‘মাহমুদ মন্দির ধ্বংস করেছে, শিয়াদের মসজিদ-ও’

রোমিলা থাপার, তিস্তা শীতলাবাদ
এখন প্রশ্ন উঠবে, কেন ওরা নিজেদের স্থাপনাগুলি বিদ্যমান স্থাপনাগুলির এতটা গা ঘেঁষে তৈরি করেছিল? এটা কি এ-জন্যে যে তাদের মনে হয়েছিল, এগুলো পবিত্র স্থান, সুতরাং আমরা এভাবে এর পবিত্রতাকেও আত্মস্যাৎ করছি? এটা একটা কারণ হতে পারে। আবার এমনটাও হতে পারে, আমরা অনেক বেশি উন্নত ধর্ম, সেজন্যে আমরা এভাবে এর জায়গায় নিজেদের স্থলাভিষিক্ত করছি। এটাও একটা সমভাবে সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। বৌদ্ধধর্ম নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পরবর্তী সময়ে আমরা দেখছি হিন্দুরা এসে বৌদ্ধদের ধর্মস্থানগুলিকে মন্দিরে রূপান্তরিত করতে।

[মসজিদের তলায় মন্দির ছিল। সেই মন্দির ভেঙেই তৈরি হয়েছে এই মসজিদ। স্বাধীনতার আগে থেকেই এ-ধরনের প্রচারের মাধ্যমে ভাবাবেগ তৈরি করে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে চেয়েছে হিন্দুত্ববাদীরা। তখন এই বিবাদগুলি সীমাবদ্ধ থাকত স্থানীয় স্তরেই। স্বাধীনতার দাবিতে ভারতীয় জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামকে দুর্বল করতে ঔপনিবেশিক শাসকরা কখনও উৎসাহ জুগিয়েছে এ-ধরনের ভাবাবেগ নির্মাণে। কিন্তু এই দাবি কখনোই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে আসতে পারেনি। স্বাধীনতার ঠিক পরপর যখন ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় রক্তাক্ত হচ্ছে বিভাজিত ভূখণ্ডের দুটি অংশ, তখন অযোধ্যার বাবরি মসজিদ চত্বরে হঠাৎ করেই রামলালার একটি মূর্তি ‘প্রকট’ হয়।  চুপিসারে মূর্তি বসিয়ে দেওয়ার এই তথাকথিত ‘প্রকট’ হওয়ার নীল নক্সাটি বুঝতে পেরে সেটিকে সরিয়ে দেওয়ার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নেহরু। ফৈজাবাদের জেলা শাসক কে. কে. নায়ার রাজ্যের মুখ্য সচিবের এই মর্মে আদেশ কার্যকর করতে অস্বীকার করেন। নায়ার পরে জনসঙ্ঘে যোগদান করেন ও লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। এই বিতর্ক পরবর্তী তিনটি দশকে কখনোই জাতীয় রাজনীতিতে আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারেনি। বিগত শতকের আটের দশকে পুরোনো জনসঙ্ঘ নতুন চেহারায় বিজেপি হয়ে আবির্ভূত হওয়ার পর বিশ্ব হিন্দু পরিষদের উদ্যোগে বাবরি মসজিদ ভেঙে রাম মন্দির গড়ার আন্দোলন শুরু হয় সারা দেশে। সেই থেকেই বিজেপি রাজনীতির মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায় অযোধ্যা, বারানসী ও মথুরায় মসজিদের তলায় মন্দিরের তত্ত্ব। বি. বি. লালের মতো সঙ্ঘ পরিবারের নিজস্ব ‘ইতিহাসবিদ’রা এ-নিয়ে আকাশ কুসুম গল্প ছড়াতে থাকে।  এই সময়ে রোমিলা থাপারের মতো আন্তর্জাতিক স্তরে নন্দিত ইতিহাসবিদরা ইতিহাস বিকৃতির এই অপচর্চার বিরুদ্ধে সত্যনিষ্ঠ প্রতিবেদন তুলে ধরেন একের পর এক। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর অযোধ্যা প্রশ্নে ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের বিতর্কিত রায়ে উৎসাহিত হয়ে সঙ্ঘ পরিবারের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে সারা দেশে অসংখ্য মসজিদকে নির্বিচারে মন্দির ভাঙার অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত করে নিম্ন আদালতে মামলা দায়ের করা শুরু হয়। মোদী রাজত্বের ভ্রূশাসনে নিম্নস্তরের আদালতগুলি ধর্মস্থান সম্পর্কিত বিদ্যমান ভারতীয় আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে সঙ্ঘ পরিবারের মর্জি-মাফিক নির্দেশও দিতে শুরু করে। সরকারি স্তর থেকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের যে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে, তাকে মোকাবিলা করার জন্যে আমাদেরকে ফিরে যেতেই হবে প্রকৃত ইতিহাসের কাছে। ২০১৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কমিউনেলিজম কমব্যাট পত্রিকার ওয়েব সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছিল এ-নিয়ে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপারের একটি পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার। সেই সাক্ষাৎকারে থাপার বলেছিলেন, এটা শুধু ভারতের বিষয় নয়, শুধুমাত্র মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরির বিষয়ও নয়। এমন দৃষ্টান্ত সারা পৃথিবী জুড়ে রয়েছে। এমনকী ভারতে মুসলিম শাসকদের আগমনের বহু আগে থেকেই ধর্মীয় স্থাপনা/উপাসনালয় ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাগুলি যতটা ধর্মীয় বিদ্বেষজাত, তার চেয়েও অনেক বেশি রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক। সম্প্রতি আবারও হিন্দুত্ববাদীরা মসজিদের নীচে মন্দির খোঁজার নামে সারা দেশে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করতে চাইছে। ১৯৯১ সালের উপাসনাস্থল বিষয়ক আইনে বলা আছে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশের যে ধর্মীয় স্থানের যে চরিত্র ছিল, তা বদলানো যাবে না। কিন্তু আরএসএসপন্থীরা এই আইনকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করার দাবি জানিয়ে ছটি মামলা দায়ের করেছে সুপ্রিম কোর্টে। গত ১২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট জানায় যে মসজিদ, মাজার নিয়ে মামলায় কোনও সমীক্ষার নির্দেশ দেওয়া যাবে না; দেওয়া যাবে না কোনও অন্তর্বতী বা চূড়ান্ত রায় এবং সমস্ত আদালতে এ-বিষয় মামলা আপাতত স্থগিত থাকবে। সেই প্রক্ষিতে ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার ও সমাজকর্মী তিস্তা শীতলাবাদের কথাবার্তার একটি অংশ এখানে প্রকাশ করা হল। —মার্কসবাদী পথ]

তিস্তা শীতলাবাদ: ধর্মীয় স্থাপনার ধ্বংস নিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে। এই অবমাননার অন্তরালের কারণ কী বা এগুলো কি শুধুই হিন্দু-মুসলিম প্রশ্ন ঘিরে— এই সমস্ত নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?

রোমিলা থাপার: এখানে একটি কথা বলা উচিত। এটা কেউ অস্বীকার করছে না যে ধর্মীয় স্থাপনার ধ্বংস বা অবমাননার কোনও ঘটনাই ঘটেনি। কিন্তু একে যদি ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, তবে একটি প্রশ্ন উঠবে কেন পৃথিবীর প্রতিটি দেশে, প্রতিটি সভ্যতার ক্ষেত্রেই ধর্মীয় স্থাপনার ধ্বংস সাধন বা অবমাননার ঘটনা দেখা গেছে। এর উত্তর হবে, এক, সেখানে একটি ধর্মীয় সংঘাতের ঘটনা বা একটি ধর্মস্থান দখল করার অভিপ্রায় ছিল। দুই, এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিকভাবে কোনও উদ্দেশ্য সিদ্ধির বিষয় ছিল। তিন, এতে অর্থনৈতিক কোনও লাভালাভের বিষয় ছিল। ভারতীয় প্রেক্ষিতে দেখলে এটা অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। যদি ঝট করে বলে দেওয়া হয় যে, মুসলিমরা এলো আর মন্দির ধ্বংস করে দিল— এটা এমন এক ধরনের স্থূল অতিসরলীকরণ হবে যাতে কর্ণপাত করাটাও অসম্ভব। জটিলতা হচ্ছে এটাই, আমরা যদি অতীতের বৌদ্ধ স্থাপনাগুলির দিকে তাকাই তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করব। এগুলো সাধারণত মেগালিথিক স্থাপনা বা সমাধিস্থানগুলি ঘেঁষে তৈরি। এমনটা নয় যে প্রত্যেকটিই এমন জায়গায় তৈরি। কিন্তু অনেক জায়গায়ই দেখা গেছে যে সেই স্থাপনাগুলি হয় সমাধিস্থানকে দখল করে তৈরি হয়েছে বা তার লাগোয়া জমিতে নির্মিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠবে, কেন ওরা নিজেদের স্থাপনাগুলি বিদ্যমান স্থাপনাগুলির এতটা গা ঘেঁষে তৈরি করেছিল? এটা কি এ-জন্যে যে তাদের মনে হয়েছিল, এগুলো পবিত্র স্থান, সুতরাং আমরা এভাবে এর পবিত্রতাকেও আত্মস্যাৎ করছি? এটা একটা কারণ হতে পারে। আবার এমনটাও হতে পারে, আমরা অনেক বেশি উন্নত ধর্ম, সেজন্যে আমরা এভাবে এর জায়গায় নিজেদের স্থলাভিষিক্ত করছি। এটাও একটা সমভাবে সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। বৌদ্ধধর্ম নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পরবর্তী সময়ে আমরা দেখছি হিন্দুরা এসে বৌদ্ধদের ধর্মস্থানগুলিকে মন্দিরে রূপান্তরিত করতে।

তিস্তা শীতলাবাদ: শংকরাচার্যদের সময়ে?

রোমিলা থাপার : তারও অনেক আগে, অনেক আগেই। তের বা শেয়জার লার মতো জায়গায় চৈত্য নামে পরিচিত বৌদ্ধদের বিশাল সভাঘর, যার একটা দিক স্তূপ ও বৌদ্ধ কারুকার্য দিয়ে সজ্জিত করা হত, ওগুলোকে বিনা বাধায় হিন্দু মন্দিরের মণ্ডপে পরিণত করা হয়। এ-রকম বহু দৃষ্টান্ত খুব সহজেই খুঁজে পাওয়া যাবে। আবার খুব উৎকট সংঘাতের ঘটনাও পাওয়া যাবে। আমরা ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলি খুঁটিয়ে পড়ি না। সেটা করা খুবই জরুরি।  দ্বাদশ শতকে কলহন নামের এক কাশ্মীরী ব্রাহ্মণ কাশ্মীরের ইতিহাস বিষয়ে রাজতরঙ্গিনী নামের বিখ্যাত গ্রন্থটি রচনা করেন। তিনি সেখানে লিখেছেন কীভাবে কাশ্মীরের শাসকরা গান্ধার অঞ্চলের বৌদ্ধ মঠগুলিকে আক্রমণ করেছিল। গান্ধার হচ্ছে আজকের পাকিস্তান ও আফগানিস্থানের সীমান্ত অঞ্চল। তারা মঠগুলি আক্রমণ করে এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হত্যা করেছিল।

তিস্তা শীতলাবাদ: এটা রাজতরঙ্গিনী-তে রয়েছে?

রোমিলা থাপার: এটা কলহনের রাজতরঙ্গিনী-তে লিখিত রয়েছে। সময়পর্বটি হচ্ছে হুনদের রাজত্বকাল, মিহিরকুল, তোরামানার সময়ে। তার মানে খ্রিস্টিয় পঞ্চম বা ষষ্ঠ শতকে। ফলে এমনটা যে ঘটে এসেছে সেটা দেখাই যাচ্ছে। হয়তো বিশাল সংখ্যায় নয়, কিন্তু এমন ঘটনা ঘটেছে। এবারে এই প্রশ্নে আসতে হবে, কেন এমনটা হত? তারপর অবশ্যই মুসলিমরা অর্থাৎ তুর্কি, আফগানরা আসে এবং মন্দিরের ধ্বংসও শুরু হয়। তবে যতটা ভাবা হয়, তারা তত বেশি সংখ্যায় ধ্বংস করেনি। সাধারণভাবে বলা হয় যে ৩০০৮টি মন্দির ধ্বংস করা হয়েছিল। কিন্তু রিচার্ড ইটন যিনি মন্দির ধ্বংস সংক্রান্ত প্রতিটি তথ্য নিয়ে নিবিড় গবেষণা করেছেন, তিনি বলেছেন প্রকৃতপক্ষে ৮০টি মন্দিরের ক্ষেত্রেই ধ্বংস করার প্র্রমাণ পাওয়া গেছে।

তিস্তা শীতলাবাদ: মাত্র ৮০টি?

রোমিলা থাপার: হ্যাঁ, মাত্র ৮০টি। অন্য যে তথ্যটি পরিবেশিত হয়ে থাকে সমাজে তার বিপরীতে ইটনের তথ্য অনুযায়ী সংখ্যাটি ৮০। তার চেয়েও মুখ্য প্রশ্নটি হচ্ছে কেন হত এই ঘটনাগুলি? এক্ষেত্রে আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখা যাবে। যে-মন্দিরগুলো ধ্বংস করা হয়েছিল সেগুলি ছোটো বা ধর্মীয় দিক থেকে খুব গুরুত্ব বহনকারী মন্দির ছিল না। সে-সব ছিল মূলত বিশালাকার মন্দির, প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী। যেগুলি রাজনৈতিক দিক থেকে এবং অর্থনৈতিক মানদণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ।  এ-ধরনের মন্দিরকেই নিশানা করা হত। তার মানে তিনটি বিষয় পাওয়া যাচ্ছে। এক, ধর্মীয় দিক। যেমন, আমরা এই ধর্মকে পছন্দ করি না, এরা যে মূর্তিপূজা করে সেটা ইসলাম বিরোধী। সুতরাং আমরা এদের মূর্তি ধ্বংস করব। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক সোমনাথ মন্দিরের ক্ষেত্রেই, মাহমুদ মূর্তি ভেঙেছে, মন্দিরের অবমাননাও করেছে, অথচ যেমনটা ভাবা হয়ে থাকে, সেই অর্থে কিন্তু মন্দির পুরোপুরি ধ্বংস করেনি। যাইহোক, পরে অবশ্য সেটার পুনর্নির্মাণ করা হয়।

তিস্তা শীতলাবাদ: মাহমুদ ধ্বংস করার আগেও এই মন্দির আরও কয়েকবার ধ্বংস করা হয়েছিল।

রোমিলা থাপার: না, না।

তিস্তা শীতলাবাদ: অন্য রাজারা?

রোমিলা থাপার: না, না। সুতরাং, একটা হচ্ছে ধর্মীয় দিক। দ্বিতীয় দিক হচ্ছে, যদি সেটা বিপুল ধনসম্পদের অধিকারী মন্দির হয়, সে ক্ষেত্রে বিষয়টি হচ্ছে লুণ্ঠন। যে যে মন্দিরগুলি ধ্বংস হয়েছিল তার সবকটির ক্ষেত্রেই এটা ছিল একটি প্রধান কারণ। সাধারণভাবে এমন মন্দিরগুলিই বাছা হত যাদের বড়ো খাজাঞ্চিখানা বা ধনভাণ্ডার ছিল। ফলে এখান থেকেই এই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাহমুদের দৃষ্টান্তটি কৌতুহলোদ্দীপক কারণ সে যেমন ধনসম্পদ থাকা মন্দির ধ্বংস করেছে, আবার সে শিয়াদের মসজিদও ধ্বংস করেছে। সে সময়ের ঘটনাপঞ্জীগুলিতে বারবার এ-কথা লেখা আছে যে মাহমুদ পঞ্চাশ হাজার কাফের ও পঞ্চাশ হাজার শিয়াদের হত্যা করেছে। এই সংখ্যাগুলি কতটা বিশ্বাসযোগ্য সেই প্রশ্ন থাকবে এবং এর থেকে বলাই যাবে যে এই বলার মধ্যে একটা  ধর্মীয় বিদ্বেষের দিকও রয়েছে। একটা অর্থকরী লাভালাভের বিষয় তো বোঝাই যায়। তৃতীয় আরেকটি দিক আমাদের মনে রাখা উচিত যে, বিপুল ধনসম্পদ থাকা যে মন্দিরগুলি রাজধানী শহরের সাথে সম্পর্কিত ছিল এবং যেগুলি ছিল শাসকদের আনুকূল্যধন্য, সেগুলি এক অর্থে ক্ষমতারও প্রতীক ছিল। যখনই একজন শাসক প্রকৃত অর্থে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বের অধিকারী হয়, তখনই সে রাজকীয় মন্দির প্রতিষ্ঠা করে এবং ঘোষণা করে দেয় যে সে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সুতরাং মন্দিরের উপর আক্রমণ রাজনৈতিক ক্ষমতার উপর আক্রমণকেও বোঝাত। এটা শুধু ভারতের ক্ষেত্রেই ঘটেছে এমনটা নয়। সারা পৃথিবী জুড়েই ঘটেছে। অর্থনৈতিক লাভ, ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বের উপর আক্রমণ, এই তিনটিই হচ্ছে কারণ যার জন্যে ধর্মীয় স্থাপনার উপর আক্রমণ সংগঠিত হয়েছে সর্বত্র। কলহন আরও কিছু কৌতুহলোদ্দীপক বিবরণ দিয়েছেন যেখানে তিনি বলেছেন, দুশো বছর সময়পর্ব জুড়ে কাশ্মীরে হিন্দু রাজারা হিন্দু মন্দিরগুলিতে আক্রমণ করে সম্পদ লুন্ঠন করেছে। বইটি পড়ার সময়ে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে কেন হিন্দু রাজারা হিন্দু মন্দির আক্রমণ করত। তারপর আমরা হর্ষদেব নামে এক বিখ্যাত রাজার রাজত্বকালের উল্লেখ পাব যিনি এবং যার অমাত্যরা শুধু মন্দির লুঠই করেননি, মন্দিরের অবমাননাও করেছেন। তিনি এক বিশেষ ধরনের অমাত্যও নিযুক্ত করছেন যাদের কাজই ছিল দেবদেবীর উৎপাটন করা।

তিস্তা শীতলাবাদ: সেটাই কাজ?

রোমিলা থাপার: সেটাই কাজ। বলা হত ‘দেবোৎপাটন-নায়ক’। এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, এখানে তো ধর্মীয় বিদ্বেষের বিষয় নেই। নিখাদ লুণ্ঠন। কলহন সেটাই বলেছেন। এ-বিষয়ে তাঁর চিত্তাকর্ষক বিশ্লেষণটি হচ্ছে যে, তখন একটি অর্থনৈতিক সংকট চলছিল। ফলে যে স্থান থেকে সহজে এবং দ্রুত বিপুল অর্থসম্পদ সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল সেটা ছিল একমাত্র মন্দির লুণ্ঠন।  ফলে আমার বক্তব্য হল, আমরা এ-ধরনের ঘটনাবলীর জন্যে একটিমাত্র কারণকে চিহ্নিত করে একে ব্যাখ্যা দিতে ব্যগ্র হলে চলবে না। এটা একটা জটিল বিষয়। এতে অনেক বিষয় সংশ্লিষ্ট রয়েছে, ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণের সম্পর্ক রয়েছে। এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে যেখানে যারা হিন্দু নয় তারা মন্দির রক্ষা করছে বা সংরক্ষণ করছে, আবার হিন্দুরা মসজিদ রক্ষা করছে ইত্যাদি। এটা ভীষণভাবে স্থানীয় স্তরের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বা স্থানীয় স্তরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বা স্থানীয় স্তরে ধর্মীয় অনুভূতি তার সাথে সম্পর্কিত।


অনুবাদ- শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার   


প্রকাশের তারিখ: ২৪-ডিসেম্বর-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org