লেনিন ও উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রাম

রতন খাসনবিশ
লেনিন মার্কসকে অনুসরণ করে এনেছিলেন সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্ব। সেই তত্ত্ব অনুসারে মার্কসের বর্ণনায় যে ভারতবর্ষ আছে সেটিকে কী ভাবে দেখতে হবে তার একটা ধারণা পাওয়া যায়। এই ধারণাটি ব্রিটিশ-শিক্ষিত ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের ভারতচিন্তাকে খণ্ডন করে। কী দাঁড়াতে পারে সেই ভারতচিন্তা সেটা পাওয়া যায় বলশেভিক বিপ্লবের অব্যবহিত পরে এক তরুণ ভারতীয়ের ভারতচিন্তার মধ্যে। ২৪ বছর বয়সী এই ভারতীয় লেনিনকে বুঝেছিলেন আর লেনিন-শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীর মতোই ব্রিটিশ সাম্রাজ্বাদের বিরোধিতায় নেমেছিলেন। সেই তরুণের নাম ভগৎ সিং।

সোভিয়েত রাশিয়ার এক জন প্রখ্যাত সাংবাদিক ডক্টর লিওনিদ মেট্রোখিন ‘লেনিন এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা’ এই শিরোনামে একটি বই লিখেছিলেন। এই বইতে তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বলশেভিক পার্টি ও সোভিয়েত রাশিয়ার কী ভূমিকা ছিল তা নিয়ে একটি অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেন। মিত্রোখিন শুধু সোভিয়েত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যগুলির ওপরেই তাঁর আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ভারতে এসেছিলেন, বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন এবং এদেশে প্রাপ্ত তথ্যসূত্রগুলিকেও তিনি খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করেছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নভেম্বর বিপ্লবের কী প্রভাব পড়েছিল সেটিও ছিল তাঁর গবেষণার একটি দিক। এই গবেষণা ছিল তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় রচনার (‘লেনিন এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা’) সম্পর্ক আছে।

ডক্টর মিত্রোখিন এটা প্রমাণ করেছেন যে, নভেম্বর বিপ্লব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে জোরদার করেছিল। বস্তুত, ইউরোপীয় মহাদেশে ঘটে যাওয়া এই একটি ঘটনাই মতাদর্শগত দিক থেকে ইউরোপের যে উপনিবেশবাদী ধারণাগুলি ছিল, সে সবের মূলে কুঠারাঘাত করেছিল। ইতিপূর্বে ইউরোপ থেকে যে সব ধারণা আমাদের কাছে এসেছিল তার মূল কথাটা ছিল, ‘আমরা হলাম সভ্যতার নিরিখে একটি পশ্চাদপদ অঞ্চলের অধিবাসী, ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞান আমাদের ক্রমশ সভ্য করে তুলছে।’ কোথাও কোথাও এটাও বলা হত যে, এই উপনিবেশগুলি হল সাদা মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া বোঝা (হোয়াইটমেনস বার্ডেন)। যেটিকে ঘাড় থেকে নামানোর দায় আছে ইউরোপের আর সেই দায় তারা মিটিয়ে যাচ্ছেন এই দেশগুলিকে উপনিবেশ বা আধা উপনিবেশে রূপান্তরিত করে। সোভিয়েত বিপ্লব ছিল এই প্রচলিত প্রজ্ঞার ওপর সরাসরি আঘাত। বলশেভিক বিপ্লবের অব্যবহিত পরে তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের যে প্রথম অধিবেশন হয়, সেখানেই ইউরোপীয় ভূখণ্ডের প্রচলিত এই প্রজ্ঞাকে খণ্ডন করা হয় এবং উপনিবেশগুলিকে অবিলম্বে স্বাধীনতা দেওয়ার দাবি তোলা হয়। লেনিনের নেতৃত্বে ওই আন্তর্জাতিক সম্মেলন দ্বর্থ্যহীন ভাষায় ঘোষণা করে যে, উপনিবেশ চায় সাম্রাজ্যবাদের নিগঢ় থেকে মুক্তিলাভ।

কথাকে কাজে পরিণত করার জন্য লেনিন প্রথম যেটি করেছিলেন তা হল, সে সময় প্রবাসে প্রোফেসর মহম্মদ বরকতউল্লার নেতৃত্বে কাবুলে যে স্বাধীন ভারত সরকার তৈরি হয়েছিল তাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া। ১৯১৯ সালের ৭মে বরকতউল্লা লেনিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সোভিয়েতে গত দু বছরে যা ঘটেছে তার পর্যালোচনা করেন। সাক্ষাৎকারের পরে বরকতউল্লা ঘোষণা করেন, ‘আমি কমিউনিস্টও নই, সমাজতন্ত্রীও নই। আমার জীবনের লক্ষ্য হল ব্রিটিশকে এশিয়া থেকে তাড়ানো। ইউরোপীয় পুঁজিবাদ এশিয়ায় যা করছে আমি তার আপসহীন শত্রু। এশিয়ায় সেই সাম্রাজ্যবাদের প্রতিভূ হল ইংরেজ। এই যুদ্ধে আমি কমিউনিস্টদের সঙ্গেই থাকব এবং এই অর্থে আমরা হলাম স্বাভাবিক মিত্র।’ বস্ত্ু্ত লেিননের বলশেভিক বিপ্লব ভারতের জন্য কী দিতে পারত বরকতউল্লার এই কথাগুলিতে তার প্রমাণ রয়েছে। পরবর্তী কালে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের ভূমিকা বিচার করতে হলে বরকতউল্লার এই আদি উপলব্ধিটিকেই মনে রাখতে হবে।

এদেশের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বলশেভিক বিপ্লবের এই তিক্ত সত্যটি সবার আগে উপলব্ধি করেছিল। এদেশে যে সব স্বাধীনতা সংগ্রামী মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন তাদের প্রত্যেককেই মস্কো-তাশখেন্দ ষড়যন্ত্রের আসামী হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছিল। পৃথ্বী সিং আজাদের বিরুদ্ধে এদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এনেছিল রাজনৈতিক অপরাধের মামলা। নবগঠিত কমিউনিস্ট পার্টি, তাশখেন্দ থেকে যা পরিচালিত হত, ইংরেজ সেটিকেও নজরদারির মধ্যে নিয়ে আসে। লেনিন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কী ভূমিকা পালন করেছেন এই প্রশ্ন যাঁরা তুলছেন, তাঁরা সচেতনভাবেই এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি পাশ কাটিয়ে যান। লেনিন হলেন সেই ইউরোপীয় যিনি মনে করতেন, ভারত ব্রিটিশ উপনিবেশ হবে এরকম কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। ভারতীয়দের শিক্ষিত করার জন্য ইংরেজদের এখানে উপনিবেশ গড়তে হবে, এটাও তিনি যথাযথ মনে করতেন না। আমাদের দেশে ব্রিটিশ শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরা কখনও এভাবে ভাবেননি। স্বাধীনতা আন্দোলনের আদি যুগে সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা ছিলেন দাদাভাই নওরোজি। নওরোজি ব্রিটিশ কীভাবে উপনিবেশ গড়ে, ভারতকে লুন্ঠন করে, তার একটি অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছিলেন। কিন্তু দাদাভাই নওরোজি কখনই এ জন্য সাম্রাজ্যবাদকে দোষারোপ করেননি। তিনি বলেছিলেন, ব্রিটিশের এই কাজটা ‘আনব্রিটিশ’ (অর্থাৎ ওদের মতো সভ্য জাতির পক্ষে বেমানান)। তাঁর বিখ্যাত বইটির শিরোনাম ছিল ‘পভার্টি অ্যান্ড আনব্রিটিশ রুল অফ ইন্ডিয়া।’নওরোজির দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই বোধহয় পরবর্তীকালে কংগ্রেসি রাজনীতি গড়ে ওঠে। ব্রিটিশের যে কোনও নৈতিক অধিকার নেই ভারতকে শাসন করার, একথাটি কংগ্রেস নেতারা বলতে চাইতেন না। ১৯৩০ সালে যখন কংগ্রেস আনল পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি (করাচি কংগ্রেস), তখনও কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের মুগ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি কংগ্রেস নেতৃত্ব।

ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে কীভাবে দেখতে হবে সে বিষয়ে কার্ল মার্ক্সের বক্তব্যগুলি অনুধাবনযোগ্য। লেনিন মার্ক্সকে অনুসরণ করে এনেছিলেন সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্ব। সেই তত্ত্ব অনুসারে মার্ক্সের বর্ণনায় যে ভারতবর্ষ আছে সেটিকে কী ভাবে দেখতে হবে তার একটা ধারণা পাওয়া যায়। এই ধারণাটি ব্রিটিশ-শিক্ষিত ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের ভারতচিন্তাকে খণ্ডন করে। কী দাঁড়াতে পারে সেই ভারতচিন্তা সেটা পাওয়া যায় বলশেভিক বিপ্লবের অব্যবহিত পরে এক তরুণ ভারতীয়ের ভারতচিন্তার মধ্যে। ২৪ বছর বয়সী এই ভারতীয় লেনিনকে বুঝেছিলেন আর লেনিন-শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীর মতোই ব্রিটিশ সাম্রাজ্বাদের বিরোধিতায় নেমেছিলেন। সেই তরুণের নাম ভগৎ সিং। ভগৎ সিংকে যখন ব্রিটিশ বিরোধিতার কারণে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয় লাহোর জেলে বসে তখন তিনি ক্লারা জেটকিনের ‘রেমিসিন্সেস অফ লেনিন’ পড়ছিলেন। ফাঁসিতে যাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন, ‘একটু অপেক্ষা করো। একজন বিপ্লবী আরেক জন বিপ্লবীর সঙ্গে কথা বলছেন।’ এই চেতনাই প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা, লেনিনের উত্তরাধিকারী হিসাবে ভগৎ সিং যা অর্জন করেছিলেন।

স্বাধীনতা সংগ্রাম বিরোধী, ব্রিটিশের একনিষ্ঠ সমর্থক সাভারকার এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা এসব খুব ভালমতোই জানেন। আর সেজন্যই তাঁরা সন্ন্যাসীর ভেকধারী এক গুণ্ডাকে দিয়ে লেনিন সরণির নাম বদল করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। এই যুদ্ধ আসলে মতাদর্শগত যুদ্ধ। প্রতিক্রিয়াশীলদের যে যুদ্ধে জয়লাভের কোনও সম্ভাবনাই নেই।


প্রকাশের তারিখ: ১১-অক্টোবর-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org