লেনিন এবং উপনিবেশগুলির জনগণ

হো চি মিন
নিপীড়িত মানুষ প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি যে এই পৃথিবীতে কোথাও এমন একজন মানুষ ও এমন কোনও পরিকল্পনার অস্তিত্ব থাকতে পারে। কিন্তু অস্পষ্টভাবে হলেও পরবর্তীতে তারা কমিউনিস্ট পার্টির কথা জেনেছে, জেনেছে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট সংগঠনের কথা, যারা শোষিত জনগণের জন্য, সমস্তরকম শোষিত জনগোষ্ঠীর জন্য লড়াই করেছে; এবং তারা জেনেছে যে সেই সংগঠনের নেতা হলেন লেনিন।

"লেনিন আর নেই!” এই সংবাদটি জনগণের কাছে এক অপ্রত্যাশিত আঘাতের মত নেমে এল। সংবাদটি আফ্রিকার উর্বর সমভূমির প্রতিটি কোণে এবং এশিয়ার সবুজ ক্ষেত্রগুলিতে ছড়িয়ে পড়ল। একথা সত্যি যে, কালো বা হলুদ মানুষেরা এখনও স্পষ্টভাবে জানে না লেনিন কে, রাশিয়াই বা কোথায়। সাম্রাজ্যবাদীরা এবিষয়ে তাদের ইচ্ছাকৃতভাবেই অজ্ঞ রেখেছে। মানুষকে অজ্ঞ রাখা — অন্ধকারে রাখা পুঁজিবাদের মূল ভিত্তিগুলির মধ্যে একটি।

কিন্তু এতদসত্ত্বেও, একজন ভিয়েতনামী কৃষক থেকে ডহেমি বনভূমির একজন শিকারি পর্যন্ত সকলেই গোপনে জেনেছেন যে পৃথিবীর কোন দূরতম প্রান্তে এমন এক জাতি রয়েছে যারা তাদের শোষকদের উৎখাত করতে সফল হয়েছে এবং তারা কোনও মালিক বা আমলাতন্ত্র ছাড়াই দেশ পরিচালনায় সক্ষম হয়েছে। তারা এও জেনেছে যে, সেই দেশের নাম রাশিয়া এবং সেখানেই সবচেয়ে সাহসী জনগণেরা রয়েছেন; আর তাদের মধ্যেও যিনি সর্বাধিক সাহসী তিনিই লেনিন। সেই দেশ এবং সেই দেশের নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও উষ্ণ অনুভূতির জন্যে তাদের কাছে এটুকু তথ্যই ছিল যথেষ্ট।

কিন্তু এটুকুও সব ছিল না। তারা এও জেনেছিল যে, সেই মহান নেতা তাঁর নিজের দেশের জনগণকে মুক্ত করার সাথে সাথে সমগ্র মানবজাতিকেই মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তিনি শ্বেতাঙ্গদের আহ্বান করেছিলেন বিদেশীদের আগ্রাসী জোয়াল থেকে এবং সমস্ত রকম সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থেকে নিপীড়িত কালো ও হলু মানুষদের মুক্তি সংগ্রামে সাহায্য করার। এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তিনি একটি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির পরিকল্পনাও করেছেন।

নিপীড়িত মানুষ প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি যে এই পৃথিবীতে কোথাও এমন একজন মানুষ ও এমন কোনও পরিকল্পনার অস্তিত্ব থাকতে পারে। কিন্তু অস্পষ্টভাবে হলেও পরবর্তীতে তারা কমিউনিস্ট পার্টির কথা জেনেছে, জেনেছে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট সংগঠনের কথা, যারা শোষিত জনগণের জন্য, সমস্তরকম শোষিত জনগোষ্ঠীর জন্য লড়াই করেছে; এবং তারা জেনেছে যে সেই সংগঠনের নেতা হলেন লেনিন।

আর এই জানাটুকুই সেই মানুষগুলোর জন্য যথেষ্ট ছিল আর তাই সাংস্কৃতিক মানে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও কৃতজ্ঞচিত্ত ও শুভাকাঙ্খী এই মানুষেরা লেনিনকে আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধা করেছে। তারা লেনিনকে তাদের মুক্তিদাতা হিসেবেই দেখেছে। 'লেনিন আর নেই! তাহলে আমাদের কী হবে? লেনিনের মত সাহসী ও উদার মানুষ কি আর কেউ আছেন যিনি আমাদের মুক্তিসংগ্রামকে নিজের অতিরিক্ত কোনো কাজ বলে ভাববেন না?' পদদলিত ঔপনিবেশিক মানুষেরা আজ সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে চলেছে।

আমাদের কথা বললে, আমরা এই অপূরণীয় ক্ষতিতে গভীরভাবে শোকাহত। সমব্যথী জনগণ আমাদের ভাই-বোন; তাদের সঙ্গেই এই শোক ভাগ করে নিচ্ছি। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি যে, কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল এবং তার সমস্ত শাখা, উপনিবেশিক দেশগুলিতে থাকা শাখাগুলিও, আমাদের জন্যে রেখে যাওয়া লেনিনের শিক্ষা ও স্বপ্নের বাস্তবায়নে সফল হবে। তিনি আমাদের যে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন তা যথার্থভাবে পালন করাই কি তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসা জানানোর সর্বোৎকৃষ্ট উপায় নয়?

তাঁর জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন আমাদের পিতা, শিক্ষক, সহযোদ্ধা ও উপদেষ্টা। আজ, তিনি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ প্রদর্শনকারী এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। মৃত্যুহীন লেনিন আমাদের কর্মের মাধ্যমেই চিরজীবিত থাকবেন।

প্রথম প্রকাশ: প্রাভদা, জানুয়ারি ২৭, ১৯২৪
উৎস: 'সিলেক্টেড ওয়ার্কস অফ হো চি মিন'; ভলিউম ১; ফরেইন ল্যাঙ্গুয়েজেস পাবলিশিং হাউস।
ভাষান্তর : সৌরভ রঞ্জন ঘোষ
ঋণ : সংবর্তক

এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ, ফলো করুন আমাদের Whatsapp Channel

প্রকাশের তারিখ: ২১-জানুয়ারি-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org