জীবনী সম্ভারে কার্ল মার্কস

কুমার রাণা
কার্ল মার্কসকে নিয়ে মানুষের এত অনন্ত আগ্রহ কেন? তাঁর জীবন নিয়ে প্রথম লেখা শুরু হয় তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে, ১৮৮৫ সালে। লেখক গুস্তাভ গ্রস। তার পর একের পর এক জীবনী বেরিয়েছে – কোনোটাতে মার্কস ঈশ্বর, কোনোটাতে দানব, কোনোটাতে তাঁর চিন্তার ওপর জোর, কোনোটাতে  তাঁর ব্যক্তিজীবনের খুঁটিনাটি নিয়ে, কেউ লিখেছেন দলীয় বা দার্শনিক অবস্থান থেকে, আবার কারো লেখায় উঠে এসেছে নির্মোহ বিশ্লেষণ।  ওপরে যে জীবনীগ্রন্থগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হল, তা কেবল মার্কসের জীবন নিয়ে লেখা বইএর ভগ্নাংশ মাত্র। কিন্তু, যেটা স্পষ্ট তা হল, মানুষের আগ্রহের ভাণ্ডারে মার্কস দারুণভাবে উপস্থিত। তিনি বীর ছিলেন না, দুর্দান্ত খেলোয়াড় ছিলেন না, নাট্যকার বা অভিনেতা ছিলেন না, সাম্রাজ্যের অধীশ্বর বা তার পৃষ্ঠপুষ্ট আমলা-মন্ত্রী ছিলেন না। তা সত্ত্বেও মানুষ তাঁকে জানতে চায়, কারণ মানুষ তার নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা-আশা-আকাংক্ষায়, মার্কসের চিন্তার প্রতিফলন দেখতে পায়, সে যা হতে চায়, মার্কস সেই হওয়াটা নিয়ে ভেবেছিলেন:

এক  

প্রায় এক দশক কাল সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্ব নিকিতা ক্রুশ্চেভের হাতে । কমিউনিস্ট বিশ্বে নানান বিভাজন  কেবল চিন ও সোভিয়েতের মহাবিতর্কই নয়, সারা দুনিয়া জুড়েই কোনটা প্রকৃত কমিউনিজম, কে প্রকৃতপক্ষে মার্কসীয় আদর্শের উত্তরাধিকারী, ইত্যাদি নানা প্রশ্নে চলছে ঘোর বিতর্ক। পুঁজিবাদী বিশ্ব মজা দেখছে  বিশ্ব থেকে মার্কস (১৮১৮-১৮৮৭) ও মার্কসবাদের চির-উন্মুলনের স্বপ্ন। সেই সময়ে, ওয়ের্নার ব্লুমেনবার্গ মার্কসের একটা জীবনী লেখেন। অনেকের মতোই ব্লুমেনবার্গও নাতসি অত্যাচারে অভিবাসী হতে বাধ্য হন। আসেন হল্যান্ডে, যোগ দেন আমস্টারডামে অবস্থিত, পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ বিদ্যায়তন, ইন্সটিট্যুট অব সোস্যাল হিস্ট্রির জার্মান বিভাগে। ১৯৬৪ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ব্লুমেনবার্গ ছিলেন এই বিভাগের প্রধান। মৃত্যুর দু’বছর আগে, ১৯৬২ সালে রচিত তাঁর সেই বই ইংরাজিতে অনূদিত হয় ১৯৭২-এ, কার্ল মার্কস: অ্যান ইলাস্ট্রেটেড হিস্ট্রি  শিরোনামে (ভার্সো বুকস)। এই বই একদিকে ছিল পুঁজিবাদী উল্লাসকে অবজ্ঞা, আর অন্যদিকে চিন্তার জগতে মার্কসের জীবন নিয়ে আবশ্যিকভাবেই নতুন অনুসন্ধানের হদিশ। যখন মানব-প্রজাতি ও বিশ্বপ্রকৃতির ক্রমবিকাশে মার্কসের চিন্তাকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে শুধু পুঁজিবাদীরাই নয়, কমিউনিস্ট বিশ্বেও কেউ কেউ সন্দিহান, সেই সময়ে ব্লুমেনবার্গ হঠাৎ মার্কসের জীবনী নিয়ে এত চিন্তিত হয়ে পড়লেন কেন? কারণ, তিনি মনে করতেন, মার্কসের চিন্তাকে জানতে হলে তাঁর জীবনটাকেও ভালভাবে জানতে হবে। তাঁর অনুধাবন:

বাস্তবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী ছিল? রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গী এই বাস্তবতার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত ছিল? প্রকৃতপক্ষেই কি তাঁর জীবনে একজন রাজনীতিবিদ ও একজন দার্শনিকের ঐক্য ধরা পড়ে? বিমূর্ত ও দ্বান্দ্বিক উপায়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, এর জন্য চাই বিশদ বিশ্লেষণ। উপরন্তু, যেহেতু এখানে চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদ হচ্ছেন একজন রক্তমাংসের মানুষ, এই [বিশ্লেষণের] প্রক্রিয়াতে তাঁর চূড়ান্ত উপলব্ধিগত চেতনার দিকটাকে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না।

সেই সময় ব্লুমেনবার্গের সংকেত খুব গুরুত্ব পেয়েছিল এমন দাবি করা কঠিন। ইতিহাসের বিচিত্র  মন, তাঁর মৃত্যুর তিন দশকের মধ্যেই কার্ল মার্কস: অ্যান ইলাস্ট্রেটেড হিস্ট্রি-র শেষ কয়েকটি বাক্য প্রায় অনুজ্ঞা হয়ে উঠল।

গত সহস্রাব্দের শেষ পর্যায়ে, সোভিয়েত এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক নামাঙ্কিত বিভিন্ন সরকারের পতন ও বাজার অর্থনীতির প্রতি বিশ্বস্ত দক্ষিণপন্থীদের ক্ষমতারোহণ মার্কসকে “অপ্রাসঙ্গিক” করে দেয়। নব্য উদারবাদের উত্থানকে হাতিয়ার করে বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সমর্থকরা সাধারণ মানুষের কাছে  এমন এক বার্তা পরিবেশন করে তুলতে সমর্থ হয় যার অর্থ হল, “মার্কস ও তাঁর চিন্তা এখন অতীত।” কিন্তু, নতুন সহস্রাব্দের প্রধান তাৎপর্য হয়ে উঠল চিন্তার জগতে এক পুনর্জাগরণ,  আর সেই জাগরণে একটা অন্যতম চর্চার বিষয় হয়ে উঠলেন, এই চিন্তার আহ্বায়ক কার্ল মার্কস, ব্যক্তি মার্কস, রাজনীতিবিদ মার্কস, দার্শনিক মার্কস, সাংসারিক মার্কস  বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কে আবদ্ধ এক জীবন্ত মার্কস। যে পুঁজিবাদের “কোনো বিকল্প নেই” বলে উল্লসিত দাবি তোলা হয়েছিল, নতুন সহস্রাব্দের প্রথম দশকেই সেই পুঁজিবাদ এমন এক সংকটের মুখোমুখি হল, যা নিয়ে চিন্তার অনুশীলনে লোকেদের আবার করে মার্কসের কাছেই ফিরে যেতে হল। বাজার অর্থনীতির বিরাট সংকটের পাশাপাশি, বিশ্ব উষ্ণায়ন, পরিবেশ ধ্বংসের কারণে প্রকৃতির প্রত্যাঘাত, ইত্যাদি বিষয়গুলোও খুব বড় আকারে উঠে আসতে লাগল, এবং এই অনুশীলনে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, মার্কস ও তাঁর চিন্তাপদ্ধতিকে অবলম্বন করে বিপর্যয় থেকে পথ খোঁজার চেষ্টা। মার্কসের তাবৎ রচনার পাঠে বিপুল আগ্রহের সৃষ্টি হল। কেবল “ক্যাপিটাল” মহাগ্রন্থই নয়, তাঁর সমগ্র রচনা নিয়ে বিদ্যাচর্চার জগতে নতুন আকর্ষণ ও মগ্নতা গড়ে উঠল: লেখা হতে লাগল মার্কসীয় চিন্তার আলোকে অর্থনীতি, পরিবেশ, সমাজ, ইতিহাস, বিজ্ঞান, এমনকি লোকস্বাস্থ্যের মতো বিষয়েও নানা রচনা। কোভিড ১৯-এর প্রাদুর্ভাব ঘটার পর  মার্কসীয় চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা আরো বৃদ্ধি পেল: অতিমারীর কারণ যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, প্রকৃতির ওপর পুঁজিবাদের উপদ্রব ও হামলার পরিণাম, মার্কসের এই সূত্র ব্যাপক ও গভীর আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল।  মার্কসীয় চিন্তার আলোকে রিচার্ড লিয়েন্টন, রিচার্ড লেভিন্স, রব ওয়ালেশ-এর মতো লোকস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এবং জন বেলামি ফস্টার, পল বার্কেট, ব্রেট ক্লার্ক ও কোহেই সাইতো-র মতো বাস্তুতন্ত্রবিদরা গত প্রায় তিন দশক ধরে পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কে বাস্তুতন্ত্রের ওপর নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণের ও তার পরিণামে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও অতিমারীর মতো বিধ্বংসী ঘটনার দ্রুত হারে পুনরাবর্তনের কথা বলে আসছিলেন, নতুন সহস্রাব্দে সে-গুলোই বারংবার প্রমাণিত হতে থাকল। এই প্রমাণগুলোই আবার বিশ্বজুড়ে মানুষের বুদ্ধিচর্চায় মার্কসীয় চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি মার্কস সম্পর্কেও আগ্রহ বাড়িয়ে তুলতে লাগল। তিনি কী লিখেছেন, তাঁর অনুসন্ধানের ফলাফলগুলো কী, সে-সব নিয়ে চর্চার প্রসার ও গভীরতা দুই-ই বৃদ্ধি পেতে লাগল। তার পাশাপাশি, এবং সেই চর্চার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে উঠে আসতে লাগল। মার্কসের চিন্তার নির্মাণে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তথ্যের ওপর নির্ভরশীল নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিনির্ভর অনুভূতির আন্তঃক্রিয়া, তাঁর সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব, ইত্যাদি নিয়ে আগ্রহ ব্যাপকতর হয়ে উঠল। তাঁর চিন্তা নিয়ে আগ্রহের প্রমাণ এ নিয়ে অজস্র গবেষণা, প্রবন্ধ ও বই-এর প্রকাশনায় আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পেয়েছি। সেগুলোর বিপুলতার একটা উদাহরণ হল, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো কোর্সগুলোর মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি মার্কস ও তাঁর চিন্তা। মার্কসের প্রতি জাতক্রোধে কম্পমান এক সমালোচক, যিনি তাঁকে ‘অন্ধকারের রাজপুত্র’ বলে অভিহিত করছেন, তিনি বিস্ময়ে হতবাক, কেন ইয়োরোপের গণভোটে মার্কস সব থেকে প্রভাবশালী চিন্তক হিসেবে উঠে আসেন! কেনই বা তাঁর লেখা এবং তাঁকে নিয়ে লেখাপত্র জ্যামিতিক প্রগতিতে বেড়ে চলেছে!  এবং ঈর্ষাচাঞ্চল্যে জর্জ ফ্যাবিয়ান নামক ভদ্রলোক মার্কসের একটা সাতশো পাতার জীবনী (প্রিন্স অব ডার্কনেস) লিখে ফেললেন, কিন্তু, “প্রকাশকরা সেই জীবনী নিশ্চিত ছাপবে না” বলে নিজের খরচে সেটা ছাপিয়ে দিলেন (২০১১ সালে)। মার্কস-জীবনীর সম্ভারে, তাঁকে গালি দেওয়ার জন্য হলেও, আরো একটা বই যোগ হল!  

বস্তুত, মার্কসের জীবন নিয়ে যত বই লেখা হয়েছে, পৃথিবীর আর কোনো চিন্তক বা অন্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ অন্য কোনো মানুষকে নিয়ে এত বই লেখা হয়েছে বলে মনে করা যাচ্ছে না। মার্কসের জীবনীগ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি, এবং তাদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর এক ডজনের বেশি প্রকাশিত হয়েছে এই সহস্রাব্দে (অর্থাৎ, গড়ে প্রতি দু বছরে একটি করে; এবং আমি কেবল ইংরাজি প্রকাশনাগুলোর কথাই বলছি  জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ইত্যাদি নানান ভাষায় লেখা মার্কস-জীবনীগুলো আমাদের পাঠের আয়ত্তাধীন নয়)। বর্তমান লেখাটিতে আমরা “অপ্রাসঙ্গিক” হয়ে যাওয়া এই চিন্তকের কিছু, মাত্র কয়েকটি, জীবনীগ্রন্থের খুব সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব।  এ-আলোচনা স্বভাবতই অসম্পূর্ণ। যোগ্য লেখকরা কাজটাকে সম্পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাবেন, এই আশা থেকে বর্তমান পরিক্রমাটির সূচনা।

  

দুই

একেবারে সাম্প্রতিক যে জীবনীটি পড়ার সুযোগ হল, সেটি হল,  দ্য লাস্ট ইয়ারস অব কার্ল মার্কস: অ্যান ইন্টেলেকচুয়াল বায়োগ্রাফি  প্রকাশক, স্ট্যানফোর্ড  ইউনিভার্সিটি প্রেস। এর লেখক তন্নিষ্ঠ মার্কস গবেষক মার্সেলো মুস্তো, কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সমাজবিদ্যার অধ্যাপক। বইটি ২০১৬ সালে প্রকাশিত মূল ইটালীয় ভাষায় লেখার অনুবাদ। এটি মার্কসের কেবল শেষ দু-বছরের কাজকর্ম নিয়ে লেখা।  কিন্তু, গুরুত্বের দিক দিয়ে এ বই-এর তুলনা নেই। মার্কস ও তাঁর কাজ নিয়ে প্রচলিত নানান ভ্রান্তির মধ্যে একটা হল, ১৮৬৭ সালে ক্যাপিটাল –এর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হবার পর থেকে মার্কস, শারীরিক ও অন্যান্য কারণে, চিন্তানুশীলন থেকে সরে যেতে থাকেন। মুস্তো দেখাচ্ছেন, যে সংগ্রামের জন্য মার্কস তাঁর সারা জীবন নিবেদিত করে  দিয়েছিলেন, তার পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বুদ্ধিচর্চা, যেখান থেকে তিনি মৃত্যু পর্যন্ত কখনোই সরে আসেননি। সাধারণ বিশ্বাসের বিপরীতে নিয়ে গিয়ে,এ বই আমাদের দেখাচ্ছে, কীভাবে মার্কস ইউরোপ-কেন্দ্রিক বিশ্ববীক্ষা, আর্থনীতিক নির্ধারণবাদ (সব কিছুই অর্থনীতির দ্বারা নির্ধারিত), বর্ণভেদ, তত্ত্বের কঠোরতা, ইত্যাদির বিরোধিতা করছেন।   পৃথিবীর সামাজিক বৈচিত্র, নানা দেশের সামূহিক সংগঠন, নৃগোষ্ঠীগত ইতিহাস, জীববৈচিত্র, বাস্তুতন্ত্র ইত্যাদির পাশাপাশি মার্কস তাঁর শেষ দু বছরের চর্চার মধ্যে রেখেছিলেন রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, এমনকি বিদ্যুতের মতো বিষয়। কেভিন অ্যান্ডারসন তাঁর ২০১০ সালে প্রকাশিত বই, মার্কস অ্যাট দ্য মার্জিন: অন ন্যাশনালিজম, এথনিসিটি, অ্যান্ড নন-ওয়েস্টার্ন সোসাইটিজ (শিকাগো ইউনিভার্সিটি প্রেস) বইতে দেখিয়েছিলেন, কীভাবে মার্কস বিশ্বের বিভিন্ন অ-পশ্চিমী সমাজ নিয়ে দীর্ঘ ও কঠোর পরিশ্রম কত্রে গেছেন। মার্কসের এই দিকটি নিয়ে গবেষণার জন্য অ্যান্ডারসন নির্ভর করেছেন অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্র, সংবাদপত্রের জন্য লেখা প্রবন্ধ, ইত্যাদির ওপর। মুস্তোর লেখা নতুন জীবনীটি আমাদের জানাচ্ছে, অন্যান্য সূত্রতো বটেই, এমনকি প্রধানত পশ্চিমী পুঁজিবাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সমালোচনার ভিত্তিতে রচিত ক্যাপিটাল গ্রন্থেই আমরা এমন এক মার্কসের দেখা পাই যিনি বহু বিদ্যার সাধক এবং বহু চিন্তার অনুশীলক। তাঁর পরবর্তী জীবন এই বহুত্বের মধ্য দিয়ে মানবমুক্তির সংগ্রামে ব্যাপৃত থেকেছে। দ্য লাস্ট ইয়ারস অব মার্কস  বইটির বিশেষ তাৎপর্য এই যে, এর আলোচনা প্রধানত মার্কসের শেষ দু বছরের ওপর কেন্দ্রীভূত হলেও, মুস্তো তাঁর মার্কস বিষয়ক বিপুল অধ্যয়নের সুবাদে কাজটিকে মার্কসের সারা জীবনের কাজের ধারাবাহিকতা হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন। সঙ্গত কারণেই এ বই খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মুস্তো মার্কসের জীবন নিয়ে আরো কিছু কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাঠকের আগ্রহের আতিশয্য স্বাভাবিক।  

এর ঠিক আগেই যে বই পড়ার সুযোগ হয় সেটি, বিশিষ্ট মার্কস বিশেষজ্ঞ মাইকেল হেইনরিখ-এর কার্ল মার্কস অ্যান্ড দ্য বার্থ অব মডার্ন সোসাইটি, ভল্যুম ১: ১৮১৮ - ১৮৪৮। জার্মান ভাষায় লেখা এর মূল বই প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালে  মুস্তোর লেখা মূল ইটালিয় বইটির প্রকাশের দু বছর পরে। কিন্তু মান্থলি রিভিউ প্রেস থেকে এর ইংরাজি তর্জমা প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে। হেইনরিখ অনেকদিন ধরে বার্লিনের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস-এ অর্থশাস্ত্র পড়িয়েছেন। লিখেছেন অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য থ্রি ভল্যুমস অব মার্কসেস ক্যাপিটাল (নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৪)-এর মতো মূল্যবান বই। হেইনরিখ-এর হাতে নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই কাজ এখনো অসম্পূর্ণ  সবে প্রথম খণ্ড বেরিয়েছে, বাকি দুটি খণ্ড প্রকাশিত হবার পর, কেবল মার্কস চর্চায় নয়, এই বই জীবনী সাহিত্যে একটি বিরাট অবদান হয়ে থাকবে। হেইনরিখ মার্কসের জীবনের নানা খুঁটিনাটি দিক নির্ভুলভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁর চিন্তার বিকাশের ধারাটিকেও নিবিষ্টভাবে অনুসরণ করে চলেছেন। ব্যক্তিজীবনের প্রেক্ষাপট, সামাজিক পরিবেশ, ঐতিহাসিক গতিপ্রকৃতি ও বুদ্ধিচর্চার ধারা  এই প্রত্যেকটি দিক নিয়েই গড়ে ওঠে এক প্রকৃত চিন্তকের জীবন ও কাজ। হেইনরিখ এই সব দিকগুলোকে হিসেবের মধ্যে রেখেছেন। মার্কসের এত জীবনী থাকা সত্ত্বেও নতুন একটি জীবনী লেখার কাজে কেন হাত দিলেন, এর ব্যাখ্যায় হেইনরিখ যে কথাগুলো বলেছেন সেগুলো খুব প্রণিধানযোগ্য। এক, মার্কসের জীবনী লেখকদের অনেকেই খণ্ডিত, বেছে নেওয়া মার্কসকে তুলে ধরেছেন। এটি একটি বড় ভুল  মার্কস যে-রকম ছিলেন, সে-রকমভাবেই তাঁর চিত্রণ একটা ঐতিহাসিক দায়। দুই, অনেক জীবনীকার মার্কসের বিশেষ একটি দিকের ওপর জোর দিয়েছেন, এবং অন্য দিকটিকে অবহেলা করেছেন। যেমন কেউ কেউ তাঁর জীবনের খুঁটিনাটি নিয়ে খুব বেশি আগ্রহী, কিন্তু তাঁর চিন্তাগত বিকাশের ওপর তাঁদের দৃষ্টি পড়েনি, আবার অনেকের কাছে উল্টোটা। তিন, তিনি মার্কসকে দেখতে চেয়েছেন, তাঁর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। যে-কারণে তাঁর বই শুরু-ই হচ্ছে মার্কসের কালে যে আধুনিক সমাজের নির্মাণ, তার ঠিক আগের সমাজের সঙ্গে তার পার্থক্য, এবং আমাদের কালে মার্কসের চিন্তাগত ধারাবাহিকতার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। অন্যান্য অনেক তাৎপর্যের সঙ্গে সঙ্গে, হেইনরিখের বইটির একটি বিশেষ ব্যাপার হল, আগেকার জীবনীকারদের কাছে অধুনা আবিষ্কৃত অনেক তথ্য ছিল না, ফলে অনেকের লেখাতেই প্রচুর তথ্যগত অসম্পূর্ণতা ও ভ্রান্তি থেকে গেছে। ১১৪ খণ্ডে পরিকল্পিত, ১৯৭৫ সাল থেকে ক্রম প্রকাশমান মার্কস এঙ্গেলস গেসামটাউসগাবে  (মার্কস-এঙ্গেলস এর চিঠিপত্র সহ সমস্ত লেখার সঙ্কলন), সাম্প্রতিক গবেষকদের হাতে অনেক নতুন তথ্য এনে দিয়েছে।  হেইনরিখ নিজে এই প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত, ফলে তাঁর পক্ষে মার্কসের জীবন সম্পর্কিত তথ্যগত ভ্রান্তিগুলো দূর করা সহজ হয়েছে।  

 

হেইনরিখের বইটি প্রকাশের ঠিক আগের বছরেই, ২০১৮ সালে বেরিয়েছে, গোঠেনবার্গ ইউনিভার্সিটিতে হিস্টরি অব আইডিয়া-র এমিরেটাস প্রফেসর, এবং অর্ধশতাব্দী ধরে মার্কস চর্চায় মগ্ন স্বেন-এরিক লিডম্যান-এর আ ওয়ার্ল্ড টু উইন: দ্য লাইফ অ্যান্ড ওয়ার্কস অব কার্ল মার্কস। প্রকাশক ভার্সো বুকস। এ বইটিও তর্জমা  মূল সুইডিশ ভাষায় লেখা, ২০১৫ সালে প্রকাশিত। অ-মার্কসীয় তো বটেই, মার্কসীয় বৃত্তেও অনেকে বেশ জোর দিয়ে বলে থাকেন, মার্কস খুবই প্রতিভাবান, তাঁর বিশ্লেষণ ও তত্ত্বও খুব মূল্যবান, কিন্তু ওগুলো এখন আর চলে না, কারণ তাঁর ধারণা ও বিশ্লেষণগুলো উনবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে (যেমন, ২০১৩তে ন্যুইয়র্ক-এর লাইভরাইট প্রকাশনা সংস্থা থেকে ছাপা জোনাথন স্পার্বার-এর কার্ল মার্কস: আ নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরি লাইফ)  লিডম্যান-এর বই কিছুটা হচ্ছে এই ধারণার প্রত্যুত্তর: তিনি দেখাচ্ছেন, কীভাবে মার্কসের চিন্তা তাঁর সময়ের মতোই বর্তমান কালেও বহমান ও প্রাসঙ্গিক। এর দ্বিতীয় দিকটাতে দেখা যাচ্ছে, কীভাবে মার্কস তাঁর প্রথম যৌবন থেকে শেষ বয়স পর্যন্ত নতুন করে ভাবছেন, নিজের চিন্তাকে পরিশীলিত করছেন, মার্জিত করছেন। এই সঙ্গে তিনি দেখাচ্ছেন মার্কসের পাঠের কি বিপুল বিস্তার: দর্শন, অর্থনীতি, ইতিহাস, ধ্রুপদী গ্রিক, ইংরাজি, জার্মান ও ফরাসি সাহিত্য, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, জীবন বিজ্ঞান, নৃতত্ব, গণিত  তাঁর পাঠের তালিকা থেকে প্রায় কোনো শাস্ত্রই বাদ যায় না। একদিকে ব্যক্তি মার্কস, এবং অন্যদিকে চিন্তক মার্কস  এই দুইয়ের দ্বান্দ্বিক আদান-প্রদানের দিকটা লিডম্যানের মত করে খুব কম লেখকই তুলে আনতে পেরেছেন।  

এর ঠিক পরে পরেই, ২০১৬-তে বেরোয়, বিশিষ্ট ইংরাজ ইতিহাসবেত্তা, প্রথমে বামপন্থী কিন্তু পরের দিকে প্রেক্ষাপট-নির্ভর তাত্বিক, গ্যারেথ স্টেডম্যান জোনস-এর কার্ল মার্কস: গ্রেটনেস অ্যান্ড ইল্যুসন  প্রকাশক অ্যালেন লেন। স্টেডম্যান জোনসের বইতে রয়েছে আশ্চর্যরকমের খুঁটিনাটি বিবরণ  বিশেষত মার্কসের সময়কার জার্মানি ও ইউরোপের আর্থনীতিক ও সামাজিক অবস্থার এত চমৎকার বর্ণনা খুব কমই পাওয়া যায়। মার্কসের কৃতির প্রতি তিনি সশ্রদ্ধ, কিন্তু তিনি যেটা প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন তা হল মার্কসের প্রাসঙ্গিকতা মোটামুটি উনবিংশ শতাব্দীতেই  কারণ তার পরের পৃথিবী এত গভীরভাবে বদলে গেছে যে, মার্কসের চিন্তা দিয়ে তার হদিশ পাওয়া শক্ত। এ বই অনেকটাই এর তিন বছর আগে প্রকাশিত, আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব মিসৌরিতে ইতিহাস বিভাগের এমিরিটাস প্রফেসর, জোনাথন স্পার্বার-এর কার্ল মার্কস: আ নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরি লাইফ-এর ধারায় লেখা: মার্কসকে তাঁর সময়ের প্রেক্ষিতে প্রতিস্থাপিত করতে হবে। স্টেডম্যান জোনস ও স্পার্বার  দুজনের কাজই সে-দিক দিয়ে খুবই গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, এই কাজগুলো সম্পর্কে অমর্ত্য সেন-এর একটি সতর্কবাণী মনে রাখা উচিৎ বলে মনে হয়। হবসবম বক্তৃতায় অমর্ত্য সেন স্টেডম্যান জোনসের বই নিয়ে বলছেন:

মার্ক্স যে সমস্ত বিষয়ে আলোচনা, বিতর্ক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছিলেন— এবং কখনও ক্রুদ্ধ, কখনও আনন্দিত হয়েছিলেন— সেগুলির ওপর তাঁর সমকালের বড় রকমের প্রভাব ছিল। তাই মার্ক্সকে বোঝার জন্য এবং ব্যাখ্যা করার জন্য নিশ্চয়ই তাঁকে তাঁর সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা দরকার। কিন্তু, এই ভাবে দেখার গুরুত্বকে একটুও ছোট না করে আমাদের [এরিক] হবসবমের সঙ্গে ভাবনা মিলিয়ে এটাও মনে রাখতে হবে যে, মার্ক্সের অনেক ধারণাই অন্য যুগেও, আমাদের বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতেও, প্রাসঙ্গিক, এবং মার্ক্স উনিশ শতকের পরিবেশে তাঁর নিজের সাধারণ প্রতিপাদ্যগুলিকে যে ভাবে ব্যবহার করেছিলেন শুধু তার সাহায্যে তাঁর এই ধারণাগুলির তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না।  কিছু কিছু উদ্দেশ্যে মার্ক্সের ধারণাগুলিকে তাঁর সমকালের প্রেক্ষাপটে বিচার করা দরকার (এবং স্টেডম্যান জোনস দেখিয়েছেন সেটা কতখানি সার্থক ও জ্ঞানপ্রদ হতে পারে)। তেমনই আবার তাঁর সময়ের চেয়ে আলাদা পরিস্থিতিতেও মার্ক্সের বিশ্লেষণ কতটা দূরপ্রসারী এবং জোরদার হতে পারে, তাঁর সাধারণ প্রতিপাদ্যগুলির ব্যাপ্তি ও প্রাসঙ্গিকতা কত দূর যেতে পারে, তা উপলব্ধি করার জন্য (হবসবমের সূত্র ধরে) তাঁকে তাঁর সমকাল থেকে আলাদা করে নিয়েও দেখা দরকার।   

(এই বক্তৃতার বাংলা তর্জমা, ‘মার্ক্সের চিন্তার নানা দিক’ শিরোনামে দেশ পত্রিকার ২ নভেম্বর, ২০২০ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া, অমর্ত্য সেন-এর স্মৃতিকথা, জগৎ কুটীর (আনন্দ, ২০২২) বইয়ের ১৩ সংখ্যক অধ্যায় “মার্কসকে কীভাবে বুঝব” ও দ্রষ্টব্য।)

 

স্পার্বার ও স্টেডম্যান জোনসের মার্কসকে উনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিস্থাপিত করার চেষ্টার বিপরীতে লিডম্যান-এর আ ওয়ার্ল্ড টু উইন  ছাড়াও আরো দুটো গুরুত্বপূর্ণ জীবনী মার্কসকে বর্তমান সময়ে প্রাসঙ্গিকভাবে তুলে আনতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বলে জানা গেল  পড়ার সুযোগ হয়নি। এর একটা, জুর্গেন নেফে-র লেখা, জার্মান ভাষায়। অন্যটি, অ্যাঞ্জেলো সের্গিলো-র লেখা, পর্তুগিজ ভাষায়। বই দুটি বেরিয়েছে যথাক্রমে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে।

এ সহস্রাব্দে প্রকাশিত মার্কসের জীবনীগুলোর মধ্যে যেটা না পড়লে আক্ষেপ থেকে যেত, সেটা মেরি গ্যাব্রিয়েলের লাভ অ্যান্ড ক্যাপিটাল: কার্ল অ্যান্ড জেনি মার্কস অ্যান্ড দ্য বার্থ অব আ রিভল্যুশন  বেরিয়েছে ২০১১ সালে, বিখ্যাত লিটল, ব্রাউন প্রকাশনা সংস্থা থেকে। এমন আশ্চর্য জীবনী গ্রন্থ পাওয়া দুষ্কর। যেমন যত্ন, তেমনি ভালবাসা। আর এই ভালবাসা যাঁর প্রতি নিবেদিত, তিনি হলেন জেনি ভন ওয়েস্টফ্যালেন  জেনি মার্কস। উভয়ের জন্ম ট্রিয়ের শহরে  দুই পরিবারের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল। কার্লের ওপর জেনির বাবার খুব প্রভাব ছিল খুব। ১৮৪৩ সালে, অনাড়ম্বর এক অনুষ্ঠানে তাঁদের বিবাহ। বিবাহের পর থেকেই দুর্ভাগ্য জেনির সঙ্গী: দারিদ্র, সন্তানের মৃত্যু, অসুস্থতা, ঋণগ্রস্ততার পাশাপাশি কার্লের সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক সহায়িকা হেলেন ডেমুথের শারীরিক সম্পর্কের কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে সাময়িক শীতলতা পর্যন্ত নানা জীবন বিপর্যয়ের তথ্য খুব অজানা কিছু নয়।  লাভ অ্যান্ড ক্যাপিটাল-এর ভিতর থেকে কার্ল ও জেনি-সহ উনবিংশ শতকের ইউরোপের যে সামাজিক জীবন উঠে এসেছে তা এককথায় অসামান্য। পক্ষপাতের দোষে দুষ্ট না হয়েই মেরি গ্যাব্রিয়েল কার্ল, জেনি, এঙ্গেলস ও অন্যদের যে ছবি এঁকেছেন তা একদিকে যেমন নির্মোহ সত্যকে আলিঙ্গন, অন্যদিকে তেমনি গভীরতম মানবতার আবাহন। তাঁর কাজের একটা দিক যদি হয় মার্কস পরিবারের সঙ্গে মিশে যাওয়া তাহলে অন্য দিকটা হচ্ছে সেই সম্পর্ক প্রকাশের জন্য ব্যবহার করা ভাষা। পেশাগতভাবে মেরি যুক্ত ছিলেন রয়টারে, সম্পাদনার কাজে। তাঁর সাংবাদিক ও লেখক সত্ত্বার সঙ্গে তাঁর নারী সত্ত্বাও বোধ হয় এ বইয়ের নির্মাণে বিশেষ একটা ভূমিকা রেখেছে  মার্কসের জীবনীগ্রন্থের প্রাচুর্যে আরো একটা সাতশো পৃষ্ঠার বই যোগ করার পিছনে তাগিদ ব্যাখ্যা করতে মেরি বলছেন, এই জীবনীগুলোতে অনেক কিছু আছে, কিন্তু মার্কসের নির্মাণের পিছনে তাঁর পরিবারের মেয়েদের ভূমিকার কথা প্রায় কিছুই জানা যায় না। মেরির লেখার প্রণোদনা প্রধানত জেনি, এবং তাঁর কন্যারা ও হেলেন ডেমুথ: “এঁরা ছাড়া মার্কস হতেন না, আর মার্কসকে ছাড়া পৃথিবীটা এ-রকম হত না।” সুন্দরতর পৃথিবী গড়ে তোলার স্বপ্নে প্রেম-ভালবাসা ও রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার পারস্পরিতা যে কত জরুরি, মেরির বর্ণনায় তা জীবন্ত হয়ে ওঠে।

এ সহস্রাব্দে ইংরাজি প্রকাশনা জগতে মার্কসের জীবনী প্রকাশের ব্যাপারে যেন একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল, ২০০৯ সালে রাউটলেজ প্রকাশ করল, ইতিহাসের অধ্যাপক, রুশ ইতিহাসের পণ্ডিত ভিনসেন্ট বার্নেট-এর লেখা মার্কস।  একমাত্র মুস্তোর লেখা লাস্ট ইয়ারস অব কার্ল মার্কস  বাদ দিলে বাকি জীবনীগ্রন্থগুলোর তুলনায়  বার্নেটের বই অনেক সংক্ষিপ্ত, ২৬৮ পৃষ্ঠার। এ বইয়ের লক্ষ্য মার্কসের চেতনা ও কাজকে তাঁর জীবনের ধারার সঙ্গে মিলিয়ে তুলে আনা  ভিনসেন্ট-এর মার্কসের চিন্তা চলমান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চিন্তার স্রোতও নানা খাতে বইতে থাকে, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি  স্থিরভাবে নিবদ্ধ একটি জায়গায়: মানব সমাজের মুক্তি। ব্যক্তিজীবনের নানা দিকের সঙ্গে মিলিয়ে ভিনসেন্ট চেষ্টা করেছেন মার্কসের ওপর বিশেষত হেগেলের ডায়ালেক্টিকসের পদ্ধতিগত প্রভাবের দিকটা তুলে আনতে। মার্কসীয় চিন্তার ঘোষিত বিরোধীরা তো বটেই, এমনকি তথাকথিত মার্কস অনুগামীরা, বিশেষত রাষ্ট্রীয় মার্কসবাদীরা মার্কসের যে একটা ভয়াল মূর্তি গড়ে তুলেছেন, ভিনসেন্ট-এর বই সেই মূর্তিটা ভেঙ্গে পাঠকের সামনে উপস্থিত করে যাবতীয় মানবিক অস্তিত্বসম্পন্ন এক মানুষ ও আধুনিক পৃথিবীর সব থেকে প্রভাবশালী চিন্তাবিদ মার্কসকে।

 আগেই বলেছি গ্যাব্রিয়েল-এর সাংবাদিক পেশা তাঁর লেখায় মার্কসকে অনেক বেশি সাধারণ পাঠকের নাগালের মধ্যে নিয়ে এসেছে। জীবনী রচনায় একটা ভিন্নধরনের পথ-প্রবর্তনের যে কাজ লাভ অ্যান্ড ক্যাপিটাল-এ দেখা গেল, তার সূচনা অবশ্য হয়ে গিয়েছিল সহস্রাব্দের সন্ধিক্ষণে  ১৯৯৯ সালে। পৃথিবীর পাঠকদের কাছে জীবন্ত এক মানুষ, সুখ-দুঃখ-আবেগ-অভিমান-কাম-ক্রোধ-স্নেহ-ভালবাসা-মমতায় সুসমৃদ্ধ এক মার্কস উঠে আসেন মুন্সী সাংবাদিক ও লেখক ফ্রান্সিস হুইন-এর কার্ল মার্কস –এর পাতায় পাতায়। প্রথাগত বিদ্যাচর্চার ছক ভেঙ্গে ফ্রান্সিস খুঁজে বের করেন এক দৈনন্দিন মার্কসকে, মার্কসের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে তাঁর চিন্তার বিকাশের ধারাকে। তিনি কীভাবে পড়তেন, লিখতেন,  কথা বলতেন, মেলামেশা করতেন, এ-সব নিয়ে খুঁটিনাটি বর্ণনা দেওয়ার পাশাপাশি মার্কসের কাজের ওপর তাঁর সময়ের ইতিহাস, সমাজ, অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির প্রভাব নিয়েও হুইন সুন্দর আলোচনা করেছেন। এ বই-এর সবচেয়ে বড় গুণ এর রচনাশৈলী। পড়তে শুরু করলে এ বই শেষ না করে থামা কঠিন  অন্তত আমার অভিজ্ঞতা এ-রকমই। এর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য, সুপাঠ্য করতে গিয়ে হুইন তথ্যগত যথার্থতার ব্যাপারে আপোষ করেননি। শুধু তাই নয়, মার্কসের জীবন নিয়ে কাজ করতে গেলে তাঁর মননগত ও তাত্ত্বিক জটিলতার যে অনুধাবন দরকার, তা অর্জন করতেও তিনি প্রভূত পরিশ্রম করেছেন। সেটা করেছেন বলেই, এই বই-এর অংশবিশেষ ও আরো গবেষণা মিলিয়ে পরের দিকে, ২০০৮ সালে তিনি লিখতে পেরেছেন,  মার্কসেস দাস ক্যাপিটাল: আ বায়োগ্রাফি  মার্কসের ক্যাপিটাল  গ্রন্থের এক জীবনী (আটলান্টিক বুকস)।

নতুন লেখা জীবনী ছাড়াও, এই সহস্রাব্দে মার্কসের অনেক জীবনীর পুনঃপ্রকাশ ঘটেছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে দুটি বই এই সহস্রাব্দে পড়ার সুযোগ হল তার প্রথমটি, আইসাইয়া বার্লিন-এর লেখা কার্ল মার্কস: হিজ লাইফ অ্যান্ড এনভাইরনমেন্ট। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সালে, এখনো পর্যন্ত এর পাঁচটি সংস্করণ ও বহু পুনর্মুদ্রণ হয়েছে। লাটভিয়াতে জন্ম নেওয়া এই দার্শনিক সোভিয়েত বিপ্লবের কিছু পরে, ছোটবেলাতেই তাঁর পরিবারের সঙ্গে ইংল্যান্ডে চলে আসেন। অসামান্য পাণ্ডিত্যের অধিকারী, দার্শনিক এবং ধারণার ইতিহাস  বিষয়ে প্রজ্ঞার প্রতিমূর্তি বার্লিন মার্কসবাদী ছিলেন না। মার্কসের তত্ত্বকে প্রমাণ করার দায় তাঁর ছিল না। আবার তাঁর বিদ্যাচর্চাগত সততা তাঁকে মার্কসের তত্ত্বকে অপ্রমাণ করার ভার তুলে নেওয়া থেকেও বিরত রেখেছে। তাঁর কাজ হল, বিশ্বের চিন্তা-কাঠামোতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসা একজন মানুষের জীবনের সঙ্গে চিন্তার যোগসূত্রগুলো  নৈর্ব্যক্তিকভাবে তুলে ধরা। ইরানী দার্শনিক রামিন জাহানবেগলুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে বার্লিন একবার বলেছিলেন, “মেইস্ত্রে [জোসেফ দে, ফরাসী দার্শনিক, ১৭১৫-১৭৭১]  ও হেলভেটিয়াস [ক্লদ অ্যাড্রিয়েন, ফরাসী দার্শনিক, ১৭৫৩-১৮২১] – দুজনের কোনো একজনকে পুরোপুরি গিলে ফেলাটা হাস্যকর একটা ব্যাপার।” তাঁর বক্তব্য “দুজনের লেখাই পড়তে হবে…নীতিশাস্ত্র ও দর্শনে কোনো ধারণাকে অন্ধবিশ্বাসে গ্রহণ করে নেওয়ার চেয়ে মারাত্মক ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না।”  ফলে, তাঁর পক্ষে খোলা মনে, মার্কসের ধারণার সঙ্গে সরাসরি, “তার্কিকভাবে আলাপ চালানো” সহজ হয়। বার্লিনের লেখা মার্কসের জীবনীটি সম্ভবত মার্কসের মননগত জীবনী (ইন্টেলেকচুয়াল বায়োগ্রাফি) ধারার প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বই, যার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হল মার্কসের চিন্তা ও তার বিকাশের প্রক্রিয়া। ১৯৩৯-এ প্রথম প্রকাশের পর বার্লিন নিজেই এর চারটি সংস্করণ তৈরি করেন, শেষটি ছিল ১৯৭৭-এ। ২০১১ সালে অ্যালান রায়ানের মুখবন্ধ সহ পঞ্চম খণ্ডটি সম্পাদনা করেন হেনরি হার্ডি, প্রকাশক প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস। বার্লিনের বইটি সহজপাঠ্য নয়, কিন্তু সাধারণভাবেই ধারণার ইতিহাস ও সমাজের বিকাশের চর্চায় এবং বিশেষ করে মার্কসীয় চিন্তার সঙ্গে পরিচয় ও কথোপকথনের কাজে এর ভূমিকা অসামান্য বললে কম বলা হয়। কেবল একটি বিশেষ দিক থেকে না দেখে, চিন্তা-জাগতিক অবস্থানের বিভিন্নতাগুলোকে বিভিন্নভাবে দেখতে পারার কারণে বার্লিন এই বইটি এমনভাবে গড়ে তুলতে পেরেছেন যে,  মার্কসের চিন্তায় প্রভাবিত ও সন্দিগ্ধ – উভয়পক্ষের জন্যই এই বই কেবল মার্কস নিয়ে নয়, সাধারণভাবেই জ্ঞানচর্চার অনুশীলনে খুবই সহায়ক হতে পারে।

বার্লিনের বই যদি হয় মননগত জীবনী তাহলে ১৯৭৩-এ ডেভিড ম্যাকলেলন-এর কার্ল মার্কস: হিজ লাইফ অ্যান্ড থটস  নামে প্রথম প্রকাশিত, ও ২০০৬-এ কার্ল মার্কস: আ বায়োগ্রাফি  শিরোনামে চতুর্থ সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত জীবনীকে বলা যেতে পারে মার্কসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জীবনী। রাজনীতি-শাস্ত্রে প্রশিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ মার্কসীয় চিন্তক ম্যাকলেলন-এর গবেষণায় ব্যক্তি মার্কসের পাশাপাশি চিন্তানুশীলক মার্কসও সমান উজ্জ্বলতায় দেখা দিচ্ছেন। এর আগে পর্যন্ত ফ্রাঞ্জ মেহরিং-এর কার্ল মার্কস: দ্য স্টোরি অব হিজ লাইফ  ছিল মার্কসের ধ্রুপদী জীবনী। শুনেছি  মার্কসের রচনাগুলোর ধারার সঙ্গে পাঠককে সবিস্তারে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে মেহরিং-এর বই-এর জুড়ি ছিল না (এ বইটি পড়ার সুযোগ আমার এখনো হয়নি)। কিন্তু এ বই লেখা হয় ১৯১৮-তে, রুশ বিপ্লবের এক বছর পর, তখনও মার্কসের বহু পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্র, খাতা, এবং তাঁর সম্পর্কে বহু মানুষের স্মৃতিকথা, ইত্যাদি অজানা ছিল। ম্যাকলেলান-এর বইতে এই অভাবের দিকটা অনেকখানি দূর হয়েছে। মার্কসীয় সাহিত্যে পাণ্ডিত্যের সঙ্গে সঙ্গে ১৯১৭-র রুশ বিপ্লব থেকে নিয়ে চীন, ইউরোপের নানা দেশ, ও অন্যত্র বিভিন্ন বিপ্লবের অভিজ্ঞতার পাঠ ম্যাকলেলানের কাজটিকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বস্তুত, নতুন সহস্রাব্দে মার্কসের জীবন নিয়ে গভীরতর গবেষণালব্ধ জীবনীগুলো প্রকাশের আগে পর্যন্ত ম্যাকলেলন-এর বইটিকেই মার্কসের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবনীগ্রন্থ মনে করা হত।  

নিজেরা নানা অবস্থানে দাঁড়িয়ে এবং মার্কসকে নানা অবস্থানে দাঁড় করিয়ে তাঁর জীবনী রচনার স্রোতধারায় আর একটা নতুন দিক যুক্ত হল এই সহস্রাব্দের চর্চায়: এটি হল তাঁর মননের নির্মাণে তাঁর ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের প্রভাব। এলাকাটাকে একেবারে আনকোরা বলা না গেলেও, এ-দিক দিয়ে অতি সম্প্রতি প্রকাশিত ইস্রায়েলি বিদ্যাতাত্বিক ও রাজনীতিবিদ শ্লোমো আভিনেরি-র কার্ল মার্কস: ফিলসফি অ্যান্ড রিভুল্যুশন (ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১৯) একটি বিশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবদান হয়ে উঠতে পারে। পারিবারিক ভাবে মার্কসের ধর্মীয় প্রেক্ষাপট ছিল ইহুদী। তাঁর মাতামহ ও পিতামহ উভয়েই ছিলেন রাবাই (ইহুদী পুরোহিত)। মার্কসের জ্যষ্ঠতাতও ছিলেন রাবাই। মার্কসের বাবা হেইনরিখ, রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক কারণে মার্কসের জন্মের দু বছর আগে ধর্মান্তরিত হয়ে প্রটেস্টান খ্রিস্টান হিসেবে  পরিচিত হন। মার্কসের মা ধর্মান্তরিত হন তারও অনেক পরে। অনেক লেখক মার্কসের এই প্রেক্ষাপটকে তাঁর মননগত নির্মাণের অন্যতম সূত্র হিসেবে দেখে থাকেন। এর একটা কারণ, অর্থগৃধ্নুতা প্রতি তাঁর সুপরিচিত ঘৃণাকে ইহুদী-বিদ্বেষ বলে গুলিয়ে ফেলা। ইহুদী বিষয়ে ব্রুনো বাউয়ারের প্রতিপাদ্যের সমালোচনা হিসেবে ১৮৪৩ সালে মার্কসের লেখা দ্য জিউইশ কোয়েশ্চেন  বইতে তাঁর প্রতিপাদ্য ছিল মানব-স্বাধীনতার একটি দিক। কার্যত তিনি ইহুদীদের ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। বিষয়টা বেশ জটিল। একদিকে তিনি ধর্মকে মানব-বিচ্ছিন্নতার একটা উপাদান হিসেবে দেখছেন, আবার মানুষের ধর্মাচরণের স্বাধীনতার পক্ষও নিচ্ছেন – অনেকের কাছেই এটা একটা স্ব-বিরোধী অবস্থান, এবং তাঁরা এর মূল খুঁজছেন মার্কসের ধর্মীয় ছিন্নমূল অবস্থার মধ্যে। এই সূত্র ধরে অনুসন্ধান শুরু করে আভিনেরি মানব সমাজে পরিচিতি-র গুরুত্ব, প্রাসঙ্গিকতা, এবং তার পরিবর্তনশীলতার আলোচনায় অনেক কিছু যোগ করেছেন। আভিনেরির মার্কস জীবনী থেকে পাঠক যত না আভিনেরির মতামত জানতে পারবেন তার চেয়ে বেশি নিজের মতামত তৈরি করতে পারবেন: কথায় কথায় উপসংহার না টেনে তিনি পাঠকের হাতে কেবল তথ্যগুলো তুলে দিচ্ছেন। আমরা আগেই দেখেছি, চিন্তার নির্মাণে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কত প্রভাবশালী হতে পারে। মার্কসের চিন্তাও এর থেকে আলাদা নয়, কিন্তু আভিনেরির আলোচনার নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পাঠক একটা জিনিস পেতে পারেন: কীভাবে একজন চিন্তানুশীলক তাঁর সামাজিক অতীত, তাঁর সমকালীন ভূগোল, এবং তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনরেখাকে অতিক্রম করে যান। আভিনেরির বইটি যে ইয়েল ইউনিভার্সিটির জিউইশ লাইভস  শৃংখলার অংশ হিসেবে প্রকাশিত হল, এটাই একটা বিড়ম্বনা!  

 

 কার্ল মার্কসকে নিয়ে মানুষের এত অনন্ত আগ্রহ কেন? তাঁর জীবন নিয়ে প্রথম লেখা শুরু হয় তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে, ১৮৮৫ সালে। লেখক গুস্তাভ গ্রস। তার পর একের পর এক জীবনী বেরিয়েছে  কোনোটাতে মার্কস ঈশ্বর, কোনোটাতে দানব, কোনোটাতে তাঁর চিন্তার ওপর জোর, কোনোটাতে  তাঁর ব্যক্তিজীবনের খুঁটিনাটি নিয়ে, কেউ লিখেছেন দলীয় বা দার্শনিক অবস্থান থেকে, আবার কারো লেখায় উঠে এসেছে নির্মোহ বিশ্লেষণ।  ওপরে যে জীবনীগ্রন্থগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হল, তা কেবল মার্কসের জীবন নিয়ে লেখা বইএর ভগ্নাংশ মাত্র। কিন্তু, যেটা স্পষ্ট তা হল, মানুষের আগ্রহের ভাণ্ডারে মার্কস দারুণভাবে উপস্থিত। তিনি বীর ছিলেন না, দুর্দান্ত খেলোয়াড় ছিলেন না, নাট্যকার বা অভিনেতা ছিলেন না, সাম্রাজ্যের অধীশ্বর বা তার পৃষ্ঠপুষ্ট আমলা-মন্ত্রী ছিলেন না। তা সত্ত্বেও মানুষ তাঁকে জানতে চায়, কারণ মানুষ তার নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা-আশা-আকাংক্ষায়, মার্কসের চিন্তার প্রতিফলন দেখতে পায়, সে যা হতে চায়, মার্কস সেই হওয়াটা নিয়ে ভেবেছিলেন:

সাম্যবাদী সমাজের উচ্চতর স্তরে, যখন ব্যক্তিমানুষ আর শ্রমবিভাজনের আজ্ঞানুবর্তী থাকবে না, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক শ্রম ও দৈহিক শ্রমকে মধ্যে বৈপরীত্যের ধারণাটা অবলুপ্ত হয়ে যাবে; যখন শ্রম হয়ে উঠবে জীবনের একটি উপকরণ মাত্র, কিন্তু তা-ই হবে জীবনের প্রধান চাহিদা; যখন ব্যক্তির সর্বাঙ্গীণ বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত উৎপাদিকা শক্তিগুলোও বেড়ে উঠবে, এবং সমবায় সম্পদের সমস্ত ধারাগুলো উচ্ছল হয়ে বইতে থাকবে— কেবলমাত্র তখনই বুর্জোয়া অধিকারের সঙ্কীর্ণ দিগন্তটাকে সম্পূর্ণ ছাড়িয়ে যাওয়া যাবে, এবং তখনই সমাজ নিজের পতাকায় লিখে নেবে: প্রত্যেকের কাছ থেকে ক্ষমতা অনুযায়ী (নেওয়া), প্রত্যেককে প্রয়োজন অনুযায়ী (দেওয়া)। (ক্রিটিক অব দ্য গোথা প্রোগ্রাম, ১৮৭৫)

গত সহস্রাব্দের প্রথম পর্ব জুড়ে এই মানুষের যে জয়গাথা রচিত হচ্ছিল, ইতিহাসের নিয়মেই সহস্রাব্দের শেষে তার জায়গা নেয় এক শোকসঙ্গীত। কিন্তু, মানুষের ইতিহাস হচ্ছে তার ক্রম উত্তরণের ইতিহাস  এই ইতিহাসের আবিষ্কর্তা মার্কসকে নিয়ে নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে নতুন আগ্রহ, তাই এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তিনি ছিলেন কপর্দকহীন, তিনি ছিলেন মননের আশ্চর্য আলোকে সব চেয়ে আলোকিত মানুষ। তাঁর সারাটা জীবন কেটেছে একটা সংগ্রামের জন্য  সে সংগ্রাম মানব-মুক্তির সংগ্রাম, আর তার আয়ুধ হল মননের সন্ধান। শুধু পুঁজিবাদী সমাজ নয়, চিন-ভারত-ইন্দোনেশিয়া-লাতিন আমেরিকার সমাজগুলো নিয়ে তিনি চালিয়ে গেছেন সুগভীর অধ্যয়ন। মার্শেলো মুস্তো যেমন দেখিয়েছেন, তাঁর অনুসন্ধানের বৈশ্বিক চরিত্রটা তাঁর সব রচনাতেই পাওয়া যায়, তদুপরি মৃত্যুর অনেক পরে পাঠকের হাতে আসা তাঁর বহু চিঠিপত্র, পাণ্ডুলিপির খসড়া, পাঠ-সারাংশ, ইত্যাদি থেকে এটা আরো স্পষ্ট হচ্ছে। মার্কসবাদী পথ-এর ২ মে, ২০২৩ সংখ্যায় সৌভিক ঘোষের লেখা এথনলজিক্যাল নোটবুকস-এর আলোচনা থেকে বাঙালি পাঠকদের মধ্যেও এ-ব্যাপারে আগ্রহের দিকটা উঠে আসছে। এক কথায় নতুন সহস্রাব্দে পুরনো তাৎপর্য  নতুন রসদের সন্ধান করে চলেছে।

স্টেডম্যান জোনস-এর কথায়, বিংশ শতাব্দীতে মার্ক্সের যে মূর্তিটি বেরিয়ে এসেছিল তা “এক ভীতিপ্রদ দাড়িওয়ালা মোড়লের, যিনি নানা বিধান দেন, নির্মম নিশ্চয়তার সঙ্গে চিন্তা করতে পারেন, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যাঁর প্রগাঢ় দূরদৃষ্টি।”  তাহলে নতুন সহস্রাব্দের মানুষ মার্কসের সঙ্গে নতুন করে আলাপ করার কারণ ও গুরুত্ব কীভাবে খুঁজে পায়? জিনিসটাকে আমরা এভাবে দেখতে পারি: গবেষকরা মার্কসের চিন্তায় ও কাজে নানা কিছু খুঁজে পাচ্ছেন, সেই খোঁজকে তাঁরা প্রশস্ততর ও গভীরতর করে তুলতে চাইছেন, এটা একটা দিক। অন্য দিকটা হল, পৃথিবী জুড়ে মানুষ মুক্তির খোঁজ করে চলেছে, সেই খোঁজে সে মার্কসকে পেয়েছে পরম মিত্র হিসেবে। সেই মার্কস কোনো দেবতা নন, কোনো যুদ্ধের সেনাপতি নন, জ্ঞান বা বস্তুজগতের একনায়ক নন, তিনি মানুষের বন্ধু, মানুষের সমাজের এক আজীবন ও চিরন্তন সদস্য, যে-সদস্যতা তিনি অর্জন করেছেন মানুষের পরম আত্মবিকাশের পথ খুঁজতে গিয়ে। সেটা এমন এক আয়োজনের ডাক, মানবিক চিন্তায় যাকে অস্বীকার করা কঠিন। এক স্ব-ঘোষিতভাবে সংশয়ী মার্কস-জীবনীকার ফ্রাংক ম্যানুয়েল-এর স্বীকৃতি ও স্ব-বিরোধের মধ্যে এটা চমৎকার উঠে এসেছে। তিনি ধরেই নিচ্ছেন মার্কস মৃত, তাই তাঁর বই-এর শিরোনাম দিচ্ছেন, আ রিকুইম ফর কার্ল মার্কস (হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৫)। অথচ, বই শেষ হচ্ছে এই বলে যে, “যে পতাকা তিনি তুলে দিয়ে গেছেন সেটাকে কবরের মধ্যে পুঁতে দেওয়া যাবে না।  এমনকি আমার মতো এক সংশয়ী কল্পাশ্রয়ীও  তাঁর [মার্কসের] সেই নির্দেশাত্মক নীতির মূল্যতে  বিশ্বাস করে: প্রত্যেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী দেবে, প্রয়োজন অনুযায়ী নেবে।”

এমন এক বাস্তবের চিন্তাকে যিনি নির্মাণ করেন, তাঁকে নিয়ে মানুষের আগ্রহতো থাকবেই। আগ্রহ আছে বলেই, তাঁর চিন্তায় তাঁর মানুষ সত্ত্বা, এবং তাঁর মানব চরিত্রে সমাজ থেকে সংগ্রহ করা চিন্তার নিরবচ্ছিন্ন আন্তঃক্রিয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে জিজ্ঞাসা থাকবে। মার্কসের জীবনী পড়া-লেখায় বিশ্ব জুড়ে যে বিপুল মানসিক শ্রম নিয়োজিত, দৈহিক শ্রমের সঙ্গে মানবিক শ্রমের পার্থক্যের অবলুপ্তির মধ্যে দিয়েই তার চরিতার্থতা। এটা এক বাস্তবের স্বপ্ন, এক ভিন্নতর স্বপ্নের বাস্তব।  

এই লেখাটি কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকারে বাঁকুড়া থেকে প্রকাশিত বাংলার আভাস পত্রিকায় প্রকাশের জন্য দেওয়া হয়েছে। লেখক বাংলার আভাস সম্পাদকের কাছে কৃতজ্ঞ। 


প্রকাশের তারিখ: ০৫-মে-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org