সফল করুন সাধারণ ধর্মঘটকে

এম এ বেবি
যখনই শ্রমিকরা দাবি তোলেন ন্যূনতম মজুরির বাস্তবায়নের এবং তাদের শ্রমের মধ্য দিয়ে যুক্ত মূল্যের ন্যায়সঙ্গত অংশীদারির, তখনই অর্থের অপ্রতুলতার অজুহাত দেওয়া হয়, যা সর্বৈব মিথ্যা। একবার ভাবা যাক, ফি বছর কী হারে কর্পোরেট ট্যাক্স মকুবের মাধ্যমে সরকারি অর্থ রেহাই হয়। এই কর্পোরেট কর ছাড়ের জন্যে প্রতি বছর সরকারের ক্ষতি হয় ১.৪৫ লক্ষ কোটি টাকা। এই অর্থ বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বরাদ্দকৃত অর্থের যোগফলের চেয়েও বেশি।

এবছর ১৯ জুন দূরদর্শনের সংবাদ শিরোনামে বলা হল, ‘কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অগ্রগতির দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করে ১১ বছরের শ্রমিক-কেন্দ্রিক সংস্কারের কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী’। 

সেই প্রতিবেদনের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন যে কেন্দ্রীয় সরকার দায়বদ্ধ রয়েছে ‘শ্রমিকদের কল্যাণ ও ক্ষমতায়নের প্রতি’ এবং ‘বিগত ১১ বছরের সরকারি নীতি, পরিকল্পনা ও অগ্রগতির প্রাণকেন্দ্রে রাখা হয়েছে ভারতের শ্রমশক্তিকেই’।

এর চেয়ে বেশি সত্যের অপলাপ হতে পারে না। সরকার চাইলে প্রকৃত বাস্তবতায় চোখ ফেললেই সেটা বুঝে নিতে পারত। সত্যিই যদি কেউ এই সরকারের ‘নীতির প্রাণকেন্দ্রে’ বিরাজ করে থাকে, সেটা হচ্ছে বৃহৎ শিল্পমহলগুলি। সরকার যদি সত্যিই দেশের শ্রমজীবী জনগণের বিষয়ে যত্নবান হত, তবে ভারত স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সূচকে আন্তর্জাতিক স্তরে শীর্ষ পর্যায়ে থাকত।

জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা অনুযায়ী, অনুর্ধ্ব ৫ বছরের ৩৬ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতি (বয়েসের তুলনায় তারা খর্ব), যা দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টিকেই সূচিত করে। আরো জানা যাচ্ছে যে এই বয়সসীমার ৩২ শতাংশ শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম। ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের রক্তাল্পতার হার ২০১৫-১৬ সালের ৫৩ শতাংশ থেকে ২০১৯-২০’তে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭.২ শতাংশে। 

এই পরিসংখ্যানগুলি সর্বগ্রাসী দারিদ্রকেই তুলে ধরে, যা রয়েছে অপুষ্টি ও রক্তাল্পতার মূলে।

তাদের আমলে দারিদ্র হ্রাস পাওয়ার সরকারি দাবির বিপরীতে পুলাপ্রে বালকৃষ্ণন ও আমন রাজের সমীক্ষা একটি ভয়াবহ ছবি তুলে ধরছে। ২০২৩-২৪ সময়কালে গ্রামীন জনগণের ৪০ শতাংশ দু’বেলা নিরামিষ ভোজনেরও সংস্থান করতে পারেনি। এবং ৯৫ শতাংশেরই সক্ষমতার নাগালের বাইরে ছিল আমিষ ভোজনের সংস্থান করা। এই সমীক্ষায় আরও বেরিয়ে আসে, গ্রামীন জনগণের ৮০ শতাংশেরই সক্ষমতা ছিল না ন্যূনতম ৮৮ টাকা ব্যয় করে আমিষ ও নিরামিষকে দু’বেলায় ভাগ করে আহারের সংস্থান করার।

একই সময়পর্বে ভারতের নগর অঞ্চলে ১০ শতাংশের সক্ষমতা ছিল না দু’বেলা নিরামিষ আহারের সংস্থান করার। ৮০ শতাংশের সক্ষমতা ছিল দু’বেলা আমিষ ভোজনের। এবং ৫০ শতাংশ সক্ষম ছিল না নিরামিষ ও আমিষে দু’বেলায় ভাগ করে আহারের সংস্থান করার।  এই পরিসংখ্যানগুলি দেশে দারিদ্রের দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যমানতা ও গভীরতার করুণ চিত্রকেই প্রকাশ করে। 

এর বিপরীতে ভারতের অভিজাত শিল্প মহলের সম্পদ অবিরাম বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। ২০১৪ সালে ১০০ কোটি বা তার বেশি টাকার সম্পত্তি রয়েছে এমন বিলিওনেয়ারের সংখ্যা ছিল ১০০। ২০২৪-এ তা দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ২০০। ১০০ জন শীর্ষস্থানীয় বিলিওনেয়ারের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রথমবারের মত ১ ট্রিলিয়ন (এক লক্ষ কোটি) ডলার ছাড়িয়েছে। এটাই মোদী জমানার আসল ছবি। 

বৈষম্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ সাল নাগাদ, জনসংখ্যার শীর্ষতম ১ শতাংশের হাতে রয়েছে মোট আয়ের ২২.৬ শতাংশ। এবং দেশের মোট সম্পদের ৪০.১ শতাংশ। বিপরীতে, সম্পদের মাত্র ৩ শতাংশ রয়েছে জনসংখ্যার সবচেয়ে তলার দিককার ৫০ শতাংশের হাতে। 

এই বর্ধিত বৈষম্য তো সরকারি নীতিরই সরাসরি ফলশ্রুতি। করের বোঝা সুপরিকল্পিতভাবে ধীরে ধীরে শিল্প মহল থেকে সাধারণ নাগরিকের কাঁধে স্থানান্তর করা হয়েছে। বাজেট সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, মোট সংগৃহীত করের ক্ষেত্রে শিল্প মহলের ভাগ ২০১৪-১৫ সালের ৩৪.৫ শতাংশ থেকে ২০২৪-২৫-এ কমে হয়েছে ২৭.২ শতাংশ। সরকার কর্পোরেট ট্যাক্সের হার ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে করেছে ২২ শতাংশ। প্রকৃত হিসেবে করের হার আরো কম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ২০২১-২২-এ কর দিয়েছে প্রকৃত হিসেবে ১৬.৫ শতাংশ হারে। আল্ট্রাটেক সিমেন্ট দিয়েছে মাত্র ১৪.৮ শতাংশ হারে।

এটাও শিল্প সংস্থাগুলির অতি-মুনাফা শুষে নেওয়া ও সম্পদ বিস্তারের একটি কৌশল। ২০১০-এর সময়কাল থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের নন-পারফর্মিং অ্যাসেট (এনপিএ) বা অনাদায়ী সম্পদে অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে ঋণের ভাগকে ছাপিয়ে গেছে অগ্রাধিকারহীন ক্ষেত্রগুলির ঋণের ভাগ। যেমন ২০০০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অনাদায়ী সম্পদ অগ্রাধিকারহীন ক্ষেত্রের ভাগ ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। ২০১৯-এ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ শতাংশে। আর এরা সকলেই বৃহৎ শিল্পমহলের ঋণগ্রহীতা, যাদের কাছে অনাদায়ী সম্পদের পরিমাণ উপরে উল্লিখিত সময়পর্বে বৃদ্ধি পেয়েছে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে।

২০১৪ থেকে ২০২৩-র মধ্যবর্তী সময়পর্বে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র রাজত্বে ১৪.৫৬ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ মকুব করে দিয়েছে ব্যাঙ্কগুলি। যা নিশ্চিতভাবেই পাহাড় প্রমাণ। প্রধানমন্ত্রী মোদী ক্ষমতায় আসার পর ঋণ মকুবের পরিমাণ তিনগুণ হয়েছে। এ থেকে স্পষ্টভাবেই বোঝা যায় যে সরকারের নীতিগুলি বৃহৎ শিল্পমহলের দিকেই বিপুলভাবে ঝুঁকে আছে। কোনও শিল্পপতিই সরকারি তহবিল থেকে আত্মসাৎ করা অর্থকে শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করে না। বরং তারা এই অর্থ চালনা করে মুনাফা আহরণ ও সম্পদ বিস্তারের লক্ষ্যে। এই সম্পদের যারা প্রকৃত স্রষ্টা, সেই শ্রমিকশ্রেণির দিকে এবারে দৃষ্টিপাত করা যাক। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২০-২১-এর মধ্যে সংগঠিত ক্ষেত্রে মজুরি বৃদ্ধির হার নেমে এসেছে মাত্র ৬ শতাংশে, যেটা এর আগেকার ৬ বছর সময়পর্বে ছিল ১০.১ শতাংশ। মুদ্রাস্ফীতির ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির নিরিখে তাঁদের প্রকৃত মজুরি কার্যক্ষেত্রে হ্রাস পেয়েছে। তাছাড়া, শিল্পক্ষেত্রে শ্রমিকরা যে মোট মূল্য যুক্ত (নেট ভ্যালু অ্যাডেড বা এনএভি) করে, সেখানে মজুরির ভাগ কমেছে ৩ শতাংশ। ২০২০ সালের ১৮.৯ থেকে ২০২৩ সালে কমে হয়েছে ১৫.৯ শতাংশ। একই সময়পর্বে যুক্ত হওয়া মোট মূল্যে মুনাফার ভাগ ৩৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫১.৯ শতাংশ। শ্রমিকদের এছাড়াও আরো একটি বঞ্চনার কারণ হচ্ছে, সরকারের তরফে ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা। দেশের অধিকাংশ স্থানে ওভারটাইমের যথাযথ ক্ষতিপূরণ তো দূরস্থান, ন্যূনতম মজুরিই দেওয়া হয় না। কাজের প্রহর ইচ্ছেমত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কোনও কোনও রাজ্যে কাজের প্রহর ১২ ঘন্টা, বা তার চেয়েও বেশি করার অনুমতি প্রদান করা হয়েছ। এই শোষণসর্বস্ব পরিস্থিতি শ্রমিকশ্রেণির সুপরিকল্পিত বঞ্চনার নির্মম চিত্রই তুলে ধরে।

যখনই শ্রমিকরা দাবি তোলেন ন্যূনতম মজুরির বাস্তবায়নের এবং তাদের শ্রমের মধ্য দিয়ে যুক্ত মূল্যের ন্যায়সঙ্গত অংশীদারির, তখনই অর্থের অপ্রতুলতার অজুহাত দেওয়া হয়, যা সর্বৈব মিথ্যা। একবার ভাবা যাক, ফি বছর কী হারে কর্পোরেট ট্যাক্স মকুবের মাধ্যমে সরকারি অর্থ রেহাই হয়। এই কর্পোরেট কর ছাড়ের জন্যে প্রতি বছর সরকারের ক্ষতি হয় ১.৪৫ লক্ষ কোটি টাকা। এই অর্থ বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বরাদ্দকৃত অর্থের যোগফলের চেয়েও বেশি।

সরকার যদি শ্রমিক কল্যাণের জন্য অর্থ সংস্থানের বিষয়ে সত্যিই ইচ্ছুক হত, তবে তার জন্যে সুস্পষ্ট বিকল্প পথ রয়েছে। একটি পথ হচ্ছে ঋণখেলাপী শিল্পমহলের সমস্ত অনাদায়ী ঋণ আদায় করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে প্রাথমিকভাবে গচ্ছিত রাষ্ট্রীয় অর্থ পরিশোধ করা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি ৪,১০,৭৫৮ কোটি টাকা অনাদায়ী ঋণ উদ্ধারে ১৬,৪২০টি মামলা দায়ের করেছে। ২০১৪ সাল থেকে সরকার ১৬.৬১ কোটি টাকার ঋণ মকুব করে দিয়েছে, যা মূলত বৃহৎ বাণিজ্য মহলকে উপকৃত করেছে। এই অর্থের পরিমাণ ২০২৫-২৬ বর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রায় এক তৃতীয়াংশ।

বিগত কয়েক বছর ধরে ট্রেড ইউনিয়নগুলি যে অর্থনৈতিক দাবিগুলি উত্থাপন করেছে, তার বেশিরভাগই পূরণ করা সম্ভব যদি ঋণখেলাপী শিল্পমহল থেকে সরকারি অর্থ উদ্ধার করে সেই অর্থ জনকল্যাণ খাতে চালিত করা যায়। এটা না করে শুধুমাত্র শ্রমিকরাই উপেক্ষিত হচ্ছে না, এর মধ্য দিয়ে জনগণের সুরক্ষার বিষয়ে সরকারের উদাসীনতাই পরিলক্ষিত হচ্ছে। ট্রেড ইউনিয়নসমূহের তরফে ধারাবাহিকভাবে দাবি করা হয়েছে সরকার কর্মক্ষেত্রে বিধিসম্মত সুরক্ষা সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিক পরিষেবা ব্যবহারকারী জনসাধারণের সুরক্ষারও ব্যবস্থা করুক।

এর জলজ্যান্ত উদাহরণ হচ্ছে রেল পরিষেবায় সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি উদাসীনতা। বছরের পর বছর ধরে রেল পরিকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়কে উপেক্ষা করে রেলযাত্রীদের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের বালেশ্বরে মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনায় ২৯২ যাত্রী প্রাণ হারানোর পর এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। সিএজি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেলপথ উন্নীতকরণের জন্যে প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থানে ঘাটতির পরিমাণ ১,০৩,৩৯৫ কোটি টাকা। তুলনায় স্মরণ করা যেতে পারে, ওই একই বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে ঋণ মকুবের পরিমাণ ছিল ১,৩৩,৯৪৫ কোটি টাকা। এতেই স্পষ্ট হয়ে যায় সরকারের অগ্রাধিকার কোথায়!

দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানে বরাদ্দ করে নবীন দক্ষ কর্মীদের নিযুক্তি না দিয়ে সরকার এখন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োগ করছে।

বছরে ২ কোটি নিয়োগের মাধ্যমে বিগত ১১ বছরে ২২ কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি রক্ষা দূরের কথা, সরকারি তৎপরতায়, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে, কর্মসংস্থান নিম্নমুখী হয়েছে। সরকারের নিজস্ব প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে কর্মী সংখ্যা ২০১৪ সালের ১৭.৩ লক্ষ থেকে ২০২২ সালে কমে হয়েছে ১৪.৬ লক্ষ। পাশাপাশি ঠিকা মজুরের হার ২০১৩ সালের ১৯ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে বেড়ে হেয়েছে ৪২.৫ শতাংশ।

একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির ক্ষেত্রেও। ২০১৪ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কর্মী সংখ্যা ছিল ৮,৪৪,৪৪৫, যা ২০২৩-এ দাঁড়িয়েছে ৭,৫৬,৬৪৪। ভারতে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের মোট কর্মীর হার এখন সারা বিশ্বে সর্বনিম্ন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে এর অংশীদারিত্ব মাত্র ৩.৮ শতাংশ, যেখানে ব্রাজিলে ১২.৩ শতাংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৩.৩ শতাংশ, আর্জেন্টিনায় ১৬.৯ শতাংশ, ব্রিটেনে ২১.৫ শতাংশ, চীনে ২৮ শতাংশ, রাশিয়ায় ৪০.৬ শতাংশ এবং কিউবায় ৭৭ শতাংশ।

সংরক্ষণের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়ের ব্যবস্থা রয়েছে শুধুমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে নিযুক্তির হ্রাস সামাজিকভাবে অবহেলিত অংশের সুযোগ সংকোচনও ঘটাচ্ছে যেহেতু বেসরকারি ক্ষেত্রে সংরক্ষণের নীতি বাস্তবায়িত হয় না। জনবিন্যাসের ক্ষেত্রে নবীনতর অংশের বিপুল  সংখ্যাধিক্যের বাড়তি সুবিধাটি বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও ব্যাপক কর্মচ্যুতির জন্যে।

এই অবিচারকে প্রত্যাহ্বান জানাতেই শ্রমিকশ্রেণি ঐক্য ও সম্মিলিত দরকষাকষি থেকে শক্তি সঞ্চয় করে, যে শক্তিকে সরকার দুর্বল করতে সরকার তৎপর। শ্রমকোডের প্রজ্ঞাপন শ্রমিকশ্রেণিকে দুর্বল করারই একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ, যাতে তারা পুঁজিপতি শ্রেণি বা বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। প্রধানমন্ত্রী মোদীর উদ্যোগে সরকার ২০২০ সালে জোর করে সংসদের দু’টি কক্ষে শ্রমকোডকে পাশ করিয়েছে। এই কোড ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে পদদলিত করতে চায়, ফলে তারা যথার্থভাবেই বলেছে যে নতুন আইন শ্রমিকদের অবশিষ্ট অধিকার এবং সুরক্ষা কেড়ে নেবে।

শ্রমিকশ্রেণির প্রতিরোধের মুখে সরকার এখন অবধি পুঁজিপতিদের স্বার্থবাহী শ্রমিক-বিরোধী এই শ্রম আইনকে বাস্তবায়িত করতে পারেনি। এখন তারা রাজ্য সরকারগুলির ওপর চাপ দিচ্ছে একই ধরনের আইন রাজ্যস্তরে পাশ করানোর জন্যে এবং বহু রাজ্য এই শ্রম কোডের ধারাতে আইন পাশও করে ফেলেছে। এই প্রচেষ্টাগুলিকে রুখে দিতে না পারলে শ্রমিকশ্রেণির অধিকার রক্ষা করা যাবে না। এটা খুবই আনন্দের বিষয় যে ট্রেড ইউনয়নগুলি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ করেনি। একইসঙ্গে কৃষক, খেতমজুর এবং জনগণের অন্যান্য অংশের দাবিদাওয়াকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক দল হিসেবে সিপিআই(এম) ট্রেড ইউনিয়নসমূহের ডাকা ৯ জুলাইয়ের সাধারণ ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপনকে একটি দায়িত্ব মনে করে। সমন্ত পার্টি শাখাগুলি সক্রিয়ভাবে প্রচারে অংশ নিয়ে এই ধর্মঘটকে সফল করার লক্ষ্যে জনগনকে সংগঠিত করায় ভূমিকা পালন করবে।

পার্টি একইসঙ্গে শ্রমিকশ্রেণির উপর সংগঠিত আক্রমণের নেপথ্যে থাকা রাজনীতিকে উন্মোচিত করে শ্রমিকশ্রেণির পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরবে। এই আক্রমণ শুধুমাত্র শ্রমিকশ্রেণির অধিকারের উপর আক্রমণই নয়। এর মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক চরিত্রের উপর আক্রমণ শানানো হচ্ছে। তাছাড়া, শাসকশ্রেণি তাদের প্রতিনিধি বিজেপি আরএসএস-এর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়িয়ে শ্রমিকশ্রেণি ও শ্রমজীবী জনগণের অন্যান্য অংশের ঐক্য ভেঙে দিতে চাইছে। এটা নয়া ফ্যাসিবাদের পথে শাসকশ্রেণির এগিয়ে যাওয়ারই একটি পদক্ষেপ। যা মতপ্রকাশের অধিকার ও পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে রূপায়িত হচ্ছে। এই সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিত সিপিআই(এম)-কে শ্রমিকশ্রেণির পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে বৃহৎ পুঁজিপতিদের স্বার্থবাহী গরিব-বিরোধী বিজেপি সরকারে বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশ করছে।

শিরোনাম মার্কসবাদী পথের
ভাষান্তর: শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার


প্রকাশের তারিখ: ২৯-জুন-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org