প্রয়াত অর্থনীতির ইতিহাসবিদ 

প্রভাত পট্টনায়েক
কঠোর পরিশ্রম করে তিনি বহু নতুন তথ্য উদ্ধার করেছেন। অর্থনীতির ভুবন খুঁড়ে তিনি তুলে এনেছেন এমন সব তথ্য যা এর আগে কখনও পাওয়া যায়নি। এর জন্য যে কঠোর পরিশ্রম তিনি করেছেন তার সঙ্গে একমাত্র তুলনা করা যেতে পারে সবচেয়ে পরিশ্রমী ঐতিহাসিকদের। উদ্ধার করা তথ্যভাণ্ডারে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন একটা প্যাটার্ন বা নকশা। তাঁর সামষ্টিক অর্থনীতিই (ম্যাক্রোইকনমিক্স) তাঁকে এই বিষয়টা দেখার চোখ দিয়েছিল।  ফলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একেবারে  নতুন ধরনের একজন অর্থনীতিবিদ, যিনি অর্থনীতির তত্ত্ব এবং অ্যাপ্লায়েড ইকনমিক্সে সমানভাবে দক্ষ এবং দক্ষ অর্থনৈতিক ইতিহাসেও।

অধ্যাপক অমিয় কুমার বাগচী বৃহস্পতিবার (২৮ নভেম্বর, ২০২৪) সন্ধ্যায় প্রয়াত হয়েছেন। তিনি ছিলেন আমাদের সময়কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ, বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ মানুষের শিবিরভুক্ত বুদ্ধিজীবী। চিরজীবন তিনি ছিলেন একজন বিদ্রোহী। ছাত্রজীবনে প্রথম যে কলেজে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন সেখানে অন্যায়ের প্রতিবাদে সোচ্চার হন। এবং সেই কলেজ ত্যাগ করে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সিতে তখন পরিবেশ ছিল তুলনায় খোলামেলা। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করার পর, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। সেখানে ডক্টরেট ডিগ্রির কাজ শেষ করে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অফ ইকনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্সে যোগ দেন। এর সঙ্গে ছিল জেসাস কলেজের ফেলোশিপ। 

তিনি কাজ শুরু করেছিলেন ম্যাথমেটিক্যাল ইকনমিস্ট হিসাবে। বস্তত তিনি ছিলেন গেম থিয়োরিস্ট। কিন্তু পিইএইচডি পেপার লেখার সময় তিনি পথ বদলে ফেলেন। এবং তাঁর শিক্ষকদের পরামর্শে বিষয় হিসাবে বেছে নেন অর্থনৈতিক ইতিহাসকে। এই ভাবে তিনি যে অর্থনৈতিক ইতিহাসের শাখায় চলে এলেন সেজন্য তাঁর কাছে অবশ্যই আমাদের দারুনভাবে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। সংকীর্ণ অর্থে অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ বলতে আমরা যা বুঝি, অমিয় কুমার বাগচী তেমন কোনও ইতিহাসবিদ ছিলেন না। বরং, তিনি ছিলেন এমন একজন সামষ্টিক অর্থনীতিবিদ (ম্যাক্রোইকনমিস্ট) যিনি কাজ করতেন ঐতিহাসিক তথ্য নিয়ে। 

কঠোর পরিশ্রম করে তিনি বহু নতুন তথ্য উদ্ধার করেছেন। অর্থনীতির ভুবন খুঁড়ে তিনি তুলে এনেছেন এমন সব তথ্য যা এর আগে কখনও পাওয়া যায়নি। এর জন্য যে কঠোর পরিশ্রম তিনি করেছেন তার সঙ্গে একমাত্র তুলনা করা যেতে পারে সবচেয়ে পরিশ্রমী ঐতিহাসিকদের। উদ্ধার করা তথ্যভাণ্ডারে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন একটা প্যাটার্ন বা নকশা। তাঁর সামষ্টিক অর্থনীতিই (ম্যাক্রোইকনমিক্স) তাঁকে এই বিষয়টা দেখার চোখ দিয়েছিল।  ফলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একেবারে  নতুন ধরনের একজন অর্থনীতিবিদ, যিনি অর্থনীতির তত্ত্ব এবং অ্যাপ্লায়েড ইকনমিক্সে সমানভাবে দক্ষ এবং দক্ষ অর্থনৈতিক ইতিহাসেও।
তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্যের প্রথম অসামান্য সৃষ্টি হল তাঁর বই যার শিরোনাম, প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট ইন ইন্ডিয়া ১৯০০-১৯৩৯ (Private Investment in India 1900-1939)। অনেক পুস্তক সমালোচক, এমনকি তাঁর যুক্তির সঙ্গে একমত নন এমন অনেক সমালোচনাকারীও, উপনিবেশ-বিরোধী ইতিহাস রচনা সংক্রান্ত তাঁর বিপুল সৃষ্টিকে তুলনা করেছেন দাদাভাই নওরোজি, রমেশচন্দ্র দত্ত, এবং ডি আর গ্যাডগিলের কাজের সঙ্গে।  এই বইটি লেখার পর সামনে তাঁর আরেকটি গবেষণা, ‘ডিইনডাস্ট্রিয়ালাইজেসন ইন দ্য ইন্ডিয়ান ইকনমি ইন দ্য কলোনিয়াল পিরিয়ড।’ নওরোজি এবং দত্তের আমল থেকে চলে আসা একটা দীর্ঘকালীন বিতর্ক অমীমাংসিত ছিল। সেই বিতর্কের নিষ্পত্তিতে তাঁর গবেষণা পত্রে তিনি যুগিয়ে দিয়েছিলেন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ। 

অসংখ্য বই ও নিবন্ধ রচনা করেছেন তিনি। সেগুলির বেশির ভাগই নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে। এসবের মধ্যে আলাদা করে আমার চোখে যেটা পড়েছে সেটা হল ১৯৭২ সালে দ্য ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলিতে লেখা তাঁর একটি প্রবন্ধ। বিশ্ব অর্থনীতির ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন এবং অনুন্নয়নের যে দ্বান্দ্বিকতা, তার একটা চমৎকার ও মৌলিক রূপরেখা তিনি ওই প্রবন্ধে তুলে ধরেছিলেন। এই লেখাটা একই সঙ্গে সহজ-সরল, আবার পাঠকের চেতনায় প্রত্যয়ের জন্ম দেয়। এই দুই গুণের কারণে এই প্রবন্ধটিকে বিবেচনা করা যেতে পারে পল বারানের সেরা বই দ্য পলিটিক্যাল ইকনমি অফ গ্রোথ-এর সত্যিকারের উত্তরাধিকারী হিসাবে। তাঁর পরের দিককার বইটি হল দ্য পলিটিক্যাল ইকনমি অফ আন্ডারডেভেলপমেন্ট। ওই বইটিতে যে যুক্তি তিনি উপস্থাপিত করেছেন আরও বিস্তারিত ভাবে, যদিও সম্ভবত তার আশু প্রভাব তুলনায় কম, সেই আলোচনারই একটি সারগর্ভ ভূমিকা পাওয়া যাবে তাঁর উপরে উল্লিখিত দ্য ইকনমিক অ্যন্ড পলিটিক্যাল  উইকলির প্রবন্ধে। তাঁর শেষ সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা হল পেরিলাস প্যাসেজ:ম্যানকাইন্ড অ্যান্ড দ্য গ্লোবাল অ্যাসেনডেন্সি অফ ক্যাপিটাল। এই বইটিতে তিনি দক্ষিণ গোলার্ধের বহু দেশের বহুতর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন এবং জোর দিয়েছেন সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও নিপীড়নের কারণে  জনসংখ্যার ধারাবাহিক ক্ষয়ের (ডেমোগ্রাফিক কলাপস) বিষয়ে। 

কেমব্রিজ পর্বের পর তিনি কলকাতায় ফিরে এসে তাঁর নিজেরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন। কয়েক বছর পর সেখান থেকে চলে যান কলকাতায় সদ্য প্রতিষ্ঠিত সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ সোশাল সায়েন্সেস-এ। ক্রমে তিনি সেখানকার ডিরেক্টর হন।  আগাগোড়াই তিনি ছিলেন বাম রাজনীতিতে কট্টর বিশ্বাসী। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে প্রথমে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পরিকল্পনা বোর্ডের সদস্য পদে ও পরে বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান পদে দীর্ঘদিন ছিলেন তিনি। সরকারি চাকরি শেষে তিনি কলকাতায় ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনিই ছিলেন সেখানকার ডিরেক্টর। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই প্রতিষ্ঠানের এমেরিটাস অধ্যাপক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। 

যাঁদের তিনি শিক্ষক ছিলেন এবং পিএইচডির গাইড ছিলেন, সেই রকম অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর ভূ্য়সী প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। সেই সব পড়ুয়ারা তাঁকে সম্মান করতেন। তিনি নিজেই ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠানের মতো। আবার তিনিই ছিলেন প্রতিষ্ঠানের স্থপতিও। সাম্রাজ্যবাদের কার্যকলাপ কীভাবে অনুন্নতি ও পশ্চাদপদতাকে পল্লবিত করে তোলে, এই বিষয়টিকে সর্বপ্রথম উপস্থাপিত করেছিলেন ভারতের জাতীয়তাবাদী লেখকেরা। বিষয়টিকে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা এবং সেই প্রক্রিয়ায় অসাধারণ স্পষ্টতায় পাঠকের সামনে অনুন্নয়নকে গভীরতর করে তোলার লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদী কার্যকলাপের স্বরূপ মেলে ধরা, এই কাজে তিনি ছিলেন পথিকৃৎ।‌ ঐতিহাসিক থেকে অর্থনীতিবিদ — সবাইকে প্রভাবিত করেছে তাঁর রচনা। তিনি ভারতীয় ইতিহাস কংগ্রেসের ৮০তম অধিবেশনের সাধারণ সভাপতি নির্বাচিত হন।

বাগচী সারা জীবন কলকাতার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তাঁর প্রিয় এই শহরকে তিনি কখনই স্থায়ীভাবে ত্যাগ করে চলে যাননি। যদিও দিল্লি সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সম্মানজনক চাকরির বহু প্রস্তাব তাঁর কাছে এসেছিল। তিনি যেন ছিলেন কলকাতার চালচিত্রেরই একটা অংশ। এই শহরের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক জীবনে তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের তরুণ মেধাজীবীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা বেশ কয়েকটি ছোট পত্রিকায় তিনি নিয়মিত বাংলায় লেখালিখি করতেন। বস্তুত, দীর্ঘ সময় জুড়ে তিনি ছিলেন কলকাতা ও কেম্ব্রিজের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী এক উল্লেখযোগ্য সেতু। কেম্ব্রিজের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ যেমন মরিস ডব, পিয়ের স্রাফা, রিচার্ড গুডউইন এবং জোয়ান রবিনসন ছিলেন তাঁর বন্ধু। বাগচী রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতেন একেবারে তন্ময় হয়ে। সেটা ছিল তাঁর মুগ্ধতাবোধের উৎস। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা কবিতা (‌শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর একেবারে সমসাময়িক)‌, উৎপল দত্তের নাটক নিয়েও আলোচনা তিনি উপভোগ করতেন। সবার ওপরে যে কথাটা বলার তা হল, শোষণমুক্ত পৃথিবী একদিন গড়ে উঠবে, তেমন একটা ভবিষ্যৎ বিষয়ে অটল ছিল তাঁর আস্থা।

শিরোনাম মার্কসবাদী পথ-এর, সূত্র:সোশাল সায়েন্টিস্ট, অনুবাদ: সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ৩০-নভেম্বর-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org