|
মাও প্রসঙ্গেচীনের পার্টির দলিল |
যেহেতু চীনে বুর্জোয়া গণতন্ত্র ছিল না এবং সশস্ত্র শক্তির দাপটে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকশ্রেণীগুলো জনগণের উপর তাদের সন্ত্রাসমূলক একনায়কত্ব কায়েম করে রেখেছিল সেহেতু চীন-বিপ্লব দীর্ঘকাল স্থায়ী সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ না নিয়ে পারে না। চীনের সশস্ত্র সংগ্রাম সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বাধীন একটি বিপ্লবী যুদ্ধ যার প্রধান শক্তি ছিল কৃষক সাধারণ। কৃষক সাধারণ সর্বহারাশ্রেণীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র। |
১৯৮১ সালের ২৭ জুন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির একাদশ কেন্দ্রীয় কমিটির ষষ্ঠ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে একটি পর্যালোচনা মূলক দলিল গৃহীত হয়। যার শিরোনাম: ‘গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর পার্টির ইতিহাসের কতকগুলো প্রশ্ন সম্পর্কে প্রস্তাব (১৯৪৯-১৯৮১)’। এই দলিলের অন্যতম বিষয়বস্তু ছিল চীন বিপ্লবে ‘কমরেড মাও জে দঙয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং মাও জে দঙয়ের চিন্তাধারা’। ১। কমরেড মাও জে দঙ ছিলেন একজন মহান মার্কসবাদী এবং একজন মহান সর্বহারা বিপ্লবী, রণনীতিবিদ ও তত্ত্ববিদ। এ কথা সত্য যে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের’ সময়ে তাঁর গুরুতর ভুল হয়েছিল। কিন্তু তাঁর সারা জীবনের তৎপরতা সামগ্রিকভাবে বিচার করলে দেখা যায় যে, চীন বিপ্লবে তাঁর যে অবদান তা তাঁর ভুলগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। তাঁর সুকৃতিই মুখ্য, তাঁর ভুলগুলো গৌণ। আমাদের পার্টি ও চীনা গণমুক্তি ফৌজের প্রতিষ্ঠায় ও পরিবর্ধনে, চীনের সকল জাতির জনগণের মুক্তিব্রতের বিজয় অর্জনে, চীন গণসাধারণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় এবং আমাদের সমাজতান্ত্রিক ব্রতের অগ্রগতিতে তিনি অক্ষয় কীর্তি স্থাপন করেছেন। পৃথিবীর নিপীড়িত জাতিগুলোর মুক্তির জন্য ও মানব প্রগতির জন্য তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। ২। কমরেড মাও জে দঙ যাঁদের প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন সেই চীনের কমিউনিস্টরা দীর্ঘকালীন বিপ্লবে সঞ্চিত চীনের নিজস্ব অভিজ্ঞতাগুলোকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূলনীতি অনুসারে তত্ত্বগতভাবে সমন্বিত করেছিলেন। এই তত্ত্বগত সমন্বয় চীনের অবস্থার উপযোগী বিজ্ঞানসম্মত কতকগুলো পথনির্দেশক নীতিমালায় রূপ নিয়েছিল। এই সমন্বয়ের নামই হল মাও জে দঙ চিন্তাধারা। মাও জে দঙ চিন্তাধারা হচ্ছে চীন বিপ্লবের বাস্তব অনুশীলনের সঙ্গে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিশ্বজনীন মূলনীতিগুলোর একীকরণের ফল। প্রাচ্যের একটি বিশাল আধা-ঔপনিবেশিক ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক দেশের বিপ্লবে এমন অনেক বিশেষ প্রকৃতির ও জটিল ধরনের সমস্যা দেখা দিতে বাধ্য, যা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সাধারণ সূত্রগুলো আউড়ে বা অন্য দেশের অভিজ্ঞতা হুবহু নকল করে সমাধান করা যায় না। মার্কসবাদকে একটি অন্ধবিশ্বাসমূলক বদ্ধ মতবাদে পরিণত করবার এবং কমিন্টার্নের প্রস্তাবগুলোকে আর সোভিয়েত ইউনিয়নের অভিজ্ঞতাকে পূজা করবার একটা ভুল প্রবণতা প্রধানত বিশের দশকের শেষ দিকে আর তিরিশের দশকের প্রথম দিকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে এবং আমাদের পার্টির ভেতরে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল এবং এই প্রবণতা চীনের বিপ্লবকে চূড়ান্ত ব্যর্থতার মুখে ঠেলে দিতে উপক্রম হয়েছিল। এই ভুল প্রবণতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালানোর এবং এ ব্যাপারে গভীরভাবে আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সার-সঙ্কলন করার প্রক্রিয়াই মাও জে দঙ চিন্তাধারার রূপ নিয়েছে এবং মাও জে দঙ চিন্তাধারার বিকাশ হয়েছে। ভূমি-বিপ্লবের যুদ্ধের শেষভাগে এবং জাপান-বিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধের সময়ে মাও জে দঙ চিন্তাধারা সুসংবদ্ধ হয়, ভিন্ন ভিন্ন বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রসারিত হয় এবং ক্রমে সুপরিণত হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এবং চীন গণসাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর মাও জে দঙ চিন্তাধারার আরও বিকাশ হয়েছে। মাও জে দঙ চিন্তাধারা হচ্ছে চীনে প্রযুক্ত ও বিকশিত মার্কসবাদ-লেনিনবাদ। মাও জে দঙ চিন্তাধারায় আছে একটি সঠিক তত্ত্ব, সঠিক নীতিমালা এবং অভিজ্ঞতার সার-সঙ্কলন; এগুলো সবই চীনের বিপ্লবের বাস্তব অনুশীলন ক্ষেত্রে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়ে গেছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির যৌথ প্রজ্ঞাই দানা বেঁধে মাও জে দঙ চিন্তাধারায় রূপ নিয়েছে। মাও জে দঙ চিন্তাধারার গঠনে ও বিকাশে আমাদের পার্টির অনেক বিশিষ্ট নেতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে এবং এইসব অবদান কমরেড মাও জে দঙ-এর বিজ্ঞানভিত্তিক রচনাবলীতে সমন্বিত করা হয়েছে। ৩। বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে মাও জে দঙ চিন্তাধারার ক্ষেত্র অত্যন্ত ব্যাপক। মাও জে দঙ চিন্তাধারা এমন একটি বিশিষ্ট সৃজনশীল তত্ত্ব যা মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে সমৃদ্ধ ও বিকশিত করেছে ক) নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পর্কে: চীনের ঐতিহাসিক ও সামাজিক অবস্থা থেকে অগ্রসর হয়ে কমরেড মাও জে দঙ চীন-বিপ্লবের বৈশিষ্ট্যগুলো ও নিয়মসূত্রগুলোর গভীর সমীক্ষা করে গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্ব সম্পর্কে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্ব প্রয়োগ করেছেন ও বিকশিত করেছেন এবং নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব হলো সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলাতান্ত্রিক-পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে ব্যাপক জনগণের দ্বারা চালিত বিপ্লব। এ বিষয়ে তাঁর প্রধান প্রধান রচনাবলীর মধ্যে আছে চীনা সমাজের শ্রেণী বিশ্লেষণ, হুনানে কৃষক আন্দোলনের তদন্ত রিপোর্ট, একটিমাত্র স্ফুলিঙ্গ দাবানলের সৃষ্টি করতে পারে, ‘কমিউনিস্ট’ পত্রিকার উদ্বোধন উপলক্ষে, নয়া গণতন্ত্র প্রসঙ্গে, যুক্ত সরকার প্রসঙ্গে এবং বর্তমান পরিস্থিতি ও আমাদের কর্তব্য। এই তত্ত্বের মূল কথাগুলো হলো: এক।। চীনের বুর্জোয়া শ্রেণীর ছিল দুটো অংশ – বৃহৎ বুর্জোয়াশ্রেণী (অর্থাৎ মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণী বা আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়াশ্রেণী) যা সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল ছিল, আর জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণী, যার ছিল বিপ্লবের দিকে ঝোঁক, কিন্তু যার প্রকৃতি ছিল দোদুল্যমান। সর্বহারাশ্রেণীর উচিত তাঁর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টে জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণীকে অংশ নেওয়ানোর প্রচেষ্টা চালানো, এমনকি বিশেষ অবস্থায় বৃহৎ বুর্জোয়াশ্রেণীর এক অংশকেও যুক্তফ্রন্টে অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে যতদূর পর্যন্ত সম্ভব প্রধান শত্রুকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা যায়। বুর্জোয়াশ্রেণীর সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার সময়ে সর্বহারাশ্রেণীকে নিজের স্বাধীন সত্ত্বা বজায় রাখতে হবে এবং ‘ঐক্য, সংগ্রাম ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঐক্যের’ নীতি অনুসরণ করতে হবে; সর্বহারাশ্রেণী যখন বুর্জোয়াশ্রেণীর সঙ্গে, প্রধানত বৃহৎ বুর্জোয়াশ্রেণীর সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করতে বাধ্য হবে তখন বৃহৎ বুর্জোয়াশ্রেণীর বিরুদ্ধে সর্বহারাশ্রেণীকে দৃঢ়ভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম চালানোর সাহস ও সামর্থ্য রাখতে হবে এবং একই সময়ে জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণীর সহানুভূতি অব্যাহত অর্জন করে চলতে হবে অথবা এই শ্রেণীকে নিরপেক্ষ করে রাখতে হবে। দুই।। যেহেতু চীনে বুর্জোয়া গণতন্ত্র ছিল না এবং সশস্ত্র শক্তির দাপটে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকশ্রেণীগুলো জনগণের উপর তাদের সন্ত্রাসমূলক একনায়কত্ব কায়েম করে রেখেছিল সেহেতু চীন-বিপ্লব দীর্ঘকাল স্থায়ী সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ না নিয়ে পারে না। চীনের সশস্ত্র সংগ্রাম সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বাধীন একটি বিপ্লবী যুদ্ধ যার প্রধান শক্তি ছিল কৃষক সাধারণ। কৃষক সাধারণ সর্বহারাশ্রেণীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র। সর্বহারাশ্রেণীর পক্ষে নিজেদের অগ্রণী অংশের মাধ্যমে নিজেদের প্রগতিশীল মতাদর্শ, সংগঠনবোধ ও শৃঙ্খলাবোধের সাহায্যে কৃষক সাধারণের রাজনৈতিক চেতনা উন্নত করা, বিভিন্ন গ্রামীণ ঘাঁটি-এলাকা কায়েম করা, দীর্ঘকালীন বিপ্লবী যুদ্ধ চালানো এবং বিপ্লবী শক্তিগুলোকে গড়ে তোলা ও বাড়ানো সম্ভব এবং প্রয়োজন। কমরেড মাও জে দঙ উল্লেখ করেছিলেন যে, ‘যুক্তফ্রন্ট ও সশস্ত্র সংগ্রাম হচ্ছে শত্রুকে পরাজিত করার দুটো মূল অস্ত্র।’ এর সঙ্গে পার্টি গঠনকে ধরে বিপ্লবের আছে ‘তিনটি যাদু অস্ত্র।’ এগুলোই ছিল মূল ভিত্তি যার জোরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সমগ্র জাতির নেতৃত্বের কেন্দ্রকোষে পরিণত হতে পেরেছিল এবং গ্রামাঞ্চল দিয়ে শহরকে ঘেরাও করার এবং অবশেষে দেশব্যাপী বিজয় অর্জনের পথ নিরূপণ করতে পেরেছিল। খ) সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক গঠনকাজ সম্পর্কে: নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের ফলে সমাজতন্ত্রের উত্তরণের যেসব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শর্ত উদ্ভূত হয়েছিল সেগুলোর ভিত্তিতে কমরেড মাও জে দঙ ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সমাজতান্ত্রিক শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গেই যুগপৎভাবে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর বাস্তবায়িত করার পথ অনুসরণ করেছিলেন ও উৎপাদন-উপকরণগুলোর ব্যক্তিগত মালিকানাকে ক্রমান্বয়ে রূপান্তরিত করার বিশেষ বিশেষ নির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করেছিলেন এবং এইভাবে চীনের মতো অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে পশ্চাৎপদ ও বিশ্বজনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ অধ্যুষিত একটি বিরাট দেশে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার দুরূহ কর্তব্যের একটি তত্ত্বগত ও বাস্তব সমাধান উপস্থিত করেছিলেন। জনগণের জন্য গণতন্ত্র ও প্রতিক্রিয়াশীলদের উপর একনায়কত্ব সম্মিলিতভাবে হয় জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব— এই মতবাদ উপস্থিত করে কমরেড মাও জে দঙ সর্বহারা একনায়কত্ব সম্পর্কে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্বকে সমৃদ্ধ করেছেন। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবার পর কমরেড মাও জে দঙ উল্লেখ করেছিলেন যে, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের মৌলিক স্বার্থ একই হয়, কিন্তু তাঁদের ভেতরে নানা ধরনের দ্বন্দ্ব বিরাজ করতে থাকে। জনগণ ও শত্রুদের মধ্যে যেসব দ্বন্দ্ব এবং জনগণের নিজেদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব— এই দুই প্রকৃতির দ্বন্দ্বকে কড়াকড়ি পৃথকভাবে চিনতে হবে এবং সঠিকভাবে এগুলোর বিহিত করতে হবে। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে, জনগণের ভেতরে আমাদের কতকগুলো সঠিক নীতি পালন করতে হবে। রাজনৈতিক ব্যাপারে ‘ঐক্য-সমালোচনা-ঐক্য’ এই নীতি আমাদের অনুসরণ করতে হবে, গণতান্ত্রিক পার্টিগুলোর সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘দীর্ঘমেয়াদী সহ অবস্থান ও পারস্পরিক তত্ত্বাবধান’ নীতি অনুসরণ করতে হবে, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ‘শত ফুল ফুটুক, শত ভাবধারার মধ্যে প্রতিযোগিতা চলুক’— এই নীতি অনুসরণ করতে হবে এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সারা দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন সামাজিক স্তরের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার নীতি এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ, যৌথ সংস্থার স্বার্থ ও ব্যক্তির স্বার্থ— এই তিন স্বার্থই বিবেচনা করার নীতি অনুসরণ করতে হবে। তিনি বার বার জোর দিয়ে বলেছিলেন, যান্ত্রিকভাবে বিদেশের অভিজ্ঞতাকে যথাবস্থায় উপড়ে এনে এখানে খাটাতে যাওয়া আমাদের উচিত নয়, বরং আমাদের উচিত, চীন যে একটি বৃহৎ কৃষিপ্রধান দেশ, এই বাস্তব সত্য অনুধাবন করে কৃষিকে অর্থনীতির ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করে, কৃষি ও হাল্কা শিল্পের সঙ্গে ভারী শিল্পের সম্পর্ক সঠিকভাবে পরিচালনা করে, কৃষি ও হাল্কা শিল্পের উন্নয়নের উপর যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করে, চীনের অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে আমাদের শিল্পায়নের নিজস্ব পথ খুঁজে বার করা। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, সমাজতান্ত্রিক গঠনকাজে অর্থনৈতিক গঠনকাজ ও প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার মধ্যে যে সম্পর্ক, বৃহদায়তন শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং মাঝারি ও ক্ষুদ্রায়তন শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যে সম্পর্ক, হান জাতি ও সংখ্যালঘু জাতিগুলোর মধ্যে যে সম্পর্ক, উপকূলীয় অঞ্চল ও অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের মধ্যে যে সম্পর্ক, কেন্দ্র ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে যে সম্পর্ক এবং আত্মনির্ভরতা ও অন্যান্য দেশ থেকে শিক্ষা নেওয়ার মধ্যে যে সম্পর্ক— সেইসব সম্পর্ক আমাদের সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে এবং পুঁজি সঞ্চিত হতে থাকা এবং পণ্যের ভোগ-ব্যবহারের মধ্যে যে সম্পর্ক সেটাও আমাদের ঠিকমতো পরিচালনা করতে হবে ও সার্বিক ভারসাম্যের দিকে আমাদের মনোযোগ রাখতে হবে। তাছাড়া তিনি জোরালোভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে,শ্রমিকরাই তাঁদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক; ক্যাডারদের উচিত দৈহিক পরিশ্রমে অংশ নেওয়া আর শ্রমিকদের উচিত ব্যবস্থাপনায় অংশ নেওয়া; যৌক্তিকতাবিহীন নিয়মবিধিগুলোর সংস্কার করতে হবে; এবং প্রযুক্তিবিদ, শ্রমিক ও ক্যাডার এই তিন নিয়ে একটি মিলিত বিন্যাস কার্যকর করতে হবে। তিনি এই রণনীতিগত ধারণা উপস্থাপিত করেছিলেন যে সারাদেশের সকল জাতির জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক দেশ গড়ে তুলতে যাবতীয় ইতিবাচক উপাদানকে স্ফূর্ত করে কাজে লাগাতে হবে এবং নেতিবাচক উপাদানগুলোকে ইতিবাচক উপাদানে পরিণত করতে হবে। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক গঠনকাজ সম্পর্কে কমরেড মাও জে দঙ-এর গুরুত্বপূর্ণ চিন্তারাজি মুখ্যত যে সব গুরুত্বপূর্ণ রচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সপ্তম কেন্দ্রীয় কমিটির দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে প্রদত্ত রিপোর্ট, জনগণতান্ত্রিক একনায়কত্ব সম্পর্কে, দশটি প্রধান সম্পর্ক প্রসঙ্গে, জনগণের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের সঠিক মীমাংসার সমস্যা সম্পর্কে এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক আহূত পরিবর্ধক কর্ম-সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণ। গ। বিপ্লবী সৈন্যবাহিনীর গঠন ও সামরিক রণনীতি সম্পর্কে: প্রধানত কৃষকদের নিয়ে গঠিত একটি বিপ্লবী বাহিনীকে কী করে এমন একটি নতুন ধরনের গণ-বাহিনীতে পরিণত করা যায়, যে-বাহিনীর আছে সর্বহারা শ্রেণীপ্রকৃতি, যে-বাহিনী কঠোর শৃঙ্খলা পালন করে, এবং জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ গড়ে তোলে এই সমস্যা কমরেড মাও জে দঙ ধারাবাহিক প্রণালীতে সমাধান করেছিলেন। তিনি স্থির করে দিয়েছিলেন যে, গণফৌজের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে মনেপ্রাণে জনগণের সেবা করা। তিনি এই মূল নীতি ধার্য করেছিলেন যে, পার্টির আজ্ঞাধীন বন্দুক, বন্দুকের আজ্ঞাধীন পার্টি নয়। তিনি শৃঙ্খলার তিনটি প্রধান নিয়ম ও মনোযোগ রাখবার আটটি দফা প্রণয়ন করেছিলেন এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক গণতন্ত্র পালন করার উপর, সামরিক অফিসার ও সৈন্যদের ঐক্যের নীতির উপর, সৈন্যবাহিনী ও জনগণের ঐক্যের নীতির উপর এবং শত্রুশক্তিকে ছত্রভঙ্গ ও বিক্ষিপ্ত করে দেওয়ার নীতির উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন এবং এইভাবে, সারসঙ্কলন করার মাধ্যমে সৈন্যবাহিনীর মধ্যে রাজনৈতিক কাজকর্ম চালানো সংক্রান্ত কতকগুলো ধারাবাহিক নীতি ও পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন। পার্টির ভেতরকার ভ্রান্ত ধারণাগুলোর সংশোধন সম্পর্কে, চীনের বিপ্লবী যুদ্ধে রণনীতির সমস্যাবলী, জাপানের বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধে রণনীতির সমস্যাবলী, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সম্পর্কে, যুদ্ধ ও রণনীতির সমস্যাবলী প্রভৃতি সামরিক রচনাবলীতে কমরেড মাও জে দঙ চীনের দীর্ঘস্থায়ী বিপ্লবী যুদ্ধের অভিজ্ঞতাগুলোর সারসঙ্কলন করেছিলেন এবং জনগণের সৈন্যবাহিনী গঠন করার এবং প্রধান শক্তি হিসাবে জনগণের সৈন্যবাহিনীকে নিয়োজিত করে জনসাধারণের উপর নির্ভর করে গ্রামীণ ঘাঁটি-এলাকা তৈরি করার ও জনযুদ্ধ চালানোর সর্বসমন্বিত মতবাদ তুলে ধরেছিলেন। গেরিলা যুদ্ধকে রণনীতির পর্যায়ে তুলে তিনি এই মত প্রকাশ করেছিলেন যে, চীনের বিপ্লবী যুদ্ধে দীর্ঘকাল ধরে ক্রিয়াকলাপের প্রধান রূপ হবে গেরিলা যুদ্ধ ও গেরিলাধর্মী চলমান যুদ্ধ। তিনি ব্যখ্যা করেছিলেন যে, শত্রু ও আমাদের মধ্যে শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তন হতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে এবং যুদ্ধ এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক রণনীতিতেও যথোচিত পরিবর্তন ঘটানো দরকার হবে। যখন শত্রু ছিল শক্তিশালী আর আমরা ছিলাম দুর্বল সেই অবস্থায় বিপ্লবী বাহিনী কর্তৃক জনযুদ্ধ চালানোর রণনীতি ও রণকৌশল তিনি প্রণয়ন করেছিলেন। এইসব রণনীতি ও রণকৌশলের মধ্যে আছে: রণনীতিগতভাবে দীর্ঘকালীন যুদ্ধ চালানো এবং নির্দিষ্ট অভিযান ও খন্ডযুদ্ধগলোর ত্বরিত নিষ্পত্তি করা, নির্দিষ্ট অভিযান ও খন্ডযুদ্ধ রণনীতিগত অপকর্ষের অবস্থাকে উৎকর্ষের অবস্থায় রূপান্তরিত করা এবং উৎকৃষ্টতর শক্তি কেন্দ্রীভূত করে শত্রুবাহিনীকে এক এক করে ধ্বংস করা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি সামরিক তৎপরতার প্রখ্যাত দশটি প্রধান নীতি প্রণয়ন করেছিলেন। এইসব ভাবধারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সামরিক তত্ত্বে কমরেড মাও জে দঙ-এর বিশিষ্ট অবদান। চীন গণসাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তিনি গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশক চিন্তাধারা উপস্থাপিত করেছিলেন যে, আমাদের জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, আধুনিক বিপ্লবী সশস্ত্র শক্তি (নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী ও বিভিন্ন প্রকৌশলমূলক শাখাসহ) গড়ে তুলতে হবে এবং আধুনিক (আত্মরক্ষামূলক পারমাণবিক অস্ত্রসহ) প্রতিরক্ষা প্রকৌশলের উন্নতি করতে হবে। ঘ। নীতি ও কর্মকৌশল প্রসঙ্গে: কমরেড মাও জে দঙ বিপ্লবী সংগ্রামে নীতি ও কর্মকৌশলের অপরিসীম গুরুত্ব গভীরভাবে ও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: নীতি ও কর্মকৌশল পার্টির প্রাণ ও বিপ্লবী পার্টির যাবতীয় বাস্তব ক্ষেত্রের কার্যকলাপের সূচনাস্থল ও লব্ধ ফল। বিরাজমান রাজনৈতিক অবস্থা, শ্রেণীগুলোর মধ্যেকার সম্পর্কগুলো, বাস্তব পরিস্থিতি ও তার পরিবর্তনগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে পার্টিকে নিজের নীতি প্রণয়ন করতে হবে এবং কর্মনীতি ও নমনীয়তার সমন্বয় করতে হবে। শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম, যুক্তফ্রন্ট এবং অন্যান্য প্রশ্নে তিনি নীতি ও কর্মকৌশল সংক্রান্ত বহু মূল্যবান প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে তিনি বলেছিলেন: পরিবর্তনশীল আত্মমুখী ও বাস্তব অবস্থায় একটি দুর্বল বিপ্লবী শক্তি শেষ পর্যন্ত একটি বলবান প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে পরাজিত করতে পারে; রণনীতির দিক থেকে আমাদের শত্রুকে তুচ্ছ মনে করতে হবে এবং রণকৌশলের দিক থেকে শত্রুকে গুরুত্ব দিতে হবে; সংগ্রামের প্রধান লক্ষ্যবস্তুর উপর আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে এবং এলোপাতাড়ি সবদিকেই আঘাত হানলে চলবে না; আমাদের বিভিন্ন শত্রুদের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে ও তাদের খন্ড খন্ড ভাবে বিভক্ত করতে হবে, এবং বিভিন্ন দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে অধিকাংশ লোককে আমাদের পক্ষে টানার, অল্প লোকের বিরোধিতা করার এবং এক এক করে শত্রুদের চূর্ণবিচূর্ণ করার কর্মকৌশল অবলম্বন করতে হবে; প্রতিক্রিয়াশীল শাসনাধীন এলাকায় আমাদের আইনসম্মত সংগ্রাম ও বেআইনী সংগ্রাম সম্মিলিত করতে হবে, এবং সাংগঠনিকভাবে, আমাদের কিছু বাছাই-করা ক্যাডারকে গোপন কাজকর্মের দায়িত্ব দেওয়ার নীতি অবলম্বন করতে হবে; পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীভুক্ত লোকদের ও প্রতিক্রিয়াশীল লোকদের ব্যাপারে আমাদের উচিত, যে পর্যন্ত তারা বিদ্রোহ না করছে বা গোলযোগ সৃষ্টি না করছে, ততদিন পর্যন্ত তাদের জীবিকা নির্বাহ করার এবং নিজেদের পরিশ্রমের উপর নির্ভরকারী মেহনতী মানুষে পরিণত হওয়ার সুযোগ দেওয়া; নিজেদের মিত্রদেরকে নেতৃত্ব দিতে সর্বহারাশ্রেণীকে ও তার পার্টিকে অবশ্যই দুটো শর্ত পূরণ করতে হবে; প্রথমত, অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে দৃঢ় সংগ্রামে তাদের অনুগামীদের পরিচালিত করা এবং বিজয় অর্জন করা। দ্বিতীয়ত, অনুগামীদের বস্তুগত উপকার দেওয়া অথবা অন্তত তাদের স্বার্থহানি এড়ানো এবং সেই সঙ্গেই তাদের রাজনৈতিক শিক্ষা দেওয়া। নীতি ও কর্মকৌশল সম্পর্কে কমরেড মাও জে দঙ-এর এইসব চিন্তা-ভাবনাকে রূপ দেওয়া হয়েছে তাঁর অনেকগুলি রচনায়, বিশেষকরে নিম্নোক্ত রচনাগুলোতে; জাপ-বিরোধী যুক্তফ্রন্টে বর্তমান রণকৌশলগত সমস্যাবলী, কর্মনীতি প্রসঙ্গে, কমিউনিস্ট-বিরোধী দ্বিতীয় আক্রমণ-অভিযান পর্যুদমনের সার-সঙ্কলন, পার্টির বর্তমান নীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা প্রসঙ্গে, এলোপাতাড়ি সবদিকেই আঘাত হানবেন না, সাম্রাজ্যবাদ ও যাবতীয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিই আসল বাঘ কিনা এই প্রশ্ন সম্পর্কে। ঙ। মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক কাজকর্ম এবং সাংস্কৃতিক কাজকর্ম সম্পর্কে (নয়া গণতন্ত্র প্রসঙ্গে) তাঁর রচনাটিতে কমরেড মাও জে দঙ উল্লেখ করেছিলেন: ‘একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি (একটি মতাদর্শগত রূপ হিসেবে) হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সমাজের রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রতিফলন, আবার সেই নির্দিষ্ট সমাজের রাজনীতি ও অর্থনীতির উপর বিরাট প্রভাব ও কার্যকারিতা বিস্তারকারী; অর্থনীতি হচ্ছে বুনিয়াদ, আর রাজনীতি হচ্ছে অর্থনীতির কেন্দ্রীভূত অভিব্যক্তি।’ এই মূলগত দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী তিনি অনেক সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদী তাৎপর্যসম্পন্ন চিন্তা-ভাবনা উপস্থাপিত করেছিলেন। যেমন, তাঁর এইসব তত্ত্ব: মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক কার্যকলাপ হচ্ছে অর্থনীতি ও অন্যান্য যাবতীয় ক্ষেত্রের কার্যকলাপের প্রাণ-সূত্র, রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতিকে, এবং রাজনীতির সঙ্গে পেশাগত দক্ষতাকে সমন্বিত করতে হবে এবং একাধারে লাল ও বিশেষজ্ঞ হতে হবে; বিজ্ঞানসম্মত জাতীয় গণসংস্কৃতি গড়ে তোলার নীতি, শত ফুল ফুটতে দেওয়ার, পুরাতনের মধ্যে যা কিছু আগাছা, তা উপড়ে ফেলে নতুনকে আবির্ভূত হতে দেওয়ার, অতীতকে বর্তমানের সেবায় লাগানো আর বিদেশী জিনিসকে চীনের সেবায় লাগানোর নীতি; বিপ্লবে ও গঠনকাজে বুদ্ধিজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা সম্পর্কে এবং শ্রমিক-কৃষকদের সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের নিজেদের এক করে দেখবার প্রয়োজন সম্পর্কে এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ অধ্যয়ন করে, সমাজ সমীক্ষণ করে ও বাস্তব কাজকর্মের মাধ্যমে বুদ্ধিজীবীদের সর্বহারা বিশ্ববীক্ষা গড়ে তোলার প্রয়োজন সম্পর্কে মতবাদ। তিনি বলেছিলেন: ‘কাদের জন্য কাজ’— এই প্রশ্নটি একটি মৌলিক প্রশ্ন; এটি একটি নীতিগত প্রশ্ন’, এবং জোর দিয়ে বলেছিলেন, আমাদের মনেপ্রাণে জনগণকে সেবা করতে হবে, বিপ্লবী কাজের ব্যাপারে অত্যন্ত দায়িত্বশীল থাকতে হবে, কঠোরভাবে সংগ্রাম চালাতে হবে এবং আত্মত্যাগে নির্ভয় থাকতে হবে। মতাদর্শ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে এখনও কমরেড মাও জে দঙ-এর অনেকগুলো অসামান্য রচনার বিরাট তাৎপর্য রয়েছে, যেমন যুব আন্দোলনের অভিমুখ, বিপুল সংখ্যায় বুদ্ধিজীবিদের সংগ্রহ করা, সাহিত্য ও শিল্পকলা সম্পর্কে ইয়েনানের আলোচনা সভায় প্রদত্ত ভাষণ, নর্ম্যান বেথুনের স্মরণে, জনগণের সেবা করুন এবং যে বোকা বুড়ো লোকটি পাহাড় সরিয়েছিল। চ। পার্টি-গঠন সম্পর্কে: যে দেশের লোকসংখ্যার বেশিরভাগই কৃষক এবং পেটি বুর্জোয়াশ্রেণীর অন্যান্য অঙ্গ, যে দেশে সর্বহারা শ্রেণী সংখ্যার দিক দিয়ে কম হলেও কার্যকর সংগ্রামশক্তিতে প্রবল, এমন একটি দেশে একটি গণধর্মী সর্বহারা মার্কসবাদী পার্টি গঠন করা একটি অত্যন্ত দুরূহ কর্ম। পার্টি-গঠন সম্পর্কে কমরেড মাও জে দঙ-এর তত্ত্ব সার্থকভাবে এই সমস্যার সমাধান করেছে। এক্ষেত্রে তাঁর কয়েকটি প্রধান প্রধান রচনা হচ্ছে, উদারতাবাদের বিরোধিতা করুন, জাতীয় যুদ্ধে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা, আমাদের অধ্যয়ন সংস্কার করুন, পার্টির কর্মরীতি সংশোধন করুন, একঘেয়ে পার্টি-রচনার বিরোধিতা করুন, আমাদের অধ্যয়ন ও বর্তমান পরিস্থিতি, পার্টি-কমিটির ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা সম্পর্কে এবং পার্টি-কমিটির কর্মপদ্ধতি। মতাদর্শগতভাবে পার্টি গড়ে তোলার উপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে, পার্টি সদস্যদের শুধু সাংগঠনিকভাবে নয়, মতাদর্শগতভাবেও পার্টিতে যোগ দেওয়া উচিত এবং অবিরতভাবে তার অসর্বহারা ধ্যান-ধারণার সংস্কার করা উচিত এবং সেসবের জায়গায় সর্বহারা ধ্যান-ধারণা আত্মস্থ করা উচিত। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, তত্ত্ব ও অনুশীলন একীকরণের কর্মরীতি, জনসাধারণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ কায়েমের কর্মরীতি ও আত্মসমালোচনা করার কর্মরীতি চীনের অন্য সমস্ত পার্টির থেকে কমিউনিস্ট পার্টির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য চিন্হিত করে। পার্টির ভেতরকার সংগ্রামে একসময়ে অনুসৃত ‘‘নিষ্করুণ সংগ্রাম ও নির্মম আঘাত হানার, ‘বামঝোঁকের’ ভুল নীতির বিরুদ্ধে তিনি ‘অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতের ভুল এড়ানোর ও রোগ সারিয়ে রোগীকে বাঁচানোর’’ সঠিক নীতি উপস্থাপিত করেছিলেন এবং পার্টির ভেতরকার সংগ্রামে মতাদর্শগুলো প্রাঞ্জলতা এবং কমরেডদের ঐক্যের লক্ষ্য হাসিলের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। সমালোচনা ও আত্মসমালোচানার পদ্ধতি প্রয়োগ করে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শগত শিক্ষাদানের উপায় হিসাবে তিনি সারা পার্টিতে শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। আমাদের পার্টি যখন সারাদেশে নেতৃত্বদানকারী ক্ষমতাসীন পার্টিতে পরিণত হতে যাচ্ছিল এবং তারপর পরিণত হয়েছিল সে-সময়ে চীন গণসাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে এবং পরবর্তীকালেও বার বার কমরেড মাও জে দঙ এই আহ্বান জানিয়েছিলেন যে, আমরা যেন বিনয়ী ও বিচক্ষন থাকি, অহঙ্কার ও অসহিষ্ণুতা সম্বন্ধে সজাগ থাকি, সাদাসিধেভাবে জীবনযাপন করা এবং কঠোরভাবে সংগ্রাম করার রেওয়াজ বজায় রাখি, বুর্জোয়া মতাদর্শের ভয়ঙ্কর প্রভাবের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকি এবং আমলাতান্ত্রিকতার বিরোধিতা করি, কারণ আমলাতান্ত্রিকতা জনসাধারণ থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ৪। মাও জে দঙ চিন্তাধারার উপরোক্ত অঙ্গগুলোতে যে মতাধিষ্ঠান, দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতি বিধৃত, সেগুলোই মাও জে দঙ চিন্তাধারার প্রাণ স্বরূপ। এই মতাধিষ্ঠান, দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতি তিনটি মূল কথায় প্রকাশ করা যায়; বাস্তব ঘটনা ও তথ্য থেকে সত্যে উপনীত হওয়া, গণ লাইন এবং স্বাধীনতা। কমরেড মাও জে দঙ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে সর্বহারাশ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির সমগ্র কার্যকলাপে প্রয়োগ করে চীন-বিপ্লবের দীর্ঘকালীন কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে চীনা কমিউনিস্টদের অনন্য বৈশিষ্ট্যবাচক এই সব মতাধিষ্ঠান, দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতি গড়ে তুলেছিলেন এবং এইভাবে মার্কসবাদ লেনিনবাদকে সমৃদ্ধ ও বিকশিত করেছেন। (বই পূজার বিরোধিতা করুন), (অনুশীলন সম্পর্কে), (দ্বন্দ্ব সম্পর্কে), (পল্লীর তথ্যানুসন্ধানের ভূমিকা ও পরিশিষ্ট), (নেতৃত্বের পদ্ধতি সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্ন), (মানুষের নির্ভুল চিন্তাধারা কোথা থেকে আসে?) প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ রচনা ছাড়াও তাঁর সমস্ত বিজ্ঞানসম্মত রচনায় এবং চীনা কমিউনিস্টদের বিপ্লবী কার্যকলাপের মধ্যে এইসব মতাধিষ্ঠান, দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতি অভিব্যক্ত রয়েছে। ক) বাস্তব ঘটনা ও তথ্য থেকে সত্যে উপনীত হওয়া: এর অর্থ বাস্তবকে গোড়া ধরে সেখান থেকে এগোনো এবং অনুশীলনের সঙ্গে তত্ত্বের সমন্বয় করা, অর্থাৎ মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিশ্বজনীন মূলনীতিগুলোকে চীন-বিপ্লবের বাস্তব অনুশীলনের সঙ্গে সমন্বিত করা। কমরেড মাও জে দঙ বরাবরই চীনের সমাজের বাস্তবতা থেকে ও চীন বিপ্লব থেকে বিচ্ছিন্নভাবে মার্কসবাদ গবেষণা করার বিরোধী ছিলেন। সেই ১৯৩০ সালেই অন্ধ বই পূজার বিরোধিতা করে তিনি সমস্ত কাজের গোড়ার পদক্ষেপ হিসাবে তদন্ত ও সমীক্ষার গুরুত্ব উল্লেখ করেছিলেন এবং বিনা তদন্তে কারুর কথা বলার অধিকারই না-থাকার উপর জোর দিয়েছিলেন। ইয়েনানে পার্টির শুদ্ধিকরণ আন্দোলন শুরু হওয়ার প্রাক্কালে তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, আত্মমুখিতাবাদ কমিউনিস্ট পার্টির একটি প্রবল পরাক্রান্ত শত্রু, পার্টির মর্মপকৃতিতে ভেজাল থাকার পরিচায়ক। এই সব প্রতিজ্ঞাদীপ্ত তত্ত্ব মতান্ধতাবাদের বেড়ি ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে ও মনকে ব্যাপকভাবে মুক্ত করতে লোককে সহায়তা করেছে। দর্শনশাস্ত্রগত রচনাগুলোতে এবং দর্শনশাস্ত্রগত মর্মবস্তুতে সমৃদ্ধ অন্যান্য আরো অনেক রচনায় চীনের বিপ্লবের অভিজ্ঞতার এবং শিক্ষাগুলোর সার-সঙ্কলন করেকমরেড মাও জে দঙ মার্কসীর জ্ঞানতত্ত্বকে ও দ্বন্দ্ববাদকে ব্যখ্যা করার ও সমৃদ্ধ করার ব্যাপারে গভীর প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি জোরালোভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের জ্ঞানতত্ত্ব হলো মনন-প্রতিভাস-সম্পর্কিত গতিশীল ও বৈপ্লবিক তত্ত্ব, এবং মানুষের বাস্তব-ভিত্তিক ও বাস্তব-অনুসারী সচেতন গতিশীল ভূমিকাকে কাজে লাগাবার পূর্ণ পরিসর নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক অনুশীলনকে ভিত্তি করে তিনি সামগ্রিকভাবে ও ধারাবিহিকভাবে জ্ঞানের উৎসগুলো সম্পর্কে, জ্ঞানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ও জ্ঞানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এবং সত্য যাচাই-এর মানদন্ড সম্পর্কে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের তত্ত্বকে আরো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, নিয়ম হিসাবে, বস্তু থেকে চেতনায়, আবার চেতনা থেকে বস্তুতে যাওয়ার প্রক্রিয়া, অর্থাৎ অনুশীলন থেকে জ্ঞানে, আবার জ্ঞান থেকে অনুশীলনে যাওয়ার প্রক্রিয়ার ক্রমাগত পুনরাবৃত্তিতে সঠিক জ্ঞানে পৌঁছানো যায় এবং সঠিক জ্ঞানের বিকাশ করা যায়। তিনি দেখিয়েছিলেন মিথ্যার বিপরীতেই সত্যের অস্তিত্ব এবং মিথ্যার সঙ্গে সংগ্রামেই সত্যের পরিবর্ধন; সত্য অশেষ; জ্ঞানের যে কোন একভাগ সত্য কি না সেটা যাচাই করতে হলে অর্থাৎ নিরপেক্ষ বাস্তবের সঙ্গে মেলে কি না তা যাচাই করতে হলে, একমাত্র সামাজিক অনুশীলনের মাধ্যমেই সেটা সম্ভব। মার্কসীয় দ্বন্দ্ববাদের মর্মকেন্দ্র— বিপরীতের একীভবনের নিয়মসূত্রকে তিনি আরো বিশদ রূপ দিয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে শুধু বাস্তব অস্তিত্বে বিরাজমান দ্বন্দ্বগুলোর বিশ্বজনীনতা পর্যালোচনা করলেই আমাদের চলবে না, যা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো দ্বন্দ্বগুলোর বিশেষত্বও আমাদের পর্যালোচনা করতে হবে এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির দ্বন্দ্বগুলোকে আমাদের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে মীমাংসা করতে হবে। কাজেই দ্বন্দ্ববাদকে এমন একটা ছকবাঁধা প্রণালী বলে মনে করা উচিত হবে না, যা মুখস্ত করা যায় আর যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করা যায়; বরং বাস্তব অনুশীলনের সঙ্গে এবং তদন্ত আর পর্যালোচনার সঙ্গে দ্বন্দ্ববাদকে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বিত করতে হবে এবং নমনীয়ভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তিনি দর্শনকে সর্বহারাশ্রেণী ও জনগণের হাতে পৃথিবীকে জানার আর বদলে দেবার একটি ধারালো হাতিয়ারের আকার দিয়েছিলেন। বিশেষ করে চীনের বিপ্লবী যুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলো বাস্তব-অনুশীলনে মার্কসবাদী জ্ঞানতত্ত্ব ও দ্বন্দ্ববাদ প্রয়োগের ও বিকাশের অতি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিল। কমরেড মাও জে দঙ-এর প্রণয়ন করা উপরোক্ত মতাদর্শগত লাইনে আমাদের পার্টিকে সব সময়েই অবিচল থাকতে হবে। খ) গণ-লাইনের অর্থ সব কিছুই জনসাধারণের জন্য, সব ব্যাপারেই জনগণের উপর নির্ভর করা, এবং ‘জনসাধারণ থেকে আসা, জনসাধারণের মধ্যে যাওয়া।’ জনসাধারণই ইতিহাসের স্রষ্টা— মার্কসবাদ-লেনিনবাদের এই মূল-তত্ত্বকে আমাদের পার্টির যাবতীয় কার্যকলাপে ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করার মাধ্যমে পার্টির যাবতীয় কাজের গণলাইন গড়ে উঠেছে। শত্রুর শক্তি যখন আমাদের চাইতে অনেক বেশি ছিল তখনকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থায় অনেক বছর যাবৎ বিপ্লবী কার্যকলাপ পরিচালনা করে পার্টির যে সব অমূল্য ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা হয়েছিল, পার্টির এই গণ-লাইন হলো সেইসব অভিজ্ঞতার সারসংকলন। কমরেড মাও জে দঙ বার বার জোরালোভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে যতোদিন পর্যন্ত আমরা জনগণের উপর নির্ভর করবো, জনগণের অফুরন্ত সৃজনী শক্তিতে দৃঢ় বিশ্বাস রাখবো আর সেজন্যে জনগণের ওপর আস্থা রেখে আমাদের নিজেদেরকে তাদের সঙ্গে এক করে দেখবো, ততদিন পর্যন্ত কোনো শত্রুই আমাদের পর্যুদস্ত করতে পারবে না, বরং আমরাই প্রত্যেক শত্রুকে পর্যুদস্ত করতে পারবো এবং প্রতিটি বাধাই অতিক্রম করতে পারবো। তিনি আরো উল্লেখ করেছিলেন যে সমস্ত বাস্তব কার্যকলাপে জনসাধারণকে পরিচালনা করতে নেতৃমন্ডল একমাত্র তখনই সঠিক চিন্তা-ভাবনা গড়তে পারে যদি তারা ‘জনসাধারণ থেকে আসার আর জনসাধারণের মধ্যে যাওয়ার’ পদ্ধতি অবলম্বন করে এবং জনসাধারণের সঙ্গে নেতৃত্ব সম্মিলিত করে ও সাধারণ আহ্বানের সঙ্গে বিশেষ নির্দেশনা সম্মিলিত করে। এর অর্থ জনসাধারণের চিন্তা-ভাবনা কেন্দ্রীভূত করা ও সেগুলোকে সুশৃঙ্খল সুসংবদ্ধ রূপ দেওয়া এবং তারপর জনসাধারণের মধ্যে যাওয়া, যাতে এইসব চিন্তা ভাবনা অধ্যবসায়ের সঙ্গে কার্যকর করা যায় এবং জনসাধারণের বাস্তব অনুশীলনে এইসব চিন্তা-ভাবনার যথার্থতা যাচাই করা যায়। এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে, বার বার এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে, যার ফলে প্রত্যেক বারেই নেতৃমন্ডলের উপলব্ধি আরো সঠিক আরো প্রগাঢ় ও আরো সমৃদ্ধ হতে থাকে। এইভাবেই কমরেড মাও জে দঙ পার্টির গণ-লাইনের সঙ্গে মার্কসবাদী জ্ঞানতত্ত্বকে সম্মিলিত করেছিলেন। সর্বহারাশ্রেণীর অগ্রবাহিনী হিসাবে আমাদের পার্টি জনগণের স্বার্থের জন্যই বিরাজ করে ও সংগ্রাম করে; তবুও, আমাদের পার্টি সবসময়েই জনগণের একটি ক্ষুদ্র অংশ, যার ফলে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে পার্টির সমস্ত সংগ্রাম ও আদর্শ যেমন সমস্ত তাৎপর্য হারিয়ে ফেলবে তেমনি সাফল্যের সমস্ত সম্ভবনা থেকে বঞ্চিত হবে। অধ্যবসায়ের সঙ্গে বিপ্লব চালাতে ও সমাজতান্ত্রিক ব্রতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের পার্টিকে অবশ্যই গণলাইন অবলম্বন করে চলতে হবে। গ। চীনের বাস্তবতাকে গোড়া ধরে সেখান থেকে এগিয়ে এবং জনসাধারণের উপর নির্ভর করে চীনের বিপ্লব ও গঠনকাজ চালানোর একটি অবশ্যম্ভাবী আনুষঙ্গিক সিদ্ধান্ত হলো স্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরতা। সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লব একটি আন্তর্জাতিক ব্রত, যার জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন দেশের সর্বাহারা শ্রেণীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা। কিন্তু এই ব্রতকে জয়যুক্ত করতে হলে, প্রতিটি দেশের সর্বহারাশ্রেণীকে প্রধানত নিজের নিজের দেশের বাস্তবতাকে ভিত্তি করে নিজের নিজের দেশের জনসাধারণের আর বিপ্লবী শক্তিগুলোর প্রচেষ্টার উপর নির্ভর করতে হবে, নিজের নিজের দেশের বিপ্লবের বাস্তব অনুশীলনের সঙ্গে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিশ্বজনীন নীতিগুলোকে সমন্বিত করতে হবে এবং এইভাবে বিজয় অর্জন করতে হবে। কমরেড মাও জে দঙ সবসময়ে একথার উপর জোর দিতেন যে, আমাদের নিজেদের শক্তির উপরই আমাদের নীতিকে ভর করতে হবে এবং আমাদের নিজেদের দেশের অবস্থা অনুযায়ীই আমাদের অগ্রগতির পথ বের করতে হবে। বিশেষ করে চীনের মতো বিশাল একটি দেশে বিপ্লব আর গঠনকাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে বরং আমাদের আরো বেশি করে আমাদের নিজেদের প্রচেষ্টার উপর নির্ভর করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে আমাদের দৃঢ় সংকল্প রাখতে হবে এবং দেশের কোটি কোটি জনগণের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে ও তাদের বিজ্ঞতা ও শক্তির উপরই নির্ভর করতে হবে; নইলে বিপ্লব হোক বা গঠন কাজ হোক কোনটাই সফল হবে না; আর যদি সফল হয়ও তবু তা সুসংহত করা যাবে না। অবশ্যই চীনের বিপ্লব ও গঠন কাজ বাকি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে না এবং সেটা পারাও সম্ভব নয়। বৈদেশিক সাহায্য অর্জন করা, বিশেষত অন্যান্য দেশে যা কিছু উন্নত ও কল্যাণকর সে সব শেখা আমাদের সবসময়েই দরকার। রুদ্ধদ্বার নীতি, বিদেশের সব কিছুরই অন্ধবিরোধিতা এবং বৃহৎ জাতিসুলভ অহমিকার তত্ত্ব ও আচরণ সমস্তই পুরোপুরি ভুল। আবার সেইসঙ্গেই, আমাদের দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি এখনও অপেক্ষাকৃতভাবে পিছিয়ে আছে বলে বড় বড়, শক্তিশালী বা ধনী দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের আচরণে আমাদের জাতীয় মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস অবশ্যই বজায় রাখতে হবে এবং কোনো ধরনেরই কোনো দাস্যভাব বা অবনতভাব থাকলে চলবে না। নয়াচীন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে হোক বা পরে হোক, আমরা যতরকম কঠিন অবস্থারই সম্মুখীন হয়ে থাকি না কেন, পার্টি এবং কমরেড মাও জে দঙ-এর নেতৃত্বাধীনে আমরা স্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরশীলতার দৃঢ় সংকল্প কখনো শিথিল করিনি, এবং বাইরের কোনো রকম চাপের কাছে কখনো নতিস্বীকার করিনি, আমরা চীন কমিউনিস্ট পার্টি ও চীনা জনগণের অদম্য ও বীর্যপূর্ণ মর্মতেজ পরিস্ফূর্ত করেছি। পৃথিবীর সমস্ত দেশের জনগণের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমান মর্যাদার ভিত্তিতে পারস্পরিক সহায়তার পক্ষে আমাদের অধিষ্ঠান। আমরা যেমন আমাদের নিজেদের স্বাধীনতার পরিপোষণ করি তেমনি সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য দেশের জনগণের স্বাধীনতার অধিকারকেও মর্যাদা করি। যে কোন দেশের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুসারে সে দেশের বিপ্লব ও গঠকাজের গতিপথ কেবলমাত্র সেই দেশের জনগণই খুঁজতে পারেন, নির্ধারণ করতে পারেন ও সৃষ্টি করতে পারেন। কারুরই অন্যের উপর নিজের ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার নেই। একমাত্র এমনি অবস্থাতেই সত্যিকারের আন্তর্জাতিকতাবাদ সম্ভব। নইলে যা হয় সেটা আধিপত্যবাদ। পররাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে আমরা সবসময়ই এই নীতিনিষ্ঠ মতাধিষ্ঠানে অবিচল থেকে যাবো। ৫। মাও জে দঙ চিন্তাধারা আমাদের পার্টির মূল্যবান আত্মিকসম্পদ। মাও জে দঙ চিন্তাধারা দীর্ঘকাল ধরে আমাদের কার্যকলাপের পথনির্দেশক থাকবে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও জে দঙ চিন্তাধারায় লালিত পার্টির নেতৃবৃন্দ ও বিপুল সংখ্যক ক্যাডার অতীতে আমাদের ব্রতের বিরাট বিরাট জয়ের অর্জনে ছিলেন মেরুদন্ড-শক্তি; সমাজতান্ত্রিক আধুনিকীকরণের ব্রতে তাঁরা আমাদের মহামূল্য অবলম্বন হয়ে রয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। কমরেড মাও জে দঙ-এর গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলীর মধ্যে অনেকগুলোই নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সময়পর্বে ও সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের সময়পর্বে রচিত হয়ে থাকলেও আমাদের এখনো সেগুলো অনবরত অধ্যয়ন করতে হবে। এটা শুধু এজন্য নয় যে, বর্তমান থেকে অতীতকে কেটে ফেলা যায় না এবং অতীতকে অনুধাবন করতে না পারলে বর্তমানকালের সমস্যাগুলো অনুধাবন করতে আমাদের অসুবিধা হবে, এজন্যেও অধ্যয়ন জরুরী যে এই সব রচনার অন্তর্ভুক্ত মূলতত্ত্ব, নীতি ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে অনেকগুলোরই বিশ্বজনীন তাৎপর্য আছে এবং অনেকগুলোতেই আমাদের জন্য অমূল্য পথনির্দেশ আছে, এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই আমাদের অতি অবশ্যই ক্রমাগত মাও জে দঙ চিন্তাধারাকে উঁচু করে ধরে রাখতে হবে, এবং বাস্তব অনুশীলন থেকে উদ্ভূত নতুন পরিস্থিতি সমীক্ষার জন্য এবং নতুন নতুন সমস্যার সমাধানের জন্য মাও জে দঙ চিন্তাধারার বিভিন্ন অধিষ্ঠান, দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতি আমাদের ক্রমাগত অধ্যয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্বের সম্পদভান্ডারে মাও জে দঙ চিন্তাধারা নতুন অনেক কিছু যোগ দিয়েছে। আমাদের অতি অবশ্যই মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন ও স্তালিনের বিজ্ঞানসম্মত রচনাবলী অধ্যয়নের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে মাও জে দঙ চিন্তাধারা অধ্যয়ন করতে হবে। জীবনের শেষ বছরগুলিতে কমরেড মাও জে দঙয়ের ভুলত্রুটি হয়েছিল বলেই মাও জে দঙ চিন্তাধারার বৈজ্ঞানিক মূল্য নাকচ করার চেষ্টা করা আর আমাদের দেশের বিপ্লব ও গঠনকাজে মাও জে দঙ চিন্তাধারার পথনির্দেশক ভূমিকা অস্বীকার করার চেষ্টা করা সম্পূর্ণই ভুল। তেমনি কমরেড মাও জে দঙ-এর উক্তি সম্পর্কে মতান্ধতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে তিনি যেটাই বলেছেন, সেটাই যান্ত্রিকভাবে অক্ষরে অক্ষরে সর্বত্র-প্রযোজ্য অক্ষয় সত্য মনে করা, তিনি যে জীবনের শেষ বছরগুলোতে ভুল করেছিলেন সেটা সত্যতার সঙ্গে স্বীকার করে নিতে না-চাওয়া, এমন কি আমাদের নতুন কার্যকলাপে সেইসব ভুলত্রুটিকেই আঁকড়ে ধরে থাকাও সম্পূর্ণ ভুল। দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা এবং দীর্ঘকাল ধরে যাচাই হয়ে যাওয়া একটা বিজ্ঞানসম্মত তত্ত্ব হিসাবে মাও জে দঙ চিন্তাধারা আর জীবনের শেষ বছরগুলোতে কমরেড মাও জে দঙ-এর ভুলত্রুটি– এ দুটো তফাৎ করতে, দুটো দৃষ্টিভঙ্গিই ব্যর্থ হয়েছে। এটা নিতান্তই অপরিহার্য যে, এ দুটোকে অতি অবশ্যই তফাৎ করতে হবে। অর্ধ শতাব্দীরও বেশি কাল ধরে চীনের বিপ্লব ও গঠনকাজের বাস্তব অনুশীলনের সঙ্গে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিশ্বজনীন নীতিগুলিকে সমন্বিত করার প্রক্রিয়ায় আমাদের যা কিছু ইতিাচক অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে সেগুলোকে আমাদের মূল্যবান সম্পদ হিসাবে রক্ষা করতে হবে, আমাদের নতুন বাস্তব অনুশীলনের মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে ও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং বাস্তবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন নতুন নীতি ও নতুন নতুন সিদ্ধান্ত দিয়ে আমাদের পার্টির তত্ত্বকে সমৃদ্ধ ও সম্প্রসারিত করতে হবে, এবং এইভাবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এবং মাও জে দঙ চিন্তাধারার বিজ্ঞানসম্মত পথে আমাদের ব্রতের ক্রমাগত অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রকাশের তারিখ: ২৬-ডিসেম্বর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |