|
গণতন্ত্র এবং শ্রেণিসংগ্রাম সম্পর্কে লেনিনপ্রভাত পট্টনায়েক |
দ্বিতীয় তাৎপর্যটি গণতন্ত্র সম্পর্কিত। বিপ্লবের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যেকার স্থিতাবস্থা ও বিচ্ছিন্নতাকে গণতন্ত্র অনেকাংশেই ভেঙে দেয়। এই জন্য মার্কসবাদী তত্ত্বে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের দুটি প্রধান অঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় স্থায়ী সেনাবাহিনী এবং আমলাতন্ত্রকে, যারা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে অবস্থিত, যারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের এবং নির্বাহী কর্মকর্তাদের ক্ষমতার সীমানা নির্ধারিত করে দেয়। কোন রাজনীতির কতটা গণতন্ত্রীকরণ হয়েছে, তার প্রকৃত সূচক হল সেই রাজনীতি দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র কতটা পরিমাণে এক বিশাল দানবের মত সমাজের ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে মানুষের স্বাধীনতা খর্ব করে। |
গণতন্ত্র সম্পর্কে লেনিন নির্দিষ্ট ভাবে কিছু লিখে যাননি। কেউ যদি গণতন্ত্র সম্পর্কে লেনিনের বক্তব্য জানতে চান, তাহলে তাকে বিভিন্ন রচনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন অংশ থেকে এবং সাধারণভাবে গণতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই বিষয়ে লেনিনের বক্তব্য অনুমান করে নিতে হবে। গণতন্ত্র সম্পর্কে লেনিনের অবস্থান ছিল জ্ঞানতত্ত্ব সম্পর্কিত সমস্যা। গণতন্ত্রের ‘খেলার নিয়মকানুন’ সম্পর্কে অথবা গণতান্ত্রিক ‘শাসন’ সম্পর্কে তিনি মাথা ঘামাননি। শ্রেণিসংগ্রামকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সেটাই ছিল তাঁর মূল চিন্তার বিষয়। রাষ্ট্রীয় শাসনের কোন্ পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত এবং বস্তুত যে কোনও বিষয় সম্পর্কে কোন্ পথে অগ্রসর হওয়া উচিত এবং বিষয়টি সম্পর্কে কী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত, সবই তিনি নির্ধারণ করতেন শ্রেণিসংগ্রামকে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রেখে, অর্থাৎ সবই তিনি বিচার করতেন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্রীয় অবস্থানে রেখে। লুকাচ [Lukacs(1924)1970] অনেকদিন আগেই বলেছিলেন, সমস্ত বিষয়কেই লেনিন বিচার করতেন ‘বিপ্লবের বাস্তব অবস্থার’ (actuality of revolution) পরিপ্রেক্ষিতে, অথবা বিপ্লবকে একটি ‘বাস্তব প্রকল্প’ হিসেবে বিবেচনা করে। এ ব্যাপারে লেনিনের কোনও দ্বিধা ছিল না যে বুর্জোয়া সমাজে সর্বহারার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য গণতান্ত্রিক বাতাবরণই হচ্ছে সম্ভাব্য সর্বোত্তম পরিস্থিতি। রাশিয়ায় জারতন্ত্রের আমলে সেন্সরশিপের দীর্ঘ পর্যায়ে এবং জারের পুলিশ ও গোয়েন্দাদের চোখ এড়িয়ে বিপ্লবী কাজকর্ম চালানোর জন্য সর্বদা সতর্ক থাকতে হত বলে বিপ্লবী আন্দোলন চালানো এতটাই অসুবিধেজনক ছিল যে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ফলে যখন জারতন্ত্রের উচ্ছেদ হল, তখন একটি সিল করা ট্রেনে চেপে লেনিন যখন পেট্রোগ্রাডে নামলেন, তখন তিনি যেন মুক্তির শ্বাস ফেললেন। পেট্রোগ্রাডের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পেছনে কোনও গুপ্ত পুলিশ তাঁকে অনুসরণ করছে কিনা তা দেখার জন্য আড়চোখে বারে বারে পেছনে তাকাতে হচ্ছে না, এই ঘটনা তাঁকে অপরিসীম আনন্দ দিয়েছিল। স্বাধীনভাবে এবং প্রকাশ্যে প্রচার ও আন্দোলন চালানোর এই মুক্ত পরিবেশের কারণে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সময়ে মাত্র ৪০,০০০ সদস্য যুক্ত বলশেভিক পার্টির সদস্য সংখ্যা ও সমর্থন দ্রুত বৃদ্ধি পেতে লাগলো। এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে যুদ্ধের বিরুদ্ধে বলশেভিকদের অবস্থানের কারণেই জনগণের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছিল এবং সেকারণেই পার্টি দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু পার্টির এই অবস্থান সহজে জনগণের মথ্যে পৌঁছে দিতে পারাটা সম্ভব হয়েছিল পুলিশি দমনপীড়নের অনুপস্থিতির জন্য। গণতান্ত্রিক বাতাবরণের প্রয়োজনীয়তার প্রতি লেনিনের এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তিনি বুঝেছিলেন যে বুর্জোয়া সমাজে সর্বহারাকে অবশ্যই সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় করার জন্য লড়াই চালাতে হবে শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে, যাতে তারা কোনক্রমেই দমনপীড়নের সাহায্যে পার্টিকে সংকুচিত করে খোলসের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে না পারে। লেনিনের দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রীয় লক্ষ্য ছিল এটাই যে বুর্জোয়ারা সর্বদাই প্রাণপণে চেষ্টা করবে গণতন্ত্রকে খর্ব করার, ফলে নিপীড়িত শ্রেণির লড়াইটা হবে গণতন্ত্রকে রক্ষা করার ও তাকে গভীরতর করার। এমন নয় যে গণতন্ত্র সম্পর্কে লেনিনের দৃষ্টিভঙ্গি বুর্জোয়া সমাজের জন্য ছিল এক রকম আর সমাজতান্ত্রিক সমাজের জন্য অন্য রকম। সমাজতান্ত্রিক সমাজে শ্রমজীবি জনগণ যাতে সক্রিয়ভাবে সর্ববিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারেন, তার জন্য গণতন্ত্রের পূর্ণতম বিকাশের প্রয়োজন। বস্তুত, ১৯১৭ সালের আগে ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লব’-এর যে অ্যাজেন্ডা বলশেভিক পার্টির ছিল, সমস্ত বুনিয়াদী শ্রেণির জন্য অর্থনৈতিক কর্মসূচির বাস্তবায়নের জন্যই কেবল এই বিপ্লবকে ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ আখ্যা দেওয়া হয়নি, এই বিপ্লব ‘গণতান্ত্রিক’ কারণ এই বিপ্লব সমস্ত বুনিয়াদী শ্রেণিকে ক্ষমতাশালীও (empower) করে। এই ক্ষমতায়নের ফলেই তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করে যাতে তারা রাষ্ট্রীয় পরিচালনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। বলশেভিকদের অ্যাজেন্ডায় ‘শ্রমিক ও কৃষকের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব’ প্রতিষ্ঠার জন্য যে রাষ্ট্ররূপ কল্পনা করা হয়েছিল, তা হল প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে বাদ দিয়ে এক বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্ররূপ। কল্পনা করা হয়েছিল যে এই দলগুলি তাদের নিজস্ব পত্রিকা প্রকাশ করে স্বাধীনভাবে তাদের মতামত জানাবে। বলশেভিকদের এমনও পরিকল্পনা ছিল যে সেসময়ে যে সীমিত পরিমাণ নিউজপ্রিন্ট পাওয়া যেত, বিপ্লবের পরে সেই নিউজপ্রিন্ট কীভাবে দলগুলিকে ভাগ ক’রে দেওয়া হবে। এমনও ভাবা হয়েছিল যে এই বহুদলীয় গণতন্ত্র অবধারিতভাবে সমাজজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্বের যুগেও প্রসারিত হবে। মূল কথাটি হচ্ছে বিপ্লবী রাষ্ট্রে রাষ্ট্ররূপ হিসেবে একদলীয় একনায়কত্বের কথা কখনই ভাবা হয়নি, যদিও বাস্তবে তা-ই ঘটেছিল। কী গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর্যায়ে এবং কী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর্যায়ে একদলীয় একনায়কত্বের রাষ্ট্ররূপের কথা লেনিনের চিন্তায় কখনই স্থান পায়নি। সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের ফলিত রূপ হওয়া উচিত একদলীয় একনায়কত্ব এবং যেহেতু সমস্ত শ্রেণি কেবলমাত্র একটি দলের মাধ্যমেই প্রতিনিধিত্ব করে, সুতরাং সর্বহারার একনায়কত্বকে একটি দলের একনায়কত্বের দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে– এই তত্ত্বায়ন এসেছিল পরবর্তীকালে, লেনিনের মৃত্যুর পরে। এই তত্ত্ব লেনিনের নয়। দুই কিন্তু এটা যদি লেনিনের চিন্তাধারার ফসল না হয়, তবে আমরা কীভাবে এই ঘটনার ব্যাখ্যা করব যে লেনিনের জীবদ্দশাতেই এমন ঘটনা ঘটেছিল যখন বলশেভিকরা গণপরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা গণপরিষদ ভেঙে দেয় এবং একদলীয় একনায়কত্ব লাগু করে লেনিনের সম্মতি নিয়েই? যদি একথা বলা হয় যে জনগণের গরিষ্ঠ অংশের সমর্থন না পেয়েও ক্ষমতায় আসীন থাকার অভিপ্রায়ে বলশেভিকরা এমন একনায়কতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাহলে সেই ব্যাখ্যা যথেষ্ট হবে না। কোনও তাত্ত্বিক ভিত্তি ছাড়া লেনিন কোনও কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হতেন না। এবং এখানেই আমরা লেনিনের তাত্ত্বিক অবস্থানের দ্বিতীয় প্রান্তে পৌঁছই। এই প্রান্তটি প্লেখানভের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এবং লেনিনের এই প্রভাবাচ্ছন্ন হওয়ার ঘটনাটা গণপরিষদে বলশেভিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর আপৎকালীন অবস্থায় উপনীত হওয়ার বহু আগেই ঘটেছিল। ক্রুপস্কায়া আমাদের জানিয়েছেন যে রাশিয়ান সোশাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে ‘‘প্লেখানভ তার বক্তৃতায় বলেছিলেন গণতান্ত্রিক নীতিসমূহের ভিত্তি হচ্ছে ‘বিপ্লবের স্বাস্থ্য ও স্বার্থ রক্ষা করাটাই সর্বোচ্চ নিয়ম’ হিসেবে গণ্য করা। এমনকি সর্বজনীন ভোটাধিকারের প্রশ্নটিকেও এই দৃষ্টিভঙ্গির অনুবর্তী হতে হবে। প্লেখানভের এই বক্তব্য ভ্লাদিমির ইলিচের চিন্তাধারার ওপর গভীর রেখাপাত করেছিল। এর চোদ্দ বছর পরে যখন গণপরিষদ ভেঙে দেওয়ার প্রশ্নটি উঠেছিল, তখনও ভ্লাদিমির প্লেখানভের এই বক্তব্যটি স্মরণে রেখেছিলেন এবং বলশেভিকরা দৃঢ়ভাবে গণপরিষদ ভেঙে দেওয়ার প্রশ্নে যাবতীয় বিরোধিতাকে খণ্ডন করেছিলেন।’’ (1970,85) কারও মনে হতে পারে যে লেনিনের এই দ্বিতীয় প্রান্তের তাত্ত্বিক অবস্থান বিপ্লবের পরে একদলীয় একনায়কত্বের ধারণাকে অনুমোদন দিয়েছিল। যদি ‘বিপ্লবের স্বার্থই সর্বাগ্রে বিবেচ্য’ হয়, তাহলে সেই নীতির ভিত্তিতে সর্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে নির্ধারিত নির্বাচনী ফলাফলকেও নস্যাৎ করা যেতে পারে (লেনিনের জীবদ্দশায় অবশ্য দুনিয়ার কোথাওই সর্বজনীন ভোটাধিকারের ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল না। ব্রিটেনে কেবলমাত্র ১৯২৮ সালে প্রায় সর্বজনীন ভোটাধিকার গৃহীত হয়েছিল যখন মহিলাদের ভোটাধিকার মেনে নেওয়া হয়। ফ্রান্সে তা প্রবর্তিত হয় ১৯৪৫ সালে)। এর অর্থ এটাই দাঁড়ায় যে, যে দলের নেতৃত্বে বিপ্লব সম্পন্ন হ’ল, সেই দলকে সম্ভবত কখনই ক্ষমতা থেকে হঠানো যাবে না; এবং হঠানোর চেষ্টা করা হলে তা হবে কার্যত বিপ্লবের অন্তর্ঘাত করা। সুতরাং এমন প্রচেষ্টাকে দমন করাই হবে বিপ্লবী কর্তব্য। উপরের সিদ্ধান্তে কেউ যদি উপনীত হন, তাহলে দুটি কারণে তা ভ্রান্ত হবে। প্রথম কারণটি হচ্ছে, সর্বহারার একনায়কত্বকে পার্টির একনায়কত্ব থেকে আলাদা করে দেখতে হবে। এমনকি সর্বহারার একনায়কত্ব যখন একদলীয় শাসনের মাধ্যমে প্রযুক্ত হয়, তখনও তা পার্টির একনায়কত্ব থেকে চরিত্রগতভাবে পৃথক। অন্যভাবে বলতে গেলে একটি দলের শাসন ঐ দলের একনায়কত্ব থেকে আলাদা। এমনকি সর্বহারার একনায়কত্ব যখন একটি দলের শাসনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়, তখনও শাসকশ্রেণির (সর্বহারার) শ্রেণি শাসন অর্থাৎ তার উদ্যোগ ও সক্রিয়তা যাতে কোনভাবেই দমিত না হয়, সেই ব্যাপারে দলের শাসনকে অবশ্যই কড়াভাবে কিছু সীমাবদ্ধতা ও অনুশাসন মেনে চলতে হবে। কিন্তু পার্টির একনায়কত্ব মানেই হচ্ছে যে শ্রেণির বকলমে পার্টি একনায়কত্ব প্রয়োগ করছে, সে শ্রেণিটিই শাসন ক্ষেত্রে সক্রিয়তা হারিয়ে উদ্যমহীন ও উদাসীন হয়ে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নে ঠিক এটাই ঘটেছিল। সেখানে সর্বহারা শ্রেণির এতটাই বি-রাজনীতিকরণ ঘটেছিল যে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটছে, তখন একটিও শ্রমিক-বিক্ষোভ হয়নি, শ্রমিকদের সাধারণ ধর্মঘট তো দূরের কথা। লেনিন কখনই এক দলের একনায়কত্বকে অনুমোদন করেননি। এমনকি যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে বলশেভিকরাই একমাত্র শাসক দল হিসেবে আবির্ভূত হল, তখনও লেনিনের আশঙ্কা ছিল যে এই একদলীয় শাসন অবশেষে একনায়কত্বে পরিণত হয়ে শ্রমিকশ্রেণির বি-রাজনীতিকরণ ঘটাবে এবং এই কারণেই তা বিপ্লবের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাত ঘটাবে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে প্লেখানভের নীতি অবলম্বন করে সেই নীতির বিরুদ্ধাচরণ করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, অক্টোবর বিপ্লব এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করল যে দেখা গেল একটি মাত্র পার্টিই (বলশেভিক) বিপ্লবের সমর্থনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এটি ঘটছে এমন একটা সময়ে যখন বলশেভিকরা বাকিদের থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন— এমন একটা অভূতপূর্ব আপৎকালীন অবস্থা। তখন রাশিয়াতে লিও ট্রটস্কির একটা ছোট গ্রুপ (যারা পরে বলশেভিকদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলো) এবং বামপন্থী সোশাল রেভল্যুশনারি দল বলশেভিকদের সঙ্গে জোটে আবদ্ধ হ’ল, যদিও খুব অল্প সময়ের জন্য। ব্রেস্ট-লিটভস্ক চুক্তির বিরোধিতা করে সোশাল রেভল্যুশনারি দল অল্পকাল পরে জোট ছেড়ে বেরিয়ে গেল। অন্য কোনও উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দল বিপ্লবের পক্ষে এল না। লেনিন এবং বলশেভিকরা বিশেষ ভাবে হতাশ হয়েছিলেন যখন মেনশেভিক নেতা জুলিয়াস মার্তভ বিপ্লবে যোগ দিতে রাজি হলেন না। (পরে মার্তভ দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ও তৃতীয় আন্তর্জাতিকের মধ্যবর্তী একটি অবস্থান গ্রহণ করেন, যাকে লেনিন আখ্যা দিয়েছিলেন আড়াই আন্তর্জাতিক হিসেবে)। মার্তভ যখন অল রাশিয়ান কংগ্রেস অব সোভিয়েতস-এর অধিবেশন থেকে ওয়াক-আউট করে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন প্রস্থান পথে দণ্ডায়মান এক বলশেভিক স্বেচ্ছাসেবক সখেদে বলে উঠেছিলেন, ‘হায়! আমরা ভেবেছিলাম মার্তভ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন!’ দেশের অভ্যন্তরে এইরূপ বিচ্ছিন্নতার সাথে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হল বলশেভিকরা যখন জার্মানিতে একের পর এক বিপ্লবী প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। অথচ সকলে মনে করতেন জার্মানিতেই বিপ্লবী পরিস্থিতি সবচেয়ে পরিপক্ক হয়ে উঠেছে। তাঁর জীবনের শেষের দিকে এক রচনায় পরবর্তী সম্ভাব্য বিপ্লবী রঙ্গমঞ্চ হিসেবে লেনিন চীন ও ভারতের কথা উল্লেখ ক’রে লিখেছেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং এই দুই দেশ মিলিতভাবে পৃথিবীর জনসংখ্যার গরিষ্ঠ অংশের বাসভূমি। স্পষ্টত, অদুর ভবিষ্যতে ইওরোপে কোনও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আশা লেনিন ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর মতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যেকার অনৈক্যের কারণেই সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকে থাকতে পেরেছিল (যদিও ম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি মিলিতভাবে শিশু সোভিয়েত রাষ্ট্রকে আক্রমণ করেছিল, তৎসত্ত্বেও তিনি এরূপ মন্তব্য করেছিলেন)। কিন্তু নিজ নিজ দেশে এইসব সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি উৎখাত হবে এমন আশু সম্ভাবনা আছে বলে তিনি মনে করতেন না। বিপ্লবোত্তর সমাজে বহুদলীয় শাসনের প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বলশেভিক বিপ্লবের অল্প সময়ের মধ্যেই বিলীন হয়ে গেল। অথচ বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রাখার প্রশ্নটা সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলের সবচেয়ে দুর্বল গ্রন্থিটিকে ভেঙে ফেলার পর প্রাথমিক ভাবে যতটা কঠিন মনে হয়েছিল, বাস্তবে তা আরও বেশি সঙ্গিন হয়ে দাঁড়ালো। তথাপি এরূপ অবস্থাতেও একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পথে বাধা দেওয়ার বিষয়ে লেনিন খুবই চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। বাস্তবে এই একদলীয় শাসন অবধারিতভাবে একটি দলের একনায়কত্বে পর্যবসিত হ’ল। এমন সম্ভাবনা কীভাবে রোধ করা যায়, লেনিন তার উপায় খুঁজছিলেন। তার প্রমাণ রয়েছে ট্রেড ইউনিয়নের প্রশ্নে তাঁর অনড় অবস্থানে শুধু নয়, কেন্দ্রীয় কমিটিকে আয়তনে আরও বড় করার প্রশ্নেও। একদলীয় শাসন যে কালক্রমে একটি ছোট কোটারির একনায়কত্বে পরিণত হতে পারে, এ বিষয়ে তিনি তীব্রভাবে সচেতন ছিলেন। তিন সেই সময়ে একটি বিতর্ক উঠেছিল যে ট্রেড ইউনিয়নগুলির সামরিকীকরণ করতে হবে যাতে তারা রাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী অঙ্গে পরিণত হয়। কারণ হিসেবে এই যুক্তি হাজির করা হয়েছিল যে বুর্জোয়া রাষ্ট্রে ট্রেড ইউনিয়নের যেসব কর্মকাণ্ড থাকে, শ্রমিক রাষ্ট্রে সেই কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। লেনিন এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন, কারণ এই প্রস্তাবে শ্রেণি ও রাষ্ট্রের ভূমিকাকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। এই প্রস্তাব গৃহীত হলে শ্রেণি ও রাষ্ট্রের বিবাদের উৎপত্তি হবে। লেনিনের বক্তব্য ছিল, এমনকি শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রেও শ্রমিকদের নিজস্ব স্বশাসিত সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যা থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়ার জন্য, বিশেষত রাষ্ট্রটি যখন একদলীয় সরকারের শাসনাধীন তখন আরও বেশি করে শ্রমিকদের নিজস্ব সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা জরুরি। এইসব প্রবণতার উপস্থিতির জন্য বিশেষ করে একটি দলের একনায়কত্বের প্রশ্নটির বিরোধিতা করেছিলেন লেনিন। এই বিরোধিতার দুটি স্পষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, শ্রেণিকে কোনভাবেই রাষ্টের অঙ্গে পরিণত করা চলবে না, এমনকি যদি সেই রাষ্ট্রটি শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্বের নীতির দ্বারা পরিচালিত হয়। দ্বিতীয়ত, শাসক দলটি শ্রেণিকে প্রতিস্থাপিত করতে পারে না, যদিও ঐতিহাসিকভাবে এক বিশেষ পরিস্থিতির কারণে শ্রমিকদের রাষ্ট্রে মাত্র একটিই শাসক দল থাকে। পার্টির অভ্যন্তরীণ কাঠামোর প্রশ্নেও লেনিন একই রকম অনড় ছিলেন। বহুপূর্বেই ‘কী করতে হবে’ গ্রন্থে লেনিন গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল পার্টি নিছকই অবিরাম বিতর্কের ফোরাম হতে পারেনা। মেনশেভিকরা পার্টিকে এরকম বিতর্কের আখড়ায় পরিণত করতে চাইত। পক্ষান্তরে লেনিনের ব্যাখ্যা ছিল যে পার্টিকে হতে হবে সক্রিয় এবং অর্থবহ হস্তক্ষেপের হাতিয়ার। সেই জন্য বিতর্কে একসময় ইতি টানতে হবে এবং এই (অসমাপ্ত) বিতর্কের আধারে অ্যাকশন প্ল্যান ঠিক করে মাঠে নেমে পড়তে হবে। প্রয়োজনে অ্যাকশন প্ল্যানে পরিবর্তন ঘটানো যেতে পারে, কিন্তু অনুশীলনকে কখনই অসম্পূর্ণ বিতর্কের অজুহাতে অনির্দিষ্টকাল স্থগিত রাখা চলবে না। পার্টি সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত অনুসারে অনুশীলনে ব্রতী হলেও নিজেদের মতামত সংরক্ষিত রাখতে পারবেন, মতামত জানাতে পারবেন, যেমন বুখারিনের নেতৃত্বাধীন গ্রুপটি তাদের নিজস্ব জার্নাল দি কমিউনিষ্ট-এ ব্রেস্ট লিটভস্ক চুক্তির বিরুদ্ধতা করে কিছুদিন মতামত জানিয়েছিল। লেনিন এটা ধরেই নিয়েছিলেন যে এই বিরুদ্ধ গ্রুপগুলি ব্যক্তিগত আনুগত্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি, আদর্শগত অবস্থানকে গ্রহণ করেই গড়ে উঠেছিল। পরে সন্দেহ নেই লেনিনের জীবদ্দশায় এইরূপ মতবিরোধ প্রকাশ্যে প্রচার করা নিষিদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু বিরোধী মতের উপস্থিতি রয়েই গেল এবং সেসব ছড়িয়ে পড়তেও লাগলো এবং অনেক ক্ষেত্রে বিরোধী মতামত গৃহীতও হত। ক্রুপস্কায়া আমাদের আরও জানিয়েছেন যে কীভাবে লেনিন আশা করতেন যে পার্টি কমরেডরা ব্যক্তিগত মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে কেবলমাত্র মতাদর্শগত বিষয়ের ওপর নিজেদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখবে। ‘এক পা আগে দুই পা পিছে’ থেকে লেনিনের লেখা একটি ঘটনা উদ্ধৃত করে লিখেছেন, আরএসডিএলপি-র দ্বিতীয় কংগ্রেসে পার্টিকেন্দ্রের এক প্রতিনিধি জানালেন, বলশেভিক ও মেনশেভিকদের মধ্যে তিক্ত মতপার্থক্যের দরুণ সভাকক্ষে দমবন্ধকর এক বিষণ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে। লেনিন সেই কমরেডকে বললেন, ‘দেখুন! আমাদের কংগ্রেসের অধিবেশন কী চমৎকার ভাবেই না চলছে! প্রকাশ্য তর্কযুদ্ধের সুযোগ রয়েছে। নানাবিধ মতামত ব্যক্ত হচ্ছে। নানা প্রবণতা চোখের সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন গ্রুপগুলোর বিন্যাস স্পষ্ট হচ্ছে, ভোটের জন্য অনেক হাত উঠছে। নতুন নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এক একটি পর্যায় আমরা অতিক্রম করছি, সামনের দিকে আমরা পদক্ষেপ করছি। এরকম ঘটনা আমি খুবই পছন্দ করি। এটাই জীবন! অবিরাম ইন্টেলেকচুয়াল বিতর্ক ও আলোচনার চেয়ে এটা অনেকটা আলাদা। সেই বিতর্ক ও আলোচনাগুলি অবশেষে শেষ হয় এই কারণে নয় যে অবশেষে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেছে, বরং এই কারণে শেষ হয় যে কমরেডরা কথা বলে বলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।’ এরপরে ক্রুপস্কায়া যোগ করেছেন, ‘এই উদ্ধৃতির মধ্য দিয়ে ইলিচকে আপাদমস্তক চেনা যাবে’ (This quotation sums up Ilyich to a ‘t’)। লেনিন জানতেন যে বিভিন্ন কমরেডের মতামতের ওপরে তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ছায়া ফেলে। তাঁর শেষ উইল ও টেস্টামেন্টে লেনিন আবার এই প্রবণতা ত্যাগ করার জন্য কমরেডদের আহবান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘অক্টোবর ঘটনার জন্য যেমন ব্যক্তিগত ভাবে কাউকে দোষারোপ করা যায় না (অক্টোবরে জিনোভিয়েভ ও কামেনেভ অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করেছিলেন। লেনিন এখানে সেই ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন), তেমনি ট্রটস্কিকে তার অ-বলশেভিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা যায় না’ (1975,680)। ট্রটস্কি ও স্তালিনের মধ্যেকার সম্পর্কের ক্রমাবনতি নিয়ে লেনিন উদ্বিগ্ন ছিলেন, কারণ পাছে এই পারস্পারিক তিক্ততা পার্টির ঐক্যকে বিনষ্ট করে। এর সমাধানকল্পে লেনিনের ঐ চিঠিতেই দাওয়াই ছিল যে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সংখ্যা একশো করতে হবে। এই নতুন সদস্যদের এমনভাবে বেছে নিতে হবে যাতে তাদের কেউই পার্টির কোনো পদাধিকারীর অনুবর্তী না হন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল অনভিজ্ঞ এইসব ‘বহিরাগত’রা এই প্রক্রিয়ায় ক্রমশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠবেন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কমিটিতে চলতে থাকা ব্যক্তিত্বের সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ার সুবিধাটুকুও তাদের থাকবে। এই ‘বহিরাগত’দের কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রবেশের ফলে এমনকি একদলীয় শাসন ক্রমশ কোটারির একনায়কত্বের পর্যায়ে অধঃপতিত হবে না; কারণ যেহেতু নবাগতরা শ্রেণিস্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার মতো মুক্ত মানসিকতার অধিকারী হবেন, সুতরাং তারা ব্যক্তিগত অথবা কোটারি একনায়কত্বকে প্রতিহত করতে পারবেন। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, গোষ্ঠী, অথবা ব্যক্তি-আনুগত্যের দ্বারা যেহেতু তারা দূষিত নন, তাই পার্টির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে তারা মতাদর্শগত স্তরেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারবেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতি অনুসরণ করলে পার্টি ‘বদ্ধ অবস্থা’য় (closed) পতিত হয় না, বরং বহির্জগতের চিন্তাধারা এবং আরও যা গুরুত্বপূর্ণ, সেই শ্রমিক ও কৃষকের চিন্তা-ভাবনা ও প্রভাবের দ্বারা পুষ্টিলাভ করে। শ্রমিকদের চিন্তা-ভাবনা এবং তদের থেকে আহৃত তথ্যের দ্বারা লেনিন নিজেও নিজেকে অবহিত রাখতে প্রবল পরিশ্রম করতেন। শ্রমিকদের যে এক স্বাভাবিক শ্রেণি চেতনা (class instinct) রয়েছে, সে বিষয়ে লেনিন প্রখরভাবে অবহিত ছিলেন। বিপ্লবের অগ্রগতি তখনই সম্ভব যখন শ্রমিকের এই স্বাভাবিক শ্রেণি চেতনার সঙ্গে নিজেদের শ্রেণি থেকে চ্যুত বুদ্ধিজীবিদের দ্বারা ‘বাইরে থেকে’ আনা তত্ত্বের মেলবন্ধন ঘটে। মেলবন্ধনের কাজটি করার জন্য লেনিন সবসময় চাইতেন কেন্দ্রীয় কমিটিতে শ্রমিকশ্রেণির প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করতে। প্রাথমিকভাবে লেনিন পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রতি দু’জন বুদ্ধিজীবি প্রতিনিধিত্বের বিনিময়ে কেন্দ্রীয় কমিটিতে শ্রমিকশ্রেণি থেকে আগত আটজন প্রতিনিধি থাকা উচিত (ক্রুপস্কায়া 1970,116)। ১৯০৫ সালের বিপ্লবের সময়ে লেনিন চেয়েছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিত্বের এই হার বহুলাংশে বাড়িয়ে প্রতি একজন বুদ্ধিজীবি প্রতিনিধির বিনিময়ে একশো জন শ্রমিকশ্রেণির প্রতিনিধিকে স্থান দিতে। বিপ্লবোত্তর সমাজে পরবর্তীকালে যে রাজনৈতিক ক্ষয়িষ্ণুতা দেখা গিয়েছিল, তার জন্য যারা লেনিনের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন এই বলে যে সমাজতান্ত্রিক সমাজের রাষ্ট্ররূপ হিসেবে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করার জনক ছিলেন লেনিন, তারা যে সম্পূর্ণ ভুল কথা বলেন তা ওপরের আলোচনা থেকেই পরিষ্কার। তৎকালীন বিদ্যমান পরিস্থিতির চাপে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে একদলীয় শাসনের পরিস্থিতি তৈরি হ’ল, শেষ নিঃশ্বাস ফেলা পর্যন্ত লেনিন চেয়েছিলেন এক দলের একনায়কত্বের পরিণাম থেকে থেকে দেশকে রক্ষা করতে। এক-দলের একনায়কত্ব যে শ্রমিক শ্রেণিকে দুর্বল করে তুলবে এবং তার ফলে পার্টির মধ্যে শ্রমিকদের স্বাভাবিক শ্রেণিচেতনার স্ফুরণ ঘটানোর অবশ্য কর্তব্যটি যে প্রতিহত হবে, যার ফলে বিপ্লবের অগ্রগতি যে বিপথচালিত হবে, এবিষয়ে লেনিন সম্যক অবহিত ছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে নেতার চারপাশে জড়ো হওয়া বুদ্ধিজীবিদের ‘তত্ত্ব’ই হবে শাসনকার্য পরিচালনার নির্ধারক বিষয়। চার দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ‘বহিরাগত’ সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার যে উপদেশ লেনিন দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে বিপ্লবের অব্যবহিত পূর্বে বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ২০ লক্ষ শ্রমিককে নিয়োজিত করার উপদেশের সঙ্গে সংতিপূর্ণ। ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে সর্বহারার একনায়কত্বের রাষ্ট্ররূপ এক নতুন ধরণের রাষ্ট্র যা তার প্রতিষ্ঠার মুহূর্ত থেকে সাবেকি রাষ্ট্র হিসেবে আর কাজ করবে না, রাষ্ট্র ‘উবে’ যেতে থাকবে। এই ইঙ্গিতটিও পূর্ববর্তী উপদেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থে রাষ্ট্র সম্পর্কে লেনিন যা বলেছিলেন তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য। সর্বহারার রাষ্ট্র হিসেবে যে রাষ্ট্ররূপ আবির্ভূত হবে, রাষ্ট্রের চলতি ধারণার বিপরীতে সেটি আর রাষ্ট্র নয়, সমাজের ওপর অবস্থিত কোনো শিলীভূত সত্তা নয়, বরং সমাজের মধ্যে ক্রমশ বিলীন হয়ে যেতে থাকা এক সত্তা এবং তার বিলয়প্রক্রিয়া অথবা ক্রমশ উবে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পরবর্তী প্রভাতে। তাঁর শেষ উইল এবং টেস্টামেন্টে এই চিন্তাধারার প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই। সোভিয়েত রাষ্ট্র আর পাঁচটা প্রথাগত রাষ্ট্রের মত সমাজের ঊর্ধ্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে, এই সম্ভাবনার অঙ্কুর তিনি দেখে গিয়েছিলেন, যদিও সোভিয়েত রাষ্ট্র তখনো সর্বহারার স্বার্থকেই রক্ষা করে চলছিল, অবশ্য সর্বহারার একনায়কত্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নয়, সর্বহারার একনায়কত্বের জন্য রাষ্ট্র হিসেবে, একদলীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণে। লেনিন চেয়েছিলেন শাসকদলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক কমিটিতে শ্রমিকদের (এবং কৃষকদের) মধ্য থেকে আগত কমরেডদের অন্তর্ভূক্ত করে রাষ্ট্র তার অনড় শিলীভূত চরিত্র বর্জন করুক। শেষ উইল ও টেস্টামেন্টে লেনিন যে উপদেশ দিয়েছিলেন তার দু’টি তাৎপর্য আছে। প্রথমত, সাধারণ ভাবে যা বলা হয় সেইমতো লেনিনের আইডিয়া ও চিন্তাধারার কোনও আমূল পরিবর্তন কখনই ঘটেনি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় নোয়াম চমস্কি এবং আরও অনেকে ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থটিকে বিপ্লবের পরিস্থিতিতে উৎসাহের আতিশয্যে লিখিত এক আধা নৈরাজ্যবাদী দলিল হিসেবে বিবেচনা করেন, যা থেকে লেনিন পরবর্তীকালে সরে এসেছিলেন। যদিও এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’-এ রাষ্ট্রকে যেভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তার সঙ্গে বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে উদ্ভূত রাষ্ট্র অনেকাংশেই আলাদা। তথাপি এক বিপরীত ধর্মের ও চরিত্রের রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য লেনিনের নিরন্তর অনুসন্ধানে কখনও ছেদ পড়েনি— এমন একটি রাষ্ট্র যা ঠিক পরিচিত অর্থে রাষ্ট্র নয়, এমন একটি রাষ্ট্র যার শিকড় সমাজের মধ্যে গ্রথিত এবং যা সমাজ থেকেই তার জীবনরস আহরণ করে, অন্য কোন ধরণের রাষ্ট্রই যা করতে পারে না। লেনিন কখনই এই দৃষ্টিভঙ্গী ও অনুসন্ধান পরিত্যাগ করেছিলেন বলে মনে হয় না। দ্বিতীয় তাৎপর্যটি গণতন্ত্র সম্পর্কিত। বিপ্লবের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যেকার স্থিতাবস্থা ও বিচ্ছিন্নতাকে গণতন্ত্র অনেকাংশেই ভেঙে দেয়। এই জন্য মার্কসবাদী তত্ত্বে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের দু’টি প্রধান অঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় স্থায়ী সেনাবাহিনী এবং আমলাতন্ত্রকে, যারা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে অবস্থিত, যারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের এবং নির্বাহী কর্মকর্তাদের ক্ষমতার সীমানা নির্ধারিত করে দেয়। কোন্ রাজনীতির কতটা গণতন্ত্রীকরণ হয়েছে, তার প্রকৃত সূচক হ’ল সেই রাজনীতি দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র কতটা পরিমাণে এক বিশাল দানবের মত সমাজের ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে মানুষের স্বাধীনতা খর্ব করে। সরকার নির্বাচিত কিনা এবং রাজনীতির অঙ্গনে বহু দলের অস্তিত্ব আছে কিনা, কেবলমাত্র তার দ্বারা গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা যায় না। বরং গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা উচিত আরও মৌলিক কিছু অধিকার অর্জিত হচ্ছে কিনা তার দ্বারা। আজকের দিনে বুর্জোয়া দুনিয়ায়, বিশেষত সেই সব দেশে যেখানে হাস্যকরভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার নামে সন্ত্রাসবাদেরই আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে এবং রাজনীতির পণ্যায়ন ঘটিয়ে নির্বাচনী ফলাফলকে টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে কর্পোরেট লবির মদতপুষ্ট যে কোনো রাজনৈতিক দল পছন্দমত ‘নির্বাচিত’ সরকার গঠন করতে পারে*, সেখানে এইমাত্র বলা গণতন্ত্রের নির্দেশক বুনিয়াদি লক্ষণকে দৃষ্টির বাইরে রাখা চলে না। এই বুনিয়াদি অর্থেই লেনিন আজীবন গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধ ছিলেন। যখন সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের নামে এক-দলের শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হ’ল, তখনও গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতায় কোনও শিথিলতা দেখা যায়নি। পাঁচ লেনিনের শেষ ইচ্ছাপত্র (Will and Testament) যখন উদ্ভটভাবে মেনশেভিক পত্রিকায় প্রকাশিত হ’ল, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিষ্ট পার্টিতে (CPSU) বিষয়টি আলোচিত হল বটে কিন্তু কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হল না। একদলীয় শাসন প্রস্তরীভূত হয়ে এক-দলের একনায়কত্বে পরিণত হল এবং এই তত্ত্ব হাজির করা হ’ল যে সর্বহারাশ্রেণির একনায়কত্ব বাস্তবক্ষেত্রে এই রূপেই ক্রিয়াশীল থাকে— এটি কোন বিচ্যুতি নয়, বরং এটাই সর্বহারা একনায়কত্বের আবশ্যক রূপ। এর ফলশ্রুতি হ’ল ক্রমবর্ধমান রূপে রাজনীতির প্রতি শ্রমিকশ্রেণির বিচ্ছিন্নতাবোধ, শ্রমিকশ্রেণির স্বাভাবিক শ্রেণিচেতনার অবদমন এবং তার ফল হিসেবে বিপ্লবের মর্মবস্তুরই ক্রমশ দুর্বলতা প্রাপ্তি। ১৯৮৯ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে, তখন এই লক্ষণগুলিই পরিস্ফুট হয়ে উঠেছিল। ফ্যাসিবাদের পরাজয়, তৃতীয় বিশ্বের উপনিবেশিক শাসনের অবসানে সোভিয়েতের অবদান এবং দুনিয়ায় অদৃষ্টপূর্ব বিশাল এক জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের নির্মাণ-সহ বহু চোখ ধাঁধানো অর্জন সত্ত্বেও সোভিয়েতের পতন রোধ করা যায়নি। *সাম্প্রতিক ভারত হচ্ছে এর এক ধ্রুপদী উদাহরণ যেখানে বহুদলীয় ব্যবস্থায় নির্বাচিত একটি সরকার গণতন্ত্রকেই ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে। রেফারেন্স Krupskaya N. (1970) Memories of Lenin (London/Panther History and Lawrence and Wishart) Lenin V.I (1975) Selected Works (3 Vol.) Vol 3 (Moscow/Progress Publishers) Lukacs Georg (1924/1970) Lenin: A Study in the Unity of his Thought (London, New Left Books) ভাষান্তরঃ নন্দন রায় প্রথম প্রকাশ: দেশকাল ভাবনা, জানুয়ারি, ২০২১ প্রকাশের তারিখ: ১০-ডিসেম্বর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |