|
শ্রমবদিবস ও পুঁজিবাদী শোষণের নৈতিকতা প্রসঙ্গেসাত্যকি রায় |
মার্কস এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রমিক তার শ্রমশক্তির সমমূল্যে মজুরি পায় না। এবং যখনই সুযোগ পেয়েছে পুঁজিবাদ পরাধীন শ্রম ব্যবহার করেছে এবং শ্রমিককে তার শ্রমশক্তির চেয়ে কম মূল্য মজুরি হিসেবে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। শিশুশ্রম ব্যবহার করা, দীর্ঘ সময় শ্রমিকদের কাজ করানো, বান্ধুয়া শ্রমিক ব্যবহার করা, ক্রীতদাস প্রথার সুযোগ নেওয়া, ঋণের দ্বারা শ্রমিককে শৃঙ্খলিত করা —এর কোনওটাই কোনওদিন পুঁজিপতিদের কাছে অন্যায় ছিল না। |
ক্যাপিটাল এর প্রথম খণ্ডে মার্কস শ্রমদিবস নির্ধারণের সংগ্রামকে প্রায় অর্ধ শতাব্দীব্যাপী বিস্তৃত প্রচ্ছন্ন গৃহযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। পুঁজিবাদ সম্পর্কে একটি তাত্ত্বিক প্রস্তাবনায় মার্কস সুদীর্ঘ পরিসরে ইংল্যান্ডের শ্রম-সম্পর্কের বিবরণ উপস্থিত করেছিলেন একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরের ম্যাজিষ্ট্রেট এবং ফ্যাক্টরি ইন্সপেক্টরদের রিপোর্ট থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে মার্কস সেই সময় ইংল্যান্ডের শ্রমিকশ্রেণির অবস্থার বিস্তৃত আখ্যান উপস্থিত করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল মজুরি ও শ্রম দিবস নির্ধারণে শ্রেণি সংগ্রামের ভূমিকাকে তুলে ধরা। শিশু শ্রমিক, মহিলা এবং পুরুষদের ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা এমনকি কখনও কখনও কুড়ি ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করতে হত। মৃৎশিল্প, লেস তৈরির কারখানা, মুদ্রণশিল্প, কামারশালা ও বেকারিতে দীর্ঘ সময় কাজ করার মর্মস্পর্শী বিবরণ তিনি তুলে ধরেন। এই হাড়ভাঙা খাটুনির কারণে শ্রমিকরা বিভিন্ন রোগে অসুস্থ হতেন এবং অল্প বয়সে মারা যেতেন। চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত পুজিপতিরা শ্রমিকদের যথেচ্ছ খাটানোর স্বাধীনতা ভোগ করেছিল। শ্রমিকদের যত খুশি ঘণ্টা কাজ করিয়ে উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টির এই প্রক্রিয়াকে অনেকে ‘হোয়াইট স্লেভারি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ১৮৩৩ সালের ইংল্যান্ডের ফ্যাক্টরি অ্যাক্ট-এ শুধুমাত্র এই কথা বলা হয় যে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী লোকেদের ১৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। এই আইনকেও নানাভাবে উপেক্ষা করার কৌশল পুঁজিপতিরা প্রয়োগ করতে থাকে। অবশেষে দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে ১৮৪৪-৪৭ —এই সময়ে ১২ ঘন্টাকেই শ্রমদিনের ঊর্ধ্বসীমা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিকদের শ্রম দিবস নির্ধারণের সংগ্রাম আমেরিকান সিভিল ওয়ারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় এবং ১৮৬৬ সালের বালটিমোরে অনুষ্ঠিত শ্রমিক সম্মেলনের সাধারণ ঘোষণায় আট ঘণ্টার শ্রমদিবস ঘোষিত হয়। দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস এই সত্যকে তুলে ধরে যে আট ঘণ্টার শ্রম দিবসের স্বীকৃতি পুঁজিবাদ কোনও নৈতিক অবস্থান থেকে গ্রহণ করেনি। বরং তারা চিরকাল এটা মনে করে এসেছে যে শ্রমশক্তি ক্রয় করার পর তার থেকে সীমাহীন ভাবে শ্রম নিংড়ে নেওয়ার সর্বোচ্চ স্বাধীনতা মালিকদের থাকা উচিত। এমনকি দেখা যাবে যন্ত্রের ব্যবহারের পরেও শ্রমিকের কায়িক শ্রম কমেনি। তার কারণ হল মালিক সর্বদাই সচেষ্ট থাকে স্থায়ী পুঁজি হিসেবে যুক্ত মেশিনের মূল্য যত তাড়াতাড়ি কায়িক শ্রম কাজে লাগিয়ে তুলে আনা যায়। এই লক্ষ্যে শ্রমিকদের সীমাহীন ভাবে শোষণ করায় পুঁজিবাদ কোনও অন্যায় দেখতে পায় না। অনেক সময় অনেকে এরকম একটি ধারণা পোষণ করে থাকেন যে পুঁজিবাদের সঙ্গে ‘পরাধীন শ্রম’ বা আনফ্রি লেবার সংহতিপূর্ণ নয়। ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদেরা, বিশেষত অ্যাডাম স্মিথ এবং ম্যালথাস মনে করতেন যে, পরাধীন শ্রম সব সময় অদক্ষ হবে কারণ দক্ষতা অর্জনে তার বিশেষ কোনও উৎসাহ থাকবে না। এই কারণে পুঁজিবাদ দাসত্বের পরিবর্তে মজুরি শ্রম প্রবর্তন করেছে। মার্কস অবশ্য মুক্ত শ্রমের এই ভনিতাকে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন পুঁজিবাদে শ্রমিক দুভাবে ‘মুক্ত’। তার প্রথম ‘মুক্তি’ হল নিজের শ্রমশক্তি বিক্রি করার স্বাধীনতা এবং দ্বিতীয় ‘মুক্তি’ হল সে সমস্ত ধরনের উৎপাদনের উপকরণ থেকে মুক্ত। তাই শ্রমশক্তি বিক্রি করা ছাড়া তার কাছে বাঁচার আর কোনও রাস্তা নেই। একজন আধুনিক শ্রমিক মুক্ত এই কারণে যে সে তার শোষককে নিজে পছন্দ করে নিতে পারে, যা একজন দাস বা ভূমিদাসের পক্ষে সম্ভব নয়। এ কথা ঠিক যে, মার্কস পুঁজিবাদের আলোচনা করতে গিয়ে ধরে নিয়েছিলেন একজন শ্রমিক তার শ্রমশক্তির মূল্যের সমান মজুরি পেয়ে থাকে। এই তাত্ত্বিক অনুমানটির পিছনে উদ্দেশ্য ছিল এটাই প্রমাণ করা যে শ্রমিক যদি তার শ্রমশক্তির পূর্ণ মূল্যও পায় তা হলেও পুঁজিবাদে শোষণ হয়ে থাকে এবং উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি হয় যা মালিকরা আত্মসাত করে থাকে। মার্কস এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রমিক তার শ্রমশক্তির সমমূল্যে মজুরি পায় না। এবং যখনই সুযোগ পেয়েছে পুঁজিবাদ পরাধীন শ্রম ব্যবহার করেছে এবং শ্রমিককে তার শ্রমশক্তির চেয়ে কম মূল্য মজুরি হিসেবে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। শিশুশ্রম ব্যবহার করা, দীর্ঘ সময় শ্রমিকদের কাজ করানো, বান্ধুয়া শ্রমিক ব্যবহার করা, ক্রীতদাস প্রথার সুযোগ নেওয়া, ঋণের দ্বারা শ্রমিককে শৃঙ্খলিত করা —এর কোনওটাই কোনওদিন পুঁজিপতিদের কাছে অন্যায় ছিল না। একথাও সঠিক নয় যে দাসেরা দক্ষ ছিল না। ইতিহাসে এরকম অজস্র উদাহরণ রয়েছে যেখানে দেখা যাবে দাসেদের সৃষ্টি শিল্প নৈপুণ্যে অভূতপূর্ব দক্ষতার নজির রেখেছে। অ্যাডাম স্মিথদের এ ধারণা ভুল যে মানুষ শুধুমাত্র ইন্সেন্টিভ-এর বিনিময়েই দক্ষতা অর্জনের উৎসাহ পায়। মানুষ নানা শাস্তি অথবা মৃত্যুভয়ের কারণেও দক্ষতা অর্জন করতে বাধ্য হতে পারে। ক্রীতদাসরা এই ভয় থেকেই কাজ করতে বাধ্য হত। একথা ভাবার কোনও কারণ নেই যে পুঁজিবাদ ক্রীতদাস প্রথার পরিবর্তে মজুরি দাসত্ব প্রবর্তন করেছিল কোনও মানবিক বা নৈতিক কারণে। আসলে উৎপাদন প্রক্রিয়ার দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে একটি মানুষের একই জীবনে খাপ খাওয়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দাসেরা হয়ে উঠছিল দাস মালিকদের কাছে স্থায়ী খরচের মত। উৎপাদকরা চাইছিল একটি ফ্লেক্সিবল শ্রম ব্যবস্থা যেখানে তারা প্রয়োজন মত শ্রমিকদের নিয়োগ করতে পারবে এবং অপ্রয়োজনে তাদের কাজ থেকে সরিয়ে দিতে পারবে। মালিকরা আরও চাইছিল তারা যাতে দাসেদের ও তাদের পরিবারের ভরণ পোষণের দায় থেকে মুক্তি পেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা হল পুঁজিবাদ বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধুমাত্র উৎপাদনই প্রয়োজন তা নয়, এই পণ্য নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় ক্রেতাও একই সাথে তৈরি করা দরকার। একজন ক্রীতদাসের শুধুমাত্র ব্যবহার মূল্য আছে, তাকে দিয়ে কিছু কাজ করানো যেতে পারে, কিন্ত সে কোনও জিনিসের ক্রেতা হতে পারে না। কারণ তার শ্রমের কোনও বিনিময় মূল্য নেই। একজন ক্রীতদাস মালিকের পূর্ণ সম্পত্তি, তার শরীরের উপর মালিকের পূর্ণ অধিকার। অতএব তার কাজের বিনিময় কিছুই প্রাপ্য নয়। একজন শ্রমিক ক্রীতদাসের থেকে একারণেই আলাদা যে সে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা দিনের একটি অংশের জন্য তার শ্রমশক্তি পুঁজিপতির কাছে বিক্রি করে। শ্রমিকের দেহের উপরে এবং কাজের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে শ্রমিকের সময়ের উপরে পুঁজিপতির কোনও মালিকানা নেই। আট ঘন্টার কাজের অধিকার অর্থাৎ সীমিত শ্রমদিবস পুঁজিবাদের গভীর পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছিল। কাজের ঘণ্টা যথেচ্ছ প্রসারিত করে উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদন, যাকে মার্কস পরম উদ্বৃত্ত মূল্য বলেছিলেন, তা বাড়ানোর সুযোগ কমে গেল। এর প্রতিক্রিয়ায় পুঁজিবাদকে উদ্বৃত্ত মূল্য বাড়ানোর নতুন রাস্তা খুঁজতে হল যা শ্রম ঘণ্টা একই রেখে উদ্বৃত্তের পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে। প্রযুক্তি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করল। কাজের নিবিড়তা বাড়িয়ে উদ্বৃত্ত মূল্যের পরিমাণ বৃদ্ধি করার প্রক্রিয়াকে মার্কস বললেন আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত মূল্য। আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায় শ্রম দিবসের সীমা কোনো কালেই পুঁজিবাদের কাছে পছন্দের বিষয় ছিল না। এবং এই সীমা নির্ধারণের সঙ্গে সভ্যতা বা নৈতিকতার কোনও সম্পর্ক নেই। আজকের সময়ে একদিকে গরিব দেশগুলিতে কাজের ঘণ্টা বাড়িয়ে পরম উদ্বৃত্ত মূল্য বৃদ্ধি করা, অন্যদিকে উন্নত প্রযুক্তির ওপরে মালিকানা স্থাপন করে আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত মূল্য বাড়ানোর রাস্তা গ্রহণ করেছে বিশ্বায়িত পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছে। চরম অনিশ্চয়তার পরিবেশে কাজ হারানোর ভয় অথবা মজুরি কমে যাওয়ার ভয় কাজে লাগিয়ে শ্রম ঘণ্টা বাড়ানোর সার্বিক প্রয়াস চলছে এবং তার পক্ষে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যুক্তিও উপস্থিত করা হচ্ছে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রও শ্রমিকদের অর্জিত অধিকারগুলিকে অযৌক্তিক হিসেবে উপস্থিত করতে উদ্যত। সভ্যতা বা নৈতিকতা এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। আসল কথাটা হলো পুঁজিবাদে শ্রমিকের সমস্ত অধিকার নৈতিকতার নিরিখে নয়, আপেক্ষিক শক্তির নিরিখে নির্ধারিত হয়। এ কারণেই মার্কস ক্যাপিটাল এর ‘শ্রমদিবস’ সম্পর্কিত অধ্যায়েই বলেছিলেন যে দুপক্ষেরই অধিকার যখন আইনে স্বীকৃত তখন শেষ বিচারে কোন অধিকারটি কার্যকর হবে তা শক্তিই নির্ধারণ করে। তাই অতীতের মতই আগামী দিনেও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির ক্রমবর্ধমান সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই। প্রকাশের তারিখ: ১৩-মে-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |