কুম্ভযাত্রা: হিন্দুরাষ্ট্রের অভিসন্ধিতে ভরা পথ

সুভাষ গাটাডে
যখন মহাকুম্ভে অনুসরণ করা ভিআইপি কালচার বা মহারথী সংস্কৃতিকে এই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, ঠিক তখনই মুখ্যমন্ত্রী, দিনের পর দিন অভূতপূর্ব সুরক্ষা ব্যবস্থাপনার ঢক্কানিনাদের পর, আত্মবিশ্লেষণের পথে না হেঁটে দুর্ঘটনার দায় ভক্তদের কাঁধেই ঠেলে দিয়েছেন। এখন হয়ত বলাই যায় যে, এই দুর্ঘটনাটি সময়ের অপেক্ষা ছিল মাত্র। কারণ নানাভাবে বোঝা যাচ্ছিল যে, জাতীয় প্রচার মাধ্যমগুলি সহ সর্বত্র মহাকুম্ভ নিয়ে বিপুল প্রচারাভিযান চালানোর পর বিভিন্ন ‘পুণ্যতিথি’তে কত মানুষের সমাগম হতে পারে এ সম্পর্কে শাসকপক্ষের ন্যুনতম ধারণাও ছিল না। তারা কী জনসমাগম সামলানো সংক্রান্ত অতীত অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নিতে পারতেন না?

মহা-দুর্ঘটনার মহাকুম্ভে সরকারিভাবে স্বীকৃত ৩০ জনের জীবনহানি ও অগণিত মানুষের আহত হওয়ার ঘটনার পর উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ কি তার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সমর্থ হবেন? এটাই এই মুহূর্তে দিল্লির ক্ষমতা অলিন্দের চাপা প্রশ্ন।

অবশ্য প্রশ্ন উঠছে মহাকুম্ভ ঘিরে চালানো মহাপ্রচার- ‘বিশ্বের বৃহত্তম জমায়েত’ আর বিপরীতে বাস্তবের প্রস্তুতিহীনতার মাঝের ফাঁক নিয়েও।

এই বিশালাকার দুর্ঘটনার জন্যে কে দায়ী?

তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত প্রশাসনের অপদার্থতা লোকসমক্ষে প্রকাশিত হওয়ার পর ‘বিশ্বের বৃহত্তম জমায়েতের আয়োজক’ হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের আগামী পথ এখন যথেষ্টই কঠিন।

এই বিপর্যয়কে খাটো করে দেখানোর পরিকল্পিত চেষ্টাগুলি কীভাবে কয়েকদিন ধরে চালানো হয়েছে এনিয়ে সংবাদমাধ্যমে অনেক লেখালেখি হয়েছ। মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ উত্তর প্রদেশের একজন মন্ত্রী বিতর্কিত বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন, ‘এত বড়ো জনসমাগমে এ ধরনের ছোট ঘটনা ঘটেই থাকে।’

এই বিবৃতির পর এতটাই হুলুস্থুল পড়ে যায় যে তাকে ক্ষমা চেয়ে আবার একটি বিবৃতি দিতে হয়। অন্যদিকে ন্যুনতম দায়িত্ববোধহীন হয়ে দুর্ঘটনার খবর বাদ দিয়ে, লাগাতার সরকারি প্রচারণাগুলি প্রকাশ করে মূলধারার সংবাদ মাধ্যমগুলি তাদের নির্লজ্জতার ভূমিকায় এক নতুন অধ্যায় জুড়েছে।

জানা গেছে, পদপিষ্ট হয়ে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাকে সরকারিভাবে উত্তর প্রদেশ প্রশাসন স্বীকার করেছে দুর্ঘটনার ১৮ ঘণ্টা পর।

এমনটাও বলা হচ্ছে, কুম্ভমেলার দুর্ঘটনায় ‘পুণ্যাত্মাদের’ জীবনহানির ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টুইট প্রকাশিত না হলে, মৃত্যুর ঘটনা স্বীকার করতে হয়ত যোগী ও তার প্রশাসন আরো কয়েক ঘণ্টা সময় নিত।

যে বিষয়টি ভক্তদের আঘাতে নুনের ছিটে দিয়েছে তা হল, যখন মহাকুম্ভে অনুসরণ করা ভিআইপি কালচার বা মহারথী সংস্কৃতিকে এই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, ঠিক তখনই মুখ্যমন্ত্রী, দিনের পর দিন অভূতপূর্ব সুরক্ষা ব্যবস্থাপনার ঢক্কানিনাদের পর, আত্মবিশ্লেষণের পথে না হেঁটে দুর্ঘটনার দায় ভক্তদের কাঁধেই ঠেলে দিয়েছেন।

এখন হয়ত বলাই যায় যে, এই দুর্ঘটনাটি সময়ের অপেক্ষা ছিল মাত্র। কারণ নানাভাবে বোঝা যাচ্ছিল যে, জাতীয় প্রচার মাধ্যমগুলি সহ সর্বত্র মহাকুম্ভ নিয়ে বিপুল প্রচারাভিযান চালানোর পর বিভিন্ন ‘পুণ্যতিথি’তে কত মানুষের সমাগম হতে পারে এ সম্পর্কে শাসকপক্ষের ন্যুনতম ধারণাও ছিল না। তারা কী জনসমাগম সামলানো সংক্রান্ত অতীত অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নিতে পারতেন না?

ছ’মাসও হয়নি হাথরাস জেলায় এক স্বঘোষিত বাবার সৎসঙ্গে ৬০,০০০ মানুষ ধরার মত জায়গায় ২.৫ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়ে পদপিষ্ট হয়ে ১২১ জন, মূলত নারী ও শিশুর মৃত্যু ও শতশত মানুষের আহত হওয়ার ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটেছে।

এই মনুষ্য-সৃষ্ট বিপর্যয় যোগী প্রশাসনের ঘুম ভাঙানোর জন্যে যথেষ্ট ছিল কারণ সেই সময়ে তারা মহাকুম্ভের প্রচার শুরু করে দিয়েছিল। স্পষ্টতই বোঝা যায় তারা সচেতন ছিলনা।

কী করে এই দুর্ঘটনা ঘটল তা নিয়ে নিশ্চিত করে এখনও কিছু বলা যাচ্ছে না। একটি বিস্তারিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়া ছাড়া তা স্পষ্ট হওয়াও অসম্ভব।

তবে নিশ্চিতভাবেই, যে নির্লজ্জতায় এই দুর্ঘটনাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে এবং যেভাবে অপদার্থ যোগী প্রশাসনকে মহারথীদের আনাগোনা বন্ধ করতে বাধ্য করা হল, সর্বোপরি এই ৩০ জানুয়ারির সংখ্যায় দৈনিক ভাস্কর-এর মত অগ্রণী হিন্দি সংবাদ মাধ্যমে এই দুর্ঘটনার জন্যে দায়ী সরকারি কর্তাদের নাম অবধি বলে দেওয়া হল, তার থেকে যথেষ্টই অনুমান করা যায় যে এই মৃত্যুর জন্যে কারা দায়ী।

মহারথী সংস্কৃতির পোষকতা, ভক্তদের উপেক্ষা?

দুর্ঘটনার পর বন্ধ হওয়া মহারথীদের আনাগোনার কথাই ধরা যাক। মহারথীরা যাতে সঙ্গম অবধি নিজেদের যানে পৌঁছে যেতে পারে তার জন্যে আলাদা রাস্তা করে দেওয়া হয়েছিল যা ভক্তদের চরম ভোগান্তির মধ্যে ফেলে দেয়। ওই পথে সমস্ত যানবাহন বন্ধ করে দেওয়ার ফলে তাদেরকে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পায়ে হেঁটে যেতে হয়েছে। এ নিয়ে লাগাতার অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া সত্ত্বেও এই ব্যবস্থাপনা বিরামহীনভাবে চালিয়ে যাওয়া হয়েছে।

স্বলিখিত পুরাণকথায় বিশ্বাস করে যে সরকার নিজেকে বিশ্বগুরু ধরে নিয়ে অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেছে এটা তাদের চরম সংবেদনহীনতার দৃষ্টান্ত।

মহারথীদের যাতায়াতের অবারিত ব্যবস্থা করে দেওয়ার বোধগম্য কারণ বোধহয়, এর ফলে এই সমাগমের ‘মুখ্য আয়োজক’, তার মন্ত্রীসভার সদস্য, স্বজনবন্ধু ও তাদের অঙ্কশায়িত সংবাদ মাধ্যম সুযোগ করে দিয়েছে যাতে, নির্বিঘ্নে এগুলির ছবি তুলে, জনসমাগমের ‘অব্যর্থ ব্যবস্থাপনা’র তেল চকচকে গল্পগাথা ছড়ানো যায়।

ভক্তদের জন্যে ‘অভূতপূর্ব’ সুরক্ষা ব্যবস্থাপনার ঢাক পেটানো সত্ত্বেও এখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে প্রশাসন কুম্ভমেলার আগেকার দুর্ঘটনাগুলি থেকেও শিক্ষা নেওয়ার কোনো প্রয়োজন অনুভব করে নি। নিকট অতীতে ২০১৩ সালের কুম্ভের সময়ে প্রয়াগরাজ রেলস্টেশনের দুর্ঘটনা থেকেও নয়।

গরিমা সিং-এর পরিচালনায় মহাকুম্ভে পদপিষ্টতার দুর্ঘটনা নিয়ে নিউজ ২৪ চ্যানেলের একটি আলোচনায় পদকপ্রাপ্ত পুলিস অফিসার ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক বিভূতি নারায়ণ রাই যিনি ১৯৮০-র দশকের কুম্ভমেলার সময়পর্বে এলাহাবাদের ডিআইজি ছিলেন, তিনি বলেন, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নারায়ণ দত্ত তেওয়ারি (তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী, শেষবার ছিলেন ১৯৮৮-৮৯ পর্বে) কুম্ভমেলার এলাকায় মহারথীদের চলাফেরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনি এমনকী তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্যদের বলেছিলেন, নিরাপত্তা বেষ্টনীর কথা ভুলে পায়ে হেঁটে সঙ্গমে স্নান করার জন্যে।

প্রসঙ্গত যোগ করা যায়, সে সময়ের টাইমস অব ইন্ডিয়ার বরিষ্ঠ সাংবাদিক ও ট্রাফিক ইন দ্য এরা অব ক্লাইমেট চেঞ্জ, ওয়াকিং, সাইক্লিং, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নিড প্রায়োরিটি বইয়ের লেখক বিদ্যাধর দাতে তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছেন কীভাবে:

‘অতীতে কুম্ভমেলা অনেক উন্নতভাবে সংগঠিত হত। এতটাই উন্নত ছিল যে মুম্বাই ও হার্ভার্ড-কেন্দ্রিক স্থপতি ও অধ্যাপক রাহুল মেহরোত্রা ২০১৩ সালের শেষ এলাহাবাদ মেলা নিয়ে সুবিস্তৃত গবেষণা করে একটি পুস্তক প্রণয়ন করেন। বইটি যুগ্ম-সম্পাদনা করেছিলেন রাহুল মেহরোত্রা ও ফেলিপ ভেরা।

কুম্ভমেলা ম্যাপিং দ্য এফিমারেল সিটি নামের বইটিতে সাউথ এশিয়া ইনস্টিট্যুটের সমর্থনে নিয়ে প্রায় পঞ্চাশের অধিক হার্ভার্ডের অধ্যাপক, ছাত্র, প্রশাসনিক কর্মী ও চিকিৎসকের ২০১৩ সালে এলাহাবাদের কুম্ভমেলায় অবস্থান করে বিপুল জনসমাগমের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির সমীক্ষা রয়েছে’।

‘স্ব-বিপণন’: লজ্জা শরমের কেউ ধার ধারে?

শাসক পক্ষের যদি ভক্তদের ভোগান্তি নিয়ে ন্যুনতম সংবেদনশীলতা থাকত কিংবা এ নিয়ে কোনো পূর্বানুমানের কথা ভাবা থাকত, তবে কোনো অবস্থাতেই মহারথীদের আসা-যাওয়ার বিষয়টি রাখা হত না। এমনটা করা হলে বহু নিরীহ ভক্তের প্রাণ বাঁচতো।

প্রকৃতপক্ষে, এই দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা বারবার দেখিয়েছেন, কীভাবে এই ভক্ত সমাগমকে স্ব-বিপণনের একটি উপলক্ষ্য করে ফেলা হয়েছে। কীভাবে ভক্তদের ভোগান্তি গৌণ হয়ে গেছে এবং কীভাবে মহাকুম্ভকে রূপান্তরিত করা হচ্ছে ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উত্তরসূরী হিসেবে আদিত্যনাথের স্ব-বিপণনের আখ্যানে’।

এটা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে এই দুর্ঘটনা নিশ্চিতভাবেই ‘মোদী-যোগী বেসুরো সম্পর্ক’ কে আরো অবনতি দিকে নিয়ে গেছে এবং কিছুদিনের জন্যে হলেও ভারতীয় জনতা পার্টির প্রাতিষ্ঠনিকতায় যোগীর দ্বিতীয় নম্বরে উল্লম্ফনের ছকে প্যাঁচ খেয়ে গেছে।

যোগীর ছক আপাতত ভেস্তে যদিও বা গেছে, এই মহাসমাগমের কিন্তু এটাই একমাত্র উপাখ্যান নয়।

ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাসনা চরিতার্থতা ব্যতিরেকে, এই মহাসমাগমকে হিন্দুত্বপন্থী আধিপত্যবাদী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও তাত্ত্বিকরা একে  হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের পথে একটি ধাপ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে।

ভূয়ো গল্পগাছা ছড়িয়ে ভক্তদের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আরো কোণঠাসা কর,  আরো দূরে ঠেলে দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদী ছক থেকে শুরু করে সাধু সন্তদের সমাবেশ ঘটিয়ে (ইতিমধ্যেই তাদের প্রভূত অর্থ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে) তাদের উচ্চকিত ভাষণকে ব্যবহার করার মাধ্যমে ‘হিন্দুরা প্রথমে’র দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বাভাবিক গ্রাহ্যতায় আনার জন্যে যা যা করা দরকার সবকিছুই তারা করেছে।

আইনী পথেই কি মুসলিমদের কোণঠাসা করা হবে?

কয়েকমাস আগে কাঁওয়ার যাত্রার প্রাক্কালে (জুলাই ২০২৪) মুজফফরনগর প্রশাসন এক নির্দেশিকা প্রকাশ করে বলেছিল যে যাত্রা পথের সকল দোকানীকে তাদের দোকানের সামনে মালিক ও কর্মচারীদের নাম টাঙিয়ে রাখতে হবে।

এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যেই নয়, যারা একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভারতের স্বপ্ন দেখে সেই সমস্ত ব্যক্তি সংগঠনের মধ্যেও আতঙ্কের জন্ম দেয়। প্রতিবাদের জেরে সেই নির্দেশনামাটি ‘পরামর্শ’-এ পরিবর্তিত হয়।

পরবর্তীতে যোগী সরকার নিজেই একই ধরনের নির্দেশনামা জারি করে যা উত্তরাখণ্ড ও মধ্যপ্রদেশ সরকারও (উভয়ই বিজেপি পরিচালিত) অনুসরণ করেছে। ভারতের উচ্চতম আদালত অন্তর্বর্তী আদেশে বিভিন্ন সরকারের জারি করা এই নির্দেশগুলি স্থগিত রেখেছে।

পরে দেখা গেল আনুষ্ঠানিক নির্দেশনামা না থাকলেও বিভিন্ন জায়গায় দোকানীরা ‘স্বযাচিত হয়ে’ নামফলক টাঙিয়ে রেখেছে। যদিও কোনো প্রমাণ নেই হুমকির মুখে মুসলিমদের কোণঠাসা করে হিন্দুত্বের কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হয়েছিল কিনা।

মহাকুম্ভ এই অপশক্তিগুলিকে সুযোগ করে দিয়েছে মুসলিম ব্যবসায়ীদের ওপর আক্রমণ আরো তীব্রতর করে‘ বিশ্বের বৃহত্তম জনসমাগম’-এর দৃশ্যমানতার বাইরে ছুঁড়ে ফেলার।

কুম্ভমেলা শুরু হওয়ার আগেই নানা অজুহাত তুলে এই মহাসমাগমে মুসলিমদের নিষিদ্ধ করার আলোচনাগুলি মনে পড়বে। এই কথাগুলি যে শূন্যগর্ভ ছিল না সেটা বোঝা গেল কুম্ভমেলা শুরু হতেই। এই মেলার শতাব্দী প্রাচীন সমন্বয়ের ঐতিহ্যকে বিনষ্ট করে দেওয়া হল এদের অপতৎপরতায়।

মধ্য জানুয়ারিতে যখন উৎসবের দিন এগিয়ে আসছে তখন অখিল ভারতীয় আখড়া পরিষদ নামের ১৩টি আখড়া সংগঠনের পরিচালকমণ্ডলী সিদ্ধান্ত নেয় যে,  মেলায় ‘অ-সনাতনী জনগণ’ অর্থাৎ যারা বিশুদ্ধ অর্থে হিন্দু ধর্মের অন্তর্গত নয় তারা দোকান দিতে পারবে না বা তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।

ঘটনা আরো গড়ানোর পর দেখা গেল এই পৃথকীকরণের আরো বিপজ্জনক কর্মসূচিও তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে।

পদপিষ্টতার দুর্ঘটনার দুর্ভাগ্যগ্রস্ত মৌনী অমাবস্যার আগের দিন বিভিন্ন আখড়ার সাধু সন্তদের নিয়ে ‘সনাতন ধর্ম সংসদে’-র আয়োজন করা হয়েছিল মহাকুম্ভে। এই সভায় দেশের বিদ্যমান নানা ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেওয়ার ভয়ঙ্কর সমস্ত প্রস্তাব কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পেশ করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

প্রস্তাবগুলির মধ্যে ছিল অর্ডিন্যান্স জারির মাধ্যমে সনাতন হিন্দু বোর্ড গঠন করে দেশের সমস্ত মন্দির সরকারের হাত থেকে সাধু সন্তদের হাতে তুলে দিয়ে রাম মন্দিরের ধারায় কৃষ্ণ জন্মভূমি বিতর্কের নিষ্পত্তি করা।

লক্ষ্যনীয় বিষয় হল আখড়া পরিষদ এই সভায় যোগ দেয় নি কারণ তারা সনাতন বোর্ড গঠনের বিরোধী। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের উৎসাহ প্রদর্শনের দৌলতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে মন্দিরগুলিকে মুক্ত করার আলোচনা ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছে। অতীতে সাধু সন্তরা নিজেদের গোষ্ঠী তৈরি করে কী ভাবে মন্দির পরিচালনার নামে অর্থ আত্মসাৎ করত সেই বিষয়গুলি এই পশ্চাৎমুখী আলোচনায় স্থান পায়নি।

প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী এই গোষ্ঠীগুলি মন্দির সমূহের তহবিল জনস্বার্থে ব্যবহার করার লক্ষ্যে নেওয়া সমস্ত উদ্যোগের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত।

স্বাধীনতার পর সমাজ সংস্কারকদের পক্ষ থেকে মন্দিরগুলিকে ব্যক্তিসমূহের কুক্ষি থেকে ‘মুক্ত’ করে আনার সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল।

হিন্দুরাষ্ট্র অভিমুখী সংবিধান: দেশদ্রোহিতা নয়?

সম্ভবত যেদিন সনাতন বোর্ড গঠনের আহ্বান জানানো হয় সেদিনই খবর বেরোয় যে প্রস্তাবিত ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্র’-এর সংবিধানও চূড়ান্ত করা হয়ে গেছে যা মহাকুম্ভে ২ ফেব্রুয়ারি বসন্ত পঞ্চমীর দিন প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রেরণ করা হবে।

২৫জন গবেষকদের নিয়ে গঠিত একটি সমিতি রামায়ণের অনুপ্রেরণা, শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা, মনুস্মৃতি ও চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের বিধি অনুসরণ করে ৫০১ পৃষ্ঠার এই নথি প্রস্তুত করেছে। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, বারাণসীর সম্পূর্ণানন্দ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় ও নতুন দিল্লির কেন্দ্রীয় সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নিয়ে তৈরি ‘হিন্দু রাষ্ট্র সংবিধান নির্মাণ সমিতি’ এই খসড়া প্রস্তুত করেছে।

ভয়াবহ দিকটি হল যে এই সমিতির পৃষ্ঠপোষক সাংবাদিকদের খোলাখুলি জানিয়েই দিয়েছেন যে ‘তাদের লক্ষ্য হল ২০৩৩ নাগাদ ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা’।

স্বাধীন ভারতের জন্য এভাবে নতুন সংবিধানের প্রস্তাব করা যে এবারই প্রথম ঘটে নি তার স্বপক্ষে যথেষ্ট তথ্য উপাত্ত রয়েছে। ১৯৯২ সালে বাবরী মসিজদ ধ্বংসের পরপরই ডাকা সাংবাদিক সম্মেলনের কথা স্মরণ করা যেতে পারে।

তফাৎটা মাত্র এটাই যে সেই সাংবাদিক সম্মেলনটি তখনকার প্রধান বিরোধী দল বিজেপির এক সাংসদের বাড়িতে ডাকা হয়েছিল।

রাম মন্দির আন্দোলনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত স্বামী মুক্তানন্দ ও বামদেও মহারাজ (ইন্ডিয়া টুডে, ৩১ জানুয়ারি, ১৯৯৩) সেই সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তা ছিল।

‘‘এই সংবিধান ‘হিন্দু বিরোধী’, অতএব একে পরিত্যাগ করতে হবে। এদেশের আইনে আমাদের কোনো আস্থা নেই। সাধুরা দেশের আইনের উর্ধে।’’

অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকারও সংবিধান বদলের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে সরকার ২০০৪-এ পরাস্ত হয়ে বিদায় নেয়। ভারতের প্রধান বিচারপতি এম, এন, ভেঙ্কচালাইয়ার নেতৃত্বে এই মর্মে একটি আয়োগও গঠন করেছিল সেই সরকার।

একটা কথা আমাদের জেনে রাখা উচিত যে, এই অপতৎপরতাগুলি কিছুতেই বন্ধ হবে না কারণ হিন্দুত্বের শক্তিগুলি সর্বদাই ভারতের সংবিধান অস্বস্তিবোধ করে। এখন অবধি, তাদের লক্ষ্যপথে সবচেয়ে বড় বাধা সংবিধান।

ফলে একটি ত্রিমুখী নীতিগত অবস্থান অপেক্ষমান আমাদের জন্যে। এক, সংবিধানকে রক্ষা করা। দুই, এই আধিপত্যবাদীদের স্বরূপ উন্মোচন করা। তিন, সামাজিক রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে সরলমনা সাধারণ মানুষকে এই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির খপ্পর থেকে বের করে আনা।

 

ঋণ: কাশ্মীর টাইমস, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
ভাষান্তর: শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার   


এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ, ফলো করুন আমাদের Whatsapp Channel

 


প্রকাশের তারিখ: ০৫-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org