নজরুল ইসলামের পত্র 

কাজী নজরুল ইসলাম
আমার শ্রমিক ভাইরা, যাহারা আপনাদের বিন্দু বিন্দু রক্ত দান করিয়া হুজুরদের অট্টালিকা লালে লাল করিয়া তুলিতেছে, যাহাদের অস্থি মজ্জা ছাঁচে ঢালিয়া রৌপ্যমুদ্রা তৈরী হইতেছে, যাহাদের চোখের জল সাগরে পড়িয়া মুক্তামাণিক ফলাইতেছে, তাহারা আজ অবহেলিত, নিষ্পেষিত, বুভুক্ষু। তাহাদের শিক্ষা নাই, দীক্ষা নাই, ক্ষুধায় পেট পুরিয়া আহার পায় না, পরণে বস্ত্র নাই। 

আমার প্রিয় ময়মনসিংহের প্রজা ও শ্রমিক ভ্রাতৃবৃন্দ । 

আপনারা আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আসার আন্তরিক ইচ্ছা ছিল, আপনাদের এই নব জাগরিত প্রাণের পূর্ণ নিজেকে পবিত্র করিয়া লইব, ধন্য হইব। কিন্তু দৈব প্রতিকূল হওয়ায় আমার সে আশা পূর্ণ হইল না। আমার শরীর আজও রীতিমত দুৰ্ব্বল, একস্থান হইতে অন্যস্থানে যাইবার মত শক্তি আমার একেবারেই নাই। আশা করি আমার এই অনিচ্ছাকৃত  অক্ষমত! সকলে ক্ষমা করিবেন। এই ময়মনসিংহ আমার কাছে নূতন নহে৷ এই ময়মনসিংহ জেলার কাছে আমি অশেষ ঋণে ঋণী। আমার বাল্যকালের অনেকগুলি দিন ইহারই বুকে কাটিয়া গিয়াছে৷ এইখানে থাকিয়া আমি কিছুদিন লেখাপড়া করিয়া গিয়াছি। আজও আমার মনে সেই সব প্রিয় স্মৃতি উজ্জ্বল ভাস্বর হইয়া জ্বলিতেছে। বড় আশা করিয়াছিলাম, আমার সেই শৈশব-চেনা ভূমির পবিত্র মাটী মাথায় লইয়া ধন্য হইব, উদার হৃদয় ময়মনসিংহ জেলাবাসীর প্রাণের পরশমণির স্পর্শে আমার লৌহ- প্রাণকে কাঞ্চনময় করিয়া তুলিব, কিন্তু তাহা হইল না,— দুরদৃষ্ট আমায়। যদি সৰ্ব্বশক্তিমান আল্লাহ, দিন দেন, আমার স্বাস্থ্য ফিরিয়া পাই, তাহা হইলে আপনাদের গফরগাঁওয়ের নিখিল বঙ্গীয় প্রজাসম্মিলনীতে যোগদান করিয়া ও আপনাদের দর্শন লাভ ৰু ৰিয়া ধন্য হইব। আপনারাই দেশের প্রাণ, দেশের আশা, দেশের ভবিষ্যৎ। মাটির মায়ায় আপনাদেরই হৃদয় কাণায় কাণায় ভরপুর। মাটির খাঁটি ছেলে আপনারাই। রৌদ্রে পুড়িয়া বৃষ্টির জলে ভিজিয়া — দিন নাই রাত নাই— সৃষ্টির প্রথম দিন হইতে আপনারাই তো এই মাটির পৃথিবীকে প্রিয় সস্তানের মত লালন পালন করিয়াছেন, করিতেছেন, ও করিবেন, – আপনাদের মাঠের এক কোদাল মাটী লইলে আপনারা আততায়ীর হয় শির লেন কিম্বা তাকে শির দেন, এত ভালবাসায় ভেজা যাদের মাটী, এতো বুকের খুনে উর্বর যে শস্যশ্যামল মাঠ,- আপনারা আমার কৃষাণ ভাইরা ছাড়া তাহার অন্য অধিকারী কেহ নাই । আমার এই কৃষাণ ভাইদের ডাকে বর্ষার আকাশ ভরিয়া বাদল নামে, তাদের বুকের স্নেহ ধারার মতই মাঠ ঘাট পানিতে বন্যায় সয়লাব হইয়া যায়, আমার এই কষাণ ভাইদের আদরে সোহাগে মাঠঘাট স্কুলে ফলে ফসলে শ্যাম সবুজ হইয়া উঠে- 

আমার এই কৃষাণ ভাইদের বধুদের প্রার্থনায় কাঁচা ধান সোণার রঙে রাঙিয়া উঠে, -এই মাঠকে জিজ্ঞাসা কর, মাঠে ইহার প্রতিধ্বনি শুনিতে পাইবে, 

এ মাঠ চাষার এ মাটী চাষার, এর ফুল ফল কৃষক-বধুর। 

আর আমার শ্রমিক ভাইরা, যাহারা আপনাদের বিন্দু বিন্দু রক্ত দান করিয়া হুজুরদের অট্টালিকা লালে লাল করিয়! তুলিতেছে, যাহাদের অস্থি মজ্জা ছাঁচে ঢালিয়া রৌপ্যমুদ্রা তৈরী হইতেছে, যাহাদের চোখের জল সাগরে পড়িয়া মুক্তামাণিক ফলাইতেছে, তাহারা আজ অবহেলিত, নিষ্পেষিত, বুভুক্ষু। তাহাদের শিক্ষা নাই, দীক্ষা নাই, ক্ষুধায় পেট পুরিয়া আহার পায় না, পরণে বস্ত্র নাই। 

হায় রে স্বার্থ! হায় রে গোভী দানব-প্রকৃতির মানব! আজ কৃষাণের দুঃখে শ্রমিকের কাতরাণীতে জ্বারশ কাঁপিয়া উঠিয়াছে! দিন আসিয়াছে, বহু যন্ত্রণা পাইয়াছ ভাই—এইবার তাহার প্রতীকারের ফেরেশতা দেবতা আসিতেছেন। তোমাদের লাঙল, তোমাদের শাবল তাহার অস্ত্র, তোমাদের কুটীর তাঁহার গৃহ! তোমাদের ছিন্ন মলিন বস্ত্র তাহার পতাকা, তোমরাই তাঁহার পিতা মাতা। আমি আপনাদের মাঝে সেই অনাগত মহাপুরুষের শুভ আগমন প্রতীক্ষা করিরা আপনাদের নব জাগরণকে সালাম করিয়া নির্নিমিষ দৃষ্টিতে তাকাইয়া আছি, ঐ বুঝি নব দিনমণির উদয় হইল ! ইতি ।


প্রকাশের তারিখ: ২৪-মে-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org