|
ডিজিটাল যুগে সংবাদমাধ্যম (৪)প্রবীর পুরকায়স্থ |
এবং তবুও, ছাপাখানা এবং গণ-পরিসরের বিস্তারে এর ভূমিকাকে আমরা ইতিহাসের অগ্রগতির অংশ হিসাবেই দেখি। সমাজের সাধারণ কাজেকর্মে অংশগ্রহণ এবং সাক্ষরতা, যা আগে ছিল সামন্তবাদী এলিটদের কুক্ষিগত, ছাপাখানার দৌলতে সেগুলিতে সাধারণ মানুষের ভূমিকা আরও বাড়ল, এবং এতটাই বাড়ল যে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে চলে এল শ্রমিকশ্রেণিও। এটা নেহাৎই আকস্মিক ছায়াপাত নয় যে, লেনিন ইসক্রা-কে শুধুমাত্র পার্টির মুখপত্র বলে মনে করতেন না, বরং এই পত্রিকাকে তিনি পার্টি গঠনের হাতিয়ার বলেও মনে করতেন। |
পর্ব ৪ কীভাবে একচেটিয়া কোম্পানি হয়ে উঠল গুগুল ও ফেসবুক? গুগল এবং ফেসবুক— দুটি কোম্পানিরই নেতৃত্বে ছিলেন প্রযুক্তিবিদেরা যারা বুঝেছিলেন এই ক্ষেত্রটিতে প্রযুক্তির গুণমানই বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে আসল ফারাকটা গড়ে দেবে। গুগল এবং ফেসবুক জানত যে তারা সফটঅয়্যার বিক্রি করছে না। তাই তারা বাজারে চালু, বিনি পয়সার, সকলে ব্যবহার করতে পারে এমন সফটঅয়্যার টুলস (tools) কাজে লাগিয়েছিল। এবং একইসঙ্গে এগুলির ব্যবহারে দক্ষ লোকজনকে কাজে লাগিয়েছিল যাতে তারা গুগল ও ফেসবুকের কাজ হাসিল হয় এমন হাতিয়ার তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি তারা এই ধরনের অনেকগুলি টুল বা হাতিয়ার বাজারে ছেড়েও দিয়েছিল যাতে যে কেউ তা নিজের মতো করে ব্যবহার করতে পারে। এইভাবে যে কয়েকটি হাতিয়ার বা প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার সহজলভ্য হয়ে গেল, তাতে করে গুগল ও ফেসবুক এমন একটা বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলার সুযোগ পেল যেখান থেকে নিখরচায় সফটঅয়্যার টুল ব্যবহারকারীরদের সম্পদগুলি কাজে লাগিয়ে হাতিয়ারগুলিকে আরও উন্নত করা যায়। গুগল ও ফেসবুক তাদের কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা বিষয়বস্তু সৃষ্টিকারীদের সঙ্গে লাভের টাকা কিছুটা ভাগ করে নেয়। তবে যেভাবে তারা এই ভাগাভাগি করে বলে দাবি করে আসল হিসাবটা তত সাদামাটা নয়। গুগলের যেসব একচেটিয়া কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়েছিল তার মধ্যে একটা হল এরা কীভাবে বিজ্ঞাপনের নিলামকে আড়াল থেকে কারসাজি করে নিয়ন্ত্রণ করে। যখন ইউটিউব দাবি করে যে কনটেন্ট সৃষ্টিকারীদের তারা মোট বিজ্ঞাপন জনিত আয়ের ৫৫ শতাংশ দিয়ে দেয়, তখন তারা কখনই একথা জানায় না যে, ইউটিউব বিজ্ঞাপন বাবদ মোট কত টাকা পেয়েছে এবং এর বিজ্ঞাপন সূত্রে আয়ের কতটা গেছে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকা গুগলের অন্যান্য কোম্পানিগুলির কাছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাস্টবিরোধী মামলা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ব্রিটেনের মনোপলি/কম্পিটিশন কমিশনে দায়ের হওয়া মামলাগুলির বিচার্য বিষয় ঠিক এইগুলিই। আমেরিকা, ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফেসবুককে ঠিক একই ধরনের ট্রাস্টবিরোধী এবং প্রতিযোগিতা বিরোধী আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়তে হয়েছে। তাও আবার ইউরোপে একচেটিয়া আইনগুলিকে পরিকল্পিত ভাবে দুর্বল করে ফেলার পর এবং নাম বদলে ‘কম্পিটিশন’ আইন রাখার পরই গুগল ও ফেসবুককে এধরনের ব্যবস্থার মুখে পড়েছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইনগুলি যদিও বদল করা হয়নি, তবে সেগুলিকে অনেক বেশি দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাখ্যাটাই বদলে ফেলে বলা হয়েছে যে, একচেটিয়া কারবার কোনও ইস্যুই নয়। বরং একচেটিয়ার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে দেখাতে হবে যে, উপভোক্তা বা প্রতিযোগীরা একচেটিয়ার দরুন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে একচেটিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে আগের চেয়ে অনেক বেশি বাধার মুখোমুখি হতে হয়। গুগল যখন এক নম্বর সার্চ ইঞ্জিন হয়ে উঠল, তখন আমাদের ধারণাই ছিল না যে কীভাবে এই কোম্পানি বিশ্বের অন্যতম বিশাল ও ক্ষমতাধর সংস্থায় পরিণত হল। এই কোম্পানি তখন আমাদের খুব সহজে কনটেন্ট খুঁজে দিতে সাহায্য করছে, তখন এদের বিজ্ঞাপনের ব্যবসাও ছিল না, এবং শ্লোগান ছিল ‘অশুভ কিছু করবেন না’। খুবই চমৎকার, একেবারে মাখনের মতো তুলতুলে একচেটিয়া কারবার! বাস্তব কিন্তু এর একেবারে উল্টোটা। গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ২০০৪ সালে দাবি করেছিলেন যে, গুগলের উদ্দেশ্য হল গ্রাহকদের এমন সাইটে নিয়ে যাওয়া যেখানে তাদের সার্চ–এর পক্ষে প্রাসঙ্গিক কনটেন্ট রয়েছে। আর এখন, দুই তৃতীয়াংশ— বা তিনের মধ্যে দুটি সার্চই আরেকবার মাউস ক্লিক না করেই শেষ হয়ে যায়। সার্চ ইঞ্জিন বিশেষজ্ঞ রান্ড ফিশকিন একে বলেছেন জিরো–ক্লিক সার্চ।১৬ মোবাইল সার্চের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে আরও বেশি— প্রতি পাঁচ বারের মধ্যে চার বার। আজকের দিনে অধিকাংশ গুগল সার্চের ক্ষেত্রেই সার্চ পেজের ডিসপ্লেতে দেখানো লিঙ্কগুলিতে আর ক্লিক করতে হয় না। অন্যভাবে বললে, যদি সার্চ পেজের লিঙ্কগুলিতে ক্লিক করা হয়, তাহলে তা প্রায়ই মূল কনটেন্ট স্রষ্টার সাইটে না-নিয়ে গিয়ে, আমাদের পৌঁছে দেয় গুগলের অন্যান্য সাইটগুলিতে। ১৭ সেকারণেই ইন্টারনেটে সার্চের ব্যাপারটায় গুগলের অধিকার একচেটিয়া। এর একমাত্র ব্যতিক্রম হল স্বাধীন সংস্থা ফেসবুক ও অ্যামাজনের অধীনস্থ পরিসরগুলি। ইন্টারনেটে সব ধরনের সার্চ-এর ওপর গুগলের এই নিয়ন্ত্রণ সমস্যার একটা দিক মাত্র। অন্য দিকটা হল, গুগলের দু-মুখো একচেটিয়া কারবার। একচেটিয়া নিয়ে গবেষণারতদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় দীনা শ্রীনিবাসন লিখেছেন, ‘বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে, একক কোম্পানি হিসাবে অ্যালফাবেট (‘গুগল’) একদিকে ব্যবসার একেবারে ওপরতলায় ট্রেডিং ভেনুতে (যেমন স্টক এক্সচেঞ্জ, মাল্টিল্যাটারাল ট্রেডিং ফেসিলিটি বা এমটিএফ, অর্গানাইজড ট্রেডিং ফেসিলিটি বা ওটিএফ ইত্যাদিতে—অনুবাদক) সক্রিয়। একইসঙ্গে ব্যবসা করার জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতাদের যে সব শীর্ষস্থাীয় মধ্যস্থতাকারী সংগঠনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় গুগল সেখানেও সক্রিয়। আবার বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞাপনের স্পেস বিক্রি করে সবচেয়ে বৃহৎ যেসব কোম্পানিগুলি, গুগল তাদের মধ্যেও অন্যতম।’ ১৮ এর মানে ইন্টারনেটের বিজ্ঞাপনের বাজারকে, ভালো রকম করসাজি করে খুব ভালোভাবে গুগলের অনুকূলে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেকারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক প্রদেশ গুগলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করছে। নিজেদের ক্ষেত্রটাকে খোলামেলা পরিসর বলে মোটেই দাবি করে না ফেসবুক। এবিষয়ে তাদের অবস্থানে কোনও ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই। ফেসবুক হল ইন্টারনেটের মধ্যে একটা ‘প্রাচীরে ঘেরা বাগান’ যেখানে জায়গা করে নিয়ে আপনি বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন এবং সমমনোভাবপন্ন লোকজনদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারেন। যখন ফেসবুকে ঢুকে আপনি অন্যদের সঙ্গে কথাবার্তা চালান, তখন বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে ফেসবুক আপনাকে বিক্রি করতে উঠে-পড়ে লাগে। ফেসবুকের লক্ষ্য হল সর্বোচ্চ সময় পর্যন্ত আপনাকে ধরে রাখা, মানে আপনি যাতে বেশি বেশি সময় ফেসবুকে আঠার মতো আটকে থাকেন তা দেখা। গুগল আবার ছালচাতুরি পছন্দ করে। গুগল দেখাতে চায় যে, তাদের সার্চ ইঞ্জিনের উদ্দেশ্য হল আপনাকে সেই সব সূত্রের কাছে পৌঁছে দেওয়া যারা মূল কনটেন্ট তৈরি করেছে। কিন্তু ফেসবুক একেবারে শুরু থেকেই তাদের পরিসরে অন্যদের নাক গলানোর সুযোগ একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, গুগল সার্চ ইঞ্জিনকে ফেসবুক কখনই তাদের পৃষ্ঠার ইনডেক্সিং করতে দেয় না, বা ফেসবুকের সার্চ রেজাল্টে গুগলের কোনও লিঙ্ক দেখাতে দেয় না। সেকারণেই এধরনের সাইটগুলিকে আমরা বলি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বাগান, কারণ মালিকের যথাযথ অনুমতি নিয়েই একমাত্র এই ধরনের সাইটগুলিতে ঢোকা যায়। তাহলে কোন উপায়ে ফেসবুক তাদের সাইটে বা সাইটগুলিতে আমাদের সর্বোচ্চ মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং কীভাবে তারা সেখানে আমাদের আটকে রাখে? এই সংস্থা হিসাব কষে বের করেছে যে ফেসবুকে আমরা যে বেশি বেশি করে ব্যস্ত থাকি তার তাগিদ মূলত আসে আমাদের আবেগ থেকে। অন্য যে কোনও আবেগের তুলনায় মানুষের জোরালো আবেগ হল ভয় ও ঘৃণা। তাই যেসব পোস্টে এই ধরনের আবেগ বেশি করে প্ররোচনা পায় সেই সব পোস্টের আকর্ষণ বেশি হয় এবং ফেসবুকের পরিসরের আরও গভীরে, অনেকদূর পর্যন্ত এগুলি প্রচার করা হয়। ঘৃণা-ভাষণের-গ্রুপগুলিকে নিয়ে এটাই ফেসবুকের সমস্যা। কাম্য জনসংযোগের লক্ষ্যে ঘৃণা-ভাষণের-গ্রুপগুলি ফেসবুকে তাদের পোস্টগুলি নিয়ে একেবারে হইচই বাধিয়ে দেয়। এই ধরনের পোস্টগুলির বিষাক্ত প্রভাবের বিষয়ে পূর্ণ মাত্রায় সচেতন থেকেই তারা এসব করে চলে। ১৯ এবং এমনকি ভুয়ো খবরই ২০ হল ফেসবুকের বিজনেস মডেলের আসল কথা ২১। যে-কোনও নতুন প্রযুক্তি যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় তা হল, যত দ্রুত গতিতে এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ে তত দ্রুতগতিতে এর সামাজিক অভিঘাত উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না। এই বিষয়টি শুধুমাত্র নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তিগুলির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। মাস কমিউনিকেশন বা গণ জ্ঞাপনের প্রথম হাতিয়ার ছিল ছাপাখানার উদ্ভাবন। এর ফলে তৈরি হল, যাকে আমরা এখন বলি, গণ-পরিসর।২২ এর দরুন বাড়ল সাক্ষরতা, জ্ঞানের গণতন্ত্রীকরণ সম্ভব হল এবং এসব কিছু আবার সমাজের রূপান্তর ঘটাল। ছাপাখানা আসায় এল মুদ্রিত সংবাদপত্র, যা গণহারে লোকজন পড়ার সুযোগ পেল। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টির জন্য দুটি বিষয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছেন। এ-দুটি বিষয় হল— মুদ্রণ পুঁজিবাদ এবং সংবাদপত্র। তবে ছাপাখানাকে অন্যান্য আরও অনেক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েও যেতে হয়েছে। গুটেনবার্গ যখন ইউরোপে ছাপাখানা চালু করলেন, তখন প্রথম ও সবচেয়ে জনপ্রিয় ছাপা বইটি ছিল বাইবেল, এবং এই বইটিকে বলা হত ‘গুটেনবার্গের বাইবেল’। দ্বিতীয় সবচেয়ে জনপ্রিয় বইটি ছিল ডাকিনীবিদ্যার বই ম্যালেয়াস মালেফিক্যারাম, সাধারণত বইটি অনুবাদ করা হত দ্য হ্যামার অফ উইচেস নামে। এটা ছিল ইনকুইজিসন সংক্রান্ত হ্যান্ডবুক। ইনকুইজিসনের ফলে কতজনের মৃত্যু হয়েছিল? ইউরোপে জাতীয়তাবাদী যুদ্ধগুলিতে কতজনের মৃত্যু হয়েছিল? এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকায় এই ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির লুণ্ঠন, গণহত্যা এবং দাসত্ব চাপিয়ে দেওয়ার কারণে কতজনের মৃত্যু হয়েছিল? এবং তবুও, ছাপাখানা এবং গণ-পরিসরের বিস্তারে এর ভূমিকাকে আমরা ইতিহাসের অগ্রগতির অংশ হিসাবেই দেখি। সমাজের সাধারণ কাজেকর্মে অংশগ্রহণ এবং সাক্ষরতা, যা আগে ছিল সামন্তবাদী এলিটদের কুক্ষিগত, ছাপাখানার দৌলতে সেগুলিতে সাধারণ মানুষের ভূমিকা আরও বাড়ল, এবং এতটাই বাড়ল যে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে চলে এল শ্রমিকশ্রেণিও। এটা নেহাৎই আকস্মিক ছায়াপাত নয় যে, লেনিন ইসক্রা-কে শুধুমাত্র পার্টির মুখপত্র বলে মনে করতেন না, বরং এই পত্রিকাকে তিনি পার্টি গঠনের হাতিয়ার বলেও মনে করতেন। প্রযুক্তি নিজে থেকেই কাউকে মুক্তি দেয় না বা কাউকে দাসে পরিণত করে ফেলে না। প্রযুক্তির যে কোনও অগ্রগতির একটা সামাজিক পরিণাম রয়েছে, সেটা শুভ বা ক্ষতিকর দুই–ই হতে পারে। যদি প্রযুক্তির কারণে উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়ে তাহলে আরও বেশি পণ্য উৎপাদন হয়, এবং তাতে সমাজের লাভ হয়। কিন্তু শ্রেণিবিভক্ত সমাজে উৎপাদন বৃদ্ধি মানে সম্পদ ও ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হয়। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুবিধা সমাজের সব অংশ সমানভাবে ভোগ করতে পারে না। তাই যুদ্ধটা প্রযুক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে নয়, বরং বিচার করতে হবে প্রযুক্তির মালিক কারা এবং বর্ধিত উৎপাদিকা শক্তি সমাজে কাদের সুবিধার স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। ছাপাখানার প্রসার এবং সংবাদপত্রের সৃষ্টি, এর থেকেই উৎপত্তি হয় বিজ্ঞাপন শিল্পের। পুঁজিবাদী দেশগুলিতে এটাই গণ-পরিসরের আসল ভিত। ভুয়ো ওষুধ, কামোদ্দীপক ওষুধ, জড়িবুটি বা পানীয়, এমনকী কোকেন— প্রথম দিকের গোপন ফর্মুলায় কোকা–কোলায় কোকেন থাকত— এসবের বিজ্ঞাপনই সংবাদপত্রকে টাকা জুগিয়ে এসেছে। এবং পরের দিকে এই সব বিজ্ঞাপন থেকে টাকা পেয়েছে রেডিও এবং টেলিভিশনও। যদিও বেশির ভাগ দেশে কয়েক ধরনের বিজ্ঞাপন সরকারি ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, তবে বিজ্ঞাপন জগতের বাস্তবতা হল আমাদের একথা বুঝিয়ে দেওয়া যে আমরা, আমাদের শরীরের স্বাভাবিক অবস্থাকেই আরও অনেক বেশি উন্নত করতে পারি, ধরা যাক, কোনও সুগন্ধি বা ফরসা হওয়ার কোনও ক্রিম কিনে এবং তা ব্যবহার করে! সমাজে যত কিছু জঘন্য কুসংস্কার রয়েছে, তার মদতদাতা হল বিজ্ঞাপন। এরই একটি সুসংস্কৃত রূপ হল ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি–র বিজ্ঞাপন। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞাপনে কৃষ্ণাঙ্গদের অপরাধী কিংবা স্বভাবগতভাবেই হিংস্র হিসাবেই নিয়মিত চিত্রিত করা হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞাপনের ব্যবসা, তার নানারকম সমস্যা থাকা সত্ত্বেও, মিডিয়া ব্যবসার ভিত্তিস্বরূপ হয়ে রয়েছে এবং সেই মিডিয়া গণ-পরিসরও তৈরি করেছে। একইভাবে মিডিয়া হিটলার ও মুসোলিনির উত্থানেও সাহায্য করেছে। মুসোলিনির রেডিও বক্তৃতা এবং লেনি রেফেনস্ট্যাহ্লের ফিল্মগুলোই প্রমাণ করে যে জনগণের বিরুদ্ধে মাস মিডিয়া একটা শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। স্নেক অয়েলের মতো ভুয়ো ওষুধের বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে লড়াই করার ফলশ্রুতিতে বেশির ভাগ দেশ এমন আইন চালু করেছে যা নির্দিষ্ট করে দেয় কীসের বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে এবং কীসের দেওয়া যাবে না। ২৩ কোন্ কোন্ পণ্য ওষুধ হিসাবে বিক্রি করা যাবে তাও নিয়ন্ত্রণ করে এই আইনগুলি। আসল সমস্যা হল এই আইনগুলিকে কাজে লাগানোর ইচ্ছা সরকারের আছে কিনা। তা সে এদেশে বাবা রামদেবের পতঞ্জলি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধেই হোক কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধের কোম্পানিগুলির তৈরি ব্যথা কমানোর আফিম জাতীয় ওষুধের (opioids) বিরুদ্ধেই হোক। ২৪ এছাড়াও, এটাও মেনে নেওয়া হয়েছে যে, যেহেতু রাজনীতিতে মিডিয়ার বিরাট প্রভাব রয়েছে তাই একচেটিয়া মিডিয়াগুলিকেও নিয়ন্ত্রণের দরকার আছে। দুর্ভাগ্যবশত, মনোপলি কমিশনকে এবং এই সংক্রান্ত আইনগুলিকে দুর্বল করে ফেলায় এবং পুরো বিষয়টাকে কম্পিটিশন কমিশনে রূপান্তরিত করে ফেলায়, সংশ্লিষ্ট আইনগুলির তাৎপর্য বহুল পরিমাণে খর্ব হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় মনোপলি বা একচেটিয়াকেই মেনে নিতে হবে যতক্ষণ না এটা দেখানো যাচ্ছে সেই একচেটিয়া সংস্থা অন্য কোনও কোম্পানির কিংবা সাধারণ মানুষের ক্ষতি করছে। এক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল, এটি অ্যান্ড টি, টেলিফোন মনোপলি ভেঙে ফেলা গিয়েছিল। কিন্তু তার তুলনায় এখন মনোপলিকে ঠেকাতে আইনি হস্তক্ষেপের সুযোগ অনেক বেশি বাধা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। কী কী ছাপা যাবে বা দেখানো যাবে সে-বিষয়ে বেশিরভাগ দেশেই আইন আছে। আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে, ডিজিটাল মিডিয়ার পরিসরে সমস্যা হল এখানে ব্যক্তিগত-পরিসর এবং গণ-পরিসরের মধ্যে ফারাকটা মুছে গেছে। যখন আমরা ফেসবুকে কিছু পোস্ট করি, কিংবা ইউটিউবে কোনও ক্লিপ আপলোড করি, কিংবা টুইটারে কোনও মন্তব্য করি, তখন আমরা বিশ্বাস করি যে এসব মতামত আমরা জানাচ্ছি ব্যক্তিগতভাবে। যদিও আমাদের সব মতাতমই শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে গণ-পরিসরে। সিনেমা নিয়ন্ত্রণের জন্য সেন্সর বোর্ডের মতো সরকারি সংস্থা যতদূর নজরদারি করতে পারে, ডিজিটাল মিডিয়ায় কনটেন্টের পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি। সুতরাং, ডিজিটাল মিডিয়ার পরিসরে, বেশিরভাগ দেশেই সরকারি কর্তৃপক্ষ প্ল্যাটফর্মগুলিকেই বলছে কনটেন্টের ওপর তারা যেন নিজেরাই নজরদারি চালায়, বলছে ফেসবুক ও গুগলের মতো কোম্পানির নিজেদেরই যেন সেই অ্যালগরিদম থাকে যা দিয়ে ভু্য়ো খবর আটকে দেওয়া যায়। ভারত সরকারও বৃহৎ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিকে ঠিক এটাই করতে বলছে। যে অ্যালগরিদম স্থির করে দেবে কোন কনটেন্টকে সেন্সর করতে হবে এবং কোনটাকে করতে হবে না, সেই সব অ্যাগরিদমের সমস্যা নিয়ে এখানে আমি আলোচনা করছি না। ক্যাথে ওনিল তাঁর ‘ওয়েপনস অফ ম্যাথ ডেস্ট্রাকশন’ ২৫ বইয়ে কোনও মানবিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অ্যালগরিদিম ব্যবহারে সমস্যা কোথায়— তা আলোচনা করেছেন। আসল কথা হল—কোনটা ক্ষতিকর এবং আর কোনটা ক্ষতিকর নয়, ভালো অঙ্কের সাহায্যে তার সমাধান করা যায় না।২৬ সমস্যা এটা নয় যে, কনটেন্টের ওপর কে বা কারা নজরদারি করবে। যারা কনটেন্ট সৃষ্টি করছেন— এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম যারা ব্যবহার করছেন— তাদের সবারই কাজ হল আইন মেনে সবকিছু করা। যদি তাঁরা সেটা না-করেন, তাহলে রাষ্ট্র এবং কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মকে একযোগে কাজ করতে হবে এটা দেখার জন্য যে আপত্তিকর কনটেন্ট যেন সরিয়ে নেওয়া হয়। সমস্যাটা হল, এই ধরনের প্ল্যাটফর্মগুলির নিজেদের মাল বিক্রি করার ক্ষমতাই শুধু নেই, এমনকী নির্বাচনের সময় তারা প্রার্থীদেরও ‘বিক্রি’ করতে পারে, এমন কী আইনপ্রণেতাদের কাছে বিধি এবং আইনও ‘বিক্রি’ করতে পারে। সেকারণে প্ল্যাটফর্মগুলিকেই দ্বাররক্ষীর ভূমিকা পালন করতে বলা মানে নেকড়কেই ভেড়ার পালের ওপর নজরদারি করতে বলা। আগের শতাব্দীতে খনিজ তেল উৎপাদন ক্ষেত্রের একচেটিয়া কোম্পানিগুলি এবং আর্থিক ক্ষেত্রের অলিগার্করা যতটা শক্তিধর ছিল, এখনকার এই সব প্ল্যাটফর্মগুলি তাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি ধরে। এই সব প্ল্যাটফর্মের নীট সম্পদ, অথবা এদের মোট শেয়ারের বর্তমানের মোট বাজারদর (মার্কেট ক্যাপিটালাইজেসন), বেশির ভাগ দেশের জিডিপির চেয়েও বেশি। আসলে আমাদের দরকার একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর নতুন বই দ্য কার্স অফ বিগনেস-এ ২৭ টিম উ–র প্রস্তাবিত বিকল্প হল, এই সব একচেটিয়া কোম্পানিগুলিকে ভেঙে ফেলে অনেকগুলি ছোটো ছোটো কোম্পানিতে পরিণত করতে হবে। বৃহৎ তেল কোম্পানি এবং মা বেল/এটি অ্যান্ড টি-এর ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। দ্য দিল্লি ডিক্লারেশন ফর আ জাস্ট অ্যান্ড ইকুইটেবল ইন্টারনেট-এ দ্য জাস্ট নেট কোয়ালিশন-এর ২৮ প্রস্তাব হল, এই প্ল্যাটফর্মগুলি আজকের দিনের অবশ্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো এবং হয় এগুলিকে সাধারণের জন্য পরিষেবা হিসাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে অথবা পুরোপুর সরকারি মালিকানাধীন হতে হবে। প্রযুক্তি বহুতর সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। আমরা নিজেরাই সেই সম্ভাবনাগুলিকে বাস্তবায়িত করে তুলি। বাস্তবায়িত করে তুলি সেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকেও, যে কাঠামোর মধ্যে কাজ করে মিডিয়া। এসব কোনও কিছুই ঘটত না যদি-না মাস-কমিউনিকেশন বা গণ-জ্ঞাপনের প্রযুক্তিতে নাটকীয় সব পরিবর্তন ঘটে যেত। এই সব পরিবর্তনের ফলশ্রুতিতেই উদ্ভব হল সার্চ ইঞ্জিন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতির। এমন সব পরিবর্তন যে ঘটে যাবে তা আমরা আগাম দেখতে পারিনি। কিন্তু একবার যখন পরিবর্তনগুলি ঘটে গেছে, তখন আমাদের দেখতে হবে কীভাবে এগুলিকে মানবতার বৃহত্তর লক্ষ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলা যায় এবং আরও মানবিক একটা সমাজ গড়ে তোলা যায়। নতুন এই প্রযুক্তির মালিক কারা, মুদ্রিত আকারে, অডিও অথবা ভিস্যুয়াল ফর্মে বা দৃষ্টি–শ্রাব্য রূপে, খবর এবং মতামতের গণ উৎপাদনের উপযোগী হাতিয়ারগুলির মালিক কারা— এটাই হল আসল ব্যাপার। এগুলোর মালিক কি পুঁজি, নাকি দেশের শ্রমজীবী মানুষ? গণ-পরিসরের রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা— এটাই আজকের দিনে আমাদের সামনে ইতিহাসের ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ। উল্লেখ্য: এই নিবন্ধটির ভাবনা আগের একটি প্রবন্ধ থেকে অংশত নেওয়া। সেই প্রবন্ধটি হল, কোল্যাপসিং দ্য পাবলিক অ্যান্ড প্রাইভেট ইন দ্য এজ অফ সোশাল মিডিয়া, ইন তথ্যসুত্র ঃ
সূত্র: মার্কসিস্ট, জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০২২ প্রকাশের তারিখ: ১০-জুলাই-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |