শত পুষ্প বিকশিত হোক

বিহঙ্গ দূত
যেইদিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন এসএসসি কি দুর্গাপূজা নাকি যে বছর বছর হবে? সেইদিন অনেকেই হাসিঠাট্টা ভেবেছিল। কিন্তু ২০১১-১৫-তে কোনও এসএসসি না হওয়ার দরুন স্কুলগুলো শিক্ষকশূন্য হওয়া শুরু করে। এই অবস্থায় আপডেটেড ভ্যাকান্সি লিস্ট ছাড়াই নিয়োগ প্রক্রিয়া করার সিদ্ধান্ত নেয় মধ্যশিক্ষা পর্ষদ যা নিয়ে সেসময় কম জলঘোলা হয়নি। তারপরেই সেই কালান্তক পরীক্ষা যা স্বাধীন ভারতবর্ষের অন্যতম শিক্ষাঘটিত দুর্নীতি হিসাবে ইতিহাসে ঠাঁই পেলো। ২৬০০০ শিক্ষক নিয়োগ বাতিল করার মতো ভয়ানক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হল সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্য সরকারের ওএমআর পুড়িয়ে দেওয়া ও তথ্যপ্রকাশ করতে না চাওয়ার মরিয়া প্রচেষ্টার দরুণ অযোগ্য, অপরাধী শিক্ষকদের সঙ্গে বলি হলেন আরও হাজারে হাজারে যোগ্য শিক্ষকরাও।

দক্ষিণ কোলকাতার এক নামী বেসরকারি স্কুলে এন ই পি (New Educational Policy) সংক্রান্ত কারিকুলাম বোঝানোর জন্য বেশকিছু স্কুলের প্রতিনিধিদের ডাকা হয়েছিল। সেখানে আঞ্চলিক ভাষার (রিজিওনাল ল্যাঙ্গুয়েজ) প্রতি নয়া শিক্ষানীতি কতটা জোর দিচ্ছে তা পর্যবেক্ষক বারংবার বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। সময় এলো ডেমো টিচিং-এর। নিউ এডুকেশনাল পলিসিতে ইন্টার ডিসিপ্লিনারি এডুকেশনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে ডেমো টিচিং-এ কোনও একটি টপিককে কেন্দ্র করে তিনজন ভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক তিনটি ভিন্ন পার্সপেক্টিভকে তুলে ধরবেন। বাধ সাধলো একটি বিশেষ ডেমোয় এসে। সেখানে সুন্দরবনের মধু সংগ্রাহকদের জীবনযাপন সংক্রান্ত একটি গল্পকে কেন্দ্র করে লাইফ সায়েন্স, জিওগ্রাফি ও বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক ডেমো দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। পর্যবেক্ষক বাংলা গল্প শুনেই বেঁকে বসলেন। পড়াতে হবে হিন্দি অথবা ইংলিশে। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল রিজিওনাল ল্যাঙ্গুয়েজের উপর জোর দিলে তো রিজিওনাল ল্যাঙ্গুয়েজকে অবশ্যই পাঠক্রমে ইনক্লুড করার কথা ভাবা দরকার। তাতে তিনি খুব উদাস সুরে বলেছিলেন- দেখুন, লেখা তো থাকে কতকিছু! কিন্তু আমাদের বাজারের চাহিদাটাও বোঝা দরকার!

নয়া শিক্ষানীতির হাল হকিকত সম্পর্কে বোঝানোর জন্য এর থেকে বেশি আর কিছু না বলাই ভালো। এই শিক্ষানীতি কি তবে পুরোটাই সেন্ট্রাল বোর্ড দ্বারা পরিচালিত হবে বা ‘এক দেশ এক পাঠক্রমে’র দমননীতিকে চাপিয়ে দেওয়ার কথা বলবে?

না। তা নয়। বস্তুতপক্ষে এই শিক্ষানীতি এখনও অব্দি রাজ্যওয়ারি বোর্ডগুলিকে মুছে দেওয়ার মতো কোনও প্রস্তাব পেশ করেনি বা তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টাও করেনি। প্রস্তাব রেখেছে সিলেবাস পরিবর্তনের। সাযুজ্য রক্ষার সুপারিশ করেছে সেন্ট্রাল বোর্ডের সঙ্গে কিন্তু এরপরেও রাজ্যওয়ারি বোর্ডগুলির স্বাধীনতা এখনও আছে আর সেখানেই যত গণ্ডগোলের মূল আখড়া। বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় এখন একটি প্যারালাল সিস্টেম চলছে। এই নয়া শিক্ষানীতি সেখানে বাংলা বোর্ডের দুর্বলতাকে প্রকট করার সুচারু পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করে চলেছে প্রতি মুহূর্তে। বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা সেই লালফিতের ফাঁসে আটকে ক্রমাগত দমবন্ধ হওয়ার জোগাড় হতে চলেছে।

এই দমবন্ধকর পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। কতগুলি ধাপে আজকের এই কঙ্কালসার দশা তৈরি হয়েছে। ২০১৫-১৬ সালে বাংলা বোর্ডে নতুন সিলেবাসে পড়ানো শুরু হয়। এই সিলেবাস আপাত অর্থে মনোগ্রাহী। বিভিন্ন বিষয়ের আধুনিকীকরণ করা হয়। ভাষাশিক্ষার বিষয়ে আধুনিক লেখকদের লেখা ঢোকানো হয়। বইয়ে ছবির মাধ্যমে বিষয়কে প্রাঞ্জলভাবে বোঝানোর দিকে বেশি নজর দেওয়া হয় কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার প্রতি অনাগ্রহ ফুটে ওঠে মাঝেমধ্যেই। বিষয় নির্বাচনে প্রকট হয় নগরকেন্দ্রীকতা। ব্যাকরণ শিক্ষার ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে বোধ নির্মানের থেকে বেশি জোর দেওয়া হয় কত বেশি বিষয়কে ছুঁয়ে যাওয়া হচ্ছে তার উপর। সবথেকে ধাক্কা খায় ইতিহাস। থেমাটিক হিস্ট্রি পড়ানোর নামে যেভাবে ইতিহাসের ক্রমকে গুলিয়ে দেওয়া হয়েছে তাতে ইতিহাস শিক্ষাটা কিছু বিশেষ টপিকের উপর নির্বাচিত পাঠ্যসূচি পড়ার নামান্তর হয়ে গেছে। এই বিশেষ সিলেবাস অনাগ্রহ তৈরি করে বাংলার ব্যাপক অংশের অনগ্রসর শিক্ষার্থীর মধ্যে। মিড ডে মিল থেকে শুরু করে অন্যান্য যে সকল সুবিধা বাংলার ছাত্রছাত্রীরা পেয়ে থাকে তা পড়াশুনার সহযোগী হিসাবেই থাকার কথা ছিল। ‘সবুজ সাথী’ বা ‘কন্যাশ্রী’ পাওয়ার জন্য পড়তে আসি ব্যাপারটা এরকম তো হওয়ার কথা ছিল না। এগুলো পাই বলে সুস্থভাবে পড়াশুনাটা করতে পারি এরকম হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে শিক্ষা নিয়ে কথা উঠলেই সরকার পক্ষের থেকে হাইলাইট করা হয় এইসকল প্রকল্পকে। এইসকল প্রকল্পের মাধ্যমে স্কুলশিক্ষায় কতদূর উন্নতি করা গেল বা স্কুলছুটদের সংখ্যা কমানো গেল কিনা তা নিয়ে বক্তব্য কমতে কমতে এখন অপার নৈঃশব্দ বিরাজ করে। কেননা সে দিকে তাকানো যাচ্ছে না। এই দৈন্যদশাকে কোভিড ১৯-র নাম করে বেশ কিছুদিন আটকানো গেছিল এবং সে সময়েই বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার উপর দ্বিতীয় ও সবথেকে নির্মম ছুরিকাঘাতটি হয়।



যেইদিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন এসএসসি কি দুর্গাপূজা নাকি যে বছর বছর হবে? সেইদিন অনেকেই হাসিঠাট্টা ভেবেছিল। কিন্তু ২০১১-১৫-তে কোনও এসএসসি না হওয়ার দরুন স্কুলগুলো শিক্ষকশূন্য হওয়া শুরু করে। এই অবস্থায় আপডেটেড ভ্যাকান্সি লিস্ট ছাড়াই নিয়োগ প্রক্রিয়া করার সিদ্ধান্ত নেয় মধ্যশিক্ষা পর্ষদ যা নিয়ে সেসময় কম জলঘোলা হয়নি। তারপরেই সেই কালান্তক পরীক্ষা যা স্বাধীন ভারতবর্ষের অন্যতম শিক্ষাঘটিত দুর্নীতি হিসাবে ইতিহাসে ঠাঁই পেলো। ২৬০০০ শিক্ষক নিয়োগ বাতিল করার মতো ভয়ানক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হল সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্য সরকারের ওএমআর পুড়িয়ে দেওয়া ও তথ্যপ্রকাশ করতে না চাওয়ার মরিয়া প্রচেষ্টার দরুণ অযোগ্য, অপরাধী শিক্ষকদের সঙ্গে বলি হলেন আরও হাজারে হাজারে যোগ্য শিক্ষকরাও। এইসব নিয়েই হাজার হাজার পাতা খরচা হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। চ্যানেল মিডিয়ার প্যানেলে বসে গলা ফেঁড়ে ফেলেছেন বাদী বিবাদী পক্ষ। দুঃখের ব্যাপার, এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় যুক্ত ছিল যা নিয়ে কথা বলতে অনাগ্রহ দেখা গেছে শাসক ও প্রধান বিরোধী দলকে। তা হল স্কুলগুলির বর্তমান অবস্থা! কোভিডের সময় টানা দেড়বছর স্কুলগুলো একপ্রকার বন্ধ হয়ে পড়েছিল। বেসরকারি স্কুলগুলোতে যখন অনলাইন ক্লাস, নোটস, এক্সামের ব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে চলেছে তখন সরকারি স্কুলে বাতি জ্বালাবার চেষ্টাও করা হয়নি। তারপর এই শিক্ষাদুর্নীতির কালো ছায়া যত ঘনাতে লেগেছে ততই বোঝা গেছে নিয়োগ আর হবে না! আর আধফোটা কুঁড়িগুলো কেউ বাক্স, প্যাঁটরা বেঁধে চলে গেছে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজে। কেউ বা বাবা, মায়ের ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙিয়ে একটি বাইক কিনে এখন দুয়ারে দুয়ারে ব্লিঙ্ক-ইট বা জেপ্টো বা জিফির ডেলিভারি করে। স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে ৮৫০০-র কাছাকাছি। ধুঁকছে আরও দশ হাজার স্কুল। এতে অবশ্য সুবিধাই হয়েছে রাজ্য সরকারের। তাদের ব্যয়ভার কমে গেছে। কিন্তু বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় সরকার পরিপোষিত শিক্ষা আর বেসরকারি শিক্ষার মধ্যে একটা জল-অচল ফারাক তৈরি হয়ে গেছে। একটি বড় সংখ্যক স্কুলে শিক্ষক আছেন, ছাত্র নেই। আরও বিরাট সংখ্যক স্কুলে ছাত্র আছে। এখনও বুক বেঁধে তারা স্কুলে আসে। তাদের বাপ মায়েরা আশা রাখেন সরকার পরিপোষিত শিক্ষাব্যবস্থার উপর কিন্তু শিক্ষক নেই! শিক্ষাকর্মী নেই! পাঠ্যসূচির বই আসে দেরি করে। কোনও বছর সিলেবাস শেষ হয় না। কন্ট্রাক্টচুয়াল টিচার দিয়ে কম্পালসারি সাবজেক্টগুলো কোনওমতে টেনেটুনে পড়ানো হয় বাকি সাবজেক্টগুলো ভুল করেও অফার করা হয় না উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে। আমরা অতলান্ত খাদের দিকে চলেছি। অথচ সে বোধ নেই আমাদের।

 
ঠিক এরকম সময়ে এন ই পি ইন্ট্রোডিউস হয়েছিল গোটা দেশে। পাঠ্যক্রমে নানাবিধ চমক ঠমক থাকলেও এই এডুকেশনাল পলিসি স্বাধীন ভারতের আজ অব্দি চলে আসা স্পেশালাইজড উচ্চশিক্ষার সমূলে কুঠারাঘাত করল। ডিপ্লোমা কোর্স, ভোকেশনাল ট্রেনিং আর জব ওরিয়েন্টেড কোর্সের চক্করে উচ্চশিক্ষা তার মূল পঠনপাঠনের গতি হারালো। কোনও শিক্ষাব্যবস্থার পরিকাঠামোগত আমূল পরিবর্তন করার সময় দুটি বিষয়কে প্রধান গুরুত্ব দেওয়া দরকার- এক, তার উপযোগিতা। দুই, তার সুদূরপ্রসারী ফলশ্রুতি। এতদিন এ ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে সরকার পরিপোষিত শিক্ষাব্যবস্থা উচ্চশিক্ষায় রিসার্চ ওরিয়েন্টেড ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করার চেষ্টা করেছে। তা কোনওদিনই যথাযোগ্য না হলেও ছাত্ররা রিসার্চ করে দেশের উন্নতি প্রকল্পে অংশগ্রহণ করবে সেই অভিমুখীনতা ছিল শিক্ষানীতিতে। কিন্তু নয়া শিক্ষানীতি এই গোটা ব্যাপারটা থেকেই হাত ঝেড়ে ফেলতে পারলে বাঁচে। ফলশ্রুতিতে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক স্কলারশিপ। রিসার্চ ফেলোদের যে টাকা স্কলারশিপ দেওয়া হয় তাতে শুধুমাত্র রিসার্চ করে পেটভাতের জোগান চালানোর কথা আশা করাও বাতুলতা। ফলে সুদূরপ্রসারী ফলশ্রুতিতে ভারতবর্ষ একটি অর্ধশিক্ষিত প্রজন্মকে তৈরি করতে চলেছে এ কথা বলাই বাহুল্য। এরপর আসি তার উপযোগিতায়। সুদূরপ্রসারী ফলশ্রুতিতে কুঠারাঘাত করে যদি বর্তমানে খেটে খাওয়ার উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা যায় তবে আপাত অর্থে মন্দ কী? কিন্তু সেই উপযোগিতা যদি ইনস্টাগ্রামে ভ্লগার তৈরি আর সোশাল ইনফ্লুয়েন্সার হওয়ার কাজে বরাদ্দ বিনিয়োগ করতে শুরু করে তাহলে এই উপযোগিতা যে দেশকে ধ্বংস করার তা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। আসলে এই শিক্ষানীতি নিষ্প্রশ্ন স্টেটসম্যান তৈরি করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে। আরও ভালো করে বলতে গেলে হিন্দুত্ববাদের সৈনিক হিসাবেই এই প্রজন্মকে শিক্ষিত করার গূঢ় পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সেইজন্যই তো পাঠ্যক্রমে জোর করে ঢোকানোর নিদান দেওয়া হয় সনাতনী ভাবধারাকে। কেউ সরকারের নীতিকে প্রশ্ন করে কোনও রিসার্চ করে যখন এ দুয়ার ও দুয়ারে গ্রান্টের জন্য ঘুরছে তখন ‘রামায়ণে বিজ্ঞানচেতনা’ বা ‘আধুনিক সমরাস্ত্রে কুরুক্ষেত্রের প্রভাব’ মার্কা অকালকুষ্মাণ্ড জাতীয় রিসার্চের প্রস্তাবও সহজেই স্বীকৃতি পায়। গ্রান্টও পায় ভালোমতোই।

এই এন ই পি-কে বিভিন্ন রাজ্য সরাসরি রিজেক্ট করেছে। বিভিন্ন রাজ্য একে প্রয়োজনমতো রূপান্তরিত করেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ? রাজ্য সরকার তড়িঘড়ি একটি বোর্ড তৈরি করেন। সেই বোর্ড নিষ্প্রশ্নে এর সবকটি প্রস্তাবকে মেনে নিয়ে ধর তক্তা, মার পেরেক গোছের একটা সিলেবাস তৈরি করে দেন। সেই সিলেবাসে পাঠ্যক্রমের কোনও হুঁশ দিশা নেই। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই স্কুলশিক্ষা সম্পর্কেই। উচ্চ মাধ্যমিক সেমেস্টার সিস্টেমে হয়েছে। প্রথম সেমেস্টার এম সি কিউ প্যাটার্নে আর দ্বিতীয় সেমেস্টার এল এ কিউ প্যাটার্নে। একে তো বই এসে পৌঁছেছে পরীক্ষার দুইমাস আগে। তারপর পাঠ্যবইতে অজস্র ভুল, অসঙ্গতি। ৪০ নম্বরের এম সি কিউ-এর জন্য সময় রাখা হয়েছে ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট। প্রশ্নের প্যাটার্ন হয়ছে ন্যাশানাল এলিজিবিলিটি টেস্টের ধাঁচায়। যে ছাত্র সাইন্স নিয়ে পড়ছে তাকে ৪০ টি প্রবলেম সলভ করতে হচ্ছে মাত্র ১ ঘন্টা ১৫ মিনিটে! তারা কি ব্যাঙ্কের বা রেলের এক্সাম দিতে এসেছে?

যে ছাত্র ভাষাশিক্ষা করছে, তাকে শেখানো হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের আদিযুগ ও মধ্যযুগটি পড়তে হবে ছোট প্রশ্নের প্যাটার্নে আর আধুনিক যুগটা যেহেতু দ্বিতীয় সেমেস্টারে তাই সেটা পড়তে হবে বড় প্রশ্নের প্যাটার্নে। একই সেমেস্টারে ২০ নম্বর এম সি কিউ, ২০ নম্বর এল এ কিউ প্যাটার্ন রাখাটা কি খুব মাথা খাটিয়ে বের করতে হত? নাকি এতে অপ্রতুল শিক্ষকদের দিয়ে দুইবার খাতা দেখানোর অসুবিধা, বারংবার খাতা পাঠানো, দেওয়া নেওয়া, মার্কস আপলোড প্রভৃতির চাপ এবং তজ্জনিত ব্যয়সংকোচ করাটাই প্রধান লক্ষ্য? ছাত্ররা কি ঠিক এতটা অবজ্ঞার পাত্র হয়ে গেছে রাষ্ট্রের কাছে?

ফলাফল বিষময়। অযোগ্য শিক্ষক, শিক্ষকশূন্য ক্লাসরুম, পুস্তকশূন্য ব্যাগ আর পরিকাঠামোশূন্য স্কুল-কলেজগুলো তাই ক্রমাগত ভূতের বাড়ি হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ফুলে ফলে বিকশিত হচ্ছে প্রাইভেট এডুকেশনাল ইন্সটিটিউশন। এই হল মাস্টারপ্ল্যান যেখানে অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা উঠে যাবে না কিন্তু তাতে শৈশব থেকে যৌবনের সময় খরচা করা হবে পুরোপুরি অ-লাভজনক। সবাই জানবে সেখানে পড়ে চাকরি কেন কোনও ভদ্রস্থ খাওয়া পরার সন্ধানও করা যাবে না। তাই বাঁচতে চাইলে হয় সর্বস্ব দিয়ে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় ভর্তি হও অথবা সোজাসুজি পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে অন্য কাজ খোঁজো।

এই অল্পসংখ্যক সব পেয়েছির ভারতবর্ষের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক সব হারিয়েছির ভারতবর্ষের তফাত ঘোচানোর লড়াই আজকের দিনে বামপন্থীদের। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষানীতি আদপে অভিন্ন এবং সেই শিক্ষানীতি নিম্নবিত্তের শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক। নির্বাচনের লড়াই আসলে এই বৈষম্যকে ঘোচানোর লড়াই এবং এ লড়াইয়ে বামপন্থীদের স্বরটুকু যদি বন্ধ করে দেওয়া যায় তবে বিপুলায়তন নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীর কাছ থেকে শিক্ষার অধিকারটুকুকেও স্তব্ধ করে দেওয়া খুবই সহজ হয়ে যাবে। তাই স্কুল বাঁচানো, মূল বাঁচানোর লড়াই আজকের নির্বাচনের প্রধান শপথ! প্রধান শপথ অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থার স্বর্ণোজ্জ্বল দিন রাজ্যে ফিরিয়ে আনা। শপথ রাজ্য বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ করার দাবিকে বাস্তবায়িত করার। শপথ  স্নাতক স্তর অব্দি টিউশন ফি মকুব করার। শপথ বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে ছাত্রদের প্রশিক্ষিত করণের। শপথ এসএসসি, পিএসসি, সিএসসি, মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের ঘুঘুর বাসা ভেঙে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করে স্কুলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার। শপথ পার্শ্বশিক্ষক ও অস্থায়ী শিক্ষকদের ন্যায্য বেতনকাঠামোর আওতাভুক্ত করার। শপথ স্কুল-কলেজগুলিকে দুর্বৃত্তায়নের কবল থেকে মুক্ত করার। শপথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষার সবক্ষেত্রে ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচনের ব্যবস্থা করার। শপথ শিক্ষার সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার।

ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়ে এই নয়া বাংলা গড়ার শপথ আমাদের। শত পুষ্প বিকশিত হোক শিক্ষাঙ্গনে!     


প্রকাশের তারিখ: ১০-এপ্রিল-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org