জীবনের বস্তুগত ভিত্তি এবং বিজ্ঞানী ওয়াটসন

তপন মিশ্র
মেন্ডেলের এই ‘ফ্যাক্টর’ হল সেই বস্তু যা পরে অর্থাৎ ১৯০৯ সালে  উদ্ভিদবিজ্ঞানী উইলহেম জোহানসেন বংশগতি বিজ্ঞানের কিছু গবেষণা করে মেন্ডেলের ফ্যাক্টরের ধারণাকে আরও নির্দিষ্ট করে বর্ণনা করার জন্য ‘জিন’ (Gene) শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি একজন ব্যক্তির বাহ্যিক চেহারা (ফেনোটাইপ) এবং তার জিনগত বৈশিষ্ট্য-এর (জিনোটাইপ) মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে এই জিনের কথা উল্লেখ করেন।

গত ২০২৫ সালের নভেম্বর ৬ তারিখে ৯৭ বছর বয়েসে মৃত্যু হয় এক অত্যন্ত পরিচিত বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন (James Dewey Watson)-এর। ওয়াটসন যে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন বা নির্দিষ্ট কোনও আদর্শে বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন এগুলির মধ্যে কোনটাই নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁকে স্মরণ করতে হয় যে কারণে তা হল ‘জীবনের বস্তুগত ভিত্তি’ আবিষ্কারে তাঁর গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকাকে আর একবার মনে করার জন্যে। ১৯৬২ সালে ওয়াটসনের সঙ্গে ফ্রান্সিস ক্রিক এবং মৌরিস উইলকিন্স ফিজিওলজি বা মেডিসিন ডি.এন.এ-র দ্বিতান্ত্রিক গঠনের (Double helix structure) আবিষ্কার জীব বিজ্ঞান গবেষণায় এক নতুন যুগের সূচনা করে। একথা ঠিকই যে বিজ্ঞানের প্রতিটি আবিষ্কার বস্তুবাদী দর্শনের ভিতকে আরও দৃঢ করে, কিন্তু এমন এক একটি আবিষ্কার আমরা দেখতে পাই যা আমাদের চেতনার জগত এবং বিজ্ঞানের জগত উভয় ক্ষেত্রকেই এতটা প্রভাবিত করে যে এই বিশ্বকে নতুন এক আলোকে দেখতে ইচ্ছা হয়। 

ওয়াটসনের মৃত্যুর শোক বার্তায় (Journal of Genetics, 2025) ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রথিতযশা মানব সুপ্রজনন বিদ্যা-র (human genetics) গবেষক এবং অধ্যাপক পার্থপ্রতিম মজুমদার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছেন যার উল্লেখ এখানে করা দরকার।  তিনি সমাজ বিজ্ঞানের একজন সুপরিচিত গবেষক এডওয়ার্ড উইলসনের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াটসন সম্পর্কে লিখেছেন ‘আমার দেখা সবচেয়ে অপ্রীতিকর মানুষ’। ওয়াটসন ছিলেন সম্ভবত প্রথম এমন একজন নোবেল বিজেতা যিনি তার জীবিত অবস্থায় তাঁর নিজের নোবেল পুরস্কারের ১৮ ক্যারেটের নোবেল মেডেলটি নিলাম করে দেন। 

অধ্যাপক মজুমদার লিখেছেন যে ওয়াটসন নিজেই বলেছিলেন যে তার কিছু দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশ্বাসের কারণে তিনি একজন ‘unperson’ হিসাবে সমাজে পরিচিত। ‘অনপারসন’-এর বাংলা যদি কেউ ‘অমানুষ’ করেন তাহলে বিস্তর ভুল হয়ে যাবে। আসলে তিনি একজন ভিন্ন ধাতের মানুষ ছিলেন যিনি অন্যদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারতেন না। তিনি নিজের সম্পর্কে আরও বলেন ‘কেউই আসলে আমার অস্তিত্ব স্বীকার করতে চায় না’ অর্থাৎ জীবন সম্পর্কে হতাশা তাঁকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখে ছিল।  

তাহলে ওয়াটসনের কথা কেন?  

সালটা ১৯৫৩। জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিক-এর যৌথ উদ্যোগে নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় একটি প্রবন্ধ। প্রবন্ধের শেষ ছত্রে তাঁরা লেখেন ‘It has not escaped our notice that the specific pairing we have postulated immediately suggests a possible copying mechanism for the genetic material.’ বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘আমরা যে নির্দিষ্ট জোড়ার (ডি.এন.এ-এর double helix-এর কথা এখানে বলা হয়েছে) কথা তুলে ধরেছি তা অবিলম্বে জেনেটিক উপাদানের জন্য একটি সম্ভাব্য অনুলিপি প্রক্রিয়ার যে ইঙ্গিত দেয় তা আমাদের নজর এড়ায়নি।’

কথাটি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বিশ্বের তাবড় ভাববাদীরা তাদের সমস্ত মেধা দিয়ে বুঝতে সক্ষম হননি। ‘ডি.এন.এ’-এর মতো একটি জৈব-রাসায়নিক অণু তার নিজের অনুলিপি তৈরি করতে পারে অর্থাৎ নিজেই প্রজনন প্রক্রিয়ার মতো ১ থেকে ২ এবং ২ থেকে ৪ হতে পারে এমন ঘটনার ধারণা আগে কেউ দিতে পারেননি। বিশ্বের কোনও অজৈব বস্তুর এই ক্ষমতা নেই। ডি.এন.এ-এর এই প্রতিলিপি গঠন ক্ষমতার পূর্বানুমান তাঁরা করেছিলেন বটে কিন্তু তা তাঁরা আবিষ্কার করতে পারেননি। তাঁরা যা আবিষ্কার করেছিলেন তা হল এমন একটি বৃহদাকার জৈব-অণু যা জীবনের মূল গঠনগত একক। ডি.এন.এ এবং আর.এন.এ এই দুই অণু যে গোষ্ঠীর তাকে নিউক্লিক অ্যাসিড বলা হয়। এই দুটো বাদ দিয়ে জীবনের কল্পনা করা যায় না। ভাইরাস থেকে শুরু করে সমস্ত ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণীদের দেহে ন্যুনতম দুই ধরনের অণু থাকা জরুরি। প্রথমটি হল ডি.এন.এ বা/এবং আর.এন.এ এবং তার সাথে প্রোটিন। এর মধ্যে কেবল ডি.এন.এ এবং আর.এন.এ-এর নিজেদের অনুলিপি তৈরির ক্ষমতা আছে, প্রোটিনের নেই। ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে আমাদের দেহ কোষ পর্যন্ত যে লক্ষ লক্ষ ধরনের প্রোটিন অণু তৈরি হয় তার সমস্ত নির্দেশ আসে ডি.এন.এন থেকে এবং আর.এন.এ-র মাধ্যমে। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে জীবনের এই রহস্যের পেছনে যে যুক্তি রয়েছে। ওয়াটসন, ফ্রান্সিস ক্রিক (Francis Harry Compton Crick), মরিস উইলকিন্স (Maurice Hugh Frederick Wilkins) এবং রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন (Rosalind Elsie Franklin) এঁদের মধ্যে কেউ মার্কিন আবার কেউ ইংরেজ নাগরিক। 

এদের মধ্যে রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন ডি.এন.এ-র দ্বিতন্ত্র (ডাবল-হেলিক্স) কাঠামো আবিষ্কারে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য এখনও সুবিদিত। রোজালিন্ডকে অন্ধকারে রেখে, বলা যেতে পারে তাঁর আবিষ্কারকে চুরি করে, ডি.এন.এ গঠনের আবিষ্কারের কৃতিত্ব দাবি করেন ওয়াটসন এবং ক্রিক। বিজ্ঞান গবেষণার এ-ঘটনা এক কালো অধ্যায়। রোজালিন্ডের তাঁর বিখ্যাত ফটো-৫১-এর মাধ্যমে, একটি স্পষ্ট এক্স-রে চিত্র, ডি.এন.এ-র হেলিকাল আকৃতি প্রকাশ করে, যা ওয়াটসন এবং ক্রিকের মডেলের জন্য অপরিহার্য ছিল। প্রাথমিকভাবে রোজালিন্ডের অবদান উপেক্ষা করা হয়। উপেক্ষিত রোজালিন্ড গবেষণা পত্র প্রকাশের পাঁচ বছরে মধ্যে জরায়ু ক্যান্সারে তাঁর মৃত্যু হয়। 

অবিচ্ছিন্ন জ্ঞানের ধারা 

এখানেই আসে সাধারণ জ্ঞান এবং যুক্তি-নির্ভর জ্ঞানের ধারাবাহিকতার কথা। এখানে সাধারণ জ্ঞান এবং যুক্তি-নির্ভর জ্ঞানকে আলাদা করে দেখতে হচ্ছে এ-কারণেই যে ভাববাদী দার্শনিকরা যে-সাধারণ-জ্ঞানের কথা বলেন তা বিচ্ছিন্ন এবং কল্পনা প্রসূত। তাতে বিচ্ছিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক এবং অন্তর্নিহিত। কিন্তু বিজ্ঞানের জ্ঞান অবিচ্ছিন্ন। 

যদি চার্লস ডারউইন থেকে শুরু করি তাহলে দেখব যে ডারউইন যে-অভিব্যক্তির কথা বললেন তা টিকে থাকার সংগ্রাম (Struggle for Exitance) এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব (Natural Selection Theory) কারণে প্রত্যেকটা প্রজন্মে যে-ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রকরণ গুলো (variation) হয়ে থাকে ডারউইন তা খুব কাছ থেকে লক্ষ করেন। অন্য দিকে গ্রিগর জোহান মেন্ডেল নামে একজন খ্রিস্টান পাদ্রী  সেন্ট থমাস আবে নামে এক চার্চের পিছনের মাঠে মটর গাছের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপ্রজনন বিদ্যা (genetics)-এর গোড়ার কথা বলেন। তিনি তাঁর পরীক্ষা লব্ধ জ্ঞান থেকে যে-ইঙ্গিত দিয়ে ছিলেন তা হল যে কোনও একটি ফ্যাক্টর (factor) আছে যার মাধ্যমে একটি প্রজাতির মধ্যে পিতা-মাতা থেকে সন্তান-সন্ততিদের দেহে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রবাহিত হয়।

মেন্ডেলের এই ‘ফ্যাক্টর’ হল সেই বস্তু যা পরে অর্থাৎ ১৯০৯ সালে  উদ্ভিদবিজ্ঞানী উইলহেম জোহানসেন বংশগতি বিজ্ঞানের কিছু গবেষণা করে মেন্ডেলের ফ্যাক্টরের ধারণাকে আরও নির্দিষ্ট করে বর্ণনা করার জন্য ‘জিন’ (Gene) শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি একজন ব্যক্তির বাহ্যিক চেহারা (ফেনোটাইপ) এবং তার জিনগত বৈশিষ্ট্য-এর (জিনোটাইপ) মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে এই জিনের কথা উল্লেখ করেন।    

এর পর আরও কয়েকটি ধারা যুক্ত হতে হতে ১৯৫৩ সালে এই জিনের গঠনের আসল রাসায়নিক এবং ভৌতিক গঠন অর্থাৎ বস্তুগত গঠনের পুরোটাই আমরা বুঝতে পারি। একেই আমরা ওয়াটস এবং ক্রিকের মডেল বলি। 

তাঁর চারিত্রিক দৃঢতা 

এখানেই কিন্তু ওয়াটসন থামেননি। ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে, জিন বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ মানব ডি.এন.এ সিকোয়েন্স (সারিবদ্ধ গঠনের ম্যাপ) তৈরি করার প্রয়াস শুরু হয়। মানুষের প্রতিটি কোষের ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমে তিন বিলিয়ন নিউক্লিওটাইড (ডি.এন.এ এবং আর.এন.এ-এর রাসায়নিক একক) রয়েছে। এই সমস্ত নিউক্লিওটাইডকে যে যেখানে আছে তাকে ম্যাপে নিয়ে আসার কারণ ছিল যে এই সিকোয়েন্স থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান চিকিৎসা এবং আমাদের জীবনের উপর অকল্পনীয় প্রভাব ফেলতে সম্ভবপর। অনেক বিজ্ঞানী এটিকে একটি স্বপ্নের প্রকল্প মনে করেছিলেন। ১৯৯০ সালে ওয়াটসনকে হ্যুমান সিকোয়েন্সিং এন্টারপ্রাইজের (যাকে হিউম্যান জিনোম প্রকল্প বলা হয়)  প্রধান নিযুক্ত করা হয়। অধ্যাপক মজুমদারের মতে এটি সত্যিই একটি সাহসী উদ্যোগ ছিল, ডি.এন.এ সিকোয়েন্সিং ছিল ধীর, শ্রমসাধ্য, ব্যয়বহুল এবং ত্রুটি-প্রবণ। ওয়াটসনের এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়ার গ্রহণযোগ্যতা আবারও প্রমাণ করে যে তিনি বড়ো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে ভয় পান না।

কিন্তু প্রকল্পের জন্য যারা সবথেকে বেশি অর্থ লগ্নি করেন সেই মার্কিন জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (NIH) পরিচালকের সাথে ওয়াটসনের মতবিরোধের কারণে তিনি ১৯৯৪ সালে প্রকল্পটি ছেড়ে দেন। ওয়াটসন বিশ্বাস করতেন যে প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত তথ্য মানবতার বৃহত্তর কল্যাণের জন্য ব্যবহার করা উচিত, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা উচিত নয়। এন.আই.এইচ পরিচালক দ্বিমত পোষণ করেন এবং জিন সিকোয়েন্স পেটেন্ট করার মাধ্যমে বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জনের উপর তাদের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। মানবতার পক্ষে এই অমননিয়তা মাইকেল ফারাডে, জোনাস শাল্ক, কালাজ্বরের ঔষধ আবিষ্কর্তা উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী মতো হাজার হাজার মানব দরদি বিজ্ঞানী পেটেন্ট নেওয়ার পদ্ধতিকে ঘৃণা করেছেন এবং ওয়াটসন ও সেই পথেই হাঁটলেন। 

ওয়াটসনের মৃত্যুর পর তাঁর জীবন নিয়ে আলোচনা করার ধৃষ্টতা আমরা দেখাব না। রোজালিন্ডকে বঞ্চনা করার দায় ওয়াটসন এড়াতে পারনি ঠিকই, কিন্তু একজন মানুষ যিনি এই বিশ্বের সমস্ত জীবনকে বস্তুর এক রূপ হিসাবে দেখতে শিখিয়েছেন, বিজ্ঞানের জ্ঞানের বানিজ্যিকরণের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করে তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প থেকে সটান বেরিয়ে এসেছেন, একজন বামপন্থী হিসাবে তাঁর কথা তো আমাদের স্মরণে রাখতেই হয়।     


প্রকাশের তারিখ: ১০-জানুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org