|
মাহশার ইরানউর্বা চৌধুরী |
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ইরানের তেহরানে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু হয় ২২ বছরের কুর্দি মেয়ে মাহ্শা আমীনির। সে দেশের উচিত কায়দায় হিজাব না পরায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল নীতিশিক্ষা দেওয়ার জন্য। সাক্ষীদের বক্তব্যে জানা যায় যে, বারবার তাঁর মাথায় লাঠি দিয়ে অজস্র নির্মম আঘাত করা হয় সেই হেফাজতে। এরপর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তার মৃত্যু হয়। |
শুরুটা হয় যুক্তির ধ্বংস দিয়ে, শেষটা হয় প্রাণের ধ্বংসে। মৌলবাদ যতবার নিজের প্রয়োগিক রূপ দেখাতে চেয়েছে, ততবারই, বিচ্ছিন্নভাবে নয়, ধারবাহিকভাবে নিজেকে কেবলই দেখাতে পেরেছে ধ্বংসের পাঁকে চোবানো কোনো অবশেষের চেহারায়। মতের বৈচিত্র্য, ইচ্ছার বৈচিত্র্য, প্রকাশের বৈচিত্র্য - চরিত্রে তা বৈপ্লবিক হোক, বা নিরীহ - সহ্য করার নিয়ম নাই মৌলবাদে। তাই "সমাজরক্ষার বিধিরীতি" তৈরির মহান কর্তব্যের ঘোষণা, ও আয়োজন দিয়ে শুরুটা হলেও, তার প্রয়োগের সময়ে মতামতের ন্যূনতম তারতম্যে ঘটনাক্রম পৌঁছে যায় গাজোয়ারি, উৎপীড়ন, কণ্ঠরোধ, হেনস্থা, প্রহার, গণপ্রহার থেকে শুরু করে একেবারে মানুষকে নিকেশ করার আয়োজন অবধি। প্রতিবার। সামগ্রিকভাবে দেখলে, ঠিক সেজন্যই মৌলবাদ, চরিত্রে “শুদ্ধ”, “মৌলিক" হওয়ার গৌরব বয়ে বেড়াবে ঠিক করলেও, দাপটের কারণে এতটাই সে মানুষবিরোধী যে, গোটা মনুষ্যসমাজটার মধ্যেকার স্বাভাবিক ভালবাসা, ও সংহতির যে বুনিয়াদ, তা নড়বড়ে করে দেওয়ার উদযোগ ছাড়া সে আর কিচ্ছু করে উঠতে পারে না। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ইরানের তেহরানে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু হয় ২২ বছরের কুর্দি মেয়ে মাহশা আমীনির। সে দেশের "উচিত" কায়দায় হিজাব না পরায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল নীতিশিক্ষা দেওয়ার জন্য। সাক্ষীদের বক্তব্যে জানা যায় যে, তাঁর মাথায় লাঠি দিয়ে অজস্র নির্মম আঘাত করা হয় সেই হেফাজতে। এরপর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তাঁর মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে আমরা জানতে পারি, রাস্তায় নেমে ইরানের মানুষের প্রতিবাদ শুরু হয় , এবং তা অবিশ্রাম চলতে থাকে। প্রতিবাদের প্রথম সারিতে বিশেষত মেয়ে মহিলাদের উপস্থিতি দেখা যায়। বিরুদ্ধতায় তাঁদের আগুনে পুড়িয়ে দিতে দেখা যায় মাথার ওড়না, হিজাব। এই প্রতিবাদপর্বে বারবার পুলিশের হামলা হতে থাকে। পুলিশের গুলিবর্ষণ প্রাণ নেয় বহু প্রতিবাদী মানুষেরও। এই পর্বেই এক শহীদের বোনকে নিজের হিজাব ছিঁড়ে, নিজের চুল কেটে দাদার কফিনের উপর ছড়িয়ে দিতে দেখা যায়। গণমাধ্যম, সমাজমাধ্যম গোটা পৃথিবী দেখে শয়ে শয়ে মহিলাদের হিজাব পুড়িয়ে ফেলতে, চুল কেটে ফেলতে। এমনই প্রখর প্রতিবাদের প্রাবল্যে ইরান গত এক মাসের বেশি সময় ধরে তপ্ত হয়ে রয়েছে। থামেনি, চলছে আজও। হিজাব সংক্রান্ত এক টালমাটালের পরিস্থিতি কয়েক মাস আগে ঘটে যায় ভারতেও - তবে সেই ঘটনার চলন ছিল একেবারে উল্টোপথে। কর্ণাটকের এক কলেজ-প্রাঙ্গণে এক ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছাত্রী হিজাব পরে আসায় তাঁর বিরুদ্ধে মাথায় গেরুয়া ফেট্টি বাঁধা হিন্দুত্ববাদীদের জমায়েত, বিক্ষোভ প্রদর্শন, স্লোগানের ছররা শুরু হয়। নিয়ম করার চেষ্টা হয় - হিজাব পরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসা বন্ধ করার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিজাব পরে আসার বিরুদ্ধের এই বিক্ষোভ প্রদর্শন, হিন্দুত্ববাদীদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় অন্যান্য ইস্কুল। ও কলেজ প্রাঙ্গণেও। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা-না পরার এই টানাপড়েনের ফয়সালার জন্য মামলা এখনো চলছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে। ইরান প্রসঙ্গে কর্ণাটকের ঘটনার উল্লেখ করার উদ্দেশ্যে হল, সমাজ-রাজনৈতিক কিছু দ্বন্দ্বের অবতারণা করে, তাকে সূক্ষ্মভাবে দেখে র্যাশানাল কোনো অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করা। কারণ আমাদের ত্রস্ত মাথায় ছেয়ে থাকা মাহশা-র প্রাণহানির ঘটনাই হোক বা কর্ণাটকের ইসলাম ধর্মাবলম্বী সাহসী কলেজ ছাত্রীর হেনস্থার ঘটনাই হোক – যা যা ঘটেছে, যা যা ঘটে, এবং বারেবারে ঘটে চলতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করি, তা কেবল যুক্তি-বিবর্জিতই নয়, তা অমানবিক, তা মারাত্মক অপরাধ। তা সমাজের নেতিবাচক, কুচক্রী শক্তির স্পর্ধার সীমা পেরিয়ে অন্ধকারের দিকে আরো অনেকটা এগিয়ে গিয়ে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা। দুই ক্ষেত্রেই কেন্দ্রবিন্দুতে যে ফ্যাক্টরটি রয়েছে, অর্থাৎ হিজাব, তাকে আর পাঁচটি পোশাকের মতো “কেবলই পোশাক” হিসাবে দেখার উপায় নাই। নি:সন্দেহে এটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে, যা নিজগুণে কিছু বার্তা দেয় – যার প্রভাব ব্যক্তিকে ছাপিয়ে সমাজ অবধি গড়ায়। ফলে বিষয়টিকে -পরিধান সম্বন্ধীয় স্বাধীনতা, বা ব্যক্তির চয়নের অধিকার, বা নারীবিদ্বেষের কুমতলব – এ জাতীয় যেকোনো একটি বগিতে ঢুকিয়ে দিয়ে, একমাত্রিক বোঝাপড়ায়, এককালীন একটি-ই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা কাজের কথা হয় না। এ ঘটনা কেবল নারীর পরিধানের স্বাধীনতা বা সাধারণভাবে নারীস্বাধীনতার-ও পথের কাঁটা নয়। এরকম ঘটনাই সাম্যাসাম্যের মতাদর্শের সূচক হয়ে ওঠে – সূচক হয়ে ওঠে সামগ্রিক রাজনীতিতে অনবরত ঠোকাঠুকিতে থাকা বিবিধ মতাদর্শের সম্মুখ সমরের, ব্যাটল অফ আইডিয়াজ-এর। তাই কেবল নৈর্ব্যক্তিকভাবে একে পর্যবেক্ষণ করাও সম্ভব না। বস্তুত পৃথিবীর কোনো উৎপীড়নকেই সামগ্রিক বৈ খণ্ডিত চেহারায় দেখে কার্যকরীভাবে চেনা যায় না, ফলত তার প্রতিরোধের মাধ্যমে তার অবসানও ঘটানো যায় না। হিজাব পরতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে শোষণ যে সংঘটিত হল – লিঙ্গবৈষম্য ও পিতৃতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ পক্ষে দাঁড়িয়ে তা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, কারণ হিজাবের তাৎপর্যের সঙ্গে যে স্পষ্টত লিঙ্গ রাজনীতির যোগ রয়েছে, তা বহুচর্চিত। তবে আমরা বহু সময়েই থমকাই হিজাব খুলে ফেলতে বাধ্য করার, অর্থাৎ যে চেষ্টা ঘটেছিল কর্ণাটকে, প্রশ্নে একটি র্যাশানাল অবস্থান নিতে – পিতৃতন্ত্রের কিঞ্চিত হলেও মেদক্ষয় ঘটতে পারে যে বস্ত্রস্খলনে, তাকে টিঁকিয়ে রাখার জন্য মৌলবাদ-বিরোধীরা, পিতৃতন্ত্র-বিরোধীরাই আবার হঠাৎ করে তৎপর কেন? - এই টানাপোড়েন মনে জাগে। আবার এর উত্তর খোঁজার উৎসাহ স্বাভাবিকভাবেই মৌলবাদ-বিরোধীদেরই থাকার কথা – কারণ অনাগ্রহীকে হিজাব খুলতে বাধ্য করার মতো নেতিবাচক, ও কর্তৃত্ববাদী কোনো ঘটনার ফের নেতিকরণ কেন করতে হয়, তার ব্যাখ্যা খোঁজার তাগিদ স্বভাবতই যুক্তিনিষ্ঠ মানুষেরই থাকবে, কোনো অন্ধবিশ্বাসীর থাকবে না – চুল চিরে বিচার করলে সম্ভবত বোঝা যাবে – “হিজাব-স্খলন” ততক্ষণ পিতৃতন্ত্রের, ও মৌলবাদের সঙ্গে টক্কর দিয়ে তাদের মাত করে দিতে পারে, যতক্ষণ তা অপরের অঙ্গুলিহেলনে হচ্ছে না – যেই মুহূর্তে নারী হিজাব খুলতে “বাধ্য” হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে বাধ্যবাধকতাজনিত জবরদস্তির ব্যাকরণে চালু হয়ে যাচ্ছে দ্বিতীয় দফার মৌলবাদ চর্চা, পিতৃতন্ত্রের অনুজ্ঞাদানের বাতিক চর্চা – অতএব এই পর্যবেক্ষণে আমরা এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, মৌলবাদের সঙ্গে যুক্তিবাদের যেমন সরাসরি বিরোধ আছে, তেমনি জৈবিক বৈরিতা আছে “স্বাধীনতা”-রও। “একক”-এর স্বাধীনতা নয়, কৌমের স্বাধীনতা, সামাজিক পরিচিতিভিত্তিক গোষ্ঠীর স্বাধীনতা, শ্রেণির স্বাধীনতা, এবং তৎসম গুরুত্বে ব্যক্তিরও স্বাধীনতা – এই সামগ্রিক চেহারার যে স্বাধীনতা তার সঙ্গে মৌলবাদের বৈরিতা থাকতে বাধ্য। কারণ মৌলবাদের টিঁকে থাকার ভিত্তিই হল আধিপত্য স্থাপন, এবং লক্ষ্য হল চূড়ান্ত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করার উপায় প্রয়োগ করে ব্যক্তি, সমাজ, শ্রেণিকে - বিভাজনের, ক্ষমতার, শোষণের, ও অসাম্যের রাজনীতির কব্জায় রাখা। ইরানে মাহশা-র মৃত্যু কেন? – সংকটের কেন্দ্র থেকে অনেকটা দূরত্বে চলে গিয়ে এমন সরল প্রশ্ন করলে আমাদের আর চলছে না, কারণ সভ্যতার বিকাশের পথে আগাছা উপড়াতে উপড়াতে আমাদের এগোনোর কথা, একদা উপড়ে ফেলা আগাছা ফের পুঁতে উপড়াতে উপড়াতে এগোনোর কথা না – আমরা জানি মাহশা-র মৃত্যু কেন; মৌলবাদের অমানবিক পরিণতি আমরা শতক পেরিয়ে অভিজ্ঞতা করে চলেছি, ভারতে হিন্দুত্ববাদের দাপটে গাদা মানুষকে আমরা বেহিসাবে মরতে দেখেছি বহু সময়ে। তাই মৃত্যু অবধি অপেক্ষা করে নয়, মৌলবাদীদের এক টানা মৌলিক প্রশ্ন করতে হবে – জবরদস্তি কেন? হিজাব পরার, বা না পরার জবরদস্তি কেন? কীসের জোরে? কোন অওকাতে? বুদবুদের মতো ফাঁপা দেমাকে থাকা মৌলবাদ গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে আকাশ ভাঙ্গার মতো করে ব্যর্থ হয়েছে বহুবার – তারা ব্যর্থ হয় ইরানের সেই মেয়ে, মহিলা, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধের কাছে, যাঁরা চিরলালিত বায়বীয় সমাজ-শৃঙ্খলাকে কোনো না কোনোভাবে, কোনো না কোনো ক্ষণে “দূরছাই” করে চলেন দশকের পর দশক ধরে। ইরানের শয়ে শয়ে প্রতিবাদী মানুষকে মৌলবাদী ধারা তার নিজের দর্শনে, নিজের মতাদর্শে কণামাত্র দীক্ষিতও করতে পারেনি, সম্মোহিতও করতে পারেনি। কারণ তার দর্শনের অন্যতম লক্ষ্য হল, মানুষের কাণ্ডজ্ঞানকে, মায় পরিশোধিত যুক্তিকাঠামোকে ধ্বংস করা। আর শত হতাশার পৃথিবীরও সর্বৈব সত্য হল, স্থায়ী বন্দোবস্তে মানুষ ভাবা, বিশ্লেষণ করা, এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া বন্ধ করতে পারে না। কারণ স্বভাবত মানুষ ভাবে। সংকটকালে ঘটনার, ঘটনাক্রমের দ্বান্দিক বিস্তারে সে যেতে বাধ্য। তার যুক্তির কাঠামো চাইলেই চিরতরে ভেঙে দেওয়া যায় না। বরং অনবরত ভাঙতে চাইলে একদিন না একদিন সে প্রত্যাঘাত করে। মাহশার প্রাণনাশের প্রতিবাদে, প্রতিবাদীদের শহীদ হওয়ার প্রতিবাদে - ইরানের মেয়েরা নিজেদের সৌন্দর্যের, রূপের বালাই পায়ে ঠেলে, বেপরোয়া কাঁচি, আর ক্ষুর চালিয়ে নিজেদের চুলে কেটে, ছেঁটে, চেঁছে ফেলে দিয়েছে্ন, আগুনে পুড়িয়েছেন, ফালা ফালা করে ফেলেছেন একটার পর একটা হিজাব। মৌলবাদী আদর্শের যে দর্প, যত পৈশাচিক হয়ে ওঠার দমই তার থাকুক, তা যে ষোল আনা ফেলনা বিশ্বের সামনে তার নজির মেলে ধরেছে মাহশা-র ইরান। প্রকাশের তারিখ: ২৪-অক্টোবর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |