রেলের ইউনিয়নে বামপন্থীদের জয়

দেবাঞ্জন চক্রবর্তী

এই সামগ্রিক বেসরকারিকরণ পরিকল্পনার প্রেক্ষাপটে রেলের শ্রমিক-কর্মচারীরা নিজ নিজ সেক্টরে ধীরে ধীরে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলেন। এরই সাথে সিআইটিইউ-সহ আরো অন্যান্য বামপন্থী কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সারা ভারতে রেল বেসরকারিকরণের বিরোধিতায় রাস্তায় নামে। ফলে যখন রেলে ইউনিয়নের মান্যতা নির্বাচন সামনে আসে, তখন এই বেসরকারিকরণ ইস্যুই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।... আন্দোলন, সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে কেন্দ্রের সরকারের বেসরকারিকরণ নীতিকে যে পরাস্ত করা যায়এই নির্বাচনের ফলাফল তার জ্বলন্ত প্রমান।

ভারতীয় রেলের অবস্থান

ভারতীয় রেল দেশে চলে ৬৮,৫৮৪ কিলোমিটার রেল ট্র্যাকে। দেশের লাইফলাইন। বিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তম ভারতীয় রেল নেটওয়ার্ক। এশিয়াতে প্রথম। ডাবল লাইন, সিঙ্গেল লাইন, রেলওয়ে সাইডিং মিলিয়ে মোট ট্র্যাক হলো– ১,৩২,৩১০ কিলোমিটার।

প্রতিদিন ২ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ ৩০ লক্ষ কিলোমিটার যাতায়াত করে রেলের মাধ্যমে। ১৩,১৬৯টি প্যাসেঞ্জার ট্রেন প্রতিদিন চলে। ৭৩২৫টি স্টেশন ভারতীয় রেলের নেটওয়ার্কে আছে।

৭ জানুয়ারি ২০২৩-এ ভারতীয় রেলে কর্মরত স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা– ১২,১৮,২২১ জন। ২০২২ সালের ২২ জুলাই রেলে কর্মরত ঠিকা-শ্রমিক সংখ্যা ৫,৮৭,৯৬৮।

রেল বেসরকারিকরণ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

২০১২ সালে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে স্টেশন ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (আইআরএসডিসি) গঠিত হয়েছিল। বিজেপি সরকার ২০১৬ সাল থেকে প্রচেষ্টা শুরু করে রেল স্টেশনগুলি বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার। প্রথমে তারা সিদ্ধান্ত নেয় ৪০০টি রেল স্টেশন বেসরকারি হাতে তুলে দেবে। পরে এটা সরকার কমিয়ে ৫০টি স্টেশন নির্দিষ্ট করে। চূড়ান্ত পর্যায়ে আইআরএসডিসি ২৩টি রেল স্টেশন বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার টেন্ডার ডাকে। ভারতজুড়ে প্রতিবাদের ফলে তা বাস্তবায়িত হয়নি– একটি স্টেশন (হাবিবগঞ্জ) বাদে। কেন্দ্রীয় সরকার প্রথমে পরিকল্পনা করেছিল ১৫০টি ট্রেন, সাথে ১০১টি রেল রুট যা রয়েছে– ১২টি ক্লাস্টারে, তার বেসরকারিকরণের। কিন্তু তা বাস্তবায়িত করতে পারেনি চারিদিক থেকে আন্দোলনের চাপে।

ট্রেন বেসরকারিকরণ স্কিমে ট্রেন চলাচল থেকে যে আয় হবে তার ভাগাভাগির ধারা তুলে দেওয়া হল। এর ফলে বেসরকারি সংস্থাগুলি দারুন খুশি হলো। এই স্কিমে যারা ট্রেন চালাবেন তারা কেবলমাত্র ট্রেন চালানোর অধিকার বাবদ এবং মাল পরিবহন মাশুল বাবদ অর্থ দেবেন। কিন্তু এই সূত্রে তারা (মালিকেরা) স্থির করবে শুল্ক কী হবে এবং হল্ট কোথায় হবে। কী কী সার্ভিস এবং রুট কী হবে। গতিশক্তি কার্গো টার্মিনাল এবং ৪০০টি বন্দে ভারত ট্রেন এখন পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে বেসরকারি সংস্থা চালাবে।

এছাড়াও আরো কিছু সুবিধাদি বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়া হবে, যেমন:

১) বেসরকারি ট্রেন যাওয়া আসার ৬০ মিনিটের পরে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ট্রেন চলবে।

২) বেসরকারি মালিকদের ৩৫ বছরের জন্য লাইসেন্স দেওয়া হবে।

৩) বেসরকারি মালিকরা স্থির করবে তাদের ট্রেনের ভাড়া কী হবে।

বর্তমানে বিভিন্ন রেল কনসেশন যা যা ছিল তার অনেকগুলি তুলে দিয়েছে। আগামীদিনে সুবার্বান ট্রেনে নিত্যযাত্রীদের মান্থলি, ত্রৈমাসিক সিজন টিকিটে রেল যে ৪৭ শতাংশ ভরতুকি দেয়, তা-ও তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই সামগ্রিক বেসরকারিকরণ পরিকল্পনার প্রেক্ষাপটে রেলের শ্রমিক-কর্মচারীরা নিজ নিজ সেক্টরে ধীরে ধীরে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলেন। এরই সাথে সিআইটিইউ-সহ আরো অন্যান্য বামপন্থী কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সারা ভারতে রেল বেসরকারিকরণের বিরোধিতায় রাস্তায় নামে। ফলে যখন রেলে ইউনিয়নের মান্যতা নির্বাচন সামনে আসে, তখন এই বেসরকারিকরণ ইস্যুই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।

এই নির্বাচনের ফলাফলের কিছু তথ্য প্রমান করবে রেলের শ্রমিক কর্মচারীরা বিজেপি সরকারের বেসরকারিকরণ নীতির ব্যাপকভাবে বিরোধিতা করেছে।

ইআরএমইউ (ইস্টার্ন রেলওয়ে মেনস্ ইউনিয়ন) মোট ৭৯,৬৯০ প্রদত্ত ভোটের মধ্যে পেয়েছে ৩৩,২৬২ ভোট। যা প্রদত্ত ভোটের ৪২ শতাংশ। ইআরএমইউ এরিয়া হলো বাংলা, বিহার, ঝাড়খণ্ড।

তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত ইউনিয়নের ব্যাপক সন্ত্রাস, ভীতিপ্রদর্শন সত্ত্বেও ইআরএমইউ ৪২ শতাংশ ভোট পেয়ে ইউনিয়নের মান্যতা পেয়েছে। এইখানে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত ইআরটিএমসি পেয়েছে মাত্র ৬.২০ শতাংশ ভোট।

চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ ওয়ার্কার্স লেবার ইউনিয়ন (সিআইটিইউ অনুমোদিত) ৩০২৬টি ভোট পেয়ে ইউনিয়নের স্বীকৃতি আদায় করতে পেরেছে।

কলকাতা মেট্রো রেলওয়েমেন্স ইউনিয়ন ১০৪২টি ভোট পেয়ে ইউনিয়নের স্বীকৃতি আদায় করেছে। এই ইউনিয়ন মোট ভোটের ৩৬.২৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে।

দক্ষিণ রেলওয়ে এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিআইটিইউ) মোট ভোটের মধ্যে ২০২৭৮টি ভোট পেয়ে (৩৮.০৪ শতাংশ) ইউনিয়নের মান্যতা নির্বাচনে জয়ী হয়েছে।

সাউথ ইস্টার্ন রেলে এআইআরএফ জয়লাভ করেছে। এইখানে বামপন্থীরা এই রেলের মুখ্য ভূমিকায় আছে। এখানে মোট ভোটের ৩৭.৫১ শতাংশ ভোট পেয়েছে এই ইউনিয়ন।

এই মান্যতা ৫ বছরের জন্য বহাল থাকবে।

উপসংহার

আন্দোলন, সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে কেন্দ্রের সরকারের বেসরকারিকরণ নীতিকে যে পরাস্ত করা যায়– এই নির্বাচনের ফলাফল তার জ্বলন্ত প্রমান।


পূর্ব রেলের গোপন ব্যালট নির্বাচন ফলাফল ২০২৪ ( মোট প্রদত্ত ভোট ৭৯৬৯০ )

প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ইউনিয়ন প্রাপ্য ভোট শতাংশ 
ইআরইইউ ৩৩৯৮ ৪.২৬
ইআরএমসি ৩১৮১৪ ৩৯.৯২
ইআরএমইউ ৩৩২৬২ ৪২
ইআরটিএমসি ৪৯৩৯ ৬.২০
পিআরকেএস ৫২১৯ ৬.৫৫




 


প্রকাশের তারিখ: ২০-ডিসেম্বর-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org