাই হয়। সকলেই মনে করেন এই ঘটনা ব্যক্তিগত, শুধুমাত্র তাঁর সঙ্গেই ঘটেছে। ঠিক যেমন স্বনিযুক্ত শ্রমিক কম মজুরি পেলে তিনি মনে করেন সমস্যাটা তাঁর ব্যক্তিগত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আর্থসামাজিক সমস্যাগুলিকে ব্যক্তিগত আখ্যা দিয়ে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু বিশ্বের দ্বিতীয় নারীবাদী ঢেউয়ের প্রধান সিমন দি বোভেয়ার বলেছিলেন, ‘যা কিছু ব্যক্তিগত, তাই রাজনৈতিক।’ তাই এই হেনস্থা একটি রাজনীতিরই ফল। তা হল লিঙ্গবৈষম্যের রাজনীতি যা আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বৈষম্যের রাজনীতির আধারে নিহিত থাকে। ওই সমীক্ষায় প্রকাশ যে, ৩৭% মানুষ যাদের মধ্যে মূলত মহিলা এই হেনস্থার শিকার হয়েছেন কর্মক্ষেত্রে। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা যায় যে ৪০% কর্মরতা মহিলা নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন, কিন্তু পরিচালন ব্যবস্থায় যারা আছেন তাঁদের মধ্যে ৫৩% ই আইনটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের কোম্পানিগুলি নিয়ে গত কয়েক বছর সমীক্ষা করেছে আশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রকল্প। তাতে জানা যায়, আমাদের দেশের কোম্পানিগুলি তাদের বার্ষিক রিপোর্টে যৌন হেনস্থার ঘটনা আরও বেশি বেশি করে উল্লেখ করেছে পরবর্তী বছরগুলিতে, কিন্তু যে হারে অভিযোগ জমা পড়েছে তার চেয়ে অনেক কম হারে তার সমাধান হয়েছে। অর্থাৎ এই বিষয়ে সামাজিক শিথিলতা প্রবল। সমাজের চোখে এটি একটি সাধারণ ভুল করার মত ঘটনা হলেও, আক্রান্ত মহিলার মননে এর স্থায়ী ট্রমার প্রভাব থেকে যায় দীর্ঘদিন, এমনকি সারা জীবনও। সারা পৃথিবীতে এমন মহিলা খুঁজেই পাওয়া যাবে না যিনি কোনও রকম হেনস্থার শিকার হননি। আক্রান্ত হওয়ার প্রভাব মারাত্মক এবং তা স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক স্থিতিকে আঘাত করে। বড় কোম্পানিগুলিতে এই ঘটনাগুলি বেশি নথিভুক্ত হয়, কিন্তু ছোট বা মাঝারি কোম্পানিতে অনেক কম ঘটনা নথিভুক্ত হয়। বেশি আয় থাকলে আক্রান্ত যে জোরের সঙ্গে অভিযোগ করতে পারেন, আয় যত কমে আসে, অভিযোগ করার জোর স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে। কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার বড় কারণ হল, এই হেনস্থা ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি পথ বা উপায়। এছাড়া এই হেনস্থা যদি আক্রান্ত মেনে নেন, তাহলে অনেক সময়ে আক্রান্ত পুরস্কৃতও হয়ে থাকে। ঠিক এই কারণেই অধস্তন মহিলা কর্মচারী তাঁর কর্তা বা কখনও কর্ত্রীর কথার অন্যথা না করে হেনস্থা মেনে নেন। এই হেনস্থার সাথে ক্ষমতার বিন্যাস ভীষণভাবে যুক্ত। তাই এই ঘটনা রাজনৈতিক। সমীক্ষায় দেখা যায় যে, কোভিড অতিমারির পর থেকে হেনস্থার ঘটনা নথিভুক্ত করার সংখ্যা এবং সমাধান হওয়ার সংখ্যার মধ্যে ফারাক বেড়েই চলেছে। আরও বেশি বেশি করে ঘটনা ঘটছে, অথচ আরও কম ঘটনার নিষ্পত্তি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে যত ঘটনা ঘটে তার একটি অংশ মাত্র সামনে আসে। মনে রাখতে হবে যদি সামনে আসা ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে আসল সংখ্যা কত গুণ বেড়েছে! এ ছাড়াও সংগঠিত ক্ষেত্রের সর্বত্র কোনও সমীক্ষা হয়নি। খুব কম সংখ্যক মানুষ এ নিয়ে কথা বলতে চান এবং জানাতে চান। সুপ্রিম কোর্ট বারবার জানিয়েছে এই আইন নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। কিন্তু কোথায় গিয়ে সবকিছু আটকে যায় আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না। সমস্যার সূত্র যখন ক্ষমতা, তখন ক্ষমতার জোরেই এই আইন বলবৎ হওয়া থেকেও নিবৃত্ত করা হয়। বিশেষ করে অসংগঠিত ক্ষেত্রে, গৃহসহায়িকাদের ক্ষেত্রে, আশা ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের ক্ষেত্রে এই আইন এখনও কার্যকর নয়। নারী আন্দোলন এ ধরণের সব ঘটনার বিরোধিতা করলেও, এই আইন কার্যকর করতে এবং এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সামাজিক আন্দোলনে জোর দেওয়া দরকার, দরকার গণ আন্দোলনের। যতদিন পর্যন্ত এ ধরণের ঘটনা শুধুমাত্র আক্রান্ত মেয়েটির ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে দেখা হবে, ততদিন পর্যন্ত এই হেনস্থা রোধ করার দাওয়াই পাওয়া যাবে না। সমাধান তো সামজিক উত্তরণের মাধ্যমে সম্ভব। তাই আন্দোলনও এক্ষেত্রে আইনের সহায়ক শক্তি। প্রকাশের তারিখ: ০৯-অক্টোবর-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |