|
মোজেলের তীরে মার্কসের ভিটেতপন মিশ্র |
মার্কসের জীবনচর্চা এবং এঙ্গেলসের সঙ্গে মার্কসের গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রদর্শনী যাদুঘরের অধিকাংশ স্থান জুড়ে রয়েছে। এই তিন তলা (মাটির নিচের একটি স্টোর (জার্মান ভাষায় “কেলার”) বাদ দিয়ে প্রদর্শনীর মূল ভাগগুলি হল ১। দার্শনিক মার্কস, ২। সমাজ বিজ্ঞানী মার্কস, ৩। অর্থনিতিবিদ মার্কস এবং ৪। সাংবাদিক মার্কস। এছাড়াও দুটি ঘর সম্পূর্ণ রূপে নিবেদিত রয়েছে এককভাবে মার্কস এবং মার্কস ও এঙ্গেলসের যৌথ কিছু সৃষ্টির সংগ্রহের উপর। এঙ্গেলস একাধারে ছিলেন মার্কসের বন্ধু, পৃষ্ঠপোষক এবং বেশ কিছু কাজের অংশীদার। |
তখনও জার্মানি একটি রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মোজেল নদীর ধারে বিশাল প্রুসিয়া সাম্রাজ্যের একটি ছোট্ট শহর ট্রিয়ের। তৃতীয় শতাব্দীর প্রায় শুরু থেকে এবং চতুর্থ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত ট্রিয়ের ছিল রোমান সাম্রাজ্যের চারটি রাজধানীর মধ্যে একটি। ১৮১৮ সালের ৫ মে এখানেই জন্ম এযাবৎ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক এবং দুনিয়ার খেটেখাওয়া মানুষের অর্থনীতি এবং দর্শনের আবিষ্কারক কার্ল মাক্সের। ১৮৭১ সালে আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে যখন জার্মানির পুনর্গঠন হয় তখন জার্মানির এই ভূমিপুত্র লন্ডনে বসে প্যারিস কম্যুনের ঘটনা বিশ্লেষণ করে প্রবন্ধ লিখতে ব্যস্ত ছিলেন। অবশ্য কার্ল মার্কসেরতেমন কোনও দেশ ছিল না। মার্কস রাষ্ট্রকে একটি প্রাকৃতিক সত্তা হিসেবে দেখেন না বরং শাসক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষাকারী সামাজিক রূপান্তরের একটি ভৌগলিক সত্তা হিসেবে দেখেন। আমরা প্রথমে বের্লিন থেকে পাড়িদিয়ে পৌছাই রাইন নদীর সঙ্গে মোজেলের সংযোগ স্থল, কোবলেঞ্জ শহরের ‘ডয়েচ এক’ তে। তার পরেরদিন আমদের গন্তব্য ছিল মোজেল নদীর পাড় বরাবর ট্রিয়ের শহর । অনেক ছোট বড় শহর, মৎস্যজীবীদের গ্রাম পেরিয়ে গত সেপ্টেম্বরের এক দুপুরে এসে পোঁছাই ট্রিয়ের শহরের প্রায় মধ্যভাগে ১০ নম্বর ব্রুকেন স্ট্রাসেতে অবস্থিত ‘কার্ল মার্কস হাউস’-এর সামনে। বের্লিন থেকে ট্রিয়ের শহরের দূরত্ব প্রায় ৯০০ কিলোমিটার। মার্কস হাউসের গড়ে ওঠা ১৯০৪ সালে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট (এসপিডি) ফ্রেডরিখ স্নেটার বাড়িটিকে পুনরায় আবিষ্কার করেন এবং এসপিডি ১৯২৮ সালে এই বাড়ি কিনে নেয়। গুস্তাভ ক্যাসেল নামে একজন স্থপতি ভবনটি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেন। ১৯৩৩ সালে নাৎজিরা এই ভবনটি দখল করে তার কিছুটা অংশ নষ্ট করে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে এই ঘরটি সংস্কারের পর একটি মিউজিয়াম হিসাবে খুলে দেওয়া হয়। ১৯৬৮ সাল থেকে এই মিউজিয়ামটি ফ্রেডরিক এবার্ট ফাউন্ডেসনের দ্বারা পরিচালিত। ফ্রেডরিখ এবার্ট ছিলেন এসডিপি-র এক সময়ে চেয়ারম্যান এবং ১৯১৯ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত ওয়েইমার প্রজাতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি। পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি এবং ব্যক্তির দান গ্রহণ করে ১৯৮৩ সালে মার্কসের শততম মৃত্যু বার্ষিকীতে নবরূপে মিউজিয়ামটি খুলে দেওয়া হয়। কি আছে এই মিউজিয়ামে এই যাদুঘরের একটি ঘরে বেশ কয়েকটি বালির ঘড়ি দিয়ে কার্ল মার্কস জীবনের কোন কোন সময়ে এবং কত দিনের জন্য কোন দেশে তাঁর অবস্থান করছিলেন সেই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে খুব সুন্দরভাবে। ১৮১৮ থেকে ১৮৩৫ পর্যন্ত তিনি ছিলেন ট্রিয়েরের বাসিন্দা। তার পর উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে ১ বছরের জন্য যান বন শহরে। এখনে তাঁর পাঠ্য ছিল আইন। ১৮৩৬ থেকে ১৮৪১ সাল অবধি ছিলেন বের্লিন শহরে যেখানে তিনি দর্শন শাস্ত্রে পিএচডি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘The Difference Between the Democritean and Epicurean Philosophy of Nature’। তার পর প্রথম পর্যায়ে ১৮৪১ থেকে ১৮৪৩ সাল অবধি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৮৪৮ থেকে ১৮৪৯ সাল অবধি তিনি ফিরে আসেন তৎকালীন প্রুসিয়া এবং বর্তমানে জার্মানির রাইন নদীর পাশে কোলন শহরে। প্রুসিয়া তখন ছিল এক বুর্জয়া শাসিত দমনবাদী রাষ্ট্র। এখানেই তিনি প্রথম পর্যায়ে রাইনিসে জেইতুং (Rheinische Zeitung) পত্রিকার সম্পদনার কাজ করেন। প্রথম পর্যায়ে সরকার এই পত্রিকা নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর তাঁকে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে নির্বাসনে চলে যেতে হয় প্যারিসে (১৮৪৩-১৮৪৫)। প্যারিসেই তাঁর প্রথম সন্তান জেনির জন্ম এবং তাঁর অকৃতিম বন্ধু এঙ্গেলসের সঙ্গে সখ্যের যাত্রা শুরু। তার পর তাঁকে সপরিবারে চলে আসতে হয় বেলজিয়ামের ব্রুগেস এবং পরে ব্রুসেলস শহরে (১৮৪৫-১৮৪৮)। সঙ্গে এঙ্গেলস। এখানেই লেখা হয় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো। আবার কোলন শহরে নতুন করে রাইনিসে জেইতুং পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন (১৮৪৮-৪৯)। এর পরই তাঁকে পাড়ি দিতে হয় লন্ডনে। এখানেই তাঁর কলম সৃষ্টি করে দাস কাপিটাল। আমৃত্যু অনেক চড়াই উতরাইর মধ্যদিয়ে লন্ডনেই তাঁকে কাটাতে হয় শেষ জীবন। মার্কসের জীবনচর্চা এবং এঙ্গেলসের সঙ্গে মার্কসের গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রদর্শনী যাদুঘরের অধিকাংশ স্থান জুড়ে রয়েছে। এই তিন তলা (মাটির নিচের একটি স্টোর (জার্মান ভাষায় “কেলার”) বাদ দিয়ে প্রদর্শনীর মূল ভাগগুলি হল ১। দার্শনিক মার্কস, ২। সমাজ বিজ্ঞানী মার্কস, ৩। অর্থনিতিবিদ মার্কস এবং ৪। সাংবাদিক মার্কস। এছাড়াও দুটি ঘর সম্পূর্ণ রূপে নিবেদিত রয়েছে এককভাবে মার্কস এবং মার্কস ও এঙ্গেলসের যৌথ কিছু সৃষ্টির সংগ্রহের উপর। এঙ্গেলস একাধারে ছিলেন মার্কসের বন্ধু, পৃষ্ঠপোষক এবং বেশ কিছু কাজের অংশীদার। তাছাড়াও একটি ঘর নিবেদিত রয়েছে এই দুই সমাজবিজ্ঞানীর পরবর্তী সময়ে দেশে দেশে মার্কসবাদের প্রয়োগের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে। তবে মার্কসের অবদান সংরক্ষণে ‘মার্কস হাউস’-এর এই সম্ভার যে সম্পূর্ণ তা বলা যাবে না। ১৮৮৩ সালে মার্কসের মৃত্যুর পর তার পরবর্তী সময়ে এঙ্গেলস বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র মতাদর্শের সৃষ্টির মশাল বয়ে নিয়ে যান। ১৮৯৫ সালে এঙ্গেলসের মৃত্যু হয়। মার্কসবাদের প্রথম সফল প্রয়োগ হয় ১৯১৭ সালে লেনিনের নেতৃত্বে রুশ বিপ্লব এবং সোভিয়েত স্থাপনের মধ্য দিয়ে। সোভিয়েত প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে দেশে দেশে মুক্তির আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমাজবাদের পক্ষে লড়াইয়ের নেতৃত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে সোভিয়েত গঠনে লেনিনের কিছু কথা থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের আক্রমণ থেকে সোভিয়েত রক্ষা করা, অন্যান্য দেশে সমাজতন্ত্রকে ছড়িয়ে দেওয়া, দেশে দেশে মুক্তিকামী মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে স্তালিনের অবদানের প্রায় কোনও উল্লেখেই নেই এই সংগ্রহশালায়। বলতে দ্বিধা নেই যে, সোভিয়েত থেকে শুরু করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মার্কসবাদ প্রয়োগ সম্পর্কে সোশাল ডেমোক্র্যাটদের যে ব্যাখ্যা তার ছাপ সংগ্রহশালার কিছু অংশে স্পষ্ট। একটি ঘরে রয়েছে মার্কসের ব্যবহার করা চেয়ারটি। চেয়ারটি লন্ডনের তাঁর বাসভবন থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। এই চেয়ারের সামনে আর একটি চেয়ার আছে যেখানে আপনি বসে মার্কসের ব্যবহার করা চেয়ারের সঙ্গে জড়িত ঘটনার কথা শুনতে পারেন। এখানেই উল্লেখ আছে যে মার্কসের মৃত্যু হয় এই চেয়ারে বসেই। দুটি ঘরে বর্তমান সময়ে সাম্রাজ্যবাদের শোষণের নতুন কৌশল, মার্কিনিদের নেতৃত্বে বাজার অর্থনীতির আগ্রাসী চরিত্র ইত্যাদি সম্পর্কে দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমে ব্যাখ্যা রয়েছে। বলাই বাহুল্য যে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ২০ টি ঘরে এই যাদুঘর কার্ল মার্কসের সমস্ত জীবনচর্চা তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। মার্কস-এঙ্গেলেসের পরবর্তী সময়ে সারা পৃথিবী জুড়ে নিপীড়িত মানুষ এই মতাদর্শকে আঁকড়ে ধরার প্রয়াসের মধ্যদিয়ে অবিচ্ছিন্ন লড়াইর সামান্য কিছু এখানে পাওয়া যায়। তবুও যে সংগ্রহ এই জাদুঘরে রয়েছে তা আপনাকে সাম্রাজ্যদাবের বিরুদ্ধে লড়াই তে প্রেরণা জোগাবে। ‘মার্কস হাউস’ কবে তৈরি হয়েছিল সে নিয়ে এক সুন্দর বৈজ্ঞানিক তথ্য এই যাদুঘরে আছে। একটি ওক গাছের বয়স নির্ধারন করে ঠিক করা হয়েছে যে এই ঘরটির সামনের অংশ, যেখানে মার্কস জন্ম গ্রহণ করেন, তা ১৭২৭ সালে তৈরি হয়। প্রতি বছর বৃক্ষের বার্ষিক বৃদ্ধির ফলে ‘গ্রোথ রিং’ তৈরি হয়। সেদিন আমাদের প্রত্যক্ষ করা মার্কস হাউস মিউজয়াম আমাদের চোখ এবং মস্তিস্কককে অনেক খাদ্য যুগিয়ে দিল। আলাপচারিতায় কিছু প্রশ্নের উত্তরে মিউজিয়ামের একজন ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজিতে বলেন এখানকার দর্শকদের মধ্যে চিনদেশের মানুষই প্রায় এক তৃতীয়াংশ। বিদেশিদের এখানে ঢুকতে হলে পাসপোর্ট দেখাতে হয়। সেখান থেকেই এই তথ্য পাওয়া যায়। হবেই তো, যে দেশ আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে তার নাগরিকদের এই উৎসাহ থাকাই স্বাভাবিক। টীকা:
প্রকাশের তারিখ: ০৫-মে-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |