লোরকার স্মৃতি

পাবলো নেরুদা
এবছর ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার জন্মের ১২৫ বছর। স্পেনে ফ্র্যাঙ্কোর জমানায় তাঁকে হত্যা করা করা হয়। এখনও পর্যন্ত তাঁর দেহ নিখোঁজ। এবছর পাবলো নেরুদার হত্যার ৫০ বছর। লোরকার মৃত্যুর পর নেরুদা লিখেছিলেন, ‘স্পেনের সেরা ফুলটি ঝরে গেল।’ নেরুদার কলমে ‘লোরকার স্মৃতি’।

১৯৩২ সালে চিলিতে ফিরলাম। আমার ‘প্রদীপ্ত শিকারী' আর 'মর্ত্যের অধিবাসী' বই দু'খানি প্রকাশিত হলো।

১৯৩৬ সালে ব্যুয়েনস্ এয়ার্সে বাণিজ্যদূত নিযুক্ত হলাম এবং অগাস্টে সেখানে পৌঁছলাম।

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা প্রায় সেই সময়ই সেখানে এলেন তাঁর 'বিবাহ-শোণিতের' নাটকটির অভিনয় দেখার জন্য। লোলামেমব্রিভর দল নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিলেন। এখানেই আলাপ হল ফেদেরিকোর সঙ্গে আমার। বন্ধু-বান্ধব আর সাহিত্যিকরা প্রায়ই আমাদের দু'জনকে তাঁদের খানাপিনার আড্ডায় আমন্ত্রণ জানাতেন। অবশ্য আমাদের দু'জনের নিন্দুকেরও অভাব ছিল না। নিন্দুকেরা সব সময়েই চেষ্টা করতেন লোরকার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বে ফাটল ধরাতে। সেবার পি.ই.এন. ক্লাব প্লাজা হোটেলে আমাদের জন্য এক ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন। এবং সারাদিন ধরে টেলিফোনে কে বা কারা আমাদের দু'জনকে ওই ভোজসভা বাতিল হয়েছে বলে জানাতে লাগলেন। তাঁরা প্লাজা হোটেলের ম্যানেজারকেও বারবার ফোন করে বলে দিয়েছিলেন যে, আমাদের জন্য যেন কোনও টেবিল সংরক্ষণ করে রাখা না হয়। তাঁদের সেই চেষ্টাকে ব্যর্থ করে প্রায় শতেকখানেক আর্জেন্টাইন কবি আর কথাশিল্পীর সঙ্গে ফেদেরিকোকে নিয়ে সেই ভোজসভায় হাজির হয়েছিলাম। আমরা দু'জনে সেই ভোজসভার জন্য একটি বক্তৃতা রচনা করেছিলাম, নাম দিয়েছিলাম 'অ্যাল্ অ্যালিম্যোঁন'। আপনাদের মতো আমিও এর মানে বুঝিনি। কিন্তু ফেদেরিকোর মাথায় সব সময়ই চমকপ্রদ সব কল্পনা ঘোরাফেরা করত। উনি আমাকে বুঝিয়েছিলেন – যখন দু'জন বুল-ফাইটার একসাথে একটা উত্তেজিত ষাঁড়ের সঙ্গে লড়াই করে, সম্ভবত দুই সহোদর অথবা এঁদের থাকে রক্তের নিবিড় সম্বন্ধ, তখন এই বুল-ফাইটিংকে বলা হয় অ্যাল্ অ্যালিম্যোঁন। ভোজসভায় পাঠ করার জন্য তাই এই বক্তৃতা তৈরি করা হলো।

সে রাতের সেই ভোজসভায় তাই করেছিলাম। আমাদের এই পরিকল্পনা আমরা দু'জন ছাড়া আর কারোর জানা ছিল না। ভোজ শেষে পি. ই. এন. ক্লাবের সভাপতিকে ধন্যবাদ জানাতে আমরা একসঙ্গে উঠে দাঁড়ালাম এবং বুল-ফাইটারদের মতোই বক্তৃতা শুরু করলাম আমরা একই সঙ্গে।

আমাদের দু'জনকে একসঙ্গে উঠে দাঁড়াতে দেখে প্রথমে সকলে একটু অবাক হয়েছিলেন এবং টেবিলের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ফেদেরিকোর জামা ধরে টেনে অনেকে তাঁকে বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন, আর অন্য প্রান্তে সে চেষ্টা আমার ওপর দিয়েও হয়েছিল। কিন্তু ওই টানাটানিকে কোনও আমল না দিয়েই আমরা শুরু করে দিলাম বক্তৃতা। ফেদেরিকো বললেন– ভদ্রমহোদয়গণ, সঙ্গে সঙ্গে আমি বললাম– ভদ্রমহিলারা। —এইভাবেই উভয়েই আমরা কথার পর কথার রেশ ধরে বক্তৃতা দিতে লাগলাম। উপস্থিত সকলেই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তন্ময় হয়ে আমাদের বক্তৃতা শুনতে লাগলেন। বক্তৃতার শেষে মনে হলো, আমরা একসঙ্গে একই সুরে কোনও গান গাইলাম। বক্তৃতার বিষয় ছিল: স্প্যানিশ কবি রুবেনদারিও। কবি রুবেনদারিও স্প্যানিশ সাহিত্যের অন্যতম সৃজনধর্মী সাহিত্যিক। অন্তত আমাদের দু'জনের মত হচ্ছে তাই। আমাদের বক্তৃতাটি ছিল এইরকম :

নেরুদা – ভদ্রমহিলারা –

লোরকা – ভদ্রমহোদয়গণ, বুল ফাইটিংয়ে একটি লড়াই আছে যার নাম হল 'বুল-ফাইটিং অ্যাল্ অ্যালিম্যোঁন'। এই ফাইটে অর্থাৎ লড়াইয়ে দু'জন ম্যাটাডোর একটা লাল কম্বল হাতে নিয়ে একটি উত্তেজিত ষাঁড়ের সঙ্গে লড়াই করে ষাঁড়টিকে পরাস্ত করেন-

নেরুদা — একটি বৈদ্যুতিক প্রবাহের মধ্যে আবদ্ধ আমি আর ফেদেরিকো দু'জনে একসঙ্গে এই সম্মানের জন্য আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

লোরকা – এরকম একটা সভায় এটাই নিয়ম যে, কবি তাঁর নিজের ভাষায় কথা বলবেন – সে ভাষাতে রুপোলি চমক বা কাঠের কাঠিন্য যাই থাকুক না কেন, সেই ভাষাতেই তিনি তাঁর সঙ্গী-সাথীদের প্রীতি-সম্ভাষণ জানাবেন ।

নেরুদা – আজ আমরা একজন মৃত ব্যক্তিকে আপনাদের সঙ্গী হিসাবে আপনাদের মাঝখানে উপস্থিত করছি। যে উজ্জ্বল জীবন এক জমকালো মুহূর্তে তাঁর পত্নী ছিলেন, সেই জীবনের কাছে তিনি আজ এক মৃতদার পুরুষ। অনেক মৃত্যুর মধ্যে একটি মৃত্যু এসে তাঁকে সরিয়ে নিয়েছিল অন্ধকারের গোপনতায়। আমরা তাঁর প্রজ্জ্বলিত ছায়ার মধ্যে দাঁড়াব – তাঁর নাম ধরে তাঁকে ডাকব– যতক্ষণ না ওই শূন্যতার মধ্যে থেকে তাঁর শক্তি লাফিয়ে এসে আমাদের সামনে হাজির হয়।

লোরকা – প্রথমে আমরা একটি পেঙ্গুইন পাখির মতোই নরম আর দরদী সাঙ্কেতিক আলিঙ্গন জানাচ্ছি আমাদের নিদারুণ তীব্র কবি 'আমাদো ভীলার'কে। এরপরই আমরা আর একটি নাম রাখতে চাই যে নামটি শুনে টেবিলে রাখা মদের গ্লাসগুলি কেঁপে উঠবে, কাঁটা-চামচগুলি ছুটে যাবে ক্ষুধার্ত দৃষ্টির সামনে আর সমুদ্রের ঢেউ এসে টেবিলের ওপরে ঢাকা কাপড়টাকে ভিজিয়ে দিয়ে যাবে। সেই নামটি হচ্ছে স্পেন তথা আমেরিকার কবি রুবেন-।

নেরুদা – দারিও। কারণ ভদ্রমহিলারা

লোরকা - এবং ভদ্রমহোদয়গণ -

নেরুদা– এই ব্যুয়েনস্ এয়ার্সের কোথাও কি আছে রুবেনদারিও নামে একটি সরণি-

লোরকা- কোথাও কি রয়েছে রুবেনদারিওর একটি মর্মর মূর্তি-

নেরুদা- রুবেন ছিলেন উদ্যানের ভক্ত, কোথাও কি আছে রুবেনদারিও উদ্যান?

লোরকা– কোন ফুলওয়ালি ‘রুবেনদারিও গোলাপ' সাজিয়ে রাখে তার বিপণিতে ?

নেরুদা– কোথাও রয়েছে 'রুবেনদারিও আপেল'-এর গাছ? কোথাও বিক্রি হয় 'রুবেনদারিও আপেল'?

লোরকা– কোথায় আছে রুবেনদারিও হাতের ছাপ?

নেরুদা – বলুন, কোথায়- কোথায় ?

লোরকা--রুবেনদারিও ঘুমিয়ে রয়েছেন নিকারাগুয়ায়। প্লাস্টারের তৈরি এক সিংহ মূর্তির তলায়- মর্মরখচিত সেরকম সিংহ মূর্তি অনেক ধনীর গৃহের সিং-দরজায় শোভা পায়।

নেরুদা- সিংহের জনক হয়েও তাঁর ভাগ্যে জুটল কি না হুকুমমাফিক বানানো প্লাস্টারের তৈরি সিংহ মূর্তি! – যিনি সমস্ত মানুষকে তারার রাজ্য উৎসর্গ করলেন, একটি তারাও তাঁর জন্য কেউ রাখলেন না !

লোরকা- তাঁর এক একটি শব্দের মধ্যে রয়েছে জঙ্গলের ধ্বনি— তাঁর শব্দের রাজ্য লেবুর নীলাভ পাতার মতো তৈরি করত গ্রহলোক, তৈরি করত চকিতা হরিণীর পায়ের পলায়নী ছন্দ বা শম্বুকের ভয়ার্ত শূন্যতা! রুবেনদারিওর দৃষ্টি দিয়ে আমরা ধাবমান যুদ্ধ জাহাজে ছুটেছি সমুদ্রের স্রোতে। অপরাহ্নের ধূসর আকাশকে ধরে রাখার জন্য তিনি সৃষ্টি করেছিলেন গড়ের মাঠের মতো বিরাট বিরাট শব্দের ফাঁদ। দখিনা বাতাসকে তিনি সম্বোধন করতেন নিবিড় আত্মীয়তায় পরিপূর্ণ হৃদয় দিয়ে। তিনি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ঐতিহাসিক করিনথিয়ান সাম্রাজ্যের স্তম্ভে– যেখানে সময় সম্বন্ধে ছিল একটা অবিশ্বাস, বিদ্রূপাত্মক করুণার ভঙ্গী!

নেরুদা – তাঁর উজ্জ্বল নামটা যেন তাঁর জীবনের সবটুকু সৌরভ বহন করে, বহন করে তাঁর হৃদয়ের দুঃখ, অনিশ্চিত ভাস্বরতা, নরকের গভীর স্তরে তাঁর অবনমন, যশের সাম্রাজ্যের শিখরে আরোহণ – অদ্বিতীয় এবং অনন্য কবি হিসাবে তিনি লাভ করুন চিরজন্ম !

লোরকা – যিনি তাঁর সময়ের বয়জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ সব কবিকেই শিক্ষা দিয়েছিলেন নিজস্ব ভঙ্গীর মাধ্যমে যা আজকের কোনও কবিই দিতে পারলেন না। ভ্যালে ইনক্লান হুয়ান ও হুয়ান রামোন হিমেনেথ — সবাই ছিলেন তাঁর ছাত্র, এমনকি মাচাদো ভ্রাতৃদ্বয়ও। রুবোনদিওর শব্দে ছিল জল 'আর রাসায়নিক সামগ্রী – যা এই প্রাচীন ভাষার মধ্যে থেকেই বেরিয়ে আসত। তিনি আসার আগে স্প্যানিশ ভাষাশব্দের এত বর্ণাঢ্য, এত স্ফুলিঙ্গ, আর এত রূপ কেউ কখনও দেখেননি। রুবেনদারিও নিজ জমির মতোই স্পেনের সমস্ত মাটিকে দেখেছিলেন।

নেরুদা– তারপর একদিন উত্তুরে সমুদ্রের জোয়ার তাঁকে টেনে নিয়ে ফেলল চিলির উপকূলে। তাঁকে সেখানে রেখে ফিরে গেল সমুদ্র। পাথরের মতো রুবেনদারিও সেখানে পড়ে রইলেন। সমুদ্রের নোনতা ফেনা এসে বারবার তাঁকে আঘাত করল। ভালপারাইসোর কালো ধোঁয়ায় ভরা বাতাস তাঁকে শুনিয়ে গেল নোনতা সমুদ্রের গান। আসুন, আজ এই রাতে হাওয়া দিয়ে তাঁর মূর্তি গড়ি, আর তারপর সেই ধোঁয়া, স্বর এবং পরিবেশ দিয়ে তাঁর সেই মূর্তির মাঝে প্রাণ সঞ্চার করি, যে প্রাণ বহন করবে তাঁর কবিতা আর বিশাল স্বপ্ন!

লোরকা- আমি কিন্তু হাওয়ায় গড়া এই মূর্তিতে সমুদ্রের রক্তাভ প্রবালের মতো শোণিত ধমনী দিতে চাই। একটা ছবিতে ফুটে ওঠা বিদ্যুৎ-রেখার মতো দিতে চাই স্নায়ু। দিতে চাই বৃষাসুরের মাথা- যার মুখাবয়বে তুষারের আলপনা। তাঁর অদৃশ্য অশান্ত চোখের কোলে দিতে চাই ব্যর্থ-মনোরথ কোনও লক্ষপতির কয়েক ফোটা অশ্রু। ফাঁকা প্রান্তরে ভেসে আসা বাঁশির সুর। - মদ্যপ্রীতির নমুনা হিসাবে কনিয়াক মদের বোতলের শোভাযাত্রা। স্বাদের আকর্ষণীয় অনুপস্থিতি আর শব্দের চমক ও ঠাট - যা তাঁর কবিতাকে মানুষকে খুব কাছে এনে উপস্থিত করেছিল। তাঁর এই উর্বর সাফল্য কোনও নিয়ম কোনও পদ্ধতি বা শিক্ষা কিছুই মেনে চলেনি!

নেরুদা – ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা একজন স্প্যানিশ, আর আমি হচ্ছি চিলির মানুষ। একসঙ্গে আজ আমরা মিলিত হয়েছি বন্ধুদের সঙ্গে একটি ছায়াকে সম্মান জানাতে যিনি আমাদের চেয়েও অনেক বেশি মহিমান্বিত গান শুনিয়েছেন আমাদের, যিনি তাঁর অনন্য সাধারণ স্বর দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন আর্জেন্টিনার মাটিকে, যে মাটির ওপরে আজ আমরা দাঁড়িয়ে রয়েছি।

লোরকা – পাবলো নেরুদা একজন চিনিয়ান, আর আমি এক স্প্যানিয়ার্ড। সেই নিকারাগুয়া- আর্জেন্টিনা- চিলি এবং স্বপ্নখ্যাত কবি রুবেনদারিওকে—

উভয়ে – সসম্মানে স্মরণ করছি, আর এই গ্লাস তুলে ধরে তাঁর গৌরবে আজ আমাদের দু'জনকে গৌরবান্বিত করার জন্য আপনাদের সবাইকে সশ্রদ্ধ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

সভা ভাঙার পরে নীরবে আমরা যার যার গন্তব্যস্থলাভিমুখী হলাম।

প্রসঙ্গত আর এক ভোজসভার অভিজ্ঞতার কথা এখানে বলা যাক। ফেদেরিকোর সহযোগিতা সে রাতে আমাকে খুবই মুগ্ধ করেছিল। এরকম উদারতা দুর্লভ।

এক কোটিপতির বাড়িতে আমি আর ফেদেরিকো দু'জনেই নিমন্ত্রিত হয়েছিলাম। এক সান্ধ্যভোজের আসরে। এক ধরনের চমকপ্রদ সংবাদপত্রের ব্যাবসা করে তিনি কোটিপতি হয়েছিলেন। নাতালিও বোতানা নামক এই ব্যবসায়ী ব্যুয়েনস্ এয়ার্সের জগৎকে পরিচালনা করতেন নিজ প্রাসাদে বসেই।

সেই সন্ধ্যায় খাবার টেবিলে আমি আর ফেদেরিকো সামনা-সামনি বসেছিলাম এবং বোতানা ও সুন্দরী দীর্ঘাঙ্গী এক মহিলা কবি বসেছিলেন অন্যদিকে। মহিলাটির সুন্দর সবুজ চোখের দৃষ্টি বারবার আমার দিকে এসে পড়ছিল। তাঁর সেই অন্তরঙ্গ দৃষ্টি আমার শরীরের জ্বলন্ত আগুনে ঘৃতাহুতি নিক্ষেপ করতে লাগল। এতে আমি কাম-কাতর হয়ে পড়লাম। বন্ধু ফেদেরিকোর চোখে এটা ধরা পড়েছিল। ভোজ শেষে মহিলাটিকে সঙ্গে নিয়ে ফেদেরিকো আর আমি সাঁতারপুলের দিকে এগোলাম ।

ফেদেরিকো দেখলাম ক্রমশ আমাদের ছেড়ে এগিয়ে এগিয়ে চলতে শুরু করল আর মাঝে মাঝে হাসি-তামাশার টুকরো ছুঁড়ে দিতে লাগল – যাতে আমরা দু'জনেই উত্তেজনায় অস্থির হয়ে উঠি। মনে হল ফেদেরিকোর মতো সুখী মানুষ বোধহয় দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া দুস্কর। এটাই ছিল ফেদেরিকোর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।

সাঁতারপুলের ওপরটায় ছিল বেশ উঁচু একটা ছাদ। তার মধ্যে অতি সুন্দরভাবে সাজানো একটা ঘর। গল্প করতে করতে তিনজনেই ছাদে উঠলাম। ছাদে উঠে মহিলাটিকে চুম্বন করলাম, আপত্তি করলেন না তিনি। বরং মনে হলো কামাতুরা এক নারীদেহ আমাকে যেন নিবিড়ভাবেই পেতে চাইছে। এরপরে ফেদেরিকোর বিস্মিত দৃষ্টির সামনেই মহিলাটিকে শুইয়ে দিয়ে বিবস্ত্র করতে লাগলাম। তিনি নিথর নিশ্চল হয়ে আমাকে প্রশ্রয় দিলেন। ফেদেরিকোকে বললাম লক্ষ্য রাখতে যাতে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে।

রাত্রির দেবী আফ্রোদাইতকে সাক্ষী রেখে তারায় ভরা নীল আকাশের নীচে সবে আমরা সম্ভোগ শুরু করেছি এমন সময় ফেদেরিকো এক অস্ফুট আর্তনাদ করে গড়িয়ে পড়ল নীচে। আমি আর ভদ্রমহিলা তাড়াতাড়ি উঠে পোশাক জড়িয়ে ছুটে গেলাম, তুললাম ফেদেরিকোকে।

এরপর প্রায় সপ্তাহ দুয়েক খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হয়েছিল ফেদেরিকোকে।

এই লেখার সময়ে স্পেনে বহু বছরের সফল বিদ্রোহের সরকারিভাবে সমারোহ- উৎসব চলছে। ঠিক এই সময়ে রঙিন পোশাক পরা ম্যুর দেহরক্ষী পরিবৃত হয়ে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার দূত সমভিব্যাহারে অধিনায়ক তাঁর সৈন্যদল পরিদর্শনে ব্যস্ত —যে সৈন্যের অধিকাংশই বালক, যারা যুদ্ধ দেখেনি। কিন্তু আমি দেখেছিলাম। দেখেছি লক্ষ লক্ষ স্প্যানিয়ার্ডের মৃতদেহ ও লক্ষাধিক নির্বাসিত স্প্যানিয়ার্ড। দেখে মনে হয়েছিল, রক্তাক্ত এই ছুরির দাগ মানুষকে বিবেক থেকে আর কোনও দিনও উঠানো যাবে না। ওই বালক বা সৈন্য এই বীভৎস যুদ্ধ জয়ের প্রকৃত ইতিহাস কোনও দিনই জানবে না।

১৯শে জুলাই ১৯৩৬-এ আমার দিনটা শুরু হল। কথা ছিল, আমি আর ফেদেরিকো সেদিন সন্ধ্যায় কুস্তি দেখতে যাব। নির্দিষ্ট জায়গায় মিলিত হয়ে আমাদের রওনা হওয়ার কথা, কিন্তু ফেদেরিকো এলেন না। ততক্ষণে তিনি পরলোকের পথে। অধিনায়ক ফ্রাঙ্কোর এক কুস্তিগীর তাঁকে ইহলোক থেকে সরিয়ে দিয়েছে। মহান এক কবির এই ভয়ঙ্কর অন্তর্ধানের মধ্যে দিয়ে স্পেনের সেদিনের যুদ্ধ আমার কবিতার ধরনকে বদলে দিল। কী মহৎ কবি এই ফেদেরিকো ! প্রতিভা আর মাধুর্যের এমন সমন্বয় আমি আর দেখিনি। তাঁর আনন্দোচ্ছ্বল লেখনী প্রাণ-প্রাচুর্যে ছিল ভরপুর, তা অন্যকেও আকর্ষণ করত। দিলখোলা আনন্দমুখর মানুষ ছিলেন তিনি। সততাই ছিল তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। আরব আর আন্দালুসিয়ান শিকড় থেকে জেগে ওঠা জুঁইফুলের গন্ধে সারা স্পেনকে মাতোয়ারা করে দিয়ে চিরতরে চলে গেলেন ফেদেরিকো। তাঁর সমস্ত রচনাই আমাকে আকৃষ্ট করেছে। মাঝে মাঝে আমার সাম্প্রতিক কবিতা পড়ে শোনাবার সময় তিনি চিৎকার করে উঠতেন- থামো থামো, তোমার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ছি আমি।

থিয়েটারের নীরবতায় হোক, আর কোলাহলমুখরিত মানুষের মাঝেই হোক, সৌন্দর্যের সৃষ্টি করতে পারতেন কবি ফেদেরিকো। এমন জাদুযুক্ত অঙ্গুলি বা এমন করে আনন্দোচ্ছ্বল হাসিকে ভালোবাসতে আমার কোনও ভাইকেই আমি দেখিনি।

হায় হতভাগ্য বন্ধু আমার! – এই পৃথিবীর জন্য তুমি গান গাইলে, লাফালে, নাচলে, পিয়ানো বাজালে — জীবনের উজ্জ্বলতা দিয়ে স্বপ্ন গড়ে তুললে – কৃতী শিল্পীর মতো মণিমুক্তার কারুকার্যে ঝলমলে হীরকসম তোমার কবিতা রেখে গেলে।

একবার গার্সিয়া লোরকার ওপরে বক্তৃতা করার সময় শ্রোতৃমন্ডলীর ভেতর থেকে একজন আমাকে প্রশ্ন করলেন, ফেদেরিকোর উদ্দেশে লেখা আপনার কবিতায় হাসপাতালটিকে আপনি নীল রঙে সাজালেন কেন ?

বন্ধুবর! আমি উত্তর দিয়েছিলাম, একজন কবিকে এই প্রশ্ন করাটা অনেকটা কোনো মহিলাকে তার বয়স জিজ্ঞাসা করার মতো। কবিতা কোনো সময়েই স্থিতিশীল নয়, কবিতা জলস্রোতের মতো, মাঝে মাঝে সৃষ্টিকর্তার হাতের নাগাল থেকে বেরিয়ে এগিয়ে যায়। কবির রচনার অবিমিশ্র বস্তুতে যে কোনও পদার্থ থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। আবার এমন বস্তুও হতে পারে যা আছে, বা যা একেবারেই নেই। তবু আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সৎ চেষ্টাই করছি। আমার কাছে নীল রং সব থেকে প্রিয় রং। নীল হচ্ছে শূন্যতার প্রতীক – উঁচু আকাশের সীমানার রং – যা স্বাধীনতা আর আনন্দের জয়গানে মুখর। ফেদেরিকোর উপস্থিতি, তাঁর জাদুকরী ব্যক্তিত্ব আর আনন্দঘন মুহূর্ত দিয়ে তাঁকে ঘিরে রাখত। আমার রচনায় আমি বোধহয় এইটাই বোঝাতে চেয়েছিলাম– তাঁর উপস্থিতি হাসপাতালের সেদিনের সবটুকু বিষণ্ণতাকে জাদুর স্পর্শে, তাঁর চঞ্চল প্রাণের আনন্দোচ্ছ্বাসে ভরিয়ে তুলেছিলেন। বিষাদাতুর মূহূর্তগুলি ভরে গিয়েছিল নীল রঙে।

ফেদেরিকো নিজের মৃত্যু সম্বন্ধে পূর্বাশঙ্কা করেছিলেন। একবার একটা নাটুকে দল নিয়ে বাইরে থেকে ফিরে এসে আমাকে তাঁর এক নতুন অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। এক গ্রামে সকলের সঙ্গে রাতে শুয়ে আছেন– এক সময় ওঁর ঘুম ভেঙে যেতে উঠে বাইরে যান এবং বেড়াতে বেড়াতে এক নির্জন জায়গায় এসে তিনি হঠাৎ খুব ভয় পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। এমন সময় কয়েকটি ভেড়ার ছানাকে দেখে তিনি আশ্বস্ত বোধ করলে তিনি হঠাৎই দেখলেন একদল শুয়োর এসে সেই ভেড়ার পালে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওঁর শঙ্কিত দৃষ্টির সামনেই নৃশংসভাবেই তাদের হত্যা করল। এই দৃশ্যটি তিনি মন থেকে সরাতে পারেননি। সেদিন তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি যেন সেই রাতেই নিজের মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

ফেদেরিকো গর্সিয়া লোরকাকে শুধু গুলিই করা হয়নি, তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। আমি ভাবতেই পারিনি যে, পৃথিবীতে এমন রাক্ষসও আছে যে শিশুর মতো সরল আনন্দোচ্ছ্বল স্পেনের এই কবিকে হত্যা করতে পারে। কে ভেবেছিল ফেদেরিকোর অতিপ্রিয় এই গ্রানাদার মাটিতে এমন এক ভয়ঙ্কর, পৈশাচিক অপরাধ ঘটবে!


[নাট্য চিন্তা পত্রিকা থেকে সংগৃহীত]

অনুবাদ:  ভবানীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
ঋণ: পাবলো নেরুদা, জীবন সময় কবিতা, সৌমিত্র লাহিড়ী (সম্পাদনা)


প্রকাশের তারিখ: ২২-সেপ্টেম্বর-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org