|
মার্কসের ‘মেটাবলিক রিফট’-এর ধারণা এখনও সমান প্রাসঙ্গিকতপন মিশ্র |
মার্কসের মতে যে-কোনও মূল্যে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করার আক্রমণাত্মক পদ্ধতি ধনতন্ত্র গ্রহণ করে থাকে। এই পদ্ধতির ফলে সমাজ ও প্রকৃতির মধ্যে আন্তসম্পর্কের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। এই দুই সত্তার মধ্যে যে-ফাটল তৈরি হয় মার্কসের ভাষায় সেটাই হল ‘মেটাবলিক রিফট’। প্রকৃতি থেকে যা কিছু সংগৃহীত হয় তা হয় প্রকৃতির ক্ষতি করেই। কিন্তু এই ক্ষতি আমাদের জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রকৃতির অত্যধিক শোষণ প্রকৃতি ও মানব সমাজের মধ্যে এক গভীর ক্ষতের জন্ম দেয়। এই ক্ষত হল মেটাবলিক রিফট। |
আজকের বিশ্ব জৈববৈচিত্র্য দিবস (২২শে মে) পালিত হচ্ছে, কিছু জরুরি আলোচনা এবং কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। কিন্তু মেটাবলিক রিফটের (Metabolic Rift) যে-ধারণা প্রায় ১৮০ বছর আগে কার্ল মার্কস আমাদের সামনে রাখেন, আর ইদানীং কালে জৈববৈচিত্র্য সংরক্ষণের যে-সংকট তৈরি হয়েছে তা নিরসনে এক জোরালো এবং বিকল্প ভাবনার অঙ্কুরোদ্গম হয়েছে মার্কসের পরিচর্যায়। কিছু উগ্র দক্ষিনপন্থী নেতা এবং তাঁদের পোষিত বিজ্ঞানীরা বলেন যে মার্কসবাদীরা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে সম্পদ আহরণ করার দোষে দুষ্ট করেন। কিন্তু লেনিনের নেতৃত্বে ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত সোভিয়েত, মার্কসবাদের আলোকে প্রকৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করে। এ-সম্পর্কিত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের অনেক গবেষক সোভিয়েতের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সমূহের সংরক্ষণ নিয়ে বিশ্বের প্রথম উদ্যোগকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন। ১৯১৯ সালে লেনিনের নিজস্ব উদ্যোগে যাপোভাদনিক ব্যবস্থা-র (Zapovednik system) ডিক্রি জারি হয় যার মধ্যে ছিল অরণ্য ও জলাভূমি। ১৯১৯ সালেই আস্ত্রখান ফরেস্ট রিজার্ভ তৈরি হয়ে যায়। আমাদের দেশে প্রথম অরণ্য সংরক্ষণ আইন তৈরি হয় ১৯৮০ সালে। প্রকৃতির মধ্যে থাকা বিভিন্ন উপাদানগুলির মধ্যে যে-ছন্দ কাজ করে তা হল পরস্পরের সঙ্গে সখ্য। মুনাফা-লোভীদের অনিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ এই সখ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করছে। ইন্টারগভর্নমেন্টাল সায়েন্স পলিসি প্লাটফর্ম অফ বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টম সার্ভিসেস (IPBES) সহ অন্যান্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, যে আমরা ষষ্ঠ গণ অবলুপ্তির দিকে এগোচ্ছি। ব্যাপকভাবে নানা প্রজাতি হারিয়ে যাওয়া যেমন বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে হচ্ছে, তেমনই প্রত্যক্ষভাবে অধিক প্রজাতি আহরণের কারণেও ঘটছে। কৃষি ক্ষেত্রে জিন বৈচিত্র্যের সর্বাধিক ক্ষয় আমরা লক্ষ করছি। এখানে বহুজাতিকদের ভূমিকা স্পষ্ট। সেই কারণে কনভেনশন অন বায়োলজিকাল ডাইভার্সিটি (CBD) এ-বছরের ২২ মে বিশ্ব জৈববৈচিত্র দিবসে আহ্বান জানিয়েছে (এবারের থীম হল)— “টেকসই উন্নয়ন এবং প্রকৃতির সঙ্গে ঐকতান (Harmony with Nature and Sustainable Development)”। প্রকৃতির মধ্যে মেটাবলিক রিফট মার্কস আরও লেখেন, যে যে পদ্ধতি মানুষ এবং এই গ্রহের প্রকৃতি জগতের সঙ্গে আন্তসম্পর্কের অবনমন ঘটায় তাই মেটাবলিক রিফট (...disturbs the metabolic interaction between human beings and the planet on which they live; this is known as the concept of “metabolic rift.” (Karl Marx, 1863-1883, Capital, vol. 3; edited by Friedrich Engels, মার্কসের মৃত্যুর ১১ বছর পর এঙ্গেলস এই খণ্ডটির সম্পাদনা সমাপ্ত করেন)। মার্কসের মতে যে-কোনও মূল্যে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করার আক্রমণাত্মক পদ্ধতি ধনতন্ত্র গ্রহণ করে থাকে। এই পদ্ধতির ফলে সমাজ ও প্রকৃতির মধ্যে আন্তসম্পর্কের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। এই দুই সত্তার মধ্যে যে-ফাটল তৈরি হয় মার্কসের ভাষায় সেটাই হল ‘মেটাবলিক রিফট’। জীবন বিজ্ঞানে মেটাবলিজিম (metabolism) কথাটির অর্থ বিপাক ক্রিয়া। দুটি বিপরীতমুখি প্রক্রিয়া যেমন উপচিতি (anabolism) এবং অপচিতি (catabolism)-র সমন্বয় হল বিপাক ক্রিয়া। উপচিতি হল গঠনমূলক এবং অপচিতি ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া। জীবন ধারণের জন্য এই দুই প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য রাখা অপরিহার্য। যেমন ধরা যাক খাদ্য গ্রহণ, পাচন এবং সরলীকৃত খাদ্যের রক্তের সঙ্গে মিশে যাওয়া পর্যন্ত প্রক্রিয়াগুলি হল গঠনমূলক বা উপচিতি। শ্বসন প্রক্রিয়ায় রক্তে মিশে যাওয়া এবং সেই সরলীকৃত খাদ্য ভেঙে দৈনন্দিন কাজ করার জন্য শক্তি উৎপাদন হল অপচিতি বা এক ‘প্রয়োজনীয় ধ্বংসাত্মক’ প্রক্রিয়া। সম্ভবত মার্কসের ‘মেটাবোলিক রিফট’-এর ধারণা এখান থেকেই। প্রকৃতি থেকে যা কিছু সংগৃহীত হয় তা হয় প্রকৃতির ক্ষতি করেই। কিন্তু এই ক্ষতি আমাদের জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রকৃতির অত্যধিক শোষণ প্রকৃতি ও মানব সমাজের মধ্যে এক গভীর ক্ষতের জন্ম দেয়। এই ক্ষত হল মেটাবলিক রিফট। মার্কসবাদীরা যেখানেই রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র (natural ecosystem) এবং মানব সমাজের মধ্যে এই ফাটল দূর করার জন্য সক্রিয় হয়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যখন অর্থনীতি (economics) এবং বাস্তুতন্ত্রের (ecosystem) মধ্যে এক বৈরদ্বন্দ্বের আবহ তৈরি করে তখন মার্কসবাদীরা এই দ্বন্দ্বকে সমাধান যোগ্য অবৈর দ্বন্দ্বে রূপান্তরণে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে। এটাই হল মার্কসবাদীদের মতে সুস্থিত উন্নয়ন (sustainable development)-এর গোড়ার কথা। এক্ষেত্রে সাবেকি সোভিয়েত ইউনিয়ন, কিউবা, চীন ইত্যাদির ভুরি ভুরি উদাহরণ পাওয়া যায়। মার্কস এবং এঙ্গেলস ঊনবিংশ শতাব্দীতে পুঁজিবাদীদের প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে উদ্ভূত পরিবেশগত সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করেন। তারা সেই সময়কালে কয়লার মজুত হ্রাস, অরণ্য ধ্বংস এবং বিশেষ করে কৃষিক্ষেত্রে মাটির উর্বরতা হ্রাস সম্পর্কে লেখেন। মৃত্তিকা রসায়নে অগ্রগতির কারণে, ১৮০০-এর মাঝামাঝি বড়ো জমির মালিকরা পটাসিয়াম লবণ, ফসফেট এবং গুয়ানো (দক্ষিণ আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে জমে থাকা সামুদ্রিক পাখির মল) মাটিতে সার হিসাবে ব্যবহার করেন। ফলে মাটির উর্বরতা কিছুটা বৃদ্ধি পায়। অন্য দিকে গরিব কৃষকরা সারের ব্যবহার করতে পারতেন না। উর্বরতার দিক দিয়ে ‘নিঃশেষিত মাটি’-কে বাইরের থেকে পুষ্টি দিয়ে উন্নত করার জন্য যে-সার ব্যবহার করা হয় তার বাজার মূল্য গরিব কৃষকদের নাগালের বাইরে ছিল। মার্কস লিখছেন “এই সময়ে কৃষকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে মাটির গুণমান বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয় যে খনিজ পদার্থগুলি সেগুলি ব্যয়বহুল এবং স্বল্প পরিমাণে পাওয়া যায়”। মার্কস মৃত্তিকা কেন্দ্রিক মেটাবলিক রিফটের ধারণা তৈরির জন্য সেই সময়কার একজন বিশ্ব বিখ্যাত রসায়ন বিজ্ঞানী লেবিগের (Justus Freiherr von Liebig, 1803 – 1873) গবেষণার সাহায্য নেন। মার্কসের মেটাবোলিক রিফটের ধারণা জমির উর্বরতা ছাড়িয়ে অরণ্য সম্পদ সহ সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। মুনাফালোভিদের জন্য আইন প্রসারিত হচ্ছে মেটাবোলিক রিফট প্রকাশের তারিখ: ২২-মে-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |