যুদ্ধের বিরুদ্ধে উত্তাল লন্ডন : আন্দোলনের কেন্দ্রে বামপন্থীরা

অর্ক ভাদুড়ি
প্যালেস্টাইনে ইজরায়েলের গণহত্যার পক্ষে একযোগে দাঁড়িয়েছে গোটা ব্রিটিশ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ঋষি সুনক থেকে কের স্টামার- সকলে। অন্যদিকে প্যালেস্টাইনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ব্রিটিশ শ্রমিক, অভিবাসী, বামপন্থী, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট, যুদ্ধ বিরোধী অ্যাক্টিভিস্টরা। গত দু'মাসে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন জেরেমি করবিন সহ বামপন্থীরা। প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে কমিউনিস্ট পার্টি সহ প্রগতিশীল শক্তিগুলি। বস্তুত চলমান আন্দোলনের মস্তিষ্ক হিসাবে কাজ করছে এই বামপন্থী কোর (core)। কীভাবে আন্দোলন চলবে, কর্মসূচি কী নেওয়া হবে- সবকিছুতেই এই অংশটির ভূমিকা বিরাট।

গাজায় ইজরায়েলের নৃশংস গণহত্যা শুরু হওয়ার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেন ফিরে গিয়েছে তার দু'দশক আগের যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহ্যে। প্রায় প্রতি শনিবার লন্ডনের রাস্তায় মিছিল করছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। তাঁরা দাবি তুলছেন স্থায়ী যুদ্ধবিরতির৷ দাবি তুলছেন প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতার৷ প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেনের কর্ণধার বেন জামাল বলছিলেন, "ইরাক ও আফগানিস্তানের ন্যাটোর সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে উত্তাল হয়েছিল লন্ডন। রাজপথে তৈরি হয়েছিল জনজোয়ার। ইজরায়েলের চলমান গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঢেউ সেই স্মৃতিকেই ফিরিয়ে আনছে।"

লন্ডনের জায়নবাদ এবং যুদ্ধবিরোধী এই আন্দোলন ইতিমধ্যেই আর্ন্তজাতিক মিডিয়ায় বিপুলভাবে আলোচিত হয়েছে। বস্তুত, মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া চলমান যুদ্ধের বিরুদ্ধে লাগাতার এত বড় আকারের জনসমাবেশ লন্ডন ছাড়া আর কোথাও হচ্ছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও লক্ষাধিক মানুষ পথে নামছেন৷ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ ও দমন-পীড়ন মোকাবিলা করে বড় আকারের প্রতিবাদ হচ্ছে। কিন্তু জমায়েতের আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে আগে থাকছে লন্ডন। প্রথম যুদ্ধবিরোধী মিছিল, যেটি প্রায় বিনা প্রস্তুতিতে সংগঠিত হয়েছিল, তাতেই অংশ নিয়েছিলেন দেড় লক্ষ মানুষ। দ্বিতীয় মিছিলে তিন লক্ষ, তৃতীয় মিছিলে পাঁচ লক্ষ, চতুর্থ মিছিলে আট লক্ষ মানুষ পথ হেঁটেছেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতপুষ্ট ইজরায়েলের গণহত্যার বিরুদ্ধে। যুদ্ধবিরতি চলাকালীন আরও একটি মিছিলে হেঁটেছেন তিন লক্ষাধিক মানুষ। এই বিরাট যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন নিয়ে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু যে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে না তা হল, এই আন্দোলনের একদম কেন্দ্রে অবস্থান করছেন বামপন্থী এবং কমিউনিস্টরা। সব সময় ঠিক লাল পতাকা হাতে নিয়েই যে তাঁরা থাকছেন, তা নয়। থাকছেন ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে, যুদ্ধবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে, কাজ করছেন আন্দোলনের কোর হিসাবে।

রাস্তার আন্দোলনের অভিঘাত পড়ছে ব্রিটিশ রাজনীতিতেও। ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির কাছ থেকে যুদ্ধবিরোধী জনতার কোনও প্রত্যাশা নেই। ঋষি সুনকের দল প্রত্যাশিতভাবেই ইজরায়েলের গণহত্যার পক্ষে। কিন্তু ঘটনা হল, প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা কের স্টামারও জায়নবাদীদের পক্ষ নিয়েছেন। কিন্তু ব্রিটেনের মুসলিমদের বিরাট অংশই লেবার পার্টির কমিটেড ভোটার৷ যে সব আসনে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি, সেগুলি সাধারণত লেবার পার্টির সেফ সিট হিসাবেই ধরা হয়৷ স্টামারের ইজরায়েলপন্থী অবস্থানে লেবারের মধ্যে থাকা মুসলিম, বামপন্থী এবং জায়নবাদবিরোধী ইহুদি অংশটি প্রবল ক্ষুব্ধ। ইতিমধ্যেই স্টামারের অবস্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তাঁর শ্যাডো ক্যাবিনেটের অন্তত ১০ জন সদস্য। ৫৬ জন লেবার সাংসদ দলীয় নেতার অবস্থানের বিরোধিতা করে ভোট দিয়েছেন সিজফায়ারের পক্ষে। স্টামারের অবস্থানের বিরোধিতায় পদত্যাগ করেছেন অসংখ্য লেবার কাউন্সিলর। তাঁদের অনেকে শামিল হচ্ছেন যুদ্ধবিরোধী মিছিলে। মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল লিবারেল ডেমোক্র্যাট, যারা 'লিব ডেম' নামে পরিচিত, তাঁদের সমর্থকরাও বড় সংখ্যায় অংশ নিচ্ছেন যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে। এমনকী টোরি সাংসদের মধ্যেও কয়েকজন সিজফায়ারের দাবিতে সরব হয়েছেন। 

উল্লেখ করা ভাল যে, লেবার পার্টির সঙ্গে ব্রিটেনের বামপন্থীদের সম্পর্কটি একমাত্রিক নয়৷ বামপন্থীদের একটি অংশ লেবার পার্টির মধ্যে থেকে কাজ করার পক্ষপাতী। আবার অন্য একটি অংশ মনে করেন, লেবার সম্পূর্ণভাবেই দক্ষিণপন্থীদের হাতে চলে গিয়েছে। এই অবস্থায় লেবার পার্টির মধ্যে থেকে কাজ করার অর্থ অহেতুক শক্তিক্ষয়৷ ব্রিটেনের সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখলে দুই পক্ষের যুক্তির মধ্যেই কিছু সারবত্তা খুঁজে পাওয়া যায়।

২০১৫ সালে যখন জেরেমি করবিন লেবার পার্টির নেতৃত্বে এলেন, তখন ব্রিটিশ রাষ্ট্রের প্রভাবশালী অংশটি আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল। করবিনের উত্থানে তাঁরা খুঁজে পেয়েছিলেন বামপন্থার ভূত। কনজারভেটিভ পার্টি সহ যাবতীয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি তো বটেই, লেবার পার্টির মধ্যে থাকা দক্ষিণপন্থীরাও এই মর্মে চিলচিৎকার জুড়ে দিয়েছিলেন যে, করবিনের পিছনে আছেন কমিউনিস্টরা। কথাটা যে খুব ভুল, এমনটাও বলা যায় না৷ জেরেমি করবিন কমিউনিস্ট নন৷ তাঁর নিজের কথায় বলতে গেলে, তিনি ততখানি মার্কস পড়েননি, যাতে মার্কসবাদী হওয়া যায়। কিন্তু কার্ল মার্কস যে একজন অসাধারণ দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ, একজন দুর্দান্ত শিক্ষক, তা নিয়ে তাঁর কোনও সংশয় নেই। বুঝতে অসুবিধা হয় না, প্রতিক্রিয়াশীলতার সাবেক সদর দফতর লন্ডনে মেইনস্ট্রিম রাজনীতি করতে করবিনের মতো মানুষের এমন অবস্থান নেওয়াটা জরুরি। করবিনের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের মধ্যেই অনেকেই ছিলেন কট্টর কমিউনিস্ট। যেমন অ্যান্ড্রু মারে। ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সারির নেতা, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ এই ভদ্রলোক ছিলেন করবিনের অন্যতম স্ট্র্যাটেজিস্ট। ব্রিটিশ মিডিয়া করবিনকে প্রশ্ন করেছিল, এমন একজন কমিউনিস্ট কেন তাঁর টিমে থাকবেন? করবিন উত্তর দিয়েছিলেন, তিনি যতদূর জানেন অ্যান্ড্রু মারে এখন একজন গণতান্ত্রিক সমাজবাদী, যিনি আগে কমিউনিস্ট পার্টি করলেও এখন লেবার পার্টিই করেন।

২০১৫ থেকে ২০২০ পর্যন্ত কালপর্ব ব্রিটেনের বামপন্থীদের কাছে তুলনামূলকভাবে সুখের সময় ছিল। লেবার পার্টির নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করবিনকে কেন্দ্র করে বামপন্থীরা নিজেদের মতপার্থক্য খানিকটা দূরে সরিয়ে রেখেই ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে ছিলেন। ২০১৭ এবং ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি প্রার্থী না দিয়ে করবিনের নেতৃত্বাধীন লেবারকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু দুটি নির্বাচনেই লেবার পার্টি পরাজিত হয়। স্বাভাবিক। কারণ করবিন-সহ বামপন্থীদের লড়তে হয়েছিল ঘরে-বাইরে একসঙ্গে। একদিকে টোরিদের বিরুদ্ধে লড়াই, অন্যদিকে লেবারের মধ্যেকার দক্ষিণপন্থী ও ব্লেয়ারাইটদের (যুদ্ধবাজ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের অনুগামীরা) বিরুদ্ধে লড়াই। দ্বিতীয় নির্বাচনী পরাজয়ের পর লেবারের নেতৃত্ব থেকে করবিনকে সরাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন দক্ষিণপন্থীরা৷ তাঁরা সফল হন। এরপর চেষ্টা শুরু হয় করবিনকে লেবার পার্টি থেকেই ছুঁড়ে ফেলার। দীর্ঘদিন ধরে প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করে চলা জেরেমির বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠা প্রো-ইজরায়েল লবি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপের রাজনীতি যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরাই জানেন এই জায়নবাদী লবির ক্ষমতা কতখানি। করবিনের বিরুদ্ধে ওঠে অ্যান্টি সেমেটিজমের অভিযোগ। ৪০ বছর ধরে টানা ইসলিংটন নর্থের লেবার পার্টির সাংসদ করবিনের বিরুদ্ধে নতুন লেবার নেতা স্টামার ফতোয়া জারি করেন, জেরেমি আগামীতে আর লেবারের প্রার্থী হিসাবে ভোটে দাঁড়াতে পারবেন না।

করবিন বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় লেবারের সর্বস্তর থেকে বামপন্থীদের সরানো অথবা কোণঠাসা করা৷ লেবার পার্টির মধ্যে 'লেফট' হিসাবে পরিচিত সাংসদরা গত তিন বছর ধরে অনেকটাই কোণঠাসা। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের নেতারাও আপাতত খুব সুবিধা করতে পারছেন না স্টামারের আমলে। সব মিলিয়েই গত তিনটি বছর ব্রিটেনের মেইনস্ট্রিম  বামপন্থীদের জন্য খুব সুখের সময় ছিল না৷ স্টামার যেন অনেকটাই ব্লেয়ারের মতো হয়ে উঠতো চাইছেন। লেবার পার্টির অভিমুখ প্রাণপণে ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন ডানপন্থার দিকে। আপাতত লেবারের মধ্যেও তিনি যে খুব অসুবিধাজনক অবস্থানে আছেন, তা-ও নয়। এমনিতেই টোরিদের বিরুদ্ধে জনগণের বিরক্তি প্রবল। স্টামারকেই ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মনে করছে ব্রিটিশ মিডিয়া থেকে শুরু করে আমজনতা। ফলে লেবারের মধ্যে থাকা বামপন্থীদের জন্য সময়টা বেশ চ্যালেঞ্জিং।

এই খানিক হতাশাজনক ছবিটাই বদলে যাচ্ছে রাজপথের জনপ্লাবনে। প্যালেস্টাইনে ইজরায়েলের গণহত্যার পক্ষে একযোগে দাঁড়িয়েছে গোটা ব্রিটিশ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ঋষি সুনক থেকে কের স্টামার- সকলে। অন্যদিকে প্যালেস্টাইনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ব্রিটিশ শ্রমিক, অভিবাসী, বামপন্থী, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট, যুদ্ধ বিরোধী অ্যাক্টিভিস্টরা। গত দু'মাসে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন জেরেমি করবিন সহ বামপন্থীরা। প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে কমিউনিস্ট পার্টি সহ প্রগতিশীল শক্তিগুলি। বস্তুত চলমান আন্দোলনের মস্তিষ্ক হিসাবে কাজ করছে এই বামপন্থী কোর (core)। কীভাবে আন্দোলন চলবে, কর্মসূচি কী নেওয়া হবে- সবকিছুতেই এই অংশটির ভূমিকা বিরাট। কেবল লন্ডনেই নয়, গোটা ব্রিটেন জুড়ে অসংখ্য ছোট-বড় কর্মসূচি চলছে প্রতিদিন। সেখানে প্রচারপত্র হাতে উপস্থিত হচ্ছেন বামপন্থীরা। চেষ্টা করছেন যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করার। লন্ডনে প্রতিটি বড় মিছিলে বিক্রি হচ্ছে হাজার হাজার কপি বামপন্থী পত্রিকা। ‘মর্নিং স্টার’-এর মতো বামপন্থী দৈনিক ফেরি করছেন ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীরা। 

সব মিলিয়ে বলা যায়, ব্রিটিশ বামপন্থার গাঙে নতুন জোয়ার এসেছে গত দুই মাসে। মিছিলগুলি হয়ে উঠছে বর্ণময়। প্রকৃত অর্থেই জনতার উৎসব। কত রকমের মানুষ যে হাঁটছেন মিছিলে! নানা দেশ থেকে আসা অভিবাসীরা পা মেলাচ্ছেন। বিভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকা হাতে হাঁটছেন তাঁরা। প্রতিটি মিছিলেই চোখে পড়ছে সমাজতান্ত্রিক কিউবা এবং ভিয়েতনামের পতাকা উড়ছে প্যালেস্টাইনের পতাকার সঙ্গেই। উড়ছে ভেনোজুয়েলা, ব্রাজিল এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতাকা। আর্ন্তজাতিক সংহতির নিশান উড়িয়ে হাঁটছেন ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ ট্রেড ইউনিয়নসের প্রতিনিধিরা। হাঁটছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট এবং ওয়ার্কাস পার্টির কমরেডরা। ইরানের মতো যে দেশগুলিতে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ, সে সব দেশের কমিউনিস্টরা লন্ডনকে ভিত্তি করে সাংগঠনিক কাজকর্ম করেন। তাঁরা দলে দলে মিছিলে যোগ দিচ্ছেন। আসছেন কুর্দিস্তানের ওয়ার্কাস পার্টির কমরেডরা। লেবান, সুদান, ইরাকের কমিউনিস্ট পার্টির কমরেডদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে দেখি উড়ছে তুদে পার্টির পতাকা। প্যালেস্টাইন পিপলস পার্টির পতাকার পাশেই ইরানের শিয়াখাল গেরিলাদের উত্তরসূরিদের নিশান। লাল পতাকা হাতে রয়েছেন প্যালেস্টাইনের কমিউনিস্ট গেরিলাবাহিনী পিএফএলপি-র প্রবাসী সদস্যরা। তাঁরা বলেন, নর্থ গাজা এবং ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের বিস্তীর্ণ এলাকায় কেমন করে গড়ে উঠছে প্রতিরোধ, কমিউনিস্ট গেরিলাদের নেতৃত্বে। মিছিলে আসেন অসংখ্য ট্রেড ইউনিয়নের কর্মীরা। ব্রিটেনের নৌ-পথ, রেল ও সড়ক পরিবহনের সবচেয়ে শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন আরএমটি-র সদস্যরা থাকছেন বিরাট সংখ্যায়। তাঁদের নেতৃত্বে কমরেড অ্যালেক্স গর্ডন, যিনি কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অংশ। অ্যালেক্স এক আশ্চর্য ঝলমলে মানুষ, ভারতীয় কাউকে দেখলেই একগাল হেসে বলেন 'লাল সালাম'। আসছেন লেবানিজ কমিউনিস্টরা। তাঁদের দেশের জায়নবাদবিরোধী প্রধান প্রতিরোধী সংগঠনটির সঙ্গে সাময়িক ঐক্য গড়ে তুলেছেন তাঁরা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার প্রয়োজনে। সেই প্রয়োজনীয়, কিন্তু অস্বস্তিকর ঐক্যের কথা বলেন তাঁরা।

দল বেঁধে আসছেন আফ্রিকার বামপন্থীরা। দক্ষিণ আফ্রিকার কমিউনিস্ট পার্টির কমরেডরা যেমন থাকছেন, ঠিক তেমনই থাকছেন মার্কসবাদী লেনিনবাদী দল ইএফএফ-এর কমরেডরা। আসছেন কেনিয়া, মালি, জিম্বাবুয়ের মহিলারা। তাঁদের হাতে ব্যানার- বর্ণবাদ বিরোধী রঙিন মহিলাদের ঐক্য। উপস্থিত থাকছেন ইহুদিরা। তাঁদের লম্বা কালো টুপি, বিনুনি করা চুল, কালো কোট৷ হাতে ব্যানার, 'নট ইন আওয়ার নেম'। আসছেন জিউস ভয়েস ফর লেবার, জিউস ফর প্যালেস্টাইনের সদস্যরা, জায়নবাদবিরোধী ইহুদিদের আর্ন্তজাতিক নেটওয়ার্কের ব্রিটিশ চ্যাপ্টারের সদস্যরা। ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির কমরেডদের পাশাপাশি স্তালিনের ছবি হাতে হাঁটছেন কমিউনিস্ট পার্টি অফ গ্রেট ব্রিটেনের (মার্কসবাদী লেনিনবাদী) সদস্যরা। সব মতভেদ সরিয়ে রেখে তাঁদের পাশেই হাঁটছেন সোস্যালিস্ট পার্টি, সোস্যালিস্ট ওয়ার্কাস পার্টি, ইন্টারন্যাশনাল মার্কসিস্ট টেন্ডেন্সির কর্মীরা - পলেমিক যেমন আছে, বিতর্ক যেমন থাকবেই, ঠিক তেমনই গণহত্যার বিরুদ্ধে সার্বিক ঐক্য গড়ে তোলাও যে খুব জরুরি।

রাস্কিন হাউজে কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে গিয়ে কথা হচ্ছিল লেবাননের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা নাদের আওয়াদের সঙ্গে। তিনি লন্ডনের পরিবহন শ্রমিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। সদ্য বেইরুট থেকে লন্ডনে ফিরেছেন নাদের। তিনি বলছিলেন, এই যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। ব্রিটেনের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে এই আন্দোলন। করবিন অবশ্য ঠিক এভাবে ভাবছেন না৷ ইসলিংটন নর্থের একটি যুদ্ধ বিরোধী সভায় দেখা হল ব্রিটেনের বামপন্থীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির সঙ্গে। ভারতের কৃষক আন্দোলন নিয়ে উচ্ছ্বসিত বৃদ্ধ বললেন, "হয়তো এই আন্দোলন ব্রিটেনের বামপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি করবে৷ আবার নাও করতে পারে। তাতে কিছু যায় আসে না৷ হাজার হাজার শিশু খুন হচ্ছে গাজায়। এথনিক ক্লিনজিং চলছে। এর বিরুদ্ধে কথা বলা প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। ফলাফল আমাদের পক্ষে যাক বা বিপক্ষে, নিজের কাছে সৎ থাকতে হলে গণহত্যার বিরোধিতা করতেই হবে।"

লন্ডনে প্রতি শনিবারের মিছিল জুড়ে থাকে মার্কস, ম্যান্ডেলা, থমাস শংকরা, আলেন্দে, ভিক্টর হারা, শাভেজ, চে, প্যাট্রিক লুলুম্বার ছবি। প্রতিবাদের কার্নিভালে অনেক রং। একটি রঙের গায়ে অন্যটি মিশে যায়। আলাদা করা যায় না। লাল কাপড়ের বুকে আঁকা কাস্তে হাতুড়িটি থাকে সেই প্রতিবাদী রামধনুর কেন্দ্রে - থাকে সাম্রাজ্যবিরোধিতার প্রতি তার চিরন্তন দায়বদ্ধতা নিয়ে।

 

 


প্রকাশের তারিখ: ০৭-ডিসেম্বর-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org