লেনিনবাদী স্তালিন

সুব্রত দত্ত
ট্রটস্কিরা লেনিনকে ব্যবহার করতে শুরু করলেন স্তালিনের বিরুদ্ধে। তখন স্তালিন ১৯২৪ সালে লিখলেন 'লেনিনবাদের ভিত্তি' এবং ১৯২৬ সালে লিখলেন 'লেনিনবাদের সমস্যা'। এই সমস্ত লেখায় ও বক্তৃতায় স্তালিন প্রকাশ করলেন, লেলিনবাদ হল সাম্রাজ্যবাদের যুগে, প্রলেতারিয় বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ। সাধারণভাবে লেনিনবাদ হল প্রলেতারিয় বিপ্লবের তত্ত্ব ও কৌশল, আরো নির্দিষ্ট করে বললে শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্বের তত্ত্ব ও কৌশল।

সিপিএসইউ’র বিশতম কংগ্রেসের পর থেকে সাধারণভাবে, আরো নির্দিষ্ট করে বললে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর থেকে প্রথমে স্তালিনকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার এবং পরবর্তীতে একনায়কের চিত্রিত করার প্রয়াস আজও চলছে। কোনও নেতার মূল্যায়ন তার সময়ের বস্তুগত বিশ্লেষণ ছাড়া সম্ভব নয়। ফলত স্তালিনকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায়নি, যাবেও না। স্তালিনকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে হলে মার্কসবাদ লেনিনবাদ ও তার জয়যাত্রার ইতিহাসকে মুছে ফেলতে হয়। মানব সভ্যতার ইতিহাসে নভেম্বর বিপ্লব যুগান্তকারী। সর্বোপরি ৩০০ বছরের পুঁজিবাদকে চ্যালেঞ্জ করে ৩০ বছরের সমাজবাদ মানব সভ্যতাকে যা উপহার দিয়েছে, সেই নির্মাণযজ্ঞের মুখ্য পুরোহিত কমরেড জে ভি স্তালিন।

বিপ্লব পূর্ববর্তী সময়ে পার্টি সংগঠন গড়ে তোলার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া, সর্বোপরি মার্কসবাদ লেনিনবাদের নান্দনিক তত্ত্বের বিকাশে ঐতিহাসিক ভূমিকা, বিপ্লবী কার্য সমাধার ক্ষেত্রে নিপুণতা, সমাজতন্ত্র গঠনে সংগ্রাম পরিচালনা, শ্রমজীবীর সামনে নতুন বিপদ ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করতে সোভিয়েত জনগণকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করানো, এই ভাবেই স্তালিনের অবদান আলোচনা করা যায়।

আজকের দিনে ১৮৭৯ সালে স্তালিন জন্মেছিলেন। পনের বছর বয়সেই যোগ দেন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে। বয়স যখন উনিশ, তখন আরএসডিএলপি’র তিফলিশ শাখার সদস্য হন। ১৯০০ সালে লেনিন যখন প্রথম ‘ইস্ক্রা’ প্রকাশ করেন, তখনই তিনি লেনিনের সঙ্গে তাঁর আত্মিক যোগাযোগ অনুভব করতে শুরু করেন।

১৯০১, জর্জিয়াতে তিনি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কাগজ (বেআইনি) প্রকাশ করেন। এবং তার সম্পাদকীয় লেখেন। মার্কসবাদী তাত্ত্বিক পত্রিকা হিসেবে ইস্ক্রা-র পরেই স্থান ছিল এই পত্রিকার। এই পত্রিকার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্তালিন বলেন, ‘জর্জিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংবাদপত্রকে শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কে সমস্ত প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দিতে হবে, নীতি সম্পর্কিত সমস্ত প্রশ্নের ব্যাখ্যা করতে হবে, সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণির ভূমিকা সম্পর্কে তথ্যগত ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং শ্রমিকশ্রেণিকে যে সমস্ত বিষয়ে মুখোমুখি হতে হয় তার উপর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আলোকপাত করতে হবে।’

এই পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায় স্তালিনের একটা গুরুত্বপূর্ণ রচনা প্রকাশিত হয় ‘রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি ও তার কর্তব্য’ শিরোনামে। এই রচনাতে স্তালিন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক আন্দোলনের সংযুক্তিকরণের প্রয়োজনীয়তা ও গণতান্ত্রিক মুক্তি আন্দোলনের নেতা হিসেবে শ্রমিকশ্রেণির উপর জোর দেন, শ্রমিকশ্রেণির একটি স্বাধীন রাজনৈতিক পার্টি গড়ে তোলাকে কর্তব্য বলে উল্লেখ করেন।

এইসঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্বও দিতে থাকেন। ১৯০৪ সালে বাকুতে স্তালিনের নেতৃত্বে শ্রমিকশ্রেণি ১৯ দিন ব্যাপী ধর্মঘট পরিচালনা করে। বলশেভিক পার্টির ইতিহাসে আছে, ‘এই ধর্মঘট ছিল রাশিয়ায় বিরাট বৈপ্লবিক ঝড়ের আগমনবার্তা ঘোষণাকারী বজ্রনির্ঘোষের মত।’ ১৯০২-১৯১৩, এই সময়ে তিনি দফায় দফায় গ্রেপ্তার ও নির্বাচনের সামনে পড়েন এবং পাঁচবার নির্বাসন থেকে পালিয়ে আসেন। এই সময়েই প্রয়োগগত ক্রিয়া-কলাপের সঙ্গে তত্ত্বের মিশ্রণ, স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক আন্দোলনকে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক চরিত্রে পরিণত করার প্রশ্নটি ‘সংক্ষেপে পার্টির মধ্যে মতানৈক্য প্রসঙ্গে’ পুস্তিকাতে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে কতগুলি প্রবন্ধে দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এর সূত্রগুলি দিয়ে তত্ত্বগত আলোচনা করেন।

১৯১৭-তে পলিটব্যুরোর সদস্য হিসেবে বিপ্লবের সময় যে পার্টি কেন্দ্র তৈরি হয় সেই পার্টি কেন্দ্রের নেতৃত্বে ছিলেন স্তালিন। এই কেন্দ্র ছিল পেট্রোগ্রাদ সোভিয়েতের বিপ্লবী সামরিক কমিটির মুখ্য কেন্দ্র। এবং সমগ্র অভিযান বাস্তব ক্ষেত্রে পরিচালিত করার দায়িত্ব ছিল এই কেন্দ্রের।

বিপ্লব পূর্ববর্তী সময়ে, মূলত ১৯১৩ পরবর্তী সময়ে মার্কসবাদ লেনিনবাদের বিকাশের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বগত আলোচনা ‘মার্কসবাদ ও জাতির প্রশ্নে’র রচনা করেন। সেই প্রবন্ধ সম্পর্কে লেনিন গোর্কিকে লেখেন, ‘আমাদের এখানে একজন চমৎকার জর্জীয় আছেন, যিনি সমস্ত অস্ট্রিও ও অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ করে প্রোসবেশচেনিয়ে (পত্রিকা)-র জন্য জাতিগত সমস্যা নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছেন।’ এই রচনার বিষয়বস্তু মার্কসবাদের ছাত্রদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জাতির সত্তা নিরূপণ করতে গিয়ে স্তালিন বলেন, কোনও জাতির চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য হলো এই যে তার অন্তর্ভুক্ত সমস্ত মানুষের একটি সাধারণ ভাষা থাকবে, একটি সাধারণ ভৌগোলিক অঞ্চলে তারা বাস করবে, তাদের একটি সাধারণ অর্থনৈতিক জীবন ও অর্থনৈতিক সঙ্ঘবদ্ধতা থাকবে যা প্রকাশিত হবে একটি সাধারণ সংস্কৃতির মধ্যে। পরবর্তীতে জাতি নিয়ে বলতে গিয়ে স্তালিন বলেন—  আধুনিক জাতিগুলি একটা নির্দিষ্ট যুগের উদীয়মান পুঁজিবাদী যুগের সৃষ্টি। সামন্তবাদের অবসান ও পুঁজিবাদের বিকাশের প্রক্রিয়া ছিল জনগণকে নিয়ে জাতি গঠনের প্রক্রিয়া।

সোভিয়েতগুলির হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা আসার পর লেনিনের নেতৃত্বে গণপরিষদ গঠিত হয়। কমরেড স্তালিন সেই গণপরিষদে জাতি ও গোষ্ঠী সমূহের পিপলস কমিশনার নিযুক্ত হন। শিশু সোভিয়েত রাষ্ট্রকে অঙ্কুরেই বিনাশ করবার জন্য অভ্যন্তরীণ প্রতিবিপ্লবীদের সহায়তায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির হস্তক্ষেপে যুদ্ধ শুরু হয়। এই সময় সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ প্রতিহত করা এবং শিশু সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে বাঁচাবার জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে স্তালিনকে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯২২ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে স্তালিনকে পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। লেনিন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের পথনিশানা তৈরি করেছিলেন, যদিও তার বাস্তবায়ন তিনি দেখে যেতে পারেননি। লেনিনের অবর্তমানে মার্কসবাদ লেনিনবাদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক মায়েস্ট্রো স্তালিনের উপর সেই মহান দায় অর্পিত হয়।

নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা ও জাতির ও আন্তর্জাতিক জটিল অবস্থাকে অতিক্রম করে স্তালিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি সোভিয়েত দেশ সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত হয়। এই কাজ সম্পাদন করা মোটেই সহজ ছিল না। লেনিনের মৃত্যুর আগে থেকেই ট্রটস্কির নেতৃত্বে বুখারিন, কামেনভ, জিনোভিয়েবরা নানা প্রকার পরিকল্পনা পরিচালনা করতে থাকেন। দুঃখের হলেও সত্যিই খুব অল্প সময়ের জন্যও মহামতি লেনিন ও ক্রুপস্কায়া এই ভয়াল ও ষড়যন্ত্রের শিকার হন। লেনিনের অসুস্থতার সময়ে বৈদেশিক বাণিজ্যে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে এই জর্জীয় প্রশ্নে পার্টির মধ্যে বিশেষ করে স্তালিনের সঙ্গে লেনিনের কৌশলগত প্রশ্নের, নীতিগত প্রশ্নে নয়, কিন্তু মতাদর্শগত পার্থক্য দেখা দেয়। এই প্রশ্নে লেনিন চূড়ান্ত গোপনীয় নোট ট্রটস্টিকে দেন পার্টিতে উপস্থিত করার জন্য, কিন্তু আলোচনার সময় ট্রটস্কি অনুপস্থিত থাকেন, কারণ সমস্ত ধরনের ভুল তথ্য পরিবেশন করেন, তার ওপর দাঁড়িয়ে লেনিন তাঁর মত দেন, কিন্তু ধারণা ছিল লেনিন কংগ্রেসে উপস্থিত থাকবেন এবং তাঁকে দিয়ে স্তালিনকে উৎখাত করবেন।

‘লেনিনের উইল’ যদি দেখা যায় তাহলে দেখা যাবে ট্রটস্কি থেকে ক্রুশ্চেভ পর্যন্ত সংস্কারবাদীরা কিভাবে এই উইলের ভাষার পরিবর্তন করেছেন। লেনিন ১৯২২ সালের ২৪ ডিসেম্বর এই নোটটি লেখেন। সেখানে তিনি বলেন: ‘কমরেড স্তালিন সম্পাদক হবার ফলে তার হাতে অসীম ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং তিনি সবসময়ই এই কর্তৃত্ব যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারবেন কি না সে বিষয়ে আমি নিশ্চয় করে কিছু বলতে পারি না।’ পরবর্তীতে স্তালিন-কুৎসা অভিযানে ‘একনায়ক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া’ হিসেবে সেই বক্তব্য বেমালুম পরিবর্তন হয়ে গেল, ‘সাধারণ সম্পাদক হয়ে কংগ্রেস স্তালিন তার হাতে অসীম কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত করেছেন এবং আমি নিশ্চিত নই তিনি সবসময়েই এই কর্তৃত্ব যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারবেন।’ মূল উইলে লেনিন আরো বলেন, ১) শ্রমিক সংখ্যা বৃদ্ধি করে কেন্দ্রীয় কমিটির সম্প্রসারণ। ২) স্তালিন ও ট্রটস্কিকে ভিত্তি করে যৌথ নেতৃত্ব। কিন্তু দশদিন পর ১৯২৩ এর ৪ঠা জানুয়ারি লেনিন তার উইলের সংযোজন করেন এবং তিনি নিজেই এর শিরোনাম দেন ‘১৯২২ সালের ২৪ ডিসেম্বরে চিঠিতে সংযোজন।’ এই ঘটনার তারিখ-ভিত্তিক পর্যালোচনা করলে দেখা যায় কামেনভ এই পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন। এই সবকিছুর উত্তর ১৯২৯ সালের পার্টি কংগ্রেসে দেন কমরেড স্তালিন। এই সময় নয়া অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর স্তালিন। 

ট্রটস্কিরা লেনিনকে ব্যবহার করতে শুরু করলেন স্তালিনের বিরুদ্ধে। তখন স্তালিন ১৯২৪ সালে লিখলেন ‘লেনিনবাদের ভিত্তি’ এবং ১৯২৬ সালে লিখলেন ‘লেনিনবাদের সমস্যা’। এই সমস্ত লেখায় ও বক্তৃতায় স্তালিন প্রকাশ করলেন, লেলিনবাদ হল সাম্রাজ্যবাদের যুগে, প্রলেতারিয় বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ। সাধারণভাবে লেনিনবাদ হল প্রলেতারিয় বিপ্লবের তত্ত্ব ও কৌশল, আরো নির্দিষ্ট করে বললে শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্বের তত্ত্ব ও কৌশল। সমাজতন্ত্র গঠনের ক্ষেত্রে বাধা ছিল প্রচুর। লেনিনবাদ বিরোধীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয় বলশেভিক পার্টিকে। স্তালিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টিকে ট্রটস্কি, জিনাভিয়েভ, বুখারিনদের মত প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ও ভারী ভারী নামের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী ও তীব্র মতাদর্শগতভাবে লড়াই পরিচালনা করতে হয়। এইসব বিখ্যাত নেতাদের বিরুদ্ধে তাত্ত্বিক লড়াই করে সঠিক লাইন স্থির করে পার্টি ও সরকারের কাজ সম্পাদন করা বিরাট কাজ। বিরোধীদের সঙ্গে মতপার্থক্য ছিল বহুবিধ বিষয়ে। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—  একটি মাত্র দেশে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার সম্ভাবনা, কৃষির যৌথ খামার (kolkhoz), সমাজতন্ত্র গঠনে কৃষকদের ভূমিকা, ভারী শিল্প গড়ে তোলা ইত্যাদি। এই তীব্র তাত্ত্বিক বিরোধে স্তালিন আরো একবার এই সময়কার শ্রেষ্ঠ মার্কসবাদী লেনিনবাদী হিসেবে তার প্রতিভার পরিচয় দেন। বিপ্লব পরবর্তী দেড় দশকের সাফল্যকে ১৯৩৩ কেন্দ্রীয় কমিটি ও কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল কমিশনের যুক্ত অধিবেশনের রিপোর্ট: 

১) সোভিয়েত ইউনিয়ন কৃষি প্রধান দেশ থেকে শিল্প প্রধান দেশে পরিণত হয়েছে। 

২) সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শিল্প ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী শক্তির উচ্ছেদ হয়েছে। 

৩) সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কৃষি ক্ষেত্র থেকে শ্রেণি হিসেবে কুলাকদের উৎখাত। 

৪) সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বেকারি সমস্যার বিলোপ। 

৫) দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বশাখায় সমাজতন্ত্রের বিস্তারের ফলে মানুষের হাতে মানুষের শোষণের অবসান। 

স্তালিনের সুদক্ষ নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি যদি লেনিনবাদ বিরোধী চক্রগুলিকে বিচ্ছিন্ন ও পর্যুদস্ত করার মাধ্যমে ইউএসএসআর-কে শিল্প কৃষি ও সামরিক ক্ষেত্রে শক্তিশালী না করতে পারত, তাহলে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর আক্রমণকে মোকাবিলা করা সম্ভব হতো না। স্তালিন ও বলশেভিক পার্টির এই অবদান অনন্য, অতুলনীয়। ১৯৪১ সালে হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করে। শুরু হয় সোভিয়েত জনগণের মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধ। এই ক্ষেত্রে ১ দশকের বেশি সময় ধরে কমরেড স্তালিন তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। 'The National Question and Leninism' ১৯২৯ সালে সিপিএসইউ-র ১৬তম কংগ্রেসের রাজনৈতিক রিপোর্টে স্তালিন বুর্জোয়া নেশন ও সোশ্যালিস্ট নেশনের কথা নতুন করে উত্থাপন করেন। সাধারণভাবে মনে করা হতো সমাজতন্ত্রে ধীরে ধীরে নেশনের অবলুপ্তি হবে। স্তালিন বলেন বুর্জোয়া জাতীয়তার অবসান হবে। তার জায়গায় সমাজতান্ত্রিক জাতীয়তার উন্মেষ হবে। এখানে স্তালিন বলেন ইতিহাসের দুই ধরনের জাতীয়তা আছে। সোভিয়েত বিপ্লবের ২৭ বর্ষপূর্তিতে স্তালিন সোভিয়েত স্বদেশপ্রেমের মৌলিক মর্মবস্তু এবং শক্তির কথা উল্লেখ করেন, ‘The strength of Soviet Patriotism lies in the fact that it is based not on racial or Nationalist prejudices but on the People's profound loyalty and devotion to their Soviet motherland or the fraternal partnership of the working people of all the nationalities in our country. Soviet patriotism harmoniously consines the national traditions of the peoples and the common vital internet of all the working people of Soviet Union.’

মনে রাখা দরকার শুধুমাত্র সামরিক রণনীতির কারণে অপরাজেয় নাৎসি বাহিনীকে পরাজিত করা যায়নি। আসলে সেটা ছিল মার্কসবাদ লেনিনবাদের বিকাশের নতুন তাত্ত্বিক সূত্রের সফল প্রয়োগ।

স্তালিন দেবদূত ছিলেন না। ছিলেন না কোনও অবতার। 

স্তালিন মানুষ ছিলেন। এটা ঠিক, কিছু ভুল-ভ্রান্তি তাঁরও ছিল। এবং এই ভুলভ্রান্তি, ব্যক্তিপূজাকে আড়াল করা নয়। বরং তার থেকে ভবিষ্যতের শিক্ষা নেওয়াই মার্কসবাদীদের কাজ। কিন্তু তা করতে গিয়ে তার ফাঁক দিয়ে মূল বিষয়টি যেন হারিয়ে না যায়।

স্তালিন মানে, ট্রটস্কিবাদকে পরাস্ত করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার তত্ত্বকে বাস্তবে রূপায়িত করা। স্তালিন মানে, স্থায়ী বিশ্ব বিপ্লব না হলে কোনও একটি দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গঠন অসম্ভব—  ট্রটস্কির এই তত্ত্বকে পরাজিত করে একটি দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান।

স্তালিন মানে, একটি অনগ্রসর কৃষিপ্রধান, সামন্তবাদী ও জারতন্ত্রের শোষণে শোষিত, বঞ্চিত, রিক্ত রাশিয়াকে শিল্পে, কৃষিতে, শিক্ষা, বিজ্ঞানে পুঁজিবাদী দেশগুলির সমকক্ষ গড়ে তোলা। কোনও কোনও ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী দেশগুলির চেয়েও উন্নত অবস্থায় নিয়ে আসার মহান কৃতিত্ব। 

স্তালিন মানে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তিশালী অর্থনৈতিক বিকাশ। স্তালিন মানে, দুর্ধর্ষ নাৎসী বাহিনী ও হিটলারের দস্যুদের পরাস্ত করে ফ্যাসিবাদের ধ্বংসসাধন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয় এবং ইউরোপের জন্য স্বাধীনতা। 

স্তালিন মানে, পরমাণু অস্ত্রের মালিকানা শুধু একচেটিয়া আমেরিকার হাতে না— পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে কোনও বড় যুদ্ধ না, এবং নয় আর কোনও হিরোশিমা-নাগাসকি। 

স্তালিন মানে, লেনিন প্রদর্শিত পথে আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রসার। লেনিনের সমস্ত প্রবন্ধ ও অভিজ্ঞতাকে সূত্রায়িত করে লেনিনবাদের প্রচার। স্তালিন মানে, বিভিন্ন জাতি-উপজাতির (প্রায় একশ’) সুদৃঢ় ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা।


প্রকাশের তারিখ: ২১-ডিসেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org