|
শ্রমদাসত্ব না মজুরিদাসত্ব : পুঁজির পছন্দ কোনটি?সাত্যকি রায় |
অ্যাডাম স্মিথ থেকে মালথাস সকলেই মনে করতেন যে পরাধীন শ্রম স্বাধীন শ্রমের তুলনায় কম দক্ষ ও তাদের উৎপাদনশীলতা কম হয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, দাস ব্যবস্থায় একজন দাস ও তার পরিবারের সারা জীবনের ভরণ পোষণের দায়িত্ব দাস মালিকের হয়ে থাকে। উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হয়। একটি মানুষ জীবনের নানা পর্যায়ে এইসব দক্ষতা অর্জন করতে পারবে এটা খুব স্বাভাবিক নয়। |
শ্রমের পরাধীনতা প্রসঙ্গে হেগেলের বক্তব্যের মার্কস উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। হেগেলের বক্তব্য ছিল যে শ্রমিকের স্বাধীনতা বলতে বোঝায় যে সে তার শ্রম সর্বোচ্চ মূল্যে বিক্রি করার অধিকার অর্জন করবে। এভাবেই সে তার একমাত্র সম্পত্তি শ্রমের উপরে অধিকার স্থাপন করতে পারবে। এর সঙ্গে যে কথাটি একই সাথে প্রাসঙ্গিক তা হল শ্রমিক ইচ্ছে করলে তার অধিকারে যে পণ্য রয়েছে তা বিক্রি না করারও সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এক অর্থে বলতে গেলে এটাই ছিল মার্কসের শ্রম সম্পর্কিত আলোচনার উৎস বিন্দু। হেগেল অবশ্য মনে করেছিলেন যে শ্রমিকের এই স্বাধীনতা সুরক্ষিত করা যাবে তখনই যদি ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সুনিশ্চিত করা যায়। মার্কস অবশ্য তার চর্চায় দেখালেন যে শ্রমের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই আসলে একটি যৌথ শ্রেণী চেতনা গড়ে ওঠার মধ্যে দিয়েই কেবলমাত্র সম্ভব হতে পারে, যা শ্রম দাসত্বকে শেষ বিচারে উৎখাত করতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ লড়াইটা শুধুমাত্র সর্বোচ্চ মূল্যে শ্রম বিক্রি করার স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়, অন্যের কাছে শ্রম বিক্রি না করেও বেঁচে থাকার স্বাধীনতা সুরক্ষিত করা। এ কারণে শ্রমের সর্বব্যাপক স্বাধীনতা অর্জিত হয় পুঁজি সম্পর্ককে উৎখাত করার মধ্যে দিয়ে, যে পুঁজি সম্পর্ক আসলে প্রকৃত উৎপাদককে তাঁর উৎপাদনের উপকরণ থেকে ধারাবাহিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। অনেক সময় এরকম একটি ধারণা পোষণ করা হয় যে পুঁজিবাদে শ্রম সম্পর্কটা একটি নৈতিক আধারের কারণেই শ্রম দাসত্ব থেকে আলাদা। পুঁজিবাদে শ্রমিকের উপরে কোন বল প্রয়োগ করা হয় না। শ্রমিক তার শ্রম শক্তির সমমূল্য মজুরি হিসেবে পেয়ে থাকে। তা পাওয়া সত্ত্বেও শোষণ হয় কিভাবে তা মার্কস ক্যাপিটাল এ আলোচনা করেছেন। কিন্তু সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে শ্রমিককে তার শ্রমের দ্বারা উৎপাদিত মূল্যের সমপরিমাণ মজুরি না দিলেও পুঁজিবাদ তার শ্রমশক্তির মূল্য অনুযায়ী মজুরি দিয়ে থাকে। ফলে অতিরিক্ত মুনাফার সম্ভাবনা প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদে নেই বললেই চলে। এ কথা ঠিক যে মার্কস তাঁর ক্যাপিটাল গ্রন্থেও মূলত প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদী স্তর নিয়েই আলোচনা করেছিলেন এবং সে ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আদর্শ রূপের নিরিখেও কিভাবে শোষণ ব্যবস্থা জারি থাকে সেটাই ছিল তাঁর প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। কিন্তু তার মানে এই নয় পুঁজিবাদে অতিমুনাফা বাস্তব নয় এবং শোষণ প্রক্রিয়ায় নানারকম বল প্রয়োগ একেবারেই অস্বাভাবিক। বরং বলা যেতে পারে পুঁজিবাদ শ্রম দাসত্ব না মজুরি দাসত্ব ব্যবহার করবে তা একান্তই উৎপাদনের প্রকৃতি ও অবশ্যই নিয়োগকারী ও নিযুক্ত মানুষের আপেক্ষিক শক্তির ভারসাম্যের উপরে নির্ভর করে। এক্ষেত্রে কোন নৈতিক অবস্থান একেবারেই প্রাসঙ্গিক নয়। বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এর বাস্তবতা সহজেই বোঝা যায়। শ্রম বিক্রি করতে চাইলেও শ্রমবাজারে পৌঁছান অনেক ক্ষেত্রেই একপ্রকার মাধ্যমের উপরে নির্ভরশীল হতে হয়। চুক্তিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাজারে চালু মজুরির চেয়েও কম মজুরীতে কাজ করতে বাধ্য হতে হয়। নির্ধারিত কাজের অতিরিক্ত সময় মজুরিহীন কাজ করে চাকরি বজায় রাখতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাজের ঘন্টার কোন উর্দ্ধসীমা থাকে না। এই সব ধরনের বিপন্নতাই পুঁজিবাদের অংশ যা আমরা সবাই আমাদের চারপাশে প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করছি। শ্রম ঐতিহাসিকদের গবেষণা এই সত্যও তুলে ধরে যে পুঁজিবাদ বিভিন্ন সময় এবং বিভিন্ন দেশে শ্রমিকের সমস্ত ধরনের বিপন্নতার সুযোগ নিয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকেও ব্রিটেন ও জার্মানিতে গ্যাং-মাস্টার সিস্টেম চালু ছিল। এছাড়াও পুঁজিবাদের আওতায় পৃথিবীর বহু ভূখণ্ডে দাস ব্যবস্থা, শিশু শ্রম, বন্ধুয়া মজদুর, কারাগার মজদুর এবং নানা ধরনের বল প্রয়োগের শিকার অগণিত নথিবিহীন শ্রম ও পরিযায়ী শ্রমিক পুঁজির শোষণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আবার একইভাবে দেখা যাবে যে মজুরি শ্রম বহু দেশেই আধুনিক পুঁজিবাদের আগেই বিদ্যমান ছিল। যেমন চতুর্থ অথবা পঞ্চদশ শতকেই জার্মানিতে এবং গ্রিসে কৃষি ক্ষেত্রে, নির্মাণ শিল্পে এবং কাঠ কাটার কাজে মজুরি শ্রমিক নিযুক্ত হত। চীন, ইরান এবং মেসিডোনিয়ায় মিলিটারিতে মজুরি শ্রমিক নিযুক্ত হত। মিশরে মিনার ও পিরামিড বানানোর কাজেও মজুরি শ্রমিক ব্যবহৃত হয়েছিল। অর্থাৎ শ্রমিক নিয়োগের পদ্ধতি হিসেবে মজুরি দাসত্ব পুঁজিবাদের আগেই পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে। পুঁজিবাদ এই মজুরি দাসত্বকেই সার্বজনীন রূপ দিয়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মজুরি শ্রমই শ্রম নিয়োগের সবচেয়ে প্রচলিত রূপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর পেছনে কোন নৈতিক কারণ নেই। কারণটা একান্তই লাভ লোকসানের। অ্যাডাম স্মিথ থেকে মালথাস সকলেই মনে করতেন যে পরাধীন শ্রম স্বাধীন শ্রমের তুলনায় কম দক্ষ ও তাদের উৎপাদনশীলতা কম হয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, দাস ব্যবস্থায় একজন দাস ও তার পরিবারের সারা জীবনের ভরণ পোষণের দায়িত্ব দাস মালিকের হয়ে থাকে। উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হয়। একটি মানুষ জীবনের নানা পর্যায়ে এইসব দক্ষতা অর্জন করতে পারবে এটা খুব স্বাভাবিক নয়। মজুরি প্রথার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় শ্রমিককে ইচ্ছে করলেই বাদ দেওয়া যেতে পারে। এবং একই সাথে তার ও তার পরিবারের সারা জীবনের বেঁচে থাকার দায়ভার মালিক কে বহন করার প্রয়োজন পড়ে না। উৎপাদনের গতিশীলতা যত বাড়তে লাগল দাস ব্যবস্থা মালিকদের কাছে একটা বোঝা স্বরূপ উপস্থিত হতে লাগল। মজুরি দাসত্ব ধীরে ধীরে শ্রমদাসত্ত্বকে প্রতিস্থাপিত করতে শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে এটাও খেয়াল করা দরকার যে পুঁজিবাদ পণ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা। এই পণ্যের প্রধান ক্রেতা উৎপাদক ব্যতিরেকে অন্য মানুষ। অন্য লোক ক্রয় করলেই উৎপাদক তার উৎপাদনের মূল্য ফেরত পেতে পারবে। অতএব বিনিময় মূল্য নির্ভর এই সমাজে উৎপাদকের ক্রেতা তৈরি করাটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াল। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাবে মজুরি দাসত্ব এই কারণে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল। শ্রমিক শ্রমের বিনিময় যে অর্থ উপার্জন করছে তা দিয়ে সে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনবে এটা একই সাথে উৎপাদিত পণ্যদ্রব্যের বাজারও তৈরি করবে। সমাজে পণ্য উৎপাদন যত সার্বজনীন চেহারা পেতে লাগল আমরা দেখব তার সাথে সাথে শ্রমদাসত্ত্ব ক্রমাগত গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে লাগল। অর্থাৎ দাস ব্যবস্থাকে মজুরি ব্যবস্থা প্রতিস্থাপিত করেছিল কোন নৈতিক কারণে নয় উৎপাদনের প্রয়োজনে মালিকদের পক্ষে মজুরি দাসত্ব অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠল। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে অন্তত এই কথাটি পরিষ্কার যে কোন ধরনের শ্রমিক পুঁজিবাদে ব্যবহৃত হবে তা পূর্ব নির্ধারিত নয়। যদিও অনেকে এ কথা মনে করেছিলেন যে বিপন্ন পরাধীন শ্রমিকের থেকে মুক্ত স্বাধীন শ্রমিক পুঁজিবাদের কাছে শ্রেয় কারণ স্বাধীন শ্রমিকের থেকে পুঁজিবাদ তুলনামূলকভাবে বেশি কাজ পেয়ে থাকবে। এ ধারণাটিও আজকের দিনে ক্রমাগত অচল বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এ কথা ঠিক যে মানুষ চাপের মুখে কাজ করার চাইতে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করলে তার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, কিন্তু শ্রমিকের বিপন্নতার মাত্রা যদি বাড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে চাপের মুখেও তার থেকে বেশি কাজ আদায় করা সম্ভব। এইটাই আজকের পৃথিবীর বাস্তবতা। ঠিক যেমন জার্মানিতে ফ্যাসিবাদী শাসনে এটাই ছিল বাস্তবতা। আজকের সময় প্রতিটি ক্ষেত্রে কর্মরত মানুষের বিপন্নতাকে এমন ভাবে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে যে সর্বস্তরের শ্রমিক ও বৃহত্তর কর্মরত মানুষকে ক্রমাগত এক স্বরহীন ক্লীবতার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই বিপন্নতাই শ্রমের যৌথ অস্তিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পুঁজিবাদের দীর্ঘ ইতিহাসে যে সময়গুলিতে শ্রমজীবী মানুষ তাঁর অধিকার কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল তার মধ্যে অন্যতম একটি পর্যায় হল যুদ্ধ পরবর্তী জনকল্যানকর রাষ্ট্রের পুঁজিবাদ। ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল এই সময়কালে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি দ্বিগুণ হয়েছিল। শুধু তাই নয় তাদের মজুরি ও আয় উৎপাদনশীলতার থেকে বিযুক্ত হয়ে মানবিক অধিকারের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু এই সময়টার একটি বিশেষ ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত ছিল এবং তা হল শ্রমজীবি মানুষের সঙ্ঘবদ্ধ অস্তিত্বের বিকাশ এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক স্তরে পুঁজিবাদের বিকল্প হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সরব অস্তিত্ব। পৃথিবীর অল্প কিছু উন্নত দেশে শ্রম ও পুঁজির একটি সার্বিক বোঝাপড়া তৈরি হলেও, এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শ্রম সম্পর্ককে তা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। শ্রমিকের মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এ কারণেই তার সঙ্গবদ্ধতার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। হেগেল যে মুক্ত স্বাধীনতা ও ব্যক্তি অধিকারের বিকাশের কথা বলেছিলেন তা যে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র সুনিশ্চিত করতে পারেনি তা দিনের আলোর মত পরিষ্কার। মার্কসের কথা সে কারণেই বারবার ঘুরে আসে শ্রমজীবি মানুষের মুক্তির একমাত্র পূর্ব শর্ত হল তার সংহতি যা পুজির বিপরীতে শ্রমকে শক্তিমান করে তুলতে পারে। পুঁজির একমাত্র পছন্দ অতি মুনাফা এবং সেক্ষেত্রে শোষণের ধরণের ব্যাপারে কোন সভ্যতা বা অসভ্যতার ধার ধারেনি পুঁজিবাদ। একারণেই মার্কস বলেছিলেন যেখানে সম অধিকার স্বীকৃত সেখানে আপেক্ষিক শক্তিই নির্ধারক হয়ে ওঠে। প্রকাশের তারিখ: ০৪-জানুয়ারি-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |