কুড়মি আন্দোলনের শিকড়ের খোঁজে

কুমার রাণা
এমন একটা সমাজে যেখানে জাতিগত নিপীড়নের কারণে মানুষের স্বাভাবিক গতি ও উন্নতি রুদ্ধ হয়, সেখানে তার সামনে দুটো পথ থাকে। একটা হল, সমবেত হয়ে এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করা, এবং যে ব্যবস্থা এই নিপীড়নের জন্ম দেয় তাকে উৎখাত করে নতুন, সকলের জন্য সমমর্যাদাপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আর দ্বিতীয়টা হল, নিজেদের জন্য এই নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার অধিকারী অংশের— এলিট ক্লাবের— সদস্যতা জোগাড় করে ফেলা। দুটো প্রক্রিয়াই কঠিন। কিন্তু স্পষ্ট জেনে রাখা দরকার, দুটো প্রক্রিয়া শুধু  স্বতঃবিচ্ছিন্নই নয়, ঘোর পরস্পরবিরোধী। একটা মানুষকে সম্মুখপানে নিয়ে চলে, অন্যটা পশ্চাতে।

পশ্চিমাঞ্চলে কুড়মি-মাহাতদের আন্দোলন গতি পেয়েছে। ঝাড়গ্রাম-বাঁকুড়া পুরুলিয়া অঞ্চলে মাঝে মাঝেই রেল ও রাস্তা রোকোর মধ্যে দিয়ে আন্দোলনের সমর্থকরা সরকারের কাছে নিজেদের দাবি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তাঁদের প্রধান দুটো দাবি হল, কুড়মি-মাহাতদের আদিবাসী (এসটি তফসিলি জনজাতি) তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্তি এবং কুড়মালি ভাষার স্বীকৃতি। এই মুহূর্তে বোধ হয় বেশি জোর পাচ্ছে তাঁদের তফসিলি জনজাতি (এসটি) তালিকায় অন্তর্ভুক্তি। 

অপরদিকে, সংবাদে প্রকাশ, তফসিলি জনজাতিভুক্ত, বিশেষত সংখ্যাবহুল সাঁওতালরা এই দাবির বিরুদ্ধে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সুতরাং আন্দোলনটি এখন আর রাষ্ট্রের কাছে জনসমাজের দাবি আদায়ের একমুখী বিষয় হয়ে থাকছে না। বরং, দুই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত— এমনকি সঙ্ঘর্ষেরও— সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলে এক ভয়াবহ পরিণতির সংকেত দিচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চল জনগোষ্ঠীগত আন্দোলন দেখেছে, বিশেষত ১৯৮০-৯০-এর দশকে এই অঞ্চলে ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে, এই অঞ্চলের দুই বৃহৎ জনগোষ্ঠী, সাঁওতাল ও কুড়মি মাহাতরা সেই আন্দোলনে, একত্রে, একান্ত আত্মীয়ভাবে লড়েছেন (এ প্রসঙ্গে লেখার শেষের দিকে ফিরে আসবো)। অথচ আজ এক ভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ ও সমাবেশে এই দুই, প্রধানত শ্রমজীবী, জনগোষ্ঠীর বৈরীভাবে পরস্পরের মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে, অবিলম্বে প্রশমিত না করতে পারলে যা এক মহা সামাজিক-রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

উল্লেখ করে রাখা দরকার যে, কুড়মি মাহাতরা ব্রিটিশ ভারতে তফসিলি জনজাতি তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তৎকালীন ভারত সরকার ১৯৩১ সালে তাঁদের নাম জনজাতি তালিকা থেকে বাদ দেয়। অবশ্য, নাম বাদ দেওয়াটা সরকারের পক্ষে সহজ হয়েছিল কুড়মি-মাহাতদেরই এক বড় আকারের আন্দোলনের কারণে। ঊনবিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকের মধ্যে কুড়মি-মাহাতরা একটা আন্দোলন গড়ে তোলেন— তাঁদের মধ্যেকার শিক্ষা, রাজনীতি ও সামাজিক ক্ষমতার দিক দিয়ে প্রভাবশালী এক গোষ্ঠী সমগ্র কুড়মি-মাহাতদের হিন্দু জাতি-শৃংখলার মধ্যে ক্ষত্রিয় মর্যাদার দাবি তোলেন। তাঁরা বিহারের কুর্মি, মহারাষ্ট্রের কুনবি, গুজরাটের পটেলদের সঙ্গে নিজেদের পরিচিতির যোগসাধনের সন্ধানের মধ্য দিয়ে এক সর্বভারতীয় জাতি-পরিচিতির ভিত্তি গড়ে তুলতে চান। তাহলে আজ বিপরীত দাবি কেন? বিষয়টা সহজ নয়। আমরা এখানে এর উত্তর খোঁজার একটা চেষ্টা করব।

ভারতের সমাজব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল জাতি বিভাজন। এই বৈশিষ্ট্যে মানুষের মর্যাদা, তার কর্ম, ক্ষমতা, অধিকার এবং বিকাশের সম্ভাবনার পূর্বশর্তই হল, সে কোন জাতিতে জন্মেছে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, ইত্যাদি উচ্চকুলে জন্মালে সামাজিক-আর্থিক উন্নতির যে নিশ্চয়তা থাকে, নীচু জাতে জন্মালে তা থাকে না। তাই ভারতের নানা প্রান্তে 'নীচু' জাতির লোকেদের মধ্যে হিন্দু জাতি-শৃংখলার ওপরের ধাপে ওঠার একটা প্রচেষ্টা বরাবরই খুব জোরালো ছিল। স্বাভাবিকভাবেই ভারতবর্ষের ধর্মীয় হেজিমনি এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দক্ষিণ ভারতে কুর্গদের এই জাতি-সোপানে উত্তরণের আন্দোলন নিয়ে এম.এন. শ্রীনিবাস তাঁর বিখ্যাত গবেষণায় এই প্রচেষ্টাকে সংস্কৃতায়ন বলে বর্ণনা করেন। শ্রীনিবাসের মতে, ‘সংস্কৃতায়ন হচ্ছে এমন এক প্রক্রিয়া যার সাহায্যে কোনও নীচু জাতি বা জনজাতি অথবা অন্য কোনও গোষ্ঠী উঁচু জাতে উত্তরণের পথে তার রীতি-রেওয়াজ, আচার, মতাদর্শ এবং জীবনযাত্রা বদলে ফেলে।’

এই সংস্কৃতায়ন প্রক্রিয়া, বা সামাজিক ঊর্ধ্বগতি (আপওয়ার্ড সোশাল মবিলিটি) ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এটা গোষ্ঠীগতভাবেই সম্ভব। যেমন, এই বঙ্গদেশে নয়টি জল-অচল জাতি সামাজিক ঊর্ধ্বগতির প্রক্রিয়ায় নিজেদের জল-চল করে তোলে, কিন্তু বহু জাতি তা করতে না পেরে জল-অচলই থেকে যায়। 

জল-অচল কথার অর্থ হল ব্রাহ্মণ যার ছোঁয়া জল খাবে। ‘ব্রাহ্মণ আমার ছোঁয়া খাবে’— এই আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দুটো আলাদা কিন্তু গভীরভাবে সংযুক্ত দিক ছিল।

প্রথমটা মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি। অস্পৃশ্যতা এমন একটা ব্যবস্থা যেখানে মানুষ এমন একটা ‘অপরাধ’-এর দণ্ডভোগ করছে, যে অপরাধ করা না করাটা তার হাতে কখনই ছিল না। কারণ তার জন্ম সম্পূর্ণত এমন একটা জৈবিক সংঘটন, যা তার পক্ষে কোনওভাবেই নিয়ন্ত্রিত করা সম্ভব না। অথচ, এর শাস্তি হিসেবে তাকে, এবং তার পর-প্রজন্মকে অচ্ছুত হয়ে থাকতে হল। একটা কারণ অবশ্য বলা হল। সেটা হল, ‘তুমি পূর্বজন্মে যে পাপ করেছিলে, তার কারণেই তোমার নীচ কুলে জন্ম।’ এই পূর্বজন্মের ব্যাখ্যাটা আবার দ্বিতীয় দিকটার সঙ্গে যুক্ত: ‘এ জন্মে উঁচু জাতির সেবা কর, পরের জন্মে মুক্তি লাভ করবে।’ অর্থাৎ, তুমি যা উৎপাদন করবে, সেই শ্রমের ফসলে তোমার কোনও হক থাকবে না, তার পুরোটাই দখল করবে সমাজের সেই অংশ, যে শ্রম করে না। করে না শুধু নয়, শ্রম না করাটাই তার জন্য সামাজিক বিধান। যেমন, ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য উঁচু জাতির লোক লাঙ্গল ধরবে না! সোজা কথায়, সমাজের উৎপন্ন দ্রব্য কীভাবে বণ্টিত হবে তার ব্যবস্থা হল জাতিকাঠামোর মধ্য দিয়ে: উঁচু জাতে জন্মালে হবে শাসক, শিক্ষক, আমলা, ইত্যাদি,আর নীচু জাতে জন্মালে হবে খেতমজুর, ডোম, চামার, প্রভৃতি। দুইয়ের মধ্যে প্রধান দুটি পার্থক্য, একপক্ষকে দেহশ্রম করতে হয় না, কিন্তু সামাজিক উৎপন্নের প্রায় পুরোটাই সে ভোগ করে, আর দ্বিতীয় পক্ষের জন্য নির্দিষ্ট থাকে দিবারাত্র হাড়ভাঙা পরিশ্রম, মানুষের বর্জ্য বহন থেকে শুরু করে যাবতীয় অমানুষিক কাজ, যার বিনিময়ে উদরপূর্তির নিশ্চয়তাটুকুও জোটে না। শুধু তাই নয়, নীচু জাতে জন্ম নেওয়া কোনও লোক পরিবেশ-পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে উন্নতির পথে এগোতে চাইলেও অনেক সময়ই তার জাতিই তার পথ আটকে দাঁড়ায়। একটা কাহিনি বলি। আমাদের গ্রামের তেলি জাতির এক মানুষ কলকাতা শহরে এসে ভাতের হোটেলে ফাই-ফরমাস খাটতে খাটতে রান্নার কাজ শিখে ফেলেন। কিন্তু রান্নার ‘ঠাকুর’কে ব্রাহ্মণ হতে হবে, অন্য কেউ রান্না করলে সে-হোটেল চলবে না। তা আমাদের গ্রামের সেই ব্যক্তি নিজের পদবি বদলে চক্রবর্তী পদবি এবং গলায় পৈতা পরে রান্নার কাজ আরম্ভ করলেন, এবং নিজের মালিকানায় একটা হোটেলও কিনে ফেলেছিলেন। বাদ সাধল, জাতি। জাতি-পরিচয় জানাজানি হয়ে যাবার পর তাঁর হেনস্থার একশেষ। তিনি গ্রামে ফিরে গিয়ে চাষবাস করে সংসার নির্বাহ করতে বাধ্য হলেন। জাতি-পরিচয় লুকোনোর জন্য হাজারে হাজারে লোকে নিজেদের পদবী বদলাচ্ছে, এমন উদাহরণ বিরল নয়।

এমন একটা সমাজে যেখানে জাতিগত নিপীড়নের কারণে মানুষের স্বাভাবিক গতি ও উন্নতি রুদ্ধ হয়, সেখানে তার সামনে দুটো পথ থাকে। একটা হল, সমবেত হয়ে এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করা, এবং যে ব্যবস্থা এই নিপীড়নের জন্ম দেয় তাকে উৎখাত করে নতুন, সকলের জন্য সমমর্যাদাপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আর দ্বিতীয়টা হল, নিজেদের জন্য এই নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার অধিকারী অংশের— এলিট ক্লাবের— সদস্যতা জোগাড় করে ফেলা। দুটো প্রক্রিয়াই কঠিন। কিন্তু স্পষ্ট জেনে রাখা দরকার, দুটো প্রক্রিয়া শুধু  স্বতঃবিচ্ছিন্নই নয়, ঘোর পরস্পরবিরোধী। একটা মানুষকে সম্মুখপানে নিয়ে চলে, অন্যটা পশ্চাতে।

প্রথম প্রক্রিয়াটা বোধ হয় অধিকতর কঠিন, কারণ প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে লড়বার জন্য এমন এক নতুন চেতনা ও মতাদর্শের প্রয়োজন হয়, যে চেতনা ও মতাদর্শের উন্মেষ ও পুনরুদ্ভাবনে প্রচলিত সমাজব্যবস্থা নানাভাবে বাধা দেয়। যেমন, জাতিগত নিপীড়ন যে আসলে এক বিশেষ ধরনের উৎপাদন ও বণ্টন প্রক্রিয়া, এবং জাতিগত নিপীড়ন দূর করতে হলে এই উৎপাদন ও বণ্টন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে হবে। কিন্তু, এই চেতনার বিকাশ ঘটাতে গেলে আবার কিছু প্রারম্ভিক চালকের দরকার হয়— যেমন, আধুনিক শিক্ষা, বিশ্বপৃথিবীর প্রাকৃতিক ও সামাজিক গতি প্রকৃতি সম্পর্কে তথ্যাবলী, এবং সর্বোপরি জাতিচৈতন্যের আচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত এক নতুন নেতৃত্ব। অপরপক্ষে, দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটার জন্য এত কিছুর প্রয়োজন হয় না, জাতিগত নিপীড়ন হাজার হাজার বছর ধরে ভারতীয় সমাজের মজ্জাগত, এবং এই সামাজিক বিভাজনটি মানুষ জন্মজাত ভাবে দেখে, শেখে ও আত্মস্থ করে।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে কুড়মি মাহাতদের ক্ষত্রিয় মর্যাদাভুক্তির দাবিতে আন্দোলন, প্রকৃতপক্ষে, এই দ্বিতীয় প্রক্রিয়ার প্রকাশ। শুধু কুড়মি মাহাতরাই নন, সেই সময় নীচু জাতের অনেক গোষ্ঠীই নিজেদের ক্ষত্রিয় পরিচিতি তুলে ধরতে থাকেন। যেমন মাল (মল্লক্ষত্রিয়), বাগদি (বর্গক্ষত্রিয়), পোদ (পৌন্ড্রক্ষত্রিয়), আগুরি (উগ্রক্ষত্রিয়) প্রভৃতি। আবার কোনও কোনও জাতি নিজেদের উৎস থেকে বিযুক্ত হয়ে জাতি-কাঠামোর অপরের দিকে স্থান করে নেন। তিলি, সদগোপ, মাহিষ্য, প্রভৃতি এর উদাহরণ। যাই হোক, অন্যান্যদের মতোই কুড়মিদের মধ্যকার কিছুটা সক্ষম হয়ে ওঠা একটা অংশ যখন দেখলেন যে, শিক্ষায়, রাজনীতিতে, চাকরি, বা পেশাগত জীবিকাতে হিন্দু উঁচু জাতের লোকের একাধিকার, তাঁদের মনে হল, সামাজিক-আর্থিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার একমাত্র উপায় নিজেদের জন্য জাতি-কাঠামোর ওপরের দিকে জায়গা করে নেওয়া।

কিন্তু, ১৯৩০-র দশকের পরের, এবং আরও স্পষ্টভাবে, স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতিতে এমন কিছু পরিবর্তন দেখা দিল, যা কুড়মি-মাহাতদের মতো জাতিগুলোর পূর্বতন দাবিটাকে আত্মঘাতী প্রমাণিত করল: তাঁরা না পারলেন জাতি-কাঠামোর প্রকৃত ক্ষমতাবান অবস্থানে পৌঁছোতে (সেটা সম্ভব ছিল না, কারণ এটা কেবল নাম বা জাতিগত মর্যাদা পরিবর্তনের ব্যাপার নয়, এর যোগ উৎপাদনের প্রক্রিয়া ও বণ্টনের সঙ্গে), না পেলেন চাকরি, শিক্ষা ও সংসদীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতে সংরক্ষণের সুযোগ। কিন্তু অন্যদিকে, খুব ধীরে হলেও, কুড়মি-মাহাতদের মধ্যে স্কুলশিক্ষার ও উচ্চতর শিক্ষার কিছু বিকাশ শুরু হয়। অর্থাৎ, তাঁদের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার দিক দিয়ে অগ্রসর অংশটি প্রসারিত হয়— যে সময় ক্ষত্রিয় আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল সে সময়ের তুলনায় কুড়মি-মাহাতদের মধ্যে আলোকপ্রাপ্ত অংশটি অনেক বেশি পরিব্যাপ্ত হয়ে ওঠে। ক্ষমতার অলিন্দে জায়গা করে নেওয়ার জন্য এই অংশটির সামনে হাজির হয় আলাদা ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দাবির মতো আঞ্চলিকতা ও জাতিসত্তার জটিল মিশ্রণে জেগে ওঠা এক আন্দোলন। এই আন্দোলন, এবং তার সঙ্গে সংযুক্তভাবে অন্যান্য অনেক সামাজিক ও বিদ্যাচর্চাগত অগ্রগতি, কুড়মি-মাহাতদের মধ্যে একটা ভিন্ন পরিচিতিসত্তা জাগ্রত করে তোলে— তা হল নিজেদের জনজাতীয় উৎসের সন্ধান। সাঁওতাল-মুণ্ডা-হো প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁরা অধিক আত্মীয়তা খুঁজে পেলেন, সারনা ধর্মাচরণ, নিজেদের বৃহত্তর খেরোয়াল নৃগোষ্ঠীর অংশীদার দাবি করা, ঝুম্যের (ঝুমুর) গান থেকে নিয়ে শুরু করে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ, নিজেদের কুড়মালি ভাষিক পরিচিতি তুলে ধরা, ইত্যাদির মধ্য দিয়ে গোটা ১৯৮০-৯০ দশক জুড়ে কুড়মি-মাহাতরা অন্যান্য ঝাড়খণ্ডী আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে একত্রে পথ হেঁটেছেন। সে-দিক দিয়ে দেখতে গেলে, এটা ছিল একটা ভিন্নতর সংহতির প্রক্রিয়া— শ্রমজীবীদের মধ্যকার ভিন্ন ভিন্ন ভাষিক-সাংস্কৃতিক বিভাজনগুলোকে গৌণ করে তুলে এক অভিন্ন আঞ্চলিক-জাতিসত্তাগত পরিচিতি গড়ে তোলা। এটি প্রত্যক্ষভাবে শ্রমজীবীদের শ্রেণিগত লড়াই ছিল না, সেটা ঠিকই; কিন্তু এর মধ্যে শ্রেণি উপাদানের অস্তিত্ব ও গতিশীলতা যে ভালমতোই ছিল সেটাও অস্বীকার করার উপায় নেই।

যাই হোক, একদিকে আর্থিক বিশ্বায়ন ও তথাকথিত মুক্তদ্বার অর্থব্যবস্থার উদ্ভব এবং অন্যদিকে দেশে নানান জটিল রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির কারণে কুড়মি-মাহাতদের রাজনৈতিক আকাংক্ষার পুনর্বিন্যাস ঘটতে থাকে। সব চেয়ে বড় কথা, ঝাড়খণ্ড রাজ্যের আন্দোলন আংশিকভাবে সফল হওয়ার কারণে, অর্থাৎ কেবল পূর্বতন বিহার প্রদেশের দক্ষিণভাগের কয়েকটি জেলাকে নিয়ে ঝাড়খণ্ড রাজ্যটি গঠিত হওয়ার ফলে, পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাংশে প্রভাবশালী ঝাড়খণ্ড আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কুড়মি-মাহাতরা ক্ষমতার অলিন্দে জায়গা করে নিতে পারলেন না। এই জায়গা থেকেই কুড়মি-মাহাতদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ বাড়তে থাকে। সেই বিক্ষোভকে আবার খানিকটা সমর্থন দেয় ঝাড়খণ্ড সরকারের একটি পদক্ষেপ— বিধানসভায় কুড়মি-মাহাতদের জনজাতি তালিকাভুক্ত করার ব্যাপারটা অনুমোদিত করে নেওয়া, যদিও ভারত সরকার এখনও এটাকে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু, ঝাড়খণ্ডের কুড়মি-মাহাতদের সঙ্গে পশ্চিমবাংলার কুড়মি-মাহাতদের একটা বড় তফাত হল, ঝাড়খণ্ডে কুড়মি-মাহাতদের রাজনৈতিক ক্ষমতায় জায়গা করে নিতে পারার একটা ধারাবাহিক ইতিহাস আছে। দ্বিতীয়ত, ঝাড়খণ্ড সরকার যে কুড়মি-মাহাতদের জনজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায় সেটা বিধানসভার অধিবেশনেই ঘোষিত। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ছবিটা অন্যরকম। এখানে বামপন্থী আন্দোলন, জমি-দখল, মজুরি-বৃদ্ধি, বনরক্ষা, সর্বোপরি ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে কুড়মি-মাহাতদের মধ্যে নেতৃত্বকারী অংশটি প্রসারলাভ করেছে, আবার এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে আকাঙ্ক্ষাও বিকশিত হয়েছে, কিন্তু কোনওভাবেই ক্ষমতার অলিন্দে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ তাঁদের নেই। ফলে তাঁরা যখন দেখতে লাগলেন যে, সাঁওতাল ও মুন্ডাদের মতো জনজাতি তালিকায় থাকা লোকেরা সংরক্ষণের সুযোগ নিয়ে কিছুটা হলেও নিজেদের সামাজিক অবস্থান বদলে ফেলতে পারছেন, কিন্তু কুড়মি-মাহাতদের এক অসম প্রতিযোগিতায় নেমে হেরে যেতে হচ্ছে, তখন তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ তীব্র হতে লাগল। এরই প্রকাশ ঘটছে জনজাতি তালিকায় নিজেদের অন্তর্ভুক্তির আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে।

বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার যে বিন্যাস, তাতে দৃশ্যত সমাজের নীচুতলার কিছু প্রতিফলন দেখা গেলেও, প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারে আছে কঠোর এক ব্রাহ্মণ্যবাদী গোষ্ঠী; সরকারি ক্ষমতায় আসীন এবং বিধানসভায় বিরোধী আসনে বসা উভয়ের ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য। ভারত সরকারের তো কথাই নেই, এই সরকার টিকেই আছে বিভাজনের রাজনীতির ওপর নির্ভর করে। পশ্চিমবঙ্গ ও ভারত, এই উভয় সরকার অন্যান্য— আদিবাসী হোক বা কুড়মি মাহাত, নমশূদ্র হোক বা সদগোপ— শ্রমজীবী জনসাধারণকে মনে করে জন্মনির্দিষ্টভাবেই সেবক শ্রেণি। আর এই সেবকশ্রেণির ‘সেবাব্রত’ সুনিশ্চিত করার যেটা সবচেয়ে সহজ প্রক্রিয়া, সেটি হল ‘সেবক’দের জাতিগত, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, ভাষিক, ইত্যাদি গোষ্ঠীতে বিভাজিত রাখা। সুতরাং, এই উভয় পক্ষের কেউই কুড়মি-মাহাতদের দাবির সমাধান চায় না। বরং তারা কার্যত ইন্ধন জুগিয়ে চলেছে, যাতে কুড়মি-মাহাতদের সঙ্গে তফসিলভুক্ত আদিবাসীদের সংঘাত রক্তক্ষয়ী শত্রুতায় পরিণত হয়।  

প্রাতিষ্ঠনিক বিদ্যাচর্চার বা একান্তভাবে কাণ্ডজ্ঞাননির্ভর বিশ্লেষণের ঝোঁকটা হচ্ছে, এই বৈশিষ্ট্যটিকে ‘পরিচিতিসত্তার রাজনীতি’ বা ‘গোষ্ঠী-সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাবাদ’ হিসেবে দেখার। কিন্তু মার্কসবাদী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এটাকে কীভাবে দেখবে? এর এক স্তরে আছে কুড়মি-মাহাতদের আকাঙ্ক্ষা, আর অন্য স্তরে আছে তাঁদের সেই আকাংক্ষার বাস্তবায়নের একটা পথ হিসেবে মনে করা জনজাতি তালিকাভুক্তিকে সাঁওতালদের মতো দীর্ঘকাল ধরে জনজাতি তালিকাভুক্তদের নিজেদের জন্য বিপদ হিসেবে দেখা। এটা খুবই বিপজ্জনক একটা দিক। কিন্তু, পাশাপাশি এটাও মনে রাখা দরকার, এই দুই জনগোষ্ঠীর পাঁচ দশক ধরে রাজনৈতিক সহযাত্রী হিসেবে পথ চলার অভিজ্ঞতাও আছে। এমন এক দুঃসময় থেকে  নিজেদের বাঁচবার পথ করে নেওয়ার কাজে সব থেকে বেশি সহায়ক হতে পারে মার্কসবাদীদের স্বচ্ছদৃষ্টি। সেই দৃষ্টিতে তাঁরা দুই গোষ্ঠীর কাছে আত্মীয়ভাবে  পৌঁছোতে পারেন, বলতে পারেন আসল শত্রুর কথা, যে শত্রু সাঁওতাল সহ অন্যান্য ঝাড়খণ্ডী আদিবাসী গোষ্ঠীগুলিকে আসামে জনজাতি তালিকায় স্থান দেয় না— কারণ, সেটা করলে আসামের সস্তা মজুরের সরবরাহে কিছুটা হলেও টান পড়বে। তাঁরা বলতে পারেন, সাঁওতাল এবং অন্যান্যদের স্বার্থহানি না ঘটিয়েও কুড়মি-মাহাতদের জনজাতি তালিকাভুক্তি করার উপায় আছে। আবার এটাও বলতে পারেন জনজাতিভুক্তি চূড়ান্ত সমাধান নয়, তার জন্য আরো অনেকগুলো মৌলিক পরিবর্তন করতে হবে। অর্থাৎ, মূলত শ্রমজীবী এই মানুষদের কাছে মার্কসবাদীরাই হয়ে উঠতে পারেন স্বাভাবিক ও সব চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মিত্র। একদিকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলে পরিস্থিতিটাকে ভালভাবে, নানা দিক দিয়ে, জানা, এবং সেই জ্ঞানভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে জনসাধারণের সচেতনতা যাতে প্রশস্ত পথ নিতে পারে, তার অনুশীলনে পরিশ্রম করে যাওয়া— এই কাজ মার্কসবাদীদের পক্ষেই সম্ভব।  অন্যভাবে বলতে গেলে, মার্কসবাদীদের কাজ হবে, একদিকে পরম বিদ্যোৎসাহিতায়, যে-কোনও প্রাতিষ্ঠিনিক বিদ্যাজীবীর চেয়ে এগিয়ে থেকে, পরিস্থিতিকে জানা এবং তাকে পরিবর্তিত করার কাজে কালবিলম্ব না করে নেমে পড়া।

 

— মতামত লেখকের নিজস্ব


প্রকাশের তারিখ: ১৬-এপ্রিল-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org