|
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীদের শোষণকার্ল মার্কস |
মেরী আনে ওয়াকলি শুক্রবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। রবিবার মারা যায়। দোকানের কর্ত্রী মাদাম এলিস তো অবাক হয়ে গেলেন। মেয়েটা হাতের কাজটা শেষ না করেই মরে গেল! |
অতিরিক্ত খাটুনির ফলে মৃত্যু ১৮৬৩ জুনের শেষ সপ্তাহে লন্ডনের দৈনিক পত্রিকায় 'অতিরিক্ত খাটুনির ফলে মৃত্যু' শীর্ষক একটি উত্তেজনাপূর্ণ খবর বের হয়। খবরটি হলো: মহিলাদের পোশাক তৈরির দোকানে কর্মরত একটি বিশ বৎসরের তরুণী, মেরী আনে ওয়াক্লির মৃত্যু ঘটেছে। মেয়েটি কাজ করত একটি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পোশাক তৈরির দোকানে। দোকানের মালিক এক অভিজাত মহিলা এলিস।
এমন ঘটনা আরও অনেকবার ঘটেছে। নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটি দৈনিক গড়ে ষোল ঘণ্টা কাজ করত। এই খাটুনি মরশুমের সময় আরও বাড়ত। কখনো কখনো তাকে একটানা ত্রিশ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করে যেতে হতো। যখন সে খাটতে খাটতে আর পেরে উঠত না, তখন তাকে মাঝে মাঝে শেরি, পোর্ট ও কফি খাইয়ে চাঙ্গা করে তোলা হতো। এ সময়টা ছিল সেরা মরশুমের সময়। সম্প্রতি এখানে এসেছেন প্রিন্সেস অব ওয়েলস্। তাঁর সম্মানে বল নৃত্যের আয়োজন করা হয়েছে। আর সেখানে আমন্ত্রিত অভিজাত মহিলাদের জন্য জাঁকজমক পোশাক নিমেষের মধ্যেই তৈরি করে দিতে হবে। মেরী আনে ওয়াকলি, আরও ষাটটি মেয়ের সঙ্গে একটানা সাড়ে ছাব্বিশ ঘণ্টা কাজ করেছে। তারা এক একটা ঘরে ত্রিশ জন করে বসেছে। আর এমন ঠাসাঠাসি করে বসতে হয়েছে তাদের যে মানুষের জীবনধারণের জন্য অন্তত যতটুকু ঘনফুট বাতাসের প্রয়োজন তারা তার তিনগুণের একভাগ মাত্র পেতে পারে। রাত্রে তারা শুতো একটা ঘরের মধ্যে কাঠের পার্টিশান করা এক একটা খুপরীর মধ্যে দুজন করে। আর এটি কিন্তু ছিল লন্ডনের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ পোশাক তৈরির দোকান। মেরী আনে ওয়াকলি শুক্রবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। রবিবার মারা যায়। দোকানের কর্ত্রী মাদাম এলিস তো অবাক হয়ে গেলেন। মেয়েটা হাতের কাজটা শেষ না করেই মরে গেল! যখন ডা. মি. কিজ-কে ডেকে আনা হলো তখন সব শেষ হয়ে গেছে। তিনি করোনারের জুরীদের কাছে যথারীতি সাক্ষ্য দিলেন: “এক ঘরের মধ্যে ঠাসাঠাসি করে বসে একটানা অতিরিক্ত খাটুনির ফলে ও আলো-বাতাসহীন বদ্ধ ঘরে শোবার ফলেই মেরী আনে ওয়াকলির মৃত্যু হয়েছে।” কিন্তু ডাক্তারকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া হলো। করোনারের জুরীরা রায় দিলেন: ‘মেরী আনের ওয়ালির মৃত্যু হয়েছে সন্ন্যাস রোগে। তবে ঠাসাঠাসি ঘরে বসে অতিরিক্ত খাটুনির জন্য মৃত্যুটা যে ত্বরান্বিত হয়েছে সে আশঙ্কাও করা যায়’। অবাধ বাণিজ্য নীতির প্রবক্তা করডেন এবং ব্রাইট-এর মুখপত্র 'মর্নিং স্টার' জোরের সঙ্গে বলল: ‘আমাদের শ্বেত ক্রীতদাসীরা খাটতে খাটতেই কবরের তলায় যাচ্ছে। নীরবে যন্ত্রণা ভোগ করছে ও মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে’। ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ড থেকে নেওয়া
সস্তা শ্রম খনির মধ্যে নারী ও দশ বৎসরের কম বয়সের শিশুদের কর্মে নিয়োগ নিষিদ্ধ হবার আগে পুঁজিপতিরা উলঙ্গ নারী ও বালিকাদের খনির মধ্যে প্রায়ই পুরুষের সঙ্গেই কাজে পাঠাত। তাদের নৈতিকতাবোধ ও ব্যবসার স্বার্থ এমনই। এ বিষয়ে আইন পাস হবার পর থেকেই তারা যন্ত্রপাতির ব্যবহার করছে। ইয়াঙ্কিরা এক প্রকার পাথর ভাঙার যন্ত্র আবিষ্কার করেছে। ইংরেজরা সেটা ব্যবহার করে না। কারণ, ঐ কাজের জন্য নিযুক্ত 'হতভাগাদের' (ইংজেরী অর্থশাস্ত্রে চাষী-মজুরদের এই রকমই বলে থাকে) এতই কম পয়সা দিতে হয় যে যন্ত্রের ব্যবহার করলে পুঁজিপতিদের উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাবে। এখনো প্রায়ই দেখা যায় যে ইংল্যান্ডে খালে নৌকা টেনে নিয়ে যাবার জন্য ঘোড়ার বদলে নারীদের নিয়োগ করা হয়। কারণ ঘোড়া পুষতে বা যন্ত্রপাতির ব্যবহার করতে একটা ন্যূনতম খরচ লাগবেই, আর অতিরিক্ত জনসংখ্যার মধ্য থেকে নারীদের ঐ কাজে নিয়োগ করলে যে কত যৎসামান্য খরচে চলে যায় তা ধারণাই করা যায় না। মানুষের দৈহিক শক্তির জায়গায় যন্ত্রপাতি কাজ করতে থাকে। তাই পুঁজিপতিরা যাদের পেশীর শক্তি কম, শারীরিক বৃদ্ধি সম্পূর্ণ হয়নি, অঙ্গ- প্রত্যঙ্গগুলো নরম, তাদের কাজে নিয়োগ করতে থাকে। শ্রমিক ও শ্রমশক্তির স্থলে এই শক্তিশালী বিকল্প যন্ত্রপাতি নারী পুরুষ বা শিশু নির্বিশেষে শ্রমিক পরিবারের সকলকেই সোজাসুজি পুঁজির আওতায় টেনে নিয়ে আসে ও শ্রমিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। শিশুরা আর খেলতে পারে না, নারীরা পারে না স্বাধীনভাবে পরিবারের জন্য গৃহকর্ম করতে, পরিবারের সকলেই তখন পুঁজিপতিদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে কাজ করতে থাকে। আগে শ্রমশক্তির মূল্য নির্ধারণের জন্য শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক মজুরকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম সময়ের বিষয়টি বিবেচনা করা হতো না, তার পরিবার প্রতিপালনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হতো। যন্ত্রপাতি পরিবারের প্রত্যেককেই শ্রমের বাজারে নিক্ষেপ করে মানুষের শ্রমশক্তির মূল্য সমগ্র পরিবারের মধ্যে ব্যাপ্ত করে দিয়েছে। কাজেই শ্রমশক্তির মূল্য হ্রাস হয়ে গেছে। পূর্বে চারজনের একটি পরিবারের প্রধানের শ্রমশক্তি জন্য করতে যা খরচ পড়ত তার তুলনায় পরিবারের চারজনেরই শ্রমশক্তি ক্রয় করার খরচ হয়তো বেশি, কিন্তু পরিবর্তে চারদিনের শ্রম একদিনেই পাওয়া যাচ্ছে। আর একজনের উদ্বৃত্ত শ্রমের বদলে চারজনের উদ্বৃত্ত শ্রম যতখানি বাড়ছে, সেই অনুপাতে শ্রমের মূল্য হ্রাস পাচ্ছে। এখন সেই পরিবারটিকে বাঁচতে হলে শুধু যে চারজনকেই খাটতে হবে তাই নয়, তাদের উদ্বৃত্ত শ্রম পুঁজিপতিকে উৎসর্গ করে দিতে হবে। এভাবেই আমরা দেখতে পাই যে যন্ত্রপাতি দ্বারা পুঁজিপতিরা যেমন অধিক সংখ্যক মানুষদের শোষণ করে তেমনি শোষণের মাত্রাও বাড়িয়ে দেয়। ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ড থেকে নেওয়া সুত্র - নারী ও নারীমুক্তি সম্পাদক— হায়দার আকবর খান রনো নবান্ন প্রকাশনী, ঢাকা প্রকাশের তারিখ: ০৪-মার্চ-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |