জীবনটাই সংগ্রামের

এম এ বেবি
ট্রেড ইউনিয়ন ও পার্টিতে কাজের মধ্য দিয়ে তিনি বহুমুখী শিক্ষার অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন। ২০০৬ ও ২০১৬ সালে যথাক্রমে মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা হিসেবে তিনি কতটা সুবিবেচনার সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, সেটা বিধানসভার সদস্য হওয়ার সুবাদে আমার স্বচক্ষে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। যে বিষয়ই তাঁর বিবেচনার জন্যে নিয়ে আসা হতো, তা তিনি সামলেছেন দক্ষতার সঙ্গে। এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল স্পষ্ট।

এক ক্লিকেই ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটস্যাপ চ্যানেল

কমরেড ভিএস অচ্যুতানন্দন ছিলেন ভারতের প্রবীণতম জীবিত কমিউনিস্ট। যে অভূতপূর্ব জনসমুদ্রের ঢেউ এই বয়োজ্যেষ্ঠ বিপ্লবীকে শেষ শ্রদ্ধা জানালো তা বর্ণনাতীত। যে বয়স্ক নারী পুরুষদের সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর পাশাপাশি থেকে কাজ করার, যে মধ্যবয়স্করা তাঁর সাহসী নেতৃত্বের পরিচয় পেয়েছে, যে যুবকেরা তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী কিংবা বিরোধী নেতা হিসেবে দেখেছে, এমনকী যে শিশুরা তিনি স্বাস্থ্যজনিত কারণে সাম্প্রতিক সময়ে জনতার দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার পর তাঁকে চিনেছে শুধু কতগুলি গল্পের মধ্য দিয়ে- জাতীয় রাজপথের দুই ধারে তারা সকলে বিপুল সংখ্যায় সারিবদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করছিল।

তিরুবনন্তপুরম থেকে আলাপ্পুঝা– ১৫০ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে এমনিতে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লাগে। বিপুল সংখ্যক মানুষের একবার চোখের দেখার আকুল ইচ্ছার কথা বিবেচনা করে অনুমান করা হয়েছিল, কমরেড ভিএস-এর অন্তিমযাত্রার ওই পথ পেরোতে ৮ ঘণ্টা সময় লাগবে। বাস্তবে, তাঁর মরদেহবাহী যান গন্তব্যে পৌঁছতে লেগেছে ২২ ঘণ্টা। এর কারণ, শতবর্ষী কমিউনিস্ট নেতা এবং তাঁদের প্রিয় কমরেড ভিএস-কে শ্রদ্ধা জানাতে রাত জেগে ধৈর্য ধরে, মুষলধারে পড়তে থাকা অফুরান বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে প্রতীক্ষায় থাকা বাঁধভাঙা জনস্রোত। নারীসমাজ ও যুবসম্প্রদায়ের বিপুল উপস্থিতিও ছিল এই জমায়েতের আরো একটি বৈশিষ্ট্য। ভিএসকে চোখের মণি হিসেবে অভিহিত করে উচ্চারিত শ্লোগান অন্তিম যাত্রার সমগ্র পথের আকাশকে মুখরিত করেছে। 

১৯৭০, কোল্লাম রেলস্টেশনের মাঠে সিপিআই(এম)-এর একটি রাজনৈতিক সমাবেশ। সেই প্রথম আমি তাঁকে দূর থেকে দেখি। সেই সময়ে তিনি ছিলেন একজন সুঠাম ও বলিষ্ঠ চেহারার মানুষ। তীব্র আবেগ ও প্রবল শরীরী অভিব্যক্তিতে ভরা তাঁর বক্তৃতায় স্বাভাবিকভাবেই প্রয়োজন হতো সেই অনুপাতে শারীরিক উদ্যমের। বক্তৃতার শেষে ঘামে ভিজে যাওয়া তাঁর শরীর, কোনওরকমে কুর্তাটা গায়ে সেঁটে থাকে– এই ছবিটাই আমার স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে গেঁথে রয়েছে। জরুরি অবস্থা পরবর্তী সময়ে দশম পার্টি কংগ্রেসের আগে আমি পার্টির কোল্লাম জেলা কমিটির সদস্য হই। আর তখনই তাঁকে ও তাঁর নেতৃত্বকে আমি খুব কাছ থেকে দেখি। প্রথম প্রথম তাঁকে আমার খুব কঠোর ও খিটখিটে বলে মনে হতো। তবে একটা ঘটনার কথা এখনও মনে পড়ে, যাতে দেখেছিলাম সমালোচনাকে গ্রহণ করতে ঠিক কতটা আগ্রহী তিনি ছিলেন।

১৯৮০, কমরেড ই কে নায়ানার যখন মুখ্যমন্ত্রী হন, তখন ভিএস হন পার্টির রাজ্য সম্পাদক। ১৯৮৫-তে কোচিতে পার্টির রাজ্য সম্মেলনে এম ভি রাঘবনের বিকল্প দলিলকে কেন্দ্র করে হওয়া বিতর্কের সুবাদে তা সংবাদ শিরোনামে আসে। সেই সম্মেলনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে– সর্বস্তরের কর্মীদের সঙ্গে পার্টি নেতৃত্বের সম্পর্ক আরও আত্মিক ও নিবিড় হওয়া উচিত। সম্মেলনের কয়েক সপ্তাহ পরের ঘটনা। একদিন আমরা কয়েকজন কোল্লামের পোলায়াথোডের জেলা দপ্তরের বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলাম। এমন সময় কমরেড ভিএস সেখানে পৌঁছলেন। সাধারণত তিনি গটগট করে জেলা সম্পাদকের ঘরের দিকে চলে যেতেন। যেমনটা জরুরি ব্যস্ততায় হেঁটে যেতেন তিনি। কিন্তু সেদিন তিনি এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটালেন। সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন সবাইকে, কে কেমন আছে। ভিতরে যাওয়ার আগে খানিকক্ষণ আমাদের সঙ্গে কথা বললেন। যাঁরা এর্নাকুলামের সেই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবেই এই পরিবর্তনটি লক্ষ্য করেছিলেন। ওই মুহূর্তটি আসলে ছিল একজন প্রকৃত কমিউনিস্টের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন– সমালোচনাকে গ্রহণ করে তার ভিত্তিতে আত্মসমীক্ষা ও নিজের বদল ঘটানো।

ভিএস-এর জন্য তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবন– উভয়ই ছিল এক দীর্ঘ অভিন্ন সংগ্রাম। তাঁর জন্ম হয়েছিল একটি দরিদ্র পরিবারে। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি মাতৃহারা হন। বাবা মারা যান এগারো বছর বয়সে। এই একটি কারণেই বোঝা যায় কেন তাঁকে সপ্তম শ্রেণিতেই স্কুল ছাড়তে হয়। যে বয়সে সকলে স্কুলে, তখন তিনি তাঁর দাদার অধীনে সেলাইয়ের কাজ শিখতে শুরু করেন। তারপর অ্যাস্পিনওয়াল কোম্পানিতে কয়ার (নারকেলের ছোবড়া) শ্রমিকের কাজে যোগ দেন। সেখানেই ট্রেড ইউনিয়নের কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। ১৭ বছর বয়সে যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। প্রবাদপ্রতিম সংগঠক কমরেড পি কৃষ্ণ পিল্লাই তরুণ ভিএস-কে কুট্টানাডের কৃষি শ্রমিকদের সংগঠিত করার দায়িত্ব দেন। পুন্নাপ্রা ভায়লার অভ্যুত্থানের পর ভিএস-কে চলে যেতে হয় আন্ডারগ্রাউন্ডে। আত্মগোপনে থেকেই তিনি কাজ চালিয়ে যান। শেষে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। বর্বর নিপীড়নের শিকার হন। তা সত্ত্বেও যৌবনের দিনে শুরু করা তাঁর সংগ্রামের জোয়ারে কখনও ভাটার টান পড়েনি। আর তা অব্যাহত ছিল তাঁর ১০১-বছর বয়স পর্যন্ত, এমনকী হাসপাতালের শয্যায় শুয়েও।

কুট্টানাডের কৃষি শ্রমিকদের সংগঠিত করে নিজেদের অধিকারের পক্ষে অটল থেকে ন্যায়সঙ্গত দাবিতে লড়াইয়ের শিক্ষায় শিক্ষিত করায় তিনি পালন করেছেন পথিকৃতের ভূমিকা। কেরালার সংগ্রামের ইতিহাসে ভিএস-এর এটি একটি অক্ষয় অবদান। পি কৃষ্ণ পিল্লাই তরুণ ভিএস-এর মধ্যে এক দক্ষ সংগঠক হয়ে ওঠার সুপ্ত সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন। আর সেজন্যেই তাঁর উপরই দায়িত্ব দিয়েছিলেন কুট্টানাডের কৃষি শ্রমিকদের লাল ঝাণ্ডার তলায় ঐক্যবদ্ধ করার। বলিষ্ঠ ও সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি ওই অঞ্চলের কৃষি শ্রমিক আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। যারা এতদিন বাধ্য হয়েছিল আদিমকালের পশুর মত জীবনে বাঁচতে, তারা মাথা উঁচু করে বজ্রমুষ্ঠি তুলে ধরে উঠে দাঁড়ালেন।  ফসলের ক্ষেত থেকে গর্জে উঠেছিল শ্লোগান, ‘আমরা দাস নই এবং আমরা কখনও মাথা নোয়াবো না’, যা প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। গণমানুষের সংগঠক হিসেবে ভিএস-এর দক্ষতার স্থায়ী স্বাক্ষর বহন করছে এই ঘটনা। রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক যে কোনও দায়িত্বের ব্যাপারেই তাঁর উপর ভরসা করা যেত। এবং সেটা সবসময়ই তিনি সার্থকতার সঙ্গে পালন করতেন।


ভিএস ছিলেন সেই ৩২ জন নেতাদের একজন, যাঁরা ১৯৬৪ সালে সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে সিপিআই-এর জাতীয় পরিষদ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। এই অর্থেও তিনি ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটি অধ্যায়কে সূচিত করেছিলেন– যা কখনোই মোছা যাবে না। ১৯৬৫ থেকে ২০১৬– তিনি দশটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। যার মধ্যে সাতবার জয়ী হন। পরাজিত হন তিনবার। কিন্তু কোনও পরাজয়ই তাঁর মনোবলকে ভাঙতে পারেনি। পরিবেশ সংক্রান্ত প্রশ্ন থেকে নারী সমস্যাকে তিনি উত্থাপন করেছেন। এবং প্রকৃত বিপ্লবী চেতনার দ্বারা চালিত হয়েই লড়াই করেছেন সমস্ত ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে। একটা সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলির কাছে তিনি ছিলেন উপহাসের পাত্র। পরবর্তীতে ওই একই সংবাদ মাধ্যমগুলিতে তিনি বন্দিত হয়েছেন ‘জননেতা’ হিসেবে।

যদিও ভিএস-এর কোনও প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা ছিল না, কিন্তু সেটা কখনোই তাঁর দায়িত্ব নির্বাহে প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠেনি। ট্রেড ইউনিয়ন ও পার্টিতে কাজের মধ্য দিয়ে তিনি বহুমুখী শিক্ষার অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন। ২০০৬ ও ২০১৬ সালে যথাক্রমে মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা হিসেবে তিনি কতটা সুবিবেচনার সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, সেটা বিধানসভার সদস্য হওয়ার সুবাদে আমার স্বচক্ষে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। যে বিষয়ই তাঁর বিবেচনার জন্যে নিয়ে আসা হতো, তা তিনি সামলেছেন দক্ষতার সঙ্গে। এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল স্পষ্ট। তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ভিএস-এর নেতৃত্বে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের ২০০৬-১১ শাসনকালে কেরালায় ‘আইটি এট স্কুল প্রজেক্ট’ নামের বিদ্যালয়-ভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তির বাস্তবায়ন। তাঁর মন্ত্রিসভায় আমি ছিলাম শিক্ষামন্ত্রী। 

১৯৯৬-২০০২, কমরেড ই কে নায়ানারের মুখ্যমন্ত্রীত্বের বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট সরকারের সময়ে গঠিত অধ্যাপক ইউ আর রাও-এর নেতৃত্বাধীন কমিটির তৈরি ‘শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তি: ভিশন ২০১০’ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ‘আইটি @ স্কুল প্রজেক্ট’ চালু করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০১-০৬ পর্বের ইউডিএফ সরকারের সময়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল যে কেরালার তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার সামগ্রিক দায়িত্ব মাইক্রোসফটের মত বাণিজ্য সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হবে। সেই সময়ের বিরোধী নেতা হিসেবে ভিএস গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টির বিবেচনা করেছিলেন। ফলে ২০০৬ সালে এলডিএফ যখন ক্ষমতায় ফিরে আসে, তখন সরকার দায়বদ্ধ ছিল গণশিক্ষার ক্ষেত্রে ফ্রি সফটওয়ার প্রয়োগে।

এলডিএফ-এর ২০০৭ সালের তথ্যপ্রযুক্তি নীতি কেরালার সামনে ফ্রি সফটওয়ারের দুনিয়াকে উন্মুক্ত করে। কেরালার গণশিক্ষা ব্যবস্থায় সার্বিকভাবে ফ্রি সফটওয়ারের দিকে স্থানান্তর ঘটে। তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার বদলে ছাত্ররা সমস্ত পাঠ্যবিষয় নির্বিশেষে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ শুরু করে। ২০০৮ নাগাদ বিএসএনএল-এর মাধ্যমে সমস্ত সরকারি ও সরকার পোষিত উচ্চ ও উচ্চতর বিদ্যালয়গুলিতে ব্রডব্যান্ড সংযোগ বিস্তৃত হয়। পরবর্তী পর্যায়ে প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলি ব্রডব্যান্ড সংযোগের আওতায় আসে পিনারাই বিজয়নের মুখ্যমন্ত্রীত্বে (২০১৬-২১) বাম গণতান্ত্রিক সরকারের সময়।

‘আইসিটি অ্যাট স্কুল’ নামের কেন্দ্রীয় কেন্দ্রীয় প্রকল্পে (৭৫ শতাংশ কেন্দ্র, ২৫ শতাংশ রাজ্য), ২০০৭-০৮ বর্ষে ১,০১৬টি বিদ্যালয়কে অর্থ অনুমোদন দেওয়া হয়। অগ্রগতির মূল্যায়নের পর আরো ৩,০৫৫ বিদ্যালয়কে যুক্ত করা হয়। সামগ্রিকভাবে পাঁচ বছরে ৪,০৭১টি বিদ্যালয়কে ২৭০ কোটি টাকা মূল্যের ল্যাপটপ, প্রজেক্টর, প্রিন্টার, ডিজিটাল ক্যামেরা, টিভি ও জেনারেটর দেওয়া হয়। ভাঙাচোরা কম্পিউটার সারাইয়ের জন্যে ছাত্রদের সহায়তায় হার্ডওয়ার ক্লিনিক স্থাপনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। ফ্রি সফটওয়ার কতটা ব্যবহার-বান্ধব, বা বাস্তবোচিত এ নিয়ে প্রকাশিত উদ্বেগের মধ্যেই ‘আইটি এট স্কুল’ এবং ‘কেরল শিক্ষা পরিকাঠামো ও প্রযুক্তি কর্মসূচি’ (কেআইটিই) শুধু এর কার্যকরিতাই নয়, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে রাজ্য সরকারের প্রায় ৩০০০ কোটি টাকা বাঁচিয়েছে। ইউনিসেফ কেরালার ডিজিটাল শিক্ষার নকশাটিকে, শুধু দক্ষিণ-বিশ্ব নয় উন্নত দেশ সহ, সারা পৃথিবীর জন্যে আদর্শ প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করেছে। ভিএস-এর নেতৃত্বাধীন এলডিএফ সরকার এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবেও ভিএস ছিলেন অনবদ্য। ১৯৫৮ সালে যখন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হচ্ছিল অমৃতসরে। সেই সময়েই দেবীকুলামে উপনির্বাচন হতে যাচ্ছে।। কেরালার ইএমএস সরকারের জন্যে এই নির্বাচন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পার্টির অনুরোধে, নির্বাচনী প্রচারে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বার্থে ভিএস সেই কংগ্রেসে গেলেন না। কংগ্রেসে অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তাঁকে জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত করা হয়। কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পার্টির প্রার্থীর সেই নির্বাচনে বিজয়ের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে প্রতিফলিত হয় কুশলী রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে ভিএস-এর সার্থকতা। আজকের সুবিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক ইলাইয়ারাজা ও তাঁর ভাই গাঙ্গাই আমারান বিপ্লবী সঙ্গীত নিয়ে এই প্রচারে শামিল হয়েছিলেন। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হল, ভিএস অনুধাবন করেছিলেন রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি সাংস্কৃতিক মাত্রা থাকা প্রয়োজন। 

এটা সকলেরই জানা যে কেরালার জীবনধারণের মান ভারতের অন্যান্য জায়গার চেয়ে উন্নত। এর নেপথ্যে ভূমিসংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বিভিন্ন সমীক্ষায় উল্লেখিত হয়েছে। ১৯৫৭ সালে ইএমএস সরকারের নেতৃত্বে ভূমিসংস্কার প্রক্রিয়ার সূচনার কথা সর্বজনবিদিত। কিন্তু উপেক্ষিত থেকে গেছে এই প্রক্রিয়ার বাস্তবায়নের পেছনে ভিএস-এর ভূমিকার কথা। ১৯৬৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ও তাদের সঙ্গীদের তৎপরতায় ইএমএস-এর নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় সরকার ভেঙে দেওয়ার পর সিপিআই(এম)-এর কৃষক সংগঠন ও কৃষি শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে ভূমিসংস্কারের বাস্তবায়নের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। কর্ষক সংঘম এবং কর্ষ থোঝিলালি ইউনিয়ন-এর আহ্বানে আরাবুকাড, আলাপ্পুঝায় জনগণকে সংগঠিত করা হয়। ভিএস-এর নেতৃত্বকারী ভূমিকায় হাজার হাজার প্রতিবাদী জনতা ১৯৬৯-র ১৩-১৪ ডিসেম্বর প্রতিবাদে শামিল হন।

ওই সময়ের সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক পি সুন্দরাইয়া, পলিটবুরো সদস্য কমরেড ইএমএস ও কমরেড একেজি এবং কৃষকসভা নেতা কমরেড হরেকৃষ্ণ কোঙার এই প্রতিবাদে যোগ দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি ভূমিসংস্কার আইনে স্বাক্ষরে অস্বীকৃতি জানানোর পর, কমরেড একেজি ঘোষণা করেন, জনগণই এই আইনের বাস্তবায়ন করবে। ভিএস-র নেতৃত্বে পরবর্তী সময়ের আন্দোলনে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক কেরালার সর্বত্র উদ্বৃত্ত জমির দখল নিয়ে লাল পতাকা পুঁতে দিয়ে নিজেদের স্বত্ব ঘোষণা করে। নারকেল গাছ বেয়ে ওঠা থেকে জনগণের স্বত্ব ঘোষণায় জনগণ পুলিশী বর্বরতা, সহিংস হামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবাসকে দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করে। কাভালোম শ্রীধরন, কাল্লিকাড নীলকানদান এবং ভার্গবী সহ ১৮ জন শহীদের মৃত্যু বরণ করেন। এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রায় ২৮ লক্ষ কৃষক এবং প্রায় ৫ লক্ষেরও বেশি ভূমিহারা পরিবার জমির মালিকানা লাভ করতে সমর্থ হয়। আরাভুকাডের প্রতিবাদী আন্দোলন বর্ণবাদী জমিদার-বিরোধী শতাব্দী প্রাচীন লড়াইয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে প্রতিভাত হয়। শোষিত ও নিপীড়িত জনগনের অধিকারের লড়াই ছিল ভিএস-র জীবনের লক্ষ্য।

একজন উল্লেখযোগ্য মুখ্যমন্ত্রী, একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় জননেতা এবং একজন সবচেয়ে অপ্রতিরোধ্য বিরোধী নেতা হিসেবে ভিএস স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। সেলাইকর্মী এবং কয়ার শ্রমিক থেকে সংগ্রামের সরণি বেয়ে তিনি সরকার ও আন্দোলনের উচ্চতম সোপানে উন্নীত হয়েছেন। সর্বঅর্থেই তিনি ছিলেন সংগ্রামের জীবন্ত প্রতীক। শ্রমিক আন্দোলনের প্রকৃত নেতা এই মানুষটি গতরখাটা শ্রমিকের স্তর থেকে পৌঁছে গেছেন একেবারে শীর্ষস্তরে। বিশ ও একুশ শতকের মধ্যে সেতু হয়ে থাকা অবিরাম সংগ্রাম ও প্রতিরোধের জীবন– এটাই ছিলেন ভিএস।

ভাষান্তর: শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার


প্রকাশের তারিখ: ২১-আগস্ট-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org