আমার গ্রামের ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করুক

সুমন মেদ্দা
বাবার নামে একটা জব কার্ড ছিল। তবে বাবার বদলে আমি যেতাম। যখন বন্ধ হল (ডিসেম্বর, ২০২১) তার আগেটায়। মাটি কাটার কাজ, জঙ্গল পরিষ্কারের কাজ, নালা পরিষ্কারের কাজ। কাজ পাচ্ছিলাম, তবে পুরো হত না। ১০০ দিন কাজ কমপ্লিট হত না। এখন চার বছর বন্ধ আছে। যদিও টাকা বকেয়া নাই। তবে ওই রোজগারটায় এগিয়ে যেত সংসারটা অনেকটা। ওটা বন্ধ হয়ে তো ক্ষতি হলই। রঙের কাজ করে বছরের হাফদিনও (১৮০ দিন) কাজ পাই না তো, তাই ওটা বন্ধ থাকলেও, ১০০ দিনের কাজ চালু থাকলে অনেকটা সুবিধা হত। 

আমার পড়াশুনা তো শেষ হল না, তাও গ্রামের ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করুক, চাই। সেটা তো চাইবই। তাই স্কুল-কলেজ নিয়ে মিটিং হলে সেগুলোতে আসি। কী আলোচনা হয়, শুনি। স্কুলগুলো যাতে খোলে, ঠিক মতো চলে— সেই কারণে। আমি কিন্তু স্কুল, লেখাপড়া সব ছেড়ে দেওয়ার পরে এসএফআই করতে শুরু করেছি।  

বাড়িতে আমরা চারজন। মা আছে, বাবা আছে। আর দাদা থাকে বাইরে, কাজ করে। বাবা চাষে খাটে, খেতমজুর। মা ঘরের কাজকর্ম করে। বাবা একা খেতমজুরের কাজ করত যে, ওখানেই সমস্যা। কারণটা তো ওটাই আমাদের পড়া ছাড়ার। দাদা এক বছরের বড়। কলকাতায় কাজ করে একটা স্টিল ফ্যাক্টরিতে। আমি পড়াশুনা ছাড়ার আগেই কিন্তু ও পড়াশুনা ছেড়েছে। ও ছেড়ে দিয়েছে নাইনে। আমি উচ্চ মাধ্যমিকের টেস্ট দিয়েছিলাম। তারপর ছেড়ে দিলাম। দারিদ্রের কারণে। টিউশান লাগত টেস্টের পর। টিউশানে মাইনে দিতে পারা যাচ্ছিল না। বাড়ির রোজগারও লাগত। তাও বাড়ির লোক পড়তে বলেছিল। চায়নি পড়া ছেড়ে দিই। সেই সময় আমাদের একটা নতুন ঘরও হচ্ছিল। চাপের মধ্যে চলছিল সংসার। আমার খালি মনে হচ্ছিল, কী করে সম্ভব হবে সংসার চালানো! রোজগার না করলে চলবে কী করে আর! এই কারণে নিজে থেকেই পড়া ছেড়ে দিলাম। মা-বাবা স্বপ্ন দেখেছিল ঠিকই, তারা তো স্বপ্ন দেখবেই যাতে আমরা বড় হই, শিক্ষিত হই। আমি খুব চাপে পড়ে গিয়েছিলাম, একদিকে মনে হত বাবা আর পারছে না। টিউশানও দিতে পারবে না। আরেকদিকে মনে হত বাবারা যা চেয়েছিল, আমি করতে পারলাম না। আমার ইচ্ছা ছিল পড়ার। এখন যদি কেউ জিজ্ঞেস করে ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ইচ্ছা ছিল, তা আর বলা যায় না। কী করে বলব কতদূর ইচ্ছা ছিল পড়ার! এগোতে পারলে বলতে পারতাম। মাধ্যমিকের পর ভেবেছিলাম কলেজে ভর্তি হব, ওইটুকুই। তার চেয়ে বড় কিছু ভাবিনি। ভেবেছিলাম কলেজ পাশ করে কোনও একটা চাকরি টাকরি করে পেলে যেন সংসারটা চলে, ফ্যামিলিটাকে যেন দেখে রাখতে পারি।

আমি যখন পড়া ছাড়ি, দাদা তখনও বাইরে যায়নি। এখানেই কাজ করছিল বাবার সাথে। বাবার সঙ্গে যেত মাঠে, কাজে। দাদা যখন একদম প্রথম যেত, পনেরোষোলো বছর বয়সে, তখন তেমন কাজ জানত না। বাবা হয়তো সেইভাবেই নিয়ে যেত, বিনা মজুরিতে সহযোগিতার জন্য। এখনও বাবা যে চাষের কাজ করে, তাতে মজুরি হয় দিনে ২২০ টাকা, খুব জোর ২৫০ টাকা। আমি যখন পড়া ছেড়েছি, ২০১৭-১৮ সালে, তখন মজুরি ছিল ১৭০/ ১৮০ টাকা।

কাজের হিসেব কিছু ভাবা হয়নি প্রথমে। যেকোনও কাজ হলেই যেতে হবে, এরকম একটা মাথায় এসেছিল। তারপর হঠাৎ যোগাযোগ হল চেনা একজন মিস্তিরির সাথে। রঙের যে মিস্তিরি, সেই মিস্তিরি। আমাদের গ্রামেরই। সে-ই নিয়ে গিয়েছিল আমায়। তার সঙ্গেই হাত ধরে প্রথম কাজ করা। এখন সব কাজেই যাই। যখন যেটা পাওয়া যায়। সবসময় তো কাজ হয় না রঙের। চাষের কাজেও যাই, মানে যা যা কাজ পাই। এখন রঙের কাজে দিনে ২৮০-৩০০ দেয় দিনের মজুরি। কনট্র্যাক্ট হিসাবে কাজ। যখন যেমন কন্ট্র্যাক্ট, তেমন টাকা। হেড মিস্তিরিই কনট্র্যাক্টর। তার রোজগার ভালই হয়, খারাপ না। একটা বাড়ির পিছনে ভালই প্রফিট সে রেখে দেয়— আমাদের অবশ্যই কমই দেয়। সে তো প্রফিটটা বেশি করতে চায়। ১০ দিনের কাজে ৫০০০-৬০০০ টাকার প্রফিট সে রাখতে চায়। তারপর বাকিটা আমাদের দিচ্ছে। বেশি কাজ হলে আমাদের চারটা মিস্তিরি লাগে। কম হলে দুজনেই কাজ চালিয়ে নিই। গোটা বছরে এক-দেড়শ’ দিনই কাজ পাই। তাও হবে না, প্রচুর মিস্তিরি এখন। চাপ আছে অনেক। দাদা বাঁধা মাইনের কাজ করে। দু-তিন বছর হল। বাবার নামে একটা জব কার্ড ছিল। তবে বাবার বদলে আমি যেতাম। যখন বন্ধ হল (ডিসেম্বর, ২০২১) তার আগেটায়। মাটি কাটার কাজ, জঙ্গল পরিষ্কারের কাজ, নালা পরিষ্কারের কাজ। কাজ পাচ্ছিলাম, তবে পুরো হত না। ১০০ দিন কাজ কমপ্লিট হত না। এখন চার বছর বন্ধ আছে। যদিও টাকা বকেয়া নাই। তবে ওই রোজগারটায় এগিয়ে যেত সংসারটা অনেকটা। ওটা বন্ধ হয়ে তো ক্ষতি হলই। রঙের কাজ করে বছরের হাফদিনও (১৮০ দিন) কাজ পাই না তো, তাই ওটা বন্ধ থাকলেও, ১০০ দিনের কাজ চালু থাকলে অনেকটা সুবিধা হত। 

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

এখন যদি জিজ্ঞেস করে কেউ, বলি, আর পড়াশুনা করার ইচ্ছা নেই। কাজকর্মে ঢুকে ইচ্ছেটাই মরে গেছে। এখন যা রাজ্যের হাল তাতে পড়াশুনা করে কিছু হবেও না। এই জন্যই আরও ইচ্ছেটা মরে গেছে। তখন যদি বাড়ির রোজাগারটা থাকত, তখন তো ছাড়তে হত না। এখন সেই ইচ্ছেটা আর নেই, শেষ হয়ে গেছে। 

[পূর্ব বর্ধমান জেলার রায়না ১ ব্লকের পলাশন গ্রামের ২৫ বছর বয়সী যুবক সুমন মেদ্দা। স্কুল ছেড়েছেন ১৭ বছর বয়সে। এদেশে শ্রমজীবী পরিবারের ১৭ বছর বয়সী ছেলের কাজের বাজারে যুতে যাওয়ার মতো অতিপ্রচলিত ঘটনায় আপত্তি নেই আইনেরও। তবে সুমন মেদ্দাদের আইনানুগ শ্রমিক-জীবনও অবশ্যই দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে তখন, যখন দেখা যায় যে, গতর খাটিয়ে রোজগার করতে তাঁদের ছাড়তে হচ্ছে স্কুল। নিজের অনিচ্ছায়, পরিবারের অনিচ্ছায়। সুমন বা তার দাদার মতো কোটি কোটি নাবালক শ্রমিকদের পারিবারিক বাস্তবতা আরেকটি দিককে স্পষ্ট করে তোলে- পশ্চিমবঙ্গে তথা ভারতে, পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কের অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থান— কর্মদিবসে ঘাটতি, মজুরির বঞ্চনা। কর্মসংস্থান সংক্রান্ত এই সংকটকে আংশিক বেকারত্ব হিসাবেও দেখা হয়। যা আজকের প্রাপ্তবয়স্ক অকৃষি শ্রমিক সুমনের জীবনেরও সংকট বটে— মুখ্য পেশা (অকৃষি শ্রম— রঙের কাজ) এবং গৌণ পেশা (খেতমজদুরি)— দুই মিলিয়েও ১৮০ দিনের নিশ্চিত কাজের যোগানও হয় না। সুমনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, পরিবারের তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক উপার্জনকারী সদস্যের আয় মিলিতভাবেও একজন শ্রমিকের ন্যূনতম আয়কে সুনিশ্চিত করতে পারছে না— মজুরির বঞ্চনার কারণে, ঘাটতিপূর্ণ কর্মদিবসের কারণে, কাজের ধরনে অনিশ্চয়তা ও অস্থায়িত্বের কারণে। এমনকী প্রবাসী শ্রমিক হয়ে “বেশি” উপার্জন করার “স্বাধীনতা” বা সেই পথ “চয়নের অধিকার” চর্চার সমান্তরালে মুখ্য হয়ে ওঠে এই শ্রমিকদের স্কুলছুট হওয়ার বাস্তবতাও। সম্ভবত সেজন্যই ১৭ বছর বয়সে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হওয়া রঙের মিস্তিরি সুমন মেদ্দা, আজ ২৫ বছর বয়সে স্কুল বাঁচানোর জন্য ছাত্র-রাজনীতিতে যুতে যান, কাজের বাজারে যুতে যাওয়ার মতো, বাধ্যতই।] 

ছবি ও অনুলিখন: উর্বা চৌধুরী


প্রকাশের তারিখ: ৩১-ডিসেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org