লিগ নেই, ভোটে বাংলাদেশ

শান্তনু দে
আরএসএসের কাছে যেমন গোলওয়ালকার, জামাতের কাছে তেমনই মওদুদি। মওলানা আবুল আলা মওদুদি। ১৯৩৮-এ গোলওয়ালকার লেখেন উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড। প্রকাশ পায় ১৯৩৯-এ। দু’বছর বাদে ১৯৪১ সালের আগস্টে মওদুদির নেতৃত্বে পাঠানকোটে তৈরি হয় জামাত-ই-ইসলামি। গোলওয়ালকার এবং মওদুদির রাজনৈতিক প্রকল্প এবং ভূমিকার সাদৃশ্য বাস্তবিকই চমকপ্রদ। হিটলার যেমন গোলওয়ালকারের নায়ক, ঠিক তেমনি মওদুদির কাছেও।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম জামাত মনে করছে তাদের জয়ের জন্য তৈরি হয়েছে একটি সত্যিকারের সম্ভাবনা। যদি একান্তই তা না হয়, তবে তারা হতে চলেছে শক্তিশালী বিরোধীপক্ষ। 

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন। সাড়ে ১৭ কোটি জনসংখ্যা। বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ, চতুর্থ বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা। আগস্ট, ২০২৪: গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অপসারণের পর এই প্রথম নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুস গতবছর মার্চেই নিষিদ্ধ করেছেন হাসিনার দল আওয়ামি লিগকে। যা দেশটিতে নতুন এক দুই মেরু প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে। দ্বি-দলীয় রাজনীতির লড়াই আগেও ছিল। তবে তা ছিল আওয়ামি লিগ আর বিএনপি (বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি)-র মধ্যে। 

মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতি দেখে এসেছে দুটি শক্তিশালী মূল ধারা: একদিকে ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি। অন্যদিকে ধর্মাশ্রয়ী বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। একদিকে লিগ। অন্যদিকে জিয়াউর রহমানের তৈরি বিএনপি। প্রথম ধারাটির নেতৃত্বে আপস সত্ত্বেও ছিল লিগ। দ্বিতীয়টির নেতৃত্বে বিএনপি। লিগ ও বিএনপি দুদলেরই শ্রেণিচরিত্র শেষ বিচারে এক। রাজনৈতিক আচরণে পার্থক্য সামান্যই। উভয় দলই সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে। উভয়েই লুটেরা-ধনিক শ্রেণির স্বার্থের প্রতিনিধি। দুর্নীতির রেকর্ড কম-বেশি দু-দলেরই রয়েছে। তবে অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে রয়েছে একেবারে সামান্য পার্থক্য। বিএনপি মৌলবাদের সঙ্গে সরাসরি গাঁটছড়া বাঁধা। জামাত ছিল তাদের প্রধান শরিক। আর লিগ মুখে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বললেও, প্রায়শই সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে আপস করে গিয়েছে। বিএনপির সঙ্গে পার্থক্য বলতে এটুকুই। 

অন্যদিকে, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী জামাত ছিল বিএনপি-র শরিক, প্রান্তিক শক্তি। কখনও ২০টির বেশি আসন পায়নি। পায়নি ১২ শতাংশের বেশি ভোট। এবারে লিগ নেই। নতুন চেহারায় দুই মেরু প্রতিযোগিতা। লড়াই বিএনপি-র দশদলের জোট বনাম জামাতের এগারো-দলের জোটের মধ্যে, যাদের সঙ্গে রয়েছে গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র-নেতাদের তৈরি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি।

গতবছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের করা জনমত সমীক্ষা বলছে বিএনপি-র পক্ষে সমর্থনের হার ৩৩ শতাংশ। ঘাড়ের কাছে জামাত। সমর্থনের হার ২৯ শতাংশ (দ্য ডেইলি স্টার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৫)। প্রায় একইরকম হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিয়েছে নভেম্বর-ডিসেম্বরে করা বাংলাদেশের চারটি প্রতিষ্ঠানের একটি যৌথ সমীক্ষা। বিএনপি-র পক্ষে ৩৪.৭ শতাংশ, জামাতের ৩৩.৬ শতাংশ (প্রথম আলো, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬)। 

কট্টর ইসলামপন্থী জামাত যদি কোনওভাবে জিতে যায়, তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তা হবে একটি নাটকীয় পরিবর্তন। যার বিরাট প্রভাব পড়বে দেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থার উপর। ধর্মীয় মৌলবাদের এই উত্থান শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, তার অবধারিত প্রভাব পড়ছে, পড়বে এই উপমহাদেশে। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরার মতো সীমান্তের রাজ্যগুলিতে। সামনে পশ্চিমবঙ্গ, আসামে বিধানসভা ভোট। যে-ই জিতুক, ভারত-বিরোধিতার সুর আরও চড়বে। সীমান্তের দুই পারের সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি একে-অপরকে এমনিতেই জ্বালানি জোগাচ্ছে। আরও জোগাবে। ঘৃণা ও বিদ্বেষ আরও তীব্র হবে। কে না জানেন, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলিম মৌলবাদ এভাবেই একে-অপরকে পুষ্ট করে।

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

আরএসএসের কাছে যেমন গোলওয়ালকার, জামাতের কাছে তেমনই মওদুদি। মওলানা আবুল আলা মওদুদি। ১৯৩৮-এ গোলওয়ালকার লেখেন উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড। প্রকাশ পায় ১৯৩৯-এ। দুবছর বাদে ১৯৪১ সালের আগস্টে মওদুদির নেতৃত্বে পাঠানকোটে তৈরি হয় জামাত-ই-ইসলামি। গোলওয়ালকার এবং মওদুদির রাজনৈতিক প্রকল্প এবং ভূমিকার সাদৃশ্য বাস্তবিকই চমকপ্রদ। হিটলার যেমন গোলওয়ালকারের নায়ক, ঠিক তেমনি মওদুদির কাছেও। গোলওয়ালকার যেমন মানব সভ‍্যতার আধুনিক সবকিছুকেই— স্বাধীনতা, সাম‍্য, ভ্রাতৃত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সংসদীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ-কে বিজাতীয় ধারণা বলে প্রত‍্যাখ‍্যান করেছিলেন— মওদুদি এবং মুসলিম মৌলবাদী দর্শনের ভূমিকাও ছিল অনুরূপ। 

১৯৪৭ সালের মে মাসে, দেশভাগ যখন আসন্ন, মওদুদি তখন ভারতীয়দের কাছে হিন্দু শাস্ত্র ও বিধান মেনে রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার আহ্বান জানান— যেমন পাকিস্তানকে তাঁরা গড়বেনআল্লার বিধান মেনে। পাকিস্তানে কুআদিআনি-বিরোধী দাঙ্গার অনুসন্ধানে নিযুক্ত এক সদস্যের কমিশনের বিচারক মহম্মদ মুনিরের কিছু প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন:হিন্দু বিধানের ওপর ভর করে কোনও হিন্দু সরকার যদি ভারতে আসে এবং মনুর বিধান যদি আইনরূপে গৃহীত হয়— এবং যার ফলে মুসলিমরা অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত হন, সরকারে তাদের অংশগ্রহণ করতে দেওয়া না হয়— শুধু তাই নয়, যদি তাঁরা নাগরিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হন— তাহলেও আমার তাতে কোনও আপত্তি নেই(জেড এ নিজামি, ১৯৭৫, পৃষ্ঠা ১১)। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধী ছিল জামাত। ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। এমনকি তৈরি করেছিল আল-বদরের মতো সশস্ত্র বাহিনী, যারা হত্যা করেছে লাখো স্বাধীনতা প্রেমী মানুষ, শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের। দেশটির ৫৫ বছরের ইতিহাসে একাধিক বার নিষিদ্ধ করা হয়েছে জামাতকে। রাজনৈতিক দল হিসেবে হাইকোর্ট রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে দেওয়ায় ২০১৩ থেকে তারা অংশ নিতে পারেনি কোনও নির্বাচনে। অপসারণের চারদিন আগে হাসিনা সরকার নিষিদ্ধ করে জামাতের সমস্ত কার্যক্রম। তার আগে তাঁর আমলে শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি, কারাদণ্ড দেওয়া হয়। 

অন্তর্বর্তী সরকার এসে শুরুতেই জামাতের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। মুক্তি দেয় বন্দি শীর্ষ নেতাদের। তারা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। লিগের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, দ্রুততার সঙ্গে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে জামাত। হয়ে ওঠে বিএনপি-র মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী। ঢাকা, জাহাঙ্গিরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পর সর্বশেষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনে বড় জয় পায় জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবির। জামাত নেতাদের দাবি তাদের সঙ্গে রয়েছে ২ কোটি মানুষের সমর্থন, যার মধ্যে রয়েছে প্রায় ২,৫০,০০০ সর্বক্ষণের কর্মী, দলের ভাষায় রুকন (খুঁটি)। জামাত ইসলামি শরিয়া আইন মেনে সরকার পরিচালনার পক্ষপাতী। নারী স্বাধীনতার বিরোধী। এমনকি, সন্তান পরিচালনার কর্তব্য পালনের জন্য মহিলাদের কাজের সময় কমিয়ে দেওয়ার পক্ষে। 

বাংলাদেশের মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি  নিয়ে রয়েছে একটি অসাধারণ গবেষণাপত্র। লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আবুল বারকাত। একসময় তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক জনতা ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান। এখন জেলে। বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। শুধু কওমি মাদ্রাসা নয়, জামাতের রয়েছে ব্যাঙ্ক, হাসপাতাল, ওষুধ তৈরির কারখানা। রয়েছে সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল এমনকি শপিং মল। আছে বাস, ট্রাক, লঞ্চ, স্টিমার, জাহাজ, অটোর ব্যবসা। সঙ্গে জমিবাড়ির রমরমা কারবার। এসব থেকেই তারা বছরে আয় করে কয়েক হাজার কোটি টাকা। আয়ের উৎস শুধু দেশ নয়। বিদেশও। বিশেষত সৌদি আরব। আর এই বিপুল অর্থশক্তিকে তারা ব্যবহার করে সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজে।

এটা ঠিক, বাংলাদেশে ইসলামি মৌলবাদের দৌরাত্ম আগেও ছিল। তবে এখন তা আরও অনেকটাই বেড়েছে। এই সময়ে সমাজ-ও হয়েছে অনেকটা ইসলাম-মুখী। তবে এও ঠিক, তারা এখনই রক্ষণশীল ইসলামি নেতৃত্বের হাতে রাষ্ট্রকে তুলে দিতে প্রস্তুত নয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ধার্মিক হতে পারেন, কিন্তু ধর্মান্ধ নন। এক্ষেত্রে লিগের সমর্থকরা নিতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। 

তাছাড়া, এযাবৎ জামাত সর্বোচ্চ ভোট ছিল ১৯৯১-তে, ১২.২ শতাংশ। ৩০০-সদস্যের সংসদে সেবার আসন সংখ্যা ছিল সাকুল্যে ১৮। তারপর কমতে-কমতে ২০০৮-এ হয় ৪.৬ শতাংশ, আসন সংখ্যা মেরেকেটে ২। অবশ্য, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪— এই তিনটে নির্বাচনে ছিল না তারা। ফলে সাড়ে ৪ শতাংশ থেকে জামাত তার নিজের সমর্থন কতটা বাড়াতে পেরেছে, বলতে পারবে একমাত্র জনাদেশ।

তৎপর ওয়াশিংটন। একসময়ে নিষিদ্ধ জামাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে চায় আমেরিকা। বাংলাদেশে উপস্থিত মার্কিন কূটনীতিবিদদের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের কথোপকথনের একটি অডিয়ো রেকর্ডিং ফাঁস করে দিয়ে এমনই দাবি করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট (২২ জানুয়ারি, ২০২৬)। স্বাভাবিক। আমেরিকা এতদিন আড়ালে আবডালে জামাতের পক্ষে কথা বলত। এখন বলছে প্রকাশ্যে। আমেরিকার কাছে জামাত এখনমডারেটইসলামি দল। জামাত তাদের কাছে নরম ও আধুনিক মৌলবাদী। চাইছে তাদেরকে গণতন্ত্রেরইনক্লুসিভঅংশীদার করতে। জামাতকে তারা কখনোই যুদ্ধাপরাধী মনে করে না। কারন জামাত যুদ্ধাপরাধী হলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাদ থাকে কেন? যুদ্ধাপরাধী নেতাদের ফাঁসির আদেশ রদ করার জন্য হাসিনাকে ফোন করে তদ্বির করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন বিদেশসচিব হিলারি ক্লিন্টন। হাসিনা তাতে আমল না দেওয়ায় হুমকি দিতেও শোনা গিয়েছিল হিলারিকে।

বাংলাদেশের জন্য জরুরি হলো একটি নিরপেক্ষ সুষ্ঠু অবাধ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। এমন একটি সরকার, যারা বিশৃঙ্খলার এই চক্রকে ভাঙতে পারবে, জনসাধারণের মনে নতুন করে আস্থা ফেরাতে পারবে, পুনরুদ্ধার করতে পারবে আইনশৃঙ্খলাকে, দূরে রাখতে পারবে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলিকে। গণতন্ত্রের অনুশীলন, বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুর পুনর্গঠনের দায়িত্ব অনেকটাই নির্ভর করছে তারেক রহমান ও তার দল বিএনপি-র উপর। তিনি কি পারবেন এই দায়িত্বভাব বহন করতে— যা নির্ধারন করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। 


প্রকাশের তারিখ: ০৬-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org