লেনিনের শিক্ষার আলোকে কৃষকের সংগ্রাম

হরেকৃষ্ণ কোঙার
কমরেড লেনিন মার্কসবাদের বিপ্লবী তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে শুধু শ্রমিক ও কৃষকের মুক্তির পথনির্দেশই করেননি, বিপ্লবের প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট করেছেন। প্রতিটি ধাপের কর্তব্য স্থির করেছেন। সেই মতো শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত এবং শিক্ষিত করেছেন। এবং নিজে বিপ্লবের জোয়ার-ভাটার মধ্যে থেকে বিপ্লবকে সার্থকতার পথে পরিচালিত করেছেন।
লেনিনের জন্মশতবার্ষিকী বৎসরে পৃথিবীর শ্রমিকশ্রেণির ন্যায় কোটি কোটি মেহনতী শোষিত কৃষক— যারা সমগ্র জনসংখ্যার সর্বাধিক সংখ্যক অংশ, তারা শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করবে সেই মহান নেতাকে, যিনি তাঁর সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক বিচারের সঙ্গে বৈপ্লবিক প্রেরণা মিশিয়ে তাদের সঠিক মুক্তির পথকে উদ্ভাসিত করে গেছেন। তিনি বর্তমান সমাজে সাম্রাজ্যবাদী, সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী শোষণে নিষ্পেষিত কৃষকদের মর্মন্তুদ বিষাদময় জীবনের চিত্র দেখে ভাবাবেগে কাতর হয়ে তাদের সামনে সহজ, সস্তা মুক্তির স্বপ্নজাল সৃষ্টি করেননি। বরং বিজ্ঞানীর বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি তাদের সামনে তুলে ধরেছেন শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে কঠিন কঠোর বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিশ্চিত মুক্তির পথ। কমরেড লেনিন মার্কসবাদের বিপ্লবী তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে শুধু শ্রমিক ও কৃষকের মুক্তির পথনির্দেশই করেননি, বিপ্লবের প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট করেছেন। প্রতিটি ধাপের কর্তব্য স্থির করেছেন। সেই মতো শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত এবং শিক্ষিত করেছেন। এবং নিজে বিপ্লবের জোয়ার-ভাটার মধ্যে থেকে বিপ্লবকে সার্থকতার পথে পরিচালিত করেছেন।

লেনিনেরই নেতৃত্বে পৃথিবীতে প্রথম শ্রমিক-কৃষকের মুক্তির কামনা স্বপ্নের জগত ছেড়ে বাস্তব রূপ গ্রহণ করেছে। রুশ-বিপ্লব শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের শ্রমিক-কৃষককে মুক্তি দেয়নি। সারা পৃথিবীর জনগণের সামনে অগ্রগতির পরীক্ষিত পথনির্দেশ করেছে। রুশ-বিপ্লবের প্রতিটি ধাপের প্রতিটি স্লোগান ও কৌশল স্থান-কাল-পাত্র নির্বিচারে নকল করার কোন প্রচেষ্টা লেনিনেরই শিক্ষার বিরোধী। কিন্তু বিপ্লবের স্তর, শ্রেণিবিন্যাস, শ্রমিক-কৃষকের সম্পর্ক, বিপ্লবের পদ্ধতি ও কর্তব্য সম্বন্ধে লেনিনের মৌলিক শিক্ষাগুলি সারা পৃথিবীর শ্রমিক-কৃষকের সামনে অবশ্যগ্রহণীয় শিক্ষা হিসাবে তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে বর্তমান অবস্থায় কৃষক সংগ্রামের ক্ষেত্রে এই শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষক সমস্যা ও কৃষকের সংগ্রাম সম্বন্ধে লেনিনের শিক্ষার সবদিক আলোচনা করা এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে সম্ভব নয়। তা করা আমার উদ্দেশ্যও নয়। গত এক বছরে (১৯৭০ সালে লেখা) পশ্চিমবঙ্গে কৃষক আন্দোলনে যে নতুন জোয়ার দেখা দিয়েছে তার পটভূমিকায় আমি দু-একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় আলোচনা করব।

দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদী সোশ্যালিস্ট নেতারা কৃষকদের বৈপ্লবিক শক্তিকে অস্বীকার করেছেন বা ছোটো করে দেখেছেন। কৃষকদের সমস্যা সমাধানের প্রশ্নটিকে তাঁরা মূলত বুর্জোয়া নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন। শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে কৃষকদের বৈপ্লবিক শক্তির বিস্ফোরণকে তাঁরা ভয় করেছেন এই বলে যে, এতে বুর্জোয়ারা ভয় খেয়ে চলে যাবে ও তাতে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ব্যাহত হবে। শ্রমিক-বিপ্লবের পক্ষে কৃষক-অভ্যুত্থানের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তাকে এঁরা অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারি নামধারী পেটি-বুর্জোয়া নেতারা কৃষকদের মুক্তির জন্য শ্রমিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তাকে, শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করতেন। তাঁরা কৃষকদের মধ্যে শ্রেণিভেদ অস্বীকার করে কৃষকদের সমস্বার্থসম্পন্ন একক শ্রেণি হিসাবে দেখতেন এবং ঘোষণা করতেন যে, শ্রমিক নেতৃত্ব বাদ দিয়ে কৃষকেরাই সামন্তবাদ ও গোলামির অবসান ঘটাবে এবং জমি-বণ্টনের মাধ্যমে এক ধাপে তারা নিজেরা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। কমরেড লেনিন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদ ও সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারিদের পেটি-বুর্জোয়া স্বপ্নবিলাস, উভয়ের বিরুদ্ধে প্রথম হতে তীব্র কষাঘাত করেছেন।

কার্ল মার্কস ১৮৫৬ সালেই বলেছিলেন যে শ্রমিক-বিপ্লবের সাফল্যের জন্য প্রয়োজন ‘কৃষকযুদ্ধের (ষষ্ঠদশ শতাব্দীর জার্মানীর কৃষক বিদ্রোহ) কোনও দ্বিতীয় সংস্করণের’ সমর্থন। প্যারি কমিউনের অভিজ্ঞতা এই কথারই সারবত্তা প্রমাণ করেছে। এই কথা মনে রেখে কমরেড লেনিন রুশদেশে পার্টি গঠনের প্রথম হতেই বলে গেছেন যে, শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবের পক্ষে অপরিহার্য হল তার সঙ্গে কৃষকদের বৈপ্লবিক অভ্যূত্থানকে যুক্ত করা। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলেছেন যে, শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্ব ছাড়া কৃষকদেরও মুক্তি অসম্ভব। পুঁজিবাদের বিকাশের ফলে ‘ধনিকশ্রেণির পিছনে শ্রমিকশ্রেণি দাঁড়িয়ে আছে’ কার্ল মার্কসের এই শিক্ষাকে মনে রেখে লেনিন শিখিয়েছেন যে, বর্তমান যুগে সামন্তবাদ ও স্বৈরাচারের জঞ্জাল ঝেঁটিয়ে দূর করার জন্য মৌলিক কৃষক অভ্যুত্থানে বুর্জোয়াশ্রেণি নেতৃত্ব দিতে পারে না। কারণ এটা উপর থেকে আংশিক সংস্কার নয়। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মূলসত্তা হিসাবে এই কৃষক অভ্যুত্থান বিপ্লবকে বুর্জোয়া স্বার্থের পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না। কৃষকদের মধ্যে যারা বেশিরভাগ অংশ, সেই গরিব কৃষকদের জাগ্রত শক্তির সঙ্গে মিতালী করে শ্রমিকশ্রেণি পরবর্তী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ধাপে এগিয়ে যাবে।

এইভাবেই কমরেড লেনিন শ্রমিকশ্রেণির পক্ষে কৃষক-সংগ্রামের গুরুত্ব এবং শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর বাস্তব বৈপ্লবিক ভিত্তি দেখিয়ে দিয়েছেন। ১৯০১ সালেই কমরেড লেনিন ‘শ্রমিক পার্টি ও কৃষক’ প্রবন্ধে সচেতন শ্রমিকদের কাছে কৃষকদের সংগঠিত করার গুরু দায়িত্বের কথা তুলে ধরেছেন। নির্মম শোষণে নিষ্পেষিত ও নানা সমস্যায় জর্জরিত কৃষকদের সংগঠিত করার বাস্তব ভিত্তিও তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ১৯০২ সালে তাঁর গ্রামের গরিবদের প্রতি নামক বিখ্যাত পুস্তিকায় সোজাসুজি কৃষকদের কাছে মুক্তির সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানিয়েছেন। তারপর থেকে বিপ্লবের গতিপথে প্রতিটি পরিবর্তিত অবস্থায় এবং বিপ্লবের প্রতিটি ধাপে, ১৯০৫ সালের বিপ্লবের প্রস্তুতিপর্বে, ১৯০৫ সালের বিপ্লবে, পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার সময়ে, ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে, নভেম্বর বিপ্লবে, বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে, কৃষকদের সমস্যা ও সংগ্রাম সম্বন্ধে শ্রমিক শ্রেণিকে শিক্ষিত করেছেন।

একমাত্র শ্রমিকের নেতৃত্বেই সমস্ত কৃষক, সামন্তবাদ ও স্বৈরাচার থেকে মুক্তি পেতে পারে। পরবর্তী ধাপে শ্রমিকের নেতৃত্বেই গরিব কৃষক পুঁজিবাদের শোষণ থেকে মুক্তি পেতে পারে। তারপরেও শ্রমিকের নেতৃত্বেই মাঝারি কৃষক সহ সমস্ত মেহনতী কৃষক দুঃখ-দারিদ্র্যের হাত হতে মুক্তি পেয়ে যৌথ প্রচেষ্টায় সুখী সমাজতন্ত্রে পৌঁছতে পারে। অন্যদিকে কৃষকের মুক্তি-সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শ্রমিকশ্রেণি মিলিতভাবে সামন্তবাদ ও স্বৈরাচারের (ভারতের ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও একচেটিয়া পুঁজির শোষণের) অবসান ঘটাতে না-পারলে পুঁজিবাদী শোষণ থেকে তার নিজের মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়। শ্রমিকের মুক্তি সবার শেষেই সম্ভব।

এইভাবে কমরেড লেনিন শ্রমিক নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষকের মৈত্রীর বৈপ্লবিক তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। এই শিক্ষায় রুশের শ্রমিকশ্রেণি শিক্ষিত হয়েছিল এবং কৃষকদের সংগঠিতভাবে পরিচালিত করতে পেরেছিল বলেই মহান রুশবিপ্লব সার্থক হয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদের সমস্ত আক্রমণ প্রতিহত করে সমাজতন্ত্রের পথে যেতে পেরেছে। এই শিক্ষার আলোকেই পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মুক্তি অর্জন করতে পেরেছে।

লেনিন জন্মশতবার্ষিকী বৎসরে এই শিক্ষাকে আমাদের বিশেষভাবে স্মরণ করতে হবে। ভারতের সংশোধনবাদীরা শ্রমিক নেতৃত্বের প্রশ্নকে কার্যত অস্বীকার করছে। তারা বুর্জোয়া নেতৃত্বে বা মনগড়া বুর্জোয়া-শ্রমিক যৌথ নেতৃত্বে বা ধাপে ধাপে শ্রমিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার নামে কার্যত বুর্জোয়া নেতৃত্বে তথাকথিত জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের নামে কৃষক মুক্তির অলীক মোহজাল বিস্তার করছে। তাই তারা গরিব কৃষকদের বৈপ্লবিক শক্তির স্ফূরণ দেখে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির বিরোধিতার নামে কৃষক সংগ্রামের কুৎসাকারীদের সঙ্গেই জোট পাকাচ্ছে। ভারতের শ্রমিকশ্রেণি ও তার পার্টিকে লেনিনের শিক্ষা আয়ত্ত করতে হবে। শ্রমিকশ্রেণি যদি নিজেদের আত্মস্বার্থের অর্থনীতিবাদী চিন্তার গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে কৃষকদের সমস্যা ও সংগ্রামকে না-বোঝে, যদি এই সংগ্রামের সঙ্গে নিজেদের ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র স্থাপন না-করতে পারে, যদি রাজনৈতিক চেতনায় শিক্ষিত হয়ে সমস্ত মেহনতী ও সংগ্রামী মানুষের পুরোভাগে দাঁড়াতে না-পারে, তাহলে তারা তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। অন্যদিকে কৃষক সংগ্রামে নিযুক্ত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কর্মীরা যদি শ্রমিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা ও শ্রমিকশ্রেণির সঙ্গে কৃষকদের সংগ্রামী যোগসূত্র সম্বন্ধে কৃষকদের সচেতন না-করে তাহলে কৃষকদের সংগ্রামও ইপ্সিত পথে এগোতে পারবে না।

কমরেড লেনিনের যে দ্বিতীয় শিক্ষার প্রতি আমাদের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন তা হল কৃষকদের মধ্যে শ্রেণিভেদ; বিপ্লবের বিভিন্ন স্তরে কৃষকদের বিভিন্ন অংশের ভূমিকা এবং গরিব কৃষকদের উপর নির্ভর করার তাৎপর্য সম্বন্ধে তাঁর বিশ্লেষণ। প্রত্যেক দেশের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কর্মীদের পক্ষে এ অবশ্যগ্রহণীয় শিক্ষা। কমরেড লেনিন দেখিয়েছেন যে, প্রাক-পুঁজিবাদী সামন্তবাদ-প্রধান কৃষি অর্থনীতিতেও বর্তমান বিশ্ব-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রভাবে কৃষকদের মধ্যে শ্রেণিভেদ অবশ্যম্ভাবীরূপে দেখা দিয়েছে। শ্রমিকশ্রেণির মতো কৃষকদের একই স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন একটি শ্রেণি মনে করলে ভুল হবে, কারণ বাস্তবে তা নেই; কৃষকদের মধ্যে ধনী কৃষক, মাঝারি কৃষক ও কৃষিমজুর সহ গরিব কৃষক (সর্বহারা ও আধা সর্বহারা) এমনি ভেদ দেখা দিয়েছে। সামন্তবাদ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ধনী কৃষকদের ক্ষোভ আছে, বিরোধিতা আছে। তাই সামন্তবাদ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিপ্লবী সংগ্রামের স্তরে ধনী কৃষকসহ সকলেরই মিলিতভাবে চলার বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু গরিব কৃষক ও কৃষি মজুরেরা সামন্তবাদ স্বৈরাচার ছাড়াও ধনী কৃষকদের দ্বারা এবং পুঁজিবাদী শোষণের দ্বারা শোষিত হয়। ধনী কৃষকেরা হল গ্রামাঞ্চলে বুর্জোয়া শ্রেণির অংশ। তাই বিপ্লব সামন্তবাদ-বিরোধী স্তর পার হলে ধনী কৃষকেরা বিরুদ্ধে চলে যায়, কিন্তু কৃষিমজুর ও গরিব কৃষক শহরের শ্রমিকশ্রেণির সহযোগিতায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে এগিয়ে না-গেলে পূর্ণ মুক্তি পেতে পারে না।

এইখানেই রয়েছে গ্রামের গরিবদের সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণির নৈকট্য এবং বিশেষ মৈত্রী স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা। তাই কৃষক আন্দোলনকে গরিব কৃষকদের উপর ভিত্তি করে দাঁড় করাতে না-পারলে, গরিবদের গ্রামাঞ্চলের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকায় আনতে না-পারলে এবং শহরের শ্রমিকশ্রেণির সঙ্গে তার বিশেষ মৈত্রী গড়ে তুলতে না-পারলে ধনী কৃষকদের প্রভাবে কৃষক সংগ্রাম তার প্রয়োজনীয় বৈপ্লবিক গতিবেগ পেতে পারে না এবং পরবর্তী ধাপে ধনী কৃষকের বাধা প্রতিহত করে পূর্ণতা পেতেও পারে না। ১৯০১ সালেই তাঁর পূর্বোক্ত প্রবন্ধে লেনিন বলেছেন যে, গ্রামাঞ্চলে পাশাপাশি দুই রকমের দ্বন্দ্ব রয়েছে: ‘জমির মালিকদের সঙ্গে কৃষি শ্রমিকদের দ্বন্দ্ব’ এবং ‘সামন্ত শোষণের সঙ্গে সমগ্র কৃষকদের দ্বন্দ্ব’। সঙ্গে সঙ্গে লেনিন বলেছেন যে, ‘আমাদের কৃষি শ্রমিকেরা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কৃষকদের সঙ্গে যুক্ত’ ও ‘কৃষকেরা সামগ্রিকভাবে যে দুর্ভাগ্যের শিকার তার দ্বারা কঠোরভাবে পিষ্ট’। এই বাস্তব বিশ্লেষণ থেকে কমরেড লেনিন বিপ্লবের বিভিন্ন স্তর ও তাতে বিভিন্ন শ্রেণির ভূমিকা সম্বন্ধে তাঁর বিখ্যাত সিদ্ধান্তকে পুষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘গ্রামের গরিবদের প্রথমে জমিদারদের বিরুদ্ধে আঘাত হানতে হবে এবং সমস্ত গোলামির সবচেয়ে ঘৃণ্য ও বিষময় ব্যবস্থাকে দূর করতে হবে; এই সংগ্রামে অনেক ধনী কৃষক ও বুর্জোয়া ভক্তরাও যোগ দেবে।… কিন্তু জমিদারদের ক্ষমতা সংকুচিত হলেই ধনী কৃষক তার আসল চরিত্র প্রকাশ করবে।... তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং শহরের শ্রমিকশ্রেণির সঙ্গে অচ্ছেদ্য মৈত্রী স্থাপন করতে হবে।’

সঙ্গে সঙ্গে লেনিন একধাপে বিপ্লবের চরম স্তরে যাবার মনোভাবের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী দিয়েছেন। বাস্তববর্জিত মনের কল্পনা হতে বিপ্লবের স্তর ও কর্তব্য নির্ধারিত হয় না, তা হয় বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতে। বিপ্লব বুকুনি দিয়ে হয় না, বিপ্লবের পথ সস্তা ও কুসুমাস্তীর্ণ নয়। বিপ্লবের প্রতিটি ধাপে সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে যত বেশি সংখ্যক মানুষকে শামিল করা সম্ভব, তা না-করে একলাফে বিপ্লবের চরম স্তরে বা লক্ষ্যে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখা বিপ্লবের পক্ষেই ক্ষতিকর। তাই লেনিন বলেছেন, ‘গ্রামাঞ্চলে প্রথম ধাপ হল কৃষকদের পূর্ণ মুক্তি,… কিন্তু আমাদের চরম ধাপ হলো... সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা… যিনি প্রথম ধাপের সঙ্গে চরম ধাপকে গুলিয়ে ফেলবেন তিনি সংগ্রামের ক্ষতি করবেন এবং অজান্তে গ্রামের গরিবদের ধোঁকা দিতেই সাহায্য করবেন।’ তিনি বলেছেন যে, এখনই মার্কসবাদীরা দুধ ও মধুর দেশের প্রতিশ্রুতি দেবেন না। ‘তাঁরা’ ছোটো কিন্তু নিশ্চিত ‘প্রথম ধাপের’ পরামর্শ দেবেন।

আমাদের দেশেও কোনও কোনও পার্টি আছে যারা কৃষিতে ধনতন্ত্রের বিকাশ ও কৃষকদের মধ্যে শ্রেণিভেদের কথা তুলে একেবারে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বলে। যাঁরা এমনি বলেন তাঁদের প্রতি কটাক্ষ করে লেনিন বলেছেন যে, সমসাময়িক জমিদারী অর্থনীতিতে পুঁজিবাদ ও ভূমিদাসত্বের লক্ষণগুলি মিশে থাকে, কিন্তু তত্ত্বতে একমাত্র পণ্ডিত-মূর্খেরাই কোনটা কত পরিমাণে আছে তা নিক্তি দিয়ে মাপতে চান এবং তারই ভিত্তিতে গোটা সমাজব্যবস্থাকে কোনও বিশেষ খাপের মধ্যে ফেলতে চান। এটা ভুল। কিন্তু তা থেকে একমাত্র কল্পনা-বিলাসীরাই দুই সমাজব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য করার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারেন। তিনি বলেছেন যে, বর্তমান জমিদারি আধা-সামন্তবাদী ব্যবস্থার মধ্যে যত বেশি পুঁজিবাদী শোষণ প্রবেশ করবে তত বেশি গ্রামের গরিবদের পৃথকভাবে সংগঠিত করা প্রয়োজন হবে যাতে বিপ্লবের প্রথম ধাপের কাজ শেষ করে দ্রুত পরবর্তী ধাপে যাওয়া যায়। (পেটি বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়ান সোশ্যালিজম- ১৯০৫) কিন্তু প্রথম ধাপকে এড়িয়ে যাওয়া বা দুই ধাপকে গুলিয়ে ফেলার বিরুদ্ধে তিনি কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। প্রথম ধাপকে তিনি বলেছেন, গণতান্ত্রিক বিপ্লব—  যাতে সমস্ত কৃষক যোগ দেবে এবং চরম ধাপ হল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব যাতে শ্রমিকশ্রেণি গ্রামের গরিবদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে । কমরেড লেনিন বলেছেন যে, তাঁদের এই মতবাদ সোশ্যালিস্ট রিভল্যুশনারিদের চেয়ে কম ‘শ্রুতিমধুর’ হতে পারে, কিন্তু যারা শুধু মিষ্টিকথায় পেট ভরাতে চায় তারা অন্যদের দলে যোগ দিক, ‘আমরা’ বলব ভালোই হয়েছে।

কমরেড লেনিন চরম লক্ষ্যের কথা বলে বিপ্লবের আশু ধাপের কর্তব্যকে যেমন ছোটো করে দেখার বিরুদ্ধে বলেছেন, তেমনি আশু কর্তব্যের কথা বলে চরম লক্ষ্যকে ভুলে যাওয়া ও তার জন্য প্রস্তুতি না-করার বিরুদ্ধেও বলেছেন। তাঁর শিক্ষা হলো এই যে, গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সমস্ত কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে গরিব কৃষকদের বিশেষভাবে সংগঠিত করতে হবে, তাদের সঙ্গে শহরের শ্রমিকশ্রেণির বিশেষ মৈত্রীবন্ধন গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রথম ধাপ শেষ করে সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায় ।

মাঝারি কৃষকদের ভূমিকা সম্বন্ধে কমরেড লেনিন বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছিলেন। তিনি পরিষ্কার দেখিয়েছেন যে, শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া মাঝারি কৃষক প্রকৃত মুক্তি পেতে পারে না। মাঝারি কৃষকের যতই ধনীর স্তরে ওঠার ইচ্ছা থাক না কেন, তাদের মধ্যে দু-একজনই বড়ো হতে পারে, বাকি পুঁজিবাদী শোষণের চাপে নিচে নেমে যেতে বাধ্য। তবু মনের দিক দিয়ে তারা ধনী হবার ইচ্ছা পোষণ করে। তাই সামন্তবাদ-বিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লবে তারা ঘনিষ্ঠভাবে থাকলেও পরবর্তী ধাপে দোদুল্যমানতা দেখাবে। সেইজন্যই গরিবদের উপর বিশেষভাবে নির্ভর করতে হবে। কিন্তু মাঝারি কৃষকদের প্রতি সব সময়ে বোঝাবার মনোভাব রাখতে হবে। রুশ বিপ্লবের পর তিনি এদের সঙ্গে মৈত্রী গঠনের উপর বিশেষে জোর দিয়েছেন। কমরেড স্তালিন এই শিক্ষাকেই পরবর্তীকালে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং স্বেচ্ছামূলক যৌথ চাষের মধ্য দিয়ে মাঝারি কৃষকদের বুঝিয়ে ও তাদের সঙ্গে ঐক্য সুদৃঢ় করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কর্তব্যকে সফলতার পথে নিয়ে গেছেন ।

কমরেড লেনিনের যে তৃতীয় শিক্ষাটি আমাদের এখন বিশেষভাবে স্মরণ করা প্রয়োজন তা হলো কৃষকদের রাজনৈতিক চেতনায় সমৃদ্ধ করা। বিপ্লবের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্ন সম্বন্ধে সচেতন না-হলে কৃষক মুক্তি অর্জন করতে পারবে না, তার আন্দোলন নিছক আশু অর্থনৈতিক দাবির গণ্ডির মধ্যে থেকে যাবে এবং যদি কখনও কৃষক অসহনীয় অবস্থা সহ্য না-করতে পেরে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে তাহলে তা হবে মূলত স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ—  যা রাজনৈতিক লক্ষ্যবিহীন হয়ে শাসকশ্রেণির রাষ্ট্রশক্তির আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। যে শোষণ-ব্যবস্থা কৃষকদের নিষ্পেষিত করছে সেই ব্যবস্থার ধারকশ্রেণি বা শ্রেণিগুলির হাতে যদি রাষ্ট্রক্ষমতা থাকে তাহলে কৃষক তার মুক্তি অর্জন বা রক্ষা কোনটাই করতে পারে না।

তাই রাজনৈতিক কর্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করেই কৃষকদের সংগ্রাম পরিচালিত করতে হবে ও তাদের চেতনা-সম্পন্ন করে তুলতে হবে। এই রাজনৈতিক লক্ষ্য সম্বন্ধে সচেতন করতে পারলে তবেই কৃষকেরা শ্রমিকশ্রেণির সহযোগী দুর্বার বিপ্লবী শক্তিতে পরিণত হতে পারবে এবং তবেই তারা প্রয়োজনীয় শ্রেণি-সমাবেশ গড়ে তুলতে পারবে। লেনিনের সমস্ত পরামর্শ ও সমস্ত লেখার মধ্যে এই রাজনৈতিক চেতনার কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে৷ ১৯০১ সালেই তিনি বলেছেন যে, কৃষকদের মধ্যে আন্দোলন করবার মতো অসংখ্য দাবি আছে; স্থানীয়, নির্দিষ্ট ও সবচেয়ে জরুরি দাবিগুলির ভিত্তিতে এই আন্দোলন করতে হবে, (হঠকারীরা লক্ষ্য করবেন!) ‘কিন্তু আন্দোলনকে এরই মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, কৃষকদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করার দিকে, তাদের রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি করার দিকে একে নিয়ে যেতে হবে।’ এই কথাটিকেই তিনি আরও জোরের সঙ্গে বলেছেন ১৯০৫ সালে তাঁর ‘সর্বহারা ও কৃষক’ প্রবন্ধে। তিনি বলেছেন, ‘মহান রুশ বিপ্লবের গতি ও পরিণতি খুব বেশি পরিমাণে নির্ভর করছে কৃষকদের রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধির উপর।’ ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পশ্চিমবঙ্গে কৃষক সংগ্রাম যে স্তরে পৌঁছেছে তাতে লেনিনের এই শিক্ষা অপরিসীম গুরুত্ব অর্জন করেছে।

লেনিনের এই সব শিক্ষাকে মনে রেখে বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পটভূমিকায় ভারতের বাস্তব অবস্থায় আমাদের পার্টি অর্থাৎ মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি বিপ্লবের কর্মসূচী স্থির করেছে। সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও একচেটিয়া পুঁজির শোষণের অবসানের জন্য জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধা করা এবং জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া কৃষকের মুক্তি হতে পারে না; তার জমির অভাব, দুঃস্থতা ও দারিদ্র্যের সমস্যার মৌলিক সমাধান হতে পারে না। এই বিপ্লবের জন্য শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষকের মৈত্রী গড়ে তুলতে হবে। গ্রামাঞ্চলের বিশেষ অবস্থা বিশ্লেষণ করে পার্টি ঘোষণা করেছে যে, কৃষি-শ্রমিকসহ গরিব কৃষকদের উপর ভিত্তি করে মাঝারি কৃষকদের সঙ্গে দৃঢ় মৈত্রী গড়ে তুলতে হবে এবং ধনী কৃষক ও গ্রামের গণতান্ত্রিক মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের দেশে কৃষকের সংখ্যাই বেশি, তাই কৃষকদের বৈপ্লবিক শক্তির বিকাশ ও তাদের রাজনৈতিক সচেতনতার উপর ভারতের বিপ্লব বহুলাংশে নির্ভর করছে। ভারতের বর্তমান গভীর রাজনৈতিক সংকটের পরিস্থিতিতে এই কর্তব্য খুব জরুরি হয়ে উঠেছে। কৃষক আন্দোলনের দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে পার্টি ‘কৃষক ফ্রন্টের কর্তব্য’ শীর্ষক প্রস্তাবে পরিষ্কারভাবে বলেছে যে, গরিব কৃষকদের ভিত্তির উপর কৃষক আন্দোলনকে দাঁড় করাতে হবে। তাদের আন্দোলনের পুরোভাগে আনতে হবে; এ বিষয়ে আমাদের যে দুর্বলতা রয়েছে তা কাটাতে হবে; এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে মাঝারি কৃষকদের সঙ্গে দৃঢ় মৈত্রী গড়ে তুলতে হবে এবং তাকে কেন্দ্র করে কৃষকদের ঐক্য সংগঠিত করতে হবে। মাঝারি কৃষকের ভিত্তিতে নয়, গরিব কৃষকের ভিত্তিতে সমগ্র কৃষক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গে কৃষক আন্দোলনকে দ্রুত শক্তিশালী করার বিশেষ প্রচেষ্টা গত দু-তিন বছর ধরে চলেছে। যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার অনুকূল পরিস্থিতিতে গত একবছরে কৃষক আন্দোলনের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছে। ব্যাপ্তি ও গভীরতা উভয় দিক দিয়েই আক্ষরিক অর্থে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। সারা রাজ্যে প্রতি জেলায় লক্ষ লক্ষ গরিব কৃষক ও খেতমজুর নতুন চেতনায় জেগে উঠেছে ও সংগ্রামের এক জোয়ার সৃষ্টি করেছে। নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, কৃষক আন্দোলন তার পূর্ব ভিত্তি ছেড়ে মূলত গ্রামের গরিবদের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছে। খাস ও বেনামি জমির সংগ্রাম, ১০ লক্ষাধিক বিঘা জমি উদ্ধার ও দখল, ধান কর্জ পাবার সংগ্রাম, মজুরির সংগ্রাম প্রভৃতির মধ্য দিয়ে গরিব কৃষকদের সংগ্রামী শক্তির ব্যাপক স্ফূরণ ঘটেছে, ভূমি সমস্যার মৌলিক সমাধানের প্রশ্নকে কৃষকদের সামনে বাস্তব প্রশ্ন হিসাবে উপস্থিত করেছে। এই আন্দোলনের পর্যালোচনা করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে কতকগুলি প্রশ্ন নিয়ে এসেছে যার উত্তর কমরেড লেনিনের শিক্ষার আলোকেই স্থির করতে হবে।

আগের কৃষক আন্দোলনে কৃষকদের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল, কৃষক আন্দোলনের ভিত্তি পরিবর্তন অর্থাৎ গরিব কৃষকদের উপর ভিত্তি-স্থাপন, সেই পুরোনো সম্পর্কের ভারসাম্যের পরিবর্তন করেছে। গরিব কৃষক জেগে উঠেছে, আন্দোলনের পুরোভাগে এসে দাঁড়িয়েছে। এ এক লক্ষণীয় সাফল্য। কিন্তু এই সাফল্যের আনন্দে কৃষকদের বিভিন্ন স্তরের ভূমিকা ও সেই মতো তাদের সমাবেশ করার প্রশ্নকে ছোটো করে দেখা চলবে না। গরিব কৃষকদের নিজেদের ঐক্যকে আরও সম্প্রসারিত করতে হবে, তাদের রাজনৈতিক চেতনায় সচেতন করতে হবে; তা না-হলে এবং জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্য তাদের সামনে তুলে না-ধরলে বর্তমান কাঠামোর সীমাবদ্ধতার মধ্যে ভূমি সমস্যার মৌলিক সমাধানের অলীক আশা তাদের সংগ্রামকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাবার পথে বাধা সৃষ্টি করবে। জমির সংগ্রামকে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এই সচেতনতার ভিত্তিতে মাঝারি কৃষকের মনে মৈত্রীর বন্ধন সুদৃঢ় করতে হবে, গ্রামের গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে তোলার পথে যেতে হবে। রাজনৈতিক চেতনা দিতে পারলে তবেই গরিবেরা এই ঐক্য স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হবে।

গত একবছরের জমির সংগ্রাম যেমন গরিব কৃষকদের সংগ্রামী শক্তির বিকাশ ঘটিয়েছে তেমনি জোতদারদের মধ্যে আতঙ্ক ও ধনীদের মধ্যে আড়ষ্টভাব সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি যুক্তফ্রন্টের মধ্যেও প্রভাব বিস্তার করেছে এবং তারই ফলে যুক্তফ্রন্টের মধ্যে সংকট দেখা দিয়েছে। বুর্জোয়া বা বুর্জোয়া-প্রভাবাধীন কোন কোন পার্টি গরিবদের জাগরণের মধ্যে ‘অরাজকতা’ ও ‘অসভ্যতার’ সন্ধান পেয়েছেন। কৃষকদের উদ্যোগকে থামিয়ে দেবার জন্য এরা আওয়াজ তুলেছেন যে, কৃষকদের সক্রিয় উদ্যোগ ও সংগ্রাম নয়, আইন করে অফিসারদের মাধ্যমে কৃষকদের মঙ্গল করা হোক। লেনিনের শিক্ষার আলোকে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি গরিব কৃষকদের সংগ্রামে অগ্রণী রয়েছে বলেই তাদের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের কেউ কেউ আক্রমণকে কেন্দ্রীভূত করেছেন। এই সবে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কমরেড লেনিনের লেখাতেই এর ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।

১৯০২ সালের রাশিয়ার অবস্থার সঙ্গে বর্তমানে পশ্চিমবাংলার অবস্থার পার্থক্য আছে, তথাপি লেনিনের তখনকার বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। ১৯০২ সালে পলতাভা, খারকভ ও অন্যান্য প্রদেশে কৃষকদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। তারা জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, ‘তাদের গোলা ভেঙেছে, গোলার খাবার নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে, চাষিরা যে ফসল চাষ করেছে অথচ জমিদাররা আত্মসাৎ করেছিল তা উপবাসী চাষিদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছে এবং জমির নতুন বণ্টনের দাবি করেছে।... কৃষকেরা সিদ্ধান্ত করেছিল এবং সঠিকভাবেই সিদ্ধান্ত করেছিল যে, বিনা সংগ্রামে না-খেয়ে মরার চেয়ে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে লড়াই করে মরা ভালো।… জারের সরকার তাদের সাধারণ দাঙ্গাকারী ও দস্যু বলে ঘোষণা করেছে (যে ফসল চাষিরা তৈরি করেছে তা দস্যু জমিদারদের কাছ থেকে নেওয়ার জন্য।) এবং তাদের শত্রু মনে করে তাদের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠিয়েছে, কৃষকেরা পরাজিত হয়েছে।’ যুক্তফ্রন্টের বিশেষ বিশেষ শরিক দল একটু ভেবে দেখবেন তাঁরা কৃষকদের লুণ্ঠনকারী, অন্যায় জবরদখলকারী বা অরাজকতা সৃষ্টিকারী বলে নিজেদের কোথায় এনে দাঁড় করাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গের জনগণ ভাববেন যে, এখানে যুক্তফ্রন্ট সরকার ছিল বলেই কৃষকদের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবহৃত হতে পারেনি এবং তারই জন্য পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করার ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। কৃষক আন্দোলনের কুৎসাকারীদের সমর্থন করে মুখে লেনিনের নাম নিতে দক্ষিণপন্থী কমিউনিস্টদের লজ্জা বোধ হয় না। যারা কৃষকদের উদ্যোগকে বন্ধ করে উপর হতে শুধু আইন করে অফিসারদের দিয়ে কল্যাণ করার কথা বলেন, তাঁরা যেন লেনিনের এই কথা মনে রাখেন যে, ‘কৃষকেরা জেনে রাখুন যে, পুরোনো কর্তৃপক্ষের দ্বারা কার্যকর হলে কোনও ভূমিসংস্কারই কোনও কাজে আসবে না।’ গত একবছরের অভিজ্ঞতা লেনিনের এই কথারই সারবত্তা প্রমাণ করছে।

১৯০২ সালের উপরোক্ত কৃষক বিদ্রোহ থেকে যে শিক্ষা নেবার জন্য কমরেড লেনিন বলেছেন তা পশ্চিমবঙ্গের মার্কসবাদী কৃষক কর্মীদের বিশেষভাবে হৃদয়ঙ্গম করা প্রয়োজন। তিনি বলেছেন, ‘কৃষক অভ্যুত্থান বিধ্বস্ত হয়েছিল, কারণ এটা ছিল অজ্ঞ ও রাজনীতিগতভাবে অচেতন জনগণের অভ্যুত্থান, যে অভ্যুত্থানে পরিষ্কার ও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দাবি ছিল না অর্থাৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবি ছিল না। কৃষক অভ্যুত্থান বিধ্বস্ত হয়েছে, কারণ এর জন্য কোন প্রস্তুতি করা হয়নি। কৃষক অভ্যুত্থান বিধ্বস্ত হয়েছে, কারণ গ্রামের সর্বহারারা শহরের সর্বহারাদের সঙ্গে এখনও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। এই হল কৃষকদের প্রথম ব্যর্থতার তিনটি কারণ।’

এই কারণ বিশ্লেষণ করে কমরেড লেনিন বলেছেন, ‘সাফল্য অর্জন করতে হলে অভ্যুত্থানের সচেতন রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকতে হবে; আগে থেকে তার প্রস্তুতি করতে হবে; তাকে সমগ্র রাশিয়ায় ব্যাপ্তি লাভ করতে হবে এবং শহরের শ্রমিকদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’ আবার একথা বলতে চাই যে, তখনকার রুশের অবস্থা ও আজকের ভারতের অবস্থার মধ্যে পার্থক্য আছে, তথাপি লেনিনের এই শিক্ষা খুবই মূল্যবান। পশ্চিমবঙ্গের কৃষক আন্দোলন যে স্তরে পৌঁছেছে তাতে কৃষকদের রাজনৈতিক লক্ষ্য সম্বন্ধে সচেতন করা একান্ত প্রয়োজন, তা না-হলে শুধুমাত্র জমি পাবার তাগিদ তাকে বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না; শুধু তাই নয় তাতে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। আরও কিছু বেনামি জমি নিশ্চয় উদ্ধার করা যাবে, আইনের সম্ভাব্য সংশোধন করে আরও কিছুদূর এগোনো যাবে, কিন্তু তাতে জমি সমস্যার মূল সমাধান হবে না, হতে পারে না। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে পারলে তবেই জমিদারদের সমস্ত জমি ও যাদের পর্যাপ্ত অন্যান্য আয় আছে সেই অকৃষক ধনী জোতদারদের জমি বিতরণ করা সম্ভব হবে; তখনই অকৃষক ছোটো মালিকদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করে অকৃষকদের হাতে জমি না-রাখার ব্যবস্থা করা যাবে; তখনই অনেক জমিহীন ও গরিব কৃষকের অন্য জীবিকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। এই চেতনায় কৃষকদের দ্রুত শিক্ষিত করা প্রয়োজন। বিপ্লবের প্রস্তুতি বলতে শুধু সাংগঠনিক প্রস্তুতিই বোঝায় না, প্রয়োজনীয় শ্রেণি সমাবেশ ও গরিব কৃষকের ভিত্তিতে সম্ভাব্য ব্যাপকতম কৃষক ঐক্য গড়ে তোলাও তার অন্তর্ভুক্ত। কৃষক আন্দোলনকে ব্যাপক এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া, এলাকাগুলির মধ্যে যোগসূত্র গড়ে তোলা এবং শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে তার মিতালি গড়ে তোলার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের কৃষক আন্দোলন বিশেষ শক্তি সঞ্চয় করলেও তার অনেক ত্রুটি ও দুর্বলতা আছে। লেনিনের শিক্ষার আলোকে সেগুলি দূর করতে হবে।

আমাদের দেশে কৃষকদের থেকে বিচ্ছিন্ন মুষ্টিমেয় হঠকারী আছে যারা কৃষক আন্দোলনের অগ্রগতির বৈপ্লবিক তাৎপর্য বোঝে না। কৃষকদের জমির সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস ও বৈপ্লবিক শক্তির স্ফূরণ ঘটেছে এবং নিশ্চিতভাবেই ঘটেছে, এটা হঠকারীদের কাছে কিছুই নয়। তারা মনে করে যে, কৃষক নিজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বুঝুক বা না-বুঝুক, বাইরে থেকে বিপ্লবের স্লোগান দিতে পারলেই কৃষকেরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বিপ্লব যেন অত্যন্ত সস্তা ও সহজ, যেন শাসকশ্রেণির সমগ্র রাষ্ট্রশক্তির অস্তিত্ব নেই। এদের তথাকথিত সস্তা বিপ্লব বিচ্ছিন্ন লুটপাট ও গোপন হত্যার কাজে অধঃপতিত হতে বাধ্য এবং তাতে কৃষকদের বিপ্লবী শক্তির বিকাশকে অপরিণত অবস্থায় ধ্বংস করে দিতে ও কৃষকদের হতাশাগ্রস্ত করতেই সাহায্য করে। বাস্তব অভিজ্ঞতাই তা প্রমাণ করছে। বর্তমান জমির ব্যাপক আন্দোলনের তাৎপর্যকে নস্যাৎ করার জন্য তারা অন্যান্য যুক্তির মধ্যে একটা যুক্তি দেখায় যে, জমির সংগ্রাম করলে জমি পেয়ে কৃষকরা অবিপ্লবী ও শান্ত হয়ে পড়বে। লেনিনের একটা কথাতেই এর জবাব মিলবে। তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান অবস্থায় কৃষকদের আন্দোলন নিঃসন্দেহে বিপ্লবী। কেউ কেউ বলেন যে, কৃষকরা জমি দখল করার পর শান্ত হয়ে যাবে। হয়তো হতে পারে। কিন্তু কৃষকরা জমি দখল করলে স্বৈরাচারী সরকার তাদের শান্ত করবে না এবং এটাই হল মূলকথা। একমাত্র বিপ্লবী সরকারই তাদের দখলকে অনুমোদন করতে পারে।’ পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সরকার থাকায় কৃষকরা এগিয়ে যাবার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু ভুললে চলবে না যে, ভারতে পুঁজিপতি-জমিদারদের রাষ্ট্র রয়েছে; যুক্তফ্রন্টের ক্ষমতাও সীমাবদ্ধ এবং তাকেও ভাঙার চক্রান্ত হচ্ছে। তাই কৃষকের জমির সংগ্রাম তাকে শান্ত করবে না, তার বৈপ্লবিক শক্তিকে বিকশিত করে তুলবে। লেনিনের শিক্ষায় একে পুষ্ট করে তুলতে হবে।

গণশক্তি, ‘লেনিন জন্মশতবার্ষিকী সংখ্যা’, ১৯৭০, মার্চ।

প্রকাশের তারিখ: ২২-এপ্রিল-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org