মার্কস এবং এঙ্গেলস তাঁদের বিশ্ব বিখ্যাত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে বলেছেন, “আমাদের যুগে অর্থাৎ বুর্জোয়া যুগে শ্রেণি-বিরোধ সরল হয়ে এসেছে। গোটা সমাজ ক্রমেই দুটি বিশাল শত্রু শিবিরে ভাগ হয়ে পড়ছে, ভাগ হচ্ছে পরস্পর সম্মুখীন দুই বিরাট শ্রেণিতে - বুর্জোয়া এবং প্রলেতারিয়েত”। তাঁরা এও লক্ষ করেছিলেন যে, “আজকের দিনে বুর্জোয়াদের মুখোমখি যে সব শ্রেণি দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে শুধু প্রলেতারিয়েত হল প্রকৃত বিপ্লবী শ্রেণি। অপর শ্রেণিগুলি আধুনিক যন্ত্রশিল্পের সামনে ক্ষয় হতে হতে লোপ পায়।”
মার্কস এবং এঙ্গেলস উপরের ঐ উক্তি করেছিলেন ১৮৪৮ সালে—অর্থাৎ আজ থেকে ১৩০ বছর আগে। পরিষ্কার ভাষাতেই তাঁরা বলেছেন, ঐ উক্তিগুলি তাঁরা করেছিলেন বুর্জোয়া যুগে। সাম্রাজ্যবাদের যুগ এবং বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগ দেখার জন্য তাঁরা জীবিত ছিলেন না; ১৯৫৭ এবং ১৯৬০ সালের বিশ্ব কমিউনিস্ট দলিলে আমাদের বর্তমান যুগকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে সেই যুগও তাঁরা দেখেননি। ঐ দলিলে বলা হয়েছে, আমাদের যুগ হল সমাজতান্ত্রিক এবং ধনতান্ত্রিক- এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে বিশ্বজোড়া সংগ্রামের যুগ; জাতীয়-মুক্তি ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগে এবং বিশ্বব্যাপী সমাজততন্ত্র ও কমিউনিজমের বিজয় লাভের যুগ।
কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো লিখিত হবার সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ কালব্যাপী সময় ধরে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন এবং বিশ্বশ্রমিক আন্দোলনের অন্যান্য শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ এবং নেতারা এই সমস্যার কথাই বারে বারে চিন্তা করে এসেছেন যে, বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে প্রলেতারিয়েতের মিত্র কারা হবেন। আবার, এই মিত্রের প্রসঙ্গ আলোচনার ক্ষেত্রে বারে বারে আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছে কৃষক সমাজের সমস্যা এবং শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর সমস্যাগুলি। জাতীয় মুক্তি বিপ্লবে, গণতান্ত্রিক বিপ্লবে এবং সর্বোপরি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও তাকে সংহত করার কাজে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর তাৎপর্য কী, তা নির্ণয়ের জন্যই শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর প্রসঙ্গটি আলোচিত হয়ে এসেছে। বিষয়টির গভীর অনুধাবন এবং কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশিত হবার পর বিগত ১৩০ বছর ধরে যে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে তার একত্রিকরণ আমাদের কাছে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত মূল্যবান সম্পদের মতো উপস্থিত হয়েছে। রুশ বিপ্লব, চীন বিপ্লব এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন বিপ্লব ও বিপ্লবী সংগ্রাম আমাদের বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছে যে, সাধারণভাবে কৃষক সমাজ এবং বিশেষভাবে কৃষক সমাজের বিভিন্ন অংশ ঐ সব বিপ্লবে ও সংগ্রামে কী ভূমিকা পালন করেছিল এবং বিপ্লবী কর্মধারার মধ্য দিয়ে যে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী গড়ে উঠেছিল, সেই মৈত্রী বিপ্লবে বেগ ও গতি সঞ্চার করতে কীভাবে সাহায্য করেছিল।
ভারতে, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী হিসাবে আমাদের কৃষক- আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যাপক অভিজ্ঞতা আছে, এবং শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী গড়ে তোলার জন্য আমরা সংগ্রাম করে চলেছি। নিঃসংকোচে এ কথা অমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, এখনও পর্যন্ত আমাদের এই অভিজ্ঞতাকে সঠিকভাবে এবং প্রামাণিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। আমাদের দেশের বিভিন্ন কৃষি সংক্রান্ত প্রশ্ন এবং ভূমি সম্পর্কের প্রশ্ন অর্থাৎ, প্রাক-ধনতান্ত্রিক, সামন্ততান্ত্রিক ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ক সেখানে এখনও কী পরিমাণে বিরাজ করছে, আমাদের কৃষিতে ধনতন্ত্রের বিকাশ কী পরিমাণে ঘটেছে এবং বিগত একশ’ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে তার প্রকৃতি কী ইত্যাদি বিষয়ের অনুধাবন ভারতীয় মার্কসবাদীরা হয় একবারেই করেননি নয়তো বা করলেও তা মোটেই সন্তোষজনক এবং ব্যাপকভাবে করেননি। আমাদের দেশের কৃষি সম্পর্কের প্রশ্নে অধিকাংশ ভারতীয় মার্কসবাদীই কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের ষষ্ঠ কংগ্রেসের বিশ্লেষণ এবং মূল্যায়নের দ্বারাই পরিচালিত হয়ে এসেছেন। ১৯২৮ সালে গৃহীত ষষ্ঠ কংগ্রেসের ঐ থিসিসে অনেক যুক্তিযুক্ত বিষয় থাকলেও ঐ থিসিস গৃহীত হবার পর বিগত ৫০ বছরে আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে যে সকল ঘটনা বিকশিত হয়েছে সে সম্পর্কে কোন মূল্যায়ন না করে যদি আমরা শুধুমাত্র ঐ থিসিসের কথাই পুনরুল্লেখ করি তবে তা অবশ্যই যথার্থ হবে না। ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ভারতে ধনতন্ত্রের যে বিকাশ ঘটেছে এবং বিশেষ করে স্বাধীনতা পরবর্তী ৩০ বছর সময়ে তার যা বিকাশ ঘটেছে তাকে আমরা তাৎপর্যহীন বলে উড়িয়ে দিতে পারি না, এবং কৃষিক্ষেত্রে ধনতন্ত্রের যে অনুপ্রবেশ ঘটেছে তাকেও আমরা হাল্কাভাবে দেখতে পারি না। ভারতীয় অর্থনীতির প্রকৃত ছাত্রদের সামনে এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ছাত্রদের সামনে আজ এই করণীয় কাজ উপস্থিত হয়েছে।
আমার এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে আমাদের প্রচলিত কৃষিসম্পর্কের কোনো মূল্যায়ন করার, এমনকি তার কোনো রূপরেখাও দেবার চেষ্টা আমি করছি না। ওরকম কঠিন কাজের দায়িত্ব নেবার প্রয়াসও এই প্রবন্ধে করা হচ্ছে না। আমার এই প্রবন্ধে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর রাজনৈতিক ধারণা, তার বিবর্তন এবং আমাদের দেশের সর্বহারার বিপ্লবী আন্দোলনে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর গুরুত্ব- এই বিষয়ে রূপরেখা দেবার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রথমেই উল্লেখ করছি যে, কার্ল মার্কসই প্রথম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “লুই বোনাপার্টের অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার”-এ লিখেছিলেন যে, “কৃষক শ্রেণির স্বার্থ আর বুর্জোয়াদের স্বার্থের, অর্থাৎ পুঁজির স্বার্থের অনুকূল নয়, বরং তার পরিপন্থী। সেইজন্যই কৃষকেরা তাদের স্বাভাবিক মিত্র ও নেতা পায় শহরের প্রলেতারিয়েতে - বুর্জোয়া ব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধনই যাদের দায়িত্ব।” এই কথা তিনি লিখেছিলেন ১৮৫২ সালে। শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর এই ধারণা মার্কাসের দ্বারা আরও সমৃদ্ধ হয়েছিল এবং আরো সুস্পষ্টভাবে অভিব্যক্ত হয়েছিল ১৮৫৬ সালের ৬ই এপ্রিল এঙ্গেলসকে এক চিঠিতে যখন তিনি লিখেছিলেন যে, “জার্মানিতে গোটা ব্যাপারটা নির্ভর করবে প্রলেতারীয় বিপ্লবের সমর্থনে কৃষকবিদ্রোহের একটা দ্বিতীয় সংস্করণের সম্ভাবনার উপর। তারপর ঘটনাবলী হয়ে উঠবে চমৎকার।”
'জার্মানিতে কৃষক যুদ্ধ' নামে প্রবন্ধটি এঙ্গেলস লিখেছিলেন ১৮৫০ সালে। এটি প্রকাশিত হয়েছিল কার্ল মার্কস সম্পাদিত একটি ম্যাগাজিনে। এই প্রবন্ধে কৃষক সমস্যার কথা তৎকালীন ঐতিহাসিক বিন্যাসে বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয়েছিল। এই কথাগুলি এখানে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল এই যে, আমরা আমাদের পাঠকদের দৃষ্টি এই ঘটনার প্রতি আকৃষ্ট করতে চাই যে, পুঁজির বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতদের সংগ্রামের সাথে কৃষকদের সমস্যার প্রশ্নটি কীরকম গুরুত্বপূর্ণভাবে মার্কস ও এঙ্গেলসের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। ১৮৭৪ সালে এঙ্গেলস তার কৃষক যুদ্ধের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায়, ১৮৯৪ সালে লিখিত তাঁর সুপরিচিত প্রবন্ধ—ফ্রান্স এবং জার্মানিতে কৃষক সমস্যা এবং আরো অন্যান্য অনেক লেখায় এই কৃষকদের প্রশ্নটি বারে বারে উল্লেখ করেছেন।
মার্কসের লেখা থেকে দু-একটি দৃষ্টান্ত এখানে উদ্ধৃত করছি। 'ফ্রান্সে শ্রেণি সংগ্রাম ১৮৪৮ থেকে ১৮৫০' নামক গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, “বিপ্লবের গতিপ্রবাহ প্রলেতারিয়েত“ বিপ্লবের গতি প্রবাহ প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়ার মধ্যবর্তী জাতির অধিকাংশ জনসমষ্টিকে, কৃষক ও পেটি বুর্জোয়াকে যতদিন পর্যন্ত ঐ সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে, পুঁজির আধিপত্যের বিরুদ্ধে না উত্থিত করে তুলছে এবং তাদের মুখপাত্রস্বরূপ প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে তাদের সংযুক্ত হতে বাধ্য না করছে, ততদিন ফরাসি শ্রমিকেরা এক পা-ও অগ্রসর হতে পারে না, বুর্জোয়া ব্যবস্থার কেশ স্পর্শ করতে পারে না। জুন মাসের প্রচণ্ড পরাজয়ের মূল্যেই শুধু শ্রমিকেরা অর্জন করতে পারে সেই বিজয়।”
ঐ গ্রন্থেই মার্কস ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “প্রজাতন্ত্র পুরানোর উপরে নতুন বোঝা চাপিয়ে দেবার দরুন ফরাসি কৃষকদের হাল কী দাঁড়াল, বুঝতেই পারা যায়। দেখা যায় যে, তাদের শোষণ শুধু রূপের দিক দিয়েই শিল্প শ্রমিকদের শোষণের থেকে ভিন্ন ধরনের। শোষক একই: পুঁজি। ব্যক্তি পুঁজিপতিরা ব্যক্তি কৃষকদের শোষণ করে মর্গেজ ও সুদখোরি মারফৎ, গোটা পুঁজিপতি শ্রেণি কৃষক সমাজকে শোষণ করে সরকারি ট্যাক্স মারফৎ । কৃষকের সত্বাধিকারই হল সেই কবচ যার দ্বারা পুঁজি এ যাবৎ তাকে যাদু করে এসেছে, সেই অছিলা যা তাকে লাগিয়েছে শিল্প-শ্রমিকদের বিরুদ্ধে। একমাত্র পুঁজির পতনেই কৃষকের উন্নতিবিধান সম্ভব; পুঁজিপতি-বিরোধী এক প্রলেতারীয় সরকারই শুধু অবসান ঘটাতে পারে তার আর্থিক দুর্গতির, তার সামাজিক অবনতির। নিয়মতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হল তার ঐক্যবদ্ধ শোষকদের একনায়কত্ব, সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক, লাল প্রজাতন্ত্র হচ্ছে তার মিত্রদের একনায়কত্ব।”
পূর্বোক্ত উদ্ধৃতি থেকে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে যে; শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ধারণাটি কোনো অপ্রত্যাশিত ধারণা নয়, এবং এই ধারণা কোনো রাজনৈতিক সুবিধার থেকেও জন্ম নেয়নি। শিল্প-শ্রমিক শ্রেণি এবং কৃষক শ্রেণি—এই দুই শ্রেণিরই মুক্তি সম্ভব একমাত্র যখন এই দুটি শ্রেণি ঐক্যবদ্ধভাবে পুঁজির শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে তাকে পরাস্ত করবে; এবং যখন ঐক্যবদ্ধ শোষকদের একনায়কত্বকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত করবে।
'ফ্রান্স ও জার্মানির কৃষক সমস্যা' প্রবন্ধে এঙ্গেলস লিখেছেন : “সর্বত্র সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে কৃষক সমস্যা আজ হঠাৎ কেন আশু আলোচ্যের মধ্যে স্থান পেয়েছে তা নিয়ে বুর্জোয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল পার্টিগুলির মধ্যে খুবই বিস্ময় সঞ্চার হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, অনেকদিন আগেই এই আলোচনা শুরু হয়নি বলেই তাদের বিস্মিত হওয়া উচিত ছিল। আয়ারল্যান্ড থেকে সিসিলি, আন্দালুসিয়া থেকে রাশিয়া ও বুলগেরিয়া পর্যন্ত কৃষকরা জনসংখ্যা, উৎপাদন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার এক অতি প্রয়োজনীয় উপাদান।”
“সমাজতন্ত্রী পার্টির দ্বারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল আজ আর সুদূর ভবিষ্যতের ব্যাপার নয়। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে হলে এই পার্টিকে প্রথমে শহর থেকে গ্রামে প্রবেশ করতে হবে, গ্রামাঞ্চলে একটা শক্তি হয়ে উঠতে হবে।”
এই চিন্তাগগুলি এত বিস্তৃতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে যে তার আর বিস্তৃত ব্যাখ্যার কোনো প্রয়োজন নেই। এই চিন্তাভাবনাগুলিই দেখিয়ে দেয় যে, মার্কস এবং এঙ্গেলস কৃষকসমস্যার প্রতি কত গুরুত্ব দিতেন ৷
শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ধারণা সম্পর্কে মার্কস এবং এঙ্গেলস এইভাবেই সর্বোচ্চ অবদান রেখে গেছেন। পরবর্তীকালে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ধারণাটিকে আরো বিস্তৃত এবং সমৃদ্ধ করেছেন লেনিন। জার শাসনের অধীনে স্বৈরতন্ত্র এবং জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময় লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি শুধুমাত্র শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী গড়ে তুলতেই যে সক্ষম হয়েছিল তা নয়, বরং সেই মৈত্রীর ধারণাকে প্রলেতারীয় একনায়কত্ব ও সমাজতন্ত্রে উত্তরণের সময় পর্যন্ত লালন করে গেছে। লেনিন বলেছিলেন যে, “শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্ব হল, মেহনতকারী জনসাধারণের অগ্রগামী বাহিনী হিসাবে শ্রমিকশ্রেণির সঙ্গে শ্রমিক ভিন্ন মেহনতকারীদের অসংখ্য স্তরের কিংবা তাদের অধিকাংশের বিশেষ ধরনের শ্রেণির সহযোগিতা”, “শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্ব হল সমাজতন্ত্রের দৃঢ় সমর্থক আর তাদের অস্থির মতি সহযোগীদের মধ্যে এবং কখনো কখনো ‘নিরপেক্ষদের' মধ্যে একটা মৈত্রী বন্ধন: এ হল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং মতবাদের দিক দিয়ে প্রাপক শ্রেণিদের মধ্যে মৈত্রী।” তিনি বলেছিলেন, শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্ব হল “প্রলেতারিয়েত এবং মেহনতকারী কৃষকদের মধ্যে শ্রেণি-মৈত্রী” এবং তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, “কৃষকদের সঙ্গে একটা মীমাংসার চুক্তিই কেবল রাশিয়াতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে রক্ষা করতে পারে।” লেনিন আরও বলেছেন, “শ্রমিকশ্রেণি যাতে নিজের নেতৃত্বের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা রক্ষা করতে পারে সেজন্য শ্রমিক আর কৃষকদের মধ্যে মৈত্রীবন্ধন রক্ষা করাই একনায়কত্বের সবচেয়ে বড় কাজ।”
উপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, রাশিয়ান বিলবের সমাজতান্ত্রিক স্তরে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী এই শব্দটি নতুনভাবে অর্থমণ্ডিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সকল গণতান্ত্রিক এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে, সেই সব বিপ্লবে রাশিয়ার অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করা হয়েছে এবং তার দ্বারা তারা বিশেষ উপকৃত হয়েছে।
বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ এবং রাজনীতিকরা কৃষিকাজে নিযুক্ত সমস্ত গ্রামীণ জনগণকেই, তা তারা জমিদারই হোন বা ভূমিহীন কৃষি-মজুরই হোন, তাদের সকলকেই 'কৃষক' এই নামে একই শ্রেণিভুক্ত করে থাকেন, কিন্তু মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা যখন কৃষকদের সম্বন্ধে আলোচনা করেন তখন তারা কোনো সময়েই কৃষকদের একটি মাত্র শ্রেণি হিসাবে বিবেচনা করেন না। এমনকি যারা বৃহৎ সামন্ততান্ত্রিক এবং আধা সামন্ততান্ত্রিক জমিদারদের অবশিষ্ট কৃষকদের থেকে পৃথক করে দেখেন তারাই আবার কৃষি-মজুর, গরিব কৃষক, মধ্য কৃষক এবং ধনী কৃষক এই সমগ্র কৃষক সমাজকে একটি মাত্র ‘কৃষক শ্রেণি' হিসাবে দেখে ভুল করে থাকেন। একমাত্র মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরাই কৃষকদের বিজ্ঞানভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস ও সংজ্ঞার প্রতি সজাগ ও কঠোর দৃষ্টি দিয়ে থাকেন। মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের কৃষকদের শ্রেণি বিন্যাসের ভিত্তি হল, জমিতে কেউ শ্রম করেন কিনা, কেউ জমির মালিকানা ভোগ করেন কিনা, কেউ জমিতে ভাড়া করা মজুর নিয়োগ করে থাকেন কিনা, কে জমিতে কত সংখ্যক ভাড়া করা মজুর নিয়োগ করে থাকেন এবং পরিবার প্রতিপালন করে ও কৃষির সব খরচ মিটিয়ে কোনো একজনের কী পরিমাণ উদ্বৃত্ত এবং লাভ হয়ে থাকে। বিপ্লবের বিভিন্ন স্তরে এবং পুঁজির বিরুদ্ধে ও সমাজের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে কৃষকদের এই প্রত্যেকটি শ্রেণির ভূমিকা কী হবে, তা যথার্থভাবে বোঝার জন্য এবং তা নির্ধারণের জন্য এই বিস্তারিত বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে। এই কাজ করতে যদি কোনো ভুল হয় তবে তার ফল হিসাবে হয় শোচনীয় সংস্কারবাদী ভ্রান্তি ঘটবে, নয়তো বা বাম সংকীর্ণতাবাদী এবং হঠকারী ভুল ঘটবে।
কৃষকদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ এবং তাদের সাধারণ সংজ্ঞা নিরূপণ এঙ্গেলসই প্রথম তাঁর 'জার্মানিতে কৃষক যুদ্ধ', ১৮৭৪ সালে লিখিত জার্মানিতে কৃষক যুদ্ধের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় এবং তাঁর প্রবন্ধ ফ্রান্স ও জার্মানিতে কৃষকসমস্যা, ইত্যাদিতে করেছিলেন। তিনি তাদের ‘কৃষি-মজুর', ‘ক্ষুদ্র কৃষক’, ‘সামন্ততান্ত্রিক কৃষক’, ‘খাজনাদায়ী কৃষক’, ‘মধ্য কৃষক', ‘বড় কৃষক' ইত্যাদি নামে বর্ণনা করেছিলেন; এবং সামন্ততান্ত্রিক বা ধনতান্ত্রিক বৃহৎ জমিদারদের থেকে তাদের স্পষ্টভাবে পৃথক করেছিলেন। ফরাসি সোস্যালিস্ট পার্টি, ১৮৯২ সালে মার্সেই কংগ্রেসে যে কৃষি কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল, তার তীব্র সমালোচনা করেন।
এঙ্গেলস লিখেছিলেন: “গ্রামের প্রলেতারিয়েত এবং ছোট কৃষক ছাড়াও, মাঝারি ও বড় কৃষক, এমনকি বড় বড় মহালের ইজারাদার, পুঁজিবাদী পশু প্রজনন ব্যবসায়ী এবং জাতির ভূমিসম্পদের অন্যান্য পুঁজিবাদীদেরও নিজেদের মধ্যে নিয়ে নেওয়া সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক পার্টির কর্তব্য হতে পারে, এ কথা আমি সরাসরি অস্বীকার করি। ভূস্বামী, সামন্ততন্ত্র এদের সবারই কাছে শত্রুরূপে দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো প্রশ্নে আমরা এদের সঙ্গে সহমত হতে বা নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য-সাধনের জন্য পাশাপাশি লড়াই করতেও পারি । সমাজের যেকোনো শ্রেণি থেকে আগত ব্যক্তি বিশেষকে আমরা পার্টিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি, কিন্তু, পুঁজিপতি, মাঝারি বুর্জোয়া বা মাঝারি কৃষক স্বার্থে প্রতিনিধিত্বমূলক কোনো দলের আমাদের কোনোই প্রয়োজন নেই।”
তৎসত্ত্বেও, বিংশ শতাব্দির বিভিন্ন বিপ্লবের ঘটনা ও অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে যে, এঙ্গেলসের উপরোক্ত ঘোষণার কিছু কিছু অংশ, বিশেষ করে মাঝারি কৃষকদের সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তার কিছু কিছু পরিবর্তন ও সংশোধন প্রয়োজন। রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য বিপ্লবের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, ক্ষমতা লাভের সংগ্রামে এবং সমাজতন্ত্র গড়ার সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণির প্রয়োজন আছে মাঝারি কৃষকদের সাথে মৈত্রী গড়ার। এই মৈত্রীকে লেনিন বলেছেন, ‘সহযোগিতার নতুন রূপ’, এবং এই মৈত্রীকে রক্ষা করেছিলেন স্তালিন। রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির অষ্টাদশ কংগ্রেসে লেনিন বলেছিলেন: “মার্কসের সঙ্গে একত্রে যিনি বৈজ্ঞানিক মার্কসবাদের অর্থাৎ যে শিক্ষা দিয়ে আমাদের পার্টি চিরকাল, বিশেষ করে বিপ্লবের সময়ে পরিচালিত হয়ে এসেছে তার ভিত্তি রচনা করেছিলেন, সেই এঙ্গেলস পর্বেই দেখিয়ে গিয়েছেন যে, কৃষক সম্প্রদায় ক্ষুদ্র চাষী, মাঝারি চাষী ও বৃহৎ চাষীতে বিভক্ত, এবং এমনকি আজ পর্যন্ত এই বিভাগ অধিকাংশ ইয়োরোপীয় দেশের পক্ষে বাস্তব।... জমিদার ও পুঁজিপতিদের প্রসঙ্গে আমাদের কর্তব্য হল সম্পূর্ণ উচ্ছেদ। কিন্তু মাঝারি চাষীর প্রতি কোনোরকম বলপ্রয়োগ আমরা চলতে দেব না। এমনকি ধনী চাষীর বেলায়ও, বুর্জোয়া সম্পর্কে যতটা দৃঢ়তা নিয়ে বলি তেমন দৃঢ়ভাবে ধনী চাষী ও কুলাকদের পরিপূর্ণ উচ্ছেদের কথা বলি না। আমাদের কর্মসূচিতে এই পার্থক্য করে রাখা আছে।”
“মাঝারি কৃষক অংশত সম্পত্তির মালিক এবং অংশত মেহনতী। অন্য মেহনতীদের সে শোষণ করে না।” এবং “গ্রামে যাঁরা যাচ্ছেন সেই কমিউনিস্ট শ্রমিকেরা মাঝারি চাষীদের সঙ্গে কমরেডসুলভ সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য। তার সঙ্গে স্বেচ্ছামূলক, পরিপূর্ণ অকপট ও পরিপূর্ণ আস্থাভাজন জোট অর্জন করা সম্ভব ও করতে হবে।”
মহান অক্টোবর বিপ্লবের পূর্ণ বিজয়ের ১৬ মাস পর ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে লেনিন উপরের কথাগুলি বলেছিলেন। এই প্রসঙ্গে এঙ্গেলস যা বলেছিলেন তাও ভোলা উচিত নয়, তিনি বলেছিলেন, “সর্বত্র এমনকি বৃহৎ কৃষকদেরও শক্তি প্রয়োগ করে দমন করার সম্ভবত প্রয়োজন হবে না।”
এই সমস্ত কথা আমরা উল্লেখ করছি শুধু এইটা দেখানোর জন্যই যে, মার্কসবাদের মহান স্থপতিরা কত সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে কৃষকসমস্যার বিভিন্ন প্রশ্ন বিবেচনা করতেন এবং কীভাবে প্রতিটি বাস্তব পরিস্তিতে যথার্থ দৃষ্টিভঙ্গি তাঁরা গ্রহণ করতেন।
আরও একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে - এঙ্গেলস যেখানে বলছেন, শ্রমিকশ্রেণির কর্তব্য হল, রাজনৈতিক ক্ষমতা অধিকার করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত বৃহৎ ভূসম্পত্তির দখল নিয়ে নেওয়া, এবং সেই সব জমিতে আগে থেকেই যে কৃষি-মজুরেরা কাজ করছেন তাঁদের নিয়েই সেইগুলিকে সমবায়ে পরিণত করা, সেখানে তিনি বলছেন: “এই উৎখাত করার দরুন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কিনা তা বহুল পরিমাণে আমাদের উপর নির্ভর করবে না, কোন অবস্থায় আমরা ক্ষমতা পাই এবং বিশেষ করে এই ভদ্রলোকেরা, বড় বড় ভূস্বামীরা কী ব্যবহার করেন, তারই উপর বহুল পরিমাণে নির্ভর করবে। কোনো ক্ষেত্রেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া চলবে না, এ কথা আমরা মোটেই ভাবি না। মার্কস আমায় বলেছিলেন যে, তাঁর মতে এদের গোটা দলটাকে কিনে ফেলতে পারলেই আমরা সবচেয়ে সস্তায় পার পাব।
এটা ঠিক যে, রাশিয়া এবং চীনের মতো বিরাট বিপ্লবে ভূসম্পত্তির মালিক ভদ্রলোকদের শত্রুতা-মূলক ও বিরোধিতা-মূলক আচরণই এই ক্ষতিপূরণ দানের প্রসঙ্গটির মীমাংসা করেছিল - তাদের সমস্ত জমি বিনা ক্ষতিপূরণে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। কিন্তু ভূস্বামীদের বাজেয়াপ্ত করা জমিগুলিকে তখনই কৃষি-মজুরদের সমবায়ের অধীনে নিয়ে আসা যায়নি। এই জমিগুলিকে ভূমিহীন এবং গরিব কৃষকদের মধ্যে বিলি করা হয়েছিল। রাশিয়ার বিপ্লবের ক্ষেত্রে, প্রলেতারিয়েত শ্রেণিকে সমাজতান্ত্রিক-বিপ্লবীদের কৃষি কর্মসূচিকেই গ্রহণ করতে হয়েছিল, এবং কৃষকদের মধ্যে সমানভাবে জমি বিলি করতে হয়েছিল। এটাও করা হয়েছিল কৃষকদের চেতনা এবং তাদের সংগঠন ইত্যাদির একটি নির্দিষ্ট স্তরে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী গড়ে তোলার একটি সুবিধাজনক কৌশল হিসাবে। শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী গড়ে তোলার বিষয়টিই ছিল সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ', যেটা ছাড়া প্রলেতারিয়েতের রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের প্রচেষ্টা এবং সেই ক্ষমতাকে রক্ষা ও সংহত করা কোনোটাই সম্ভব হতনা।
শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর প্রসঙ্গটি আলোচনা করার সময় এটাও আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের মতো অগ্রসর ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কৃষক শ্রেণির অস্তিত্ব প্রায় না থাকার অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। ঐ সব রাষ্ট্রে মোট জনসংখ্যার শতকরা মাত্র চার কি পাঁচ ভাগ মানুষ কৃষিকাজে নিযুক্ত। এমনকি ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইটালির মতো দেশে, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে মোট জনসমষ্টির শতকরা ৪৫ থেকে ৫৫ জন মানুষ ছিলেন কৃষক শ্রেণিভুক্ত, সেখানেও তাঁদের শতকরা হার বর্তমানে অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। সুতরাং, এইসব উন্নত ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কৃষকসমস্যা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ভারতের কৃষকসমস্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ ভারতের মোট জন সংখ্যার শতকরা ৭০ ভাগ থেকে ৭৫ ভাগ মানুষ কৃষক শ্রেণিভুক্ত, এখানে কৃষিবিপ্লব এখনও সম্পন্ন হয়নি, এবং আধুনিক প্রলেতারিয়েত এখনও এখানে সংখ্যালঘু, তাদের সংখ্যা মোট জনসমষ্টির শতকরা মাত্র ৫ থেকে ৬ ভাগ ।
যদি শ্রমিকশ্রেণি রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সংগঠিত না হয়, শ্রমিকশ্রেণির অগ্রগামী বাহিনী কমিউনিস্ট পার্টি যদি দুর্বল ও অসংগঠিত হয় এবং পার্টি যদি কৃষকদের মধ্যে আন্তরিক এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে কাজ না করে, তবে, শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী গড়ে তোলা একটি ধারণাতীত বিষয় হয়েই থাকে। শহরের শ্রমিকশ্রেণি কৃষকদের দাবির সমর্থনে প্রকাশ্য আন্দোলন করতে এবং সংহতিমূলক আন্দোলনে কতটা এগিয়ে আসবে ইত্যাদিও নির্ভর করে শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক চেতনার স্তরের উপর। লেনিন বলেছেন: “প্রলেতারিয়েতের গুরুত্ব কত তা সম্পূর্ণভাবে এবং সন্দেহাতীতভাবে সুস্পষ্ট। সমকালীন সমাজের একমাত্র অটল বিপ্লবী শ্রেণি হিসাবে পূর্ণ গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য সমগ্র জনগণের সংগ্রামে, এবং অত্যাচারী ও শোষকদের বিরুদ্ধে সমস্ত মেহনতী ও শোষিত মানুষের সংগ্রামে প্রলেতারিয়েতকে অবশ্যই নেতৃত্ব দিতে হবে, তাকে নেতা হতে হবে। প্রলেতারিয়েত হলো ততদূর পর্যন্তই বিপ্লবী, একমাত্র যতদূর পর্যন্ত সে তার এই নেতৃত্বদানের বিষয় সম্পর্কে সচেতন এবং সেই মতো কাজ করতে সক্ষম। যে প্রলেতারিয়েত তার এই কর্তব্যের বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠেছে, সে হল সেই রকম একজন দাসের মতো যে তার দাসত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে উঠেছে। যে প্রলেতারিয়েতের এই চেতনা নেই যে, তার শ্রেণিকেই নেতৃত্ব দিতে হবে, অথবা যে এই ধারণাকে স্বীকার করে না, সে হল সেই রকমই একজন দাসের মতো যে তার নিজের দাসত্বের আবহকে উপলব্ধিই করতে পারে না। বড়জোর সে হল সেইরকম একজন দাসের মতো, যে দাস হিসেবেই তার অবস্থার উন্নতির জন্য লড়াই করে, কিন্তু দাসত্বকে ছেড়ে ফেলার জন্য লড়াই করে না।"
উপরের এই বিচারের মাপকাঠিতেই আমরা নির্ণয় করতে পারি যে, ভারতীয় কমিউনিস্টরা বিগত ৪০ বছর ধরে কৃষকদের মধ্যে কাজ করা সত্ত্বেও আমাদের প্রলেতারিয়েত শ্রেণির চেতনার স্তর কী এবং কী প্রচণ্ড তার সীমাবদ্ধতা।
কৃষির ক্ষেত্রে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, গত ৩০ বছরে বুর্জোয়া-জমিদার সরকার বিভিন্ন ভূমি আইনের যে পরিবর্তন ঘটিয়েছে এবং গ্রামাঞ্চলে যে অজ্ঞতা, নিরক্ষরতা, দারিদ্র এবং দুর্দশা বিরাজ করছে, এই সবকিছুও এই প্রসঙ্গে অবশ্যই আমাদের মনে রাখতে হবে।
আমাদের দেশে যদিও কোনো আমলে ভূমিসংস্কার করা হয়নি, যদিও সমগ্র চাষযোগ্য জমির শতকরা ৪০ ভাগ এখনও মাত্র শতকরা ৫ কি ৬ ভাগ জমির মালিকদের হাতে, যদিও কৃষকদের মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ থেকে ৬০ ভাগ মানুষ হয় সম্পূর্ণ ভূমিহীন কৃষি-মজুর নয় তো বা গরিব চাষী, এবং যদিও আমাদের সমাজের বর্তমান পরিস্থিতিতে যে সকল শ্রেণিবিরোধ বিরাজ করছে তার মধ্যে সর্ব‘প্রধান শ্রেণিবিরোধ হল, একদিকে জমিদারতন্ত্র অপরদিকে সমগ্র কৃষকদের মধ্যে শ্রেণিবিরোধ। তবু, আমাদের দেশে বৈপ্লবিক কৃষি আন্দোলন আশানরূপ সাড়া জাগাতে পারেনি। এর বহুবিধ কারণ আছে। রাষ্ট্র এবং সরকারে অধিষ্ঠিত বুর্জোয়া নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশের বৈপ্লবিক আন্দোলন থেকে নিজেরা যেমন শিক্ষা গ্রহণ করছে, আমাদের দেশের বৈপ্লবিক কৃষি আন্দোলন থেকেও তারা তেমন শিক্ষা গ্রহণ করছে। তারা ভূমি সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমনভাবে পরিবর্তন ঘটাতে চেষ্টা করে যাতে বিভিন্ন শ্রেণিবিরোধ, যেমন—জমিদারতন্ত্র এবং সমগ্র কৃষকদের মধ্যে শ্রেণিবিরোধ, ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং সমগ্র কৃষক জনগণের মধ্যে শ্রেণিবিরোধ সময়ে সময়ে ভোঁতা হয়ে পড়ে। এই শ্রেণিবিরোধগুলি যাতে দৃষ্টিগোচর এবং তীক্ষ্ণ হতে পারে তার পথ ও উপায় নির্ধারণের জন্য প্রগাঢ় অধ্যয়নের প্রয়োজন ।
শ্রমিকশ্রেণি ও তার কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্য হল বাস্তবের ভূমিসম্পর্কগুলিকে এবং কৃষকদের অন্যান্য অবস্থাগুলিকে অনুধাবন করা। এবং সেই মতো তার দাবি ও স্লোগান নির্ধারণ করা, যাতে অন্য সমস্ত আন্দোলনের স্রোতকে শক্তিশালী মূল কৃষি আন্দোলনের স্রোতে মিলিত করা যায়। ভারতের শ্রমিকশ্রেণি এবং তার কমিউনিস্ট পার্টি এই কাজ কতটা দক্ষতা ও সাফল্যের সাথে করতে পারবে তার উপরই নির্ভর করবে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ।
দেশহিতৈষী শারদ সংখ্যা - ১৯৭৮
প্রকাশের তারিখ: ০৬-নভেম্বর-২০২৩ |