|
সাহিত্য ও রাজনীতিই এম এস নাম্বুদিরিপাদ |
সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া ধারণাসম্পন্ন ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক সাহিত্য-গোষ্ঠীভুক্ত নারী ও পুরুষেরা এই নূতন ভাবধারা দারুণভাবে অপছন্দ করত। সাহিত্যকে রাজনীতির অবাঞ্ছিত আবর্তে বিপথগামী করার দোষারোপ দিত তাঁরা প্রগতিশীল লেখকদের প্রতি,'শিল্পের জন্যই শিল্প'এই স্লোগান তুলে। 'সমাজের জন্য শিল্প' এই স্লোগান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রগতি লেখক সংঘকে কঠিন লড়াই করতে হয়েছিল। |
স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগতি ভারতীয় সাহিত্যের বিকাশে প্রচণ্ড অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। ভারতের প্রত্যেকটি ভাষা সৃষ্টি করেছিল, তাদের নিজস্ব জাতীয় কবি, ঔপন্যাসিক, সাহিত্য সমালোচক, প্রভৃতি। লেখকদের মধ্যে কেউ কেউ, স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় অংশীদার ছিলেন, আরো অনেকে সক্রিয় অংশীদার না হলেও, ছিলেন এর প্রতি অকুণ্ঠ সহানুভূতিশীল। এঁরা সকলেই অবশ্য, স্বাধীনতা আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নৈতিক সমর্থন ও উপদেশ আকাঙ্ক্ষা করত। স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও অন্যান্য সংগঠন সমূহের সর্বভারতীয়, প্রাদেশিক ও স্থানীয় সম্মেলনগুলির অংশ হিসাবে, সাহিত্যের উপর বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতো। এই কারণে, ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে স্বাধীনতা আন্দোলনে স্পষ্টভাবে বামপন্থী ও সমাজবাদের পক্ষে যে ঝোঁক সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রতিফলন সাহিত্যের ক্ষেত্রেও দেখা দিল। উল্লেখযোগ্য যে এই সময়েই বিশ্ব-রাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করছিল। বহু দেশপ্রেমিক ভারতীয়ের ধ্যান-ধারণা ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে প্রভাবিত করছিল। প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশে যে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটছিল, যদিও সেটাকে গণ্য করা হতো একটা ‘পরীক্ষা-মূলক’ ব্যাপার মাত্র— রুশীয় পরীক্ষা— তবুও ১৯২০-র দশকের প্রথমে যে ক্ষুদ্র কমিউনিষ্ট ও সোস্যালিস্ট গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছিল তারা ছাড়াও, জাতীয় কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন এর প্রতি। ধনতন্ত্রের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সংকটের সমকালীন, সোভিয়েত পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (১৯২৮-১৯৩৩) অপূর্ব সাফল্যে এই প্রক্রিয়া বহুগুণে জোরদার হলো। ফ্যাসিবাদের উদ্ভব শুধুমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজবাদী আন্দোলনের নয়, পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় ও স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত প্রত্যেকটি দেশের পক্ষে বিপদ স্বরূপ হয়ে দেখা দিল, আমাদের দেশে দ্রুত বিকাশমান বাম ও সমাজবাদী আন্দোলনে আরও শক্তি সঞ্চারিত করল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রের এই ঘটনা সাহিত্যের জগতেও প্রতিফলিত হল। বিগত পর্যায়ের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে, সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই নয়া প্রগতি ও সমাজবাদী আন্দোলন ব্যক্তিবিশেষ লেখকের এবং তাদের রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক ক্রিয়াকলাপের মধ্যেই শুধু সীমাবদ্ধ রইল না। ‘প্রগতি লেখক সংঘ’ নামে একটি বিশেষ সমিতির মধ্যে সংঘবদ্ধ হলো। সমিতি গঠনের ও কাজকর্মের প্রেরণা এসেছিল, প্রসারমান ফ্যাসিবাদের ঢেউ-এর বিরুদ্ধে দৃঢ় সংগ্রামের জন্য ম্যাক্সিম গোর্কি, অরি বারবুস প্রভৃতি বিশ্ববিখ্যাত ফ্যাসি-বিরোধী মনীষীদের উদাত্ত আহবানে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মুন্সী প্রেমচাঁদ, সরোজিনী নাইডু প্রমুখ ভারতের সাহিত্য জগতের খ্যাতনামা লোকদের আশীর্বাদ ছিল এর প্রতি। এই সমিতির সবচেয়ে সক্রিয় কর্মীরা এসেছিলেন, কমিউনিস্ট, কংগ্রেস, সোশ্যালিস্ট ও অন্যান্য প্রগতিবাদী রাজনীতিক দলের জঙ্গী রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্য থেকে। আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সঙ্গে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের খুঁটিগুলির বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য সাহিত্যকে অন্যতম মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করার ঘোষিত লক্ষ্য নিয়েই তাঁরা সমিতি গঠন করে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। লক্ষ লক্ষ খেটে যাওয়া মানুষের সঙ্গে নিবিড় হতে পারে এমন সাহিত্য সৃষ্টির চেষ্টাই তারা করছিলেন। এই সময়কার লেখকেরা, স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁদের অনতি-পূর্বসুরীদের সৃষ্ট ধারাই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের মতোই, এঁরা প্রত্যেকটি ভারতীয় ভাষা ও তার সাহিত্যের সংস্কার সাধন, আধুনিকীকরণ ও উন্নতিসাধনের প্রক্রিয়ায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অবশ্য, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কাজকর্ম কোন পথে চালিত হবে, সে বিষয় পূর্বসূরীদের চেয়ে এঁদের ধারণা ছিল অনেক স্পষ্ট। তাঁরা ছিলেন এমন একটা আদর্শে বিশ্বাসী, যা শুরু ও শেষ হয়নি, বিদেশী শাসনের অপসারণের মধ্যেই বরং আরও এগিয়ে গিয়ে স্বাধীন ভারতে নূতন সমাজবাদী সমাজ গড়ে তোলার একটা ইতিবাচক চিত্র এঁকেছিল। স্বাভাবিকভাবে নূতন ভারতের এই চিত্র রূপায়িত ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক সামাজিক-অর্থনীতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির আদর্শে। সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া ধারণাসম্পন্ন ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক সাহিত্য-গোষ্ঠীভুক্ত নারী ও পুরুষেরা এই নূতন ভাবধারা দারুণভাবে অপছন্দ করত। সাহিত্যকে রাজনীতির ‘অবাঞ্ছিত’ আবর্তে বিপথগামী করার দোষারোপ দিত তাঁরা প্রগতিশীল লেখকদের প্রতি, ‘শিল্পের জন্যই শিল্প’ এই স্লোগান তুলে। ‘সমাজের জন্য শিল্প’ এই স্লোগান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রগতি লেখক সংঘকে কঠিন লড়াই করতে হয়েছিল। সাহিত্যকে রাজনৈতিক লড়াই এর মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করার ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে অসহিঞ্চুতা-পরায়ণ সাহিত্য-জগতের অতি রক্ষণশীল নেতাদের আক্রমণ থেকে, বহু খ্যাতনামা নরনারীর আশীর্বাদ ও নৈতিক সমর্থনপুষ্ট প্রগতি লেখক সংঘকে রক্ষা করা যায়নি। ক্রমে ক্রমে, এই ভাবধারা বহুল পরিমাণে সমর্থন পেয়েছিল। প্রগতি লেখক সংঘ এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের অন্যান্য সংগঠন ও আন্দোলন, যেমন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ এবং বিভিন্ন ভারতীয় ভাষাভাষী সাংস্কৃতিক দলগুলি শক্তিশালী আন্দোলন হিসাবে, শুধুমাত্র সাহিত্য জগতের অতি রুচিবানদের মধ্যেই নয়, ব্যাপক জনসাধারণের মধ্যেও প্রভাব বিস্তার করেছিল। আপেক্ষিকভাবে এই অবস্থা ছিল স্বল্পসময়ের জন্য। প্রগতি লেখক সংঘ গঠনের এক যুগের মধ্যে দেশে একটা বিরাট রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে গেল। ১৯৪৭ সালের ক্ষমতা হস্তান্তরের কথাই উল্লেখ করছি। স্বাধীনতা আন্দোলনে তখনকার প্রগতিশীল লেখকদের মধ্যে এতদিন যে ঐক্য বিরাজমান ছিল তাতে প্রচণ্ড একটা আঘাত এল। ক্ষমতা হস্তান্তরের মর্ম নিয়ে, ভারতের জনসাধারণ যে রাজনীতিক ক্ষমতা দখল করল তার বাস্তবতা ও ব্যাপকতা নিয়ে এবং অগ্রগমনের পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিল। স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী অন্যান্যদের থেকে নূতন রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিটি বিষয়ে কমিউনিস্টরা তাদের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিপ্রসূত নিজেদের আলাদা করে নিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে এবং প্রগতি লেখক সংঘতে সহযোগীদের সঙ্গে তাদের দ্বিমত ঘটল। যে তীব্র বিতর্ক শুরু হলো, তাতে প্রগতি লেখক সংঘ, কমিউনিস্ট ও অ-কমিউনিস্ট এই সাধারণ অংশে বিভক্ত হয়ে গেল। বলা হলো, কমিউনিস্টরা ‘একটা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন বিভক্ত করছে’, তাদের মতবাদ অন্যের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে, ‘মস্কো থেকে নির্দেশ নিচ্ছে’ ইত্যাদি। কমিউনিস্ট অংশ অ-কমিউনিস্টদের অভিযুক্ত করল তারা ‘নয়া শাসকদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে’, ‘সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করছে’ ইত্যাদি। সুতরাং ১৯৪৭ সালের ক্ষমতা হস্তান্তরের কয়েক বছরের মধ্যে প্রগতি লেখক সংঘের ( আইপিটিএ-র মতো সহযোগী সংগঠন ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠন সহ) বেঁচে থাকা অসম্ভব হলো। এই প্রবন্ধের লেখক প্রগতি লেখক সংঘের সর্বভারতীয় সংগঠনে না থেকেও কেরালা শাখার মধ্যে এইসব বিতর্কে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল। কমিউনিস্ট অংশের সদস্য হিসাবে, যে তীব্র বিতর্ক চলেছিল তাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল। যুক্তি ও প্রতিযুক্তি, অভিযোগ ও প্রত্যাভিযোগ কেরালায় যেভাবে আারোপিত হয়েছিল, দেশের অন্যত্র হয়তো ঠিক সেইভাবে হয়নি। তবে, কেরালায় বিবাদের বিষয়বস্তু এবং সংঘর্ষের ধারা সন্দেহাতীতভাবে সর্বভারতীয় বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছিল। এই কারণে, বিতর্কের প্রধান প্রধান বিষয়গুলি সম্পর্কে সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনামূলক পরীক্ষার এবং বিতর্কের মৌল বিষয়ে একটা বাস্তবানুগ মূল্যায়নের চেষ্টার প্রস্তাব এই প্রবন্ধে করা হচ্ছে। প্রথমেই আমরা স্পষ্ট করে রাখতে চাই যে, প্রগতি লেখক সংঘতে ভাঙনের জন্য কমিউনিস্টরা দায়ী ও শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে সর্বজনবিদিত ঝানব থিসিসের প্রভাবে অ-কমিউনিস্ট লেখকদের প্রতি কমিউনিস্ট অংশের ‘অত্যন্ত সংকীর্ণ’ মনোভাবের সৃষ্টি, সংশোধনবাদীদের এই দৃষ্টিভঙ্গি আমরা পোষণ করি না। যদিও সন্দেহ নেই যে কমিউনিস্ট অংশ ভুলত্রুটি করেছে, কিন্তু সেটা ঘটেছে একটা সংগ্রামের মধ্যে যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। অ-কমিউনিস্ট লেখকরা অন্যান্য অ-কমিউনিস্টদের অনুসরণ করে, ১৯৪৭ সালে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটল তার মর্মবস্তু সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত মূল্যায়ন করল। ১৯৪৭ সালে অর্জিত মুক্তি ও স্বাধীনতার শ্রেনি চরিত্র উন্মোচন করতে তারা অপারগ হলো। কমিউনিস্টদের সঙ্গে একত্রে প্রগতি লেখক সংঘ সংগঠিত করার সময় তাঁরা যে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী প্রকৃত গণতান্ত্রিক ধারণা গ্রহণ করেছিল, তাদের এই মতামতে কার্যত তা নাকচ হয়ে গেল। কমিউনিস্ট এবং অন্যান্যদের মধ্যে আদর্শের সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠল। এই সংগ্রামে যুক্ত হওয়া সঠিক সঙ্গত হয়েছিল, জঙ্গী সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা ও প্রলেতারীয় সমাজবাদের পতাকা উর্ধ্বে তুলে ধরা কমিউনিস্টদের পক্ষে অত্যন্ত সঠিক হয়েছিল। অনিবার্য ও প্রয়োজনীয় আদর্শগত এই সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে কমিউনিস্টরা সংকীর্ণতাবাদী চরিত্রের ভুল করেছিল। মোটামুটি এই ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে কেরালায় লেখকদের মধ্যে অধুনা গভীর আলোচনার উদ্ভব হয়েছে, সামাজিক অগ্রগমনে সাহিত্যের ভূমিকা, রাজনীতির সঙ্গে এর সম্পর্ক, শ্রমজীবী মানুষের শ্রেনি আন্দোলন সৃষ্টির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে সাহিত্যকে বোঝার ও সৃষ্টি করার জন্য কমিউনিস্টদের আদর্শগত ও তত্ত্বগত ভিত্তি, প্রভৃতি। এই পর্যায়েও আমরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি। প্রকাশের তারিখ: ০১-নভেম্বর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |