|
ডিজিটাল যুগে সংবাদমাধ্যম (৩)প্রবীর পুরকায়স্থ |
একদিক থেকে গুগল ও ফেসবুকের ব্যবসা একই ধরনের— তাদের কাজ আমাদের কাছে বিজ্ঞাপন বিক্রি করা। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা এই দুই প্ল্যাটফর্মের কাছে যাই সেটা কিন্তু আলাদা। আমাদের গুগল ব্যবহারের খুব বড় কারণ সম্ভবত তথ্যের সন্ধান করা। যে তথ্য আমরা অনুসন্ধান করি সেগুলির বেশির ভাগটাই তৈরি করে দিয়েছেন আমাদের মতো ব্যবহারকারীরাই। সার্চ ইঞ্জিনের ওপর কার্যত একচেটিয়া দখলদারির কারণে একেবারে গোড়ার দিকে গুগলই শীর্ষে ছিল বিজ্ঞাপন থেকে আয় করার ব্যাপারে। এই লাভের টাকা দিয়েই গুগল, প্রথম সারির ভিডিও পোস্ট করার সাইট ইউটিউব, এবং আই-ফোন বাদে বেশির ভাগ মোবাইলের অপারেটিং সিস্টেম অ্যানড্রয়েডের মালিকানা কিনে নিতে সমর্থ হয়েছে। এবং এভাবেই তারা তাদের ব্যবসার পরিসর আরও বাড়িয়ে গেছে। |
পর্ব ৩ বৃহৎ মিডিয়ার মূল লক্ষ্য বিজ্ঞাপনের ব্যবসা কব্জা করা মাস মিডিয়া (গণমাধ্যম) এবং মাস কমিউনিকেশন (গণ যোগাযোগ)-এর উদ্দেশ্য দুটো— ক) খবর ও বিনোদনের যোগান দেওয়ার মাধ্যমে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা ও তা ধরে রাখা। খ) বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে আমাদেরকেই পণ্য হিসাবে বিক্রি করা। বিজ্ঞাপন বিক্রি করতে হলে মিডিয়া কোম্পানিগুলোর দরকার আমাদের চোখের তারা, মানে আমাদের নজর ও মনোযোগ। যারা কিনতে পাগল তেমন কিছু হাতেগোনা লোকজন ছাড়া আমরা কেউই বিজ্ঞাপন দেখতে চাই না। খবর পেতে গেলে, কোনও বিশ্লেষণ শুনতে হলে, কিংবা বিনোদন উপভোগের সময় হঠাৎ চলে আসা বিজ্ঞাপনকে আমরা ঘাড়ের ওপর এসে পড়া আপদ বলেই মনে করি। বেনেট অ্যান্ড কোলম্যান, যারা টাইমস অফ ইন্ডিয়ার মালিক, সেই সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর বিনীত জৈন, নিউ ইয়র্কার-কে যথার্থভাবেই বলেছিলেন, ‘আমরা মোটেই খবরের কাগজের ব্যবসা করি না, আমরা আসলে রয়েছি বিজ্ঞাপনের ব্যবসায়।’৯ এই কথাটা পাঠকদের তো বটেই, এমনকি সাংবাদিকদের কাছেও ছিল একটা ধাক্কা দেওয়ার মতো বক্তব্য। তবে ধাক্কাটা আসলে লেগেছিল চাঁছাছোলা ভাষায় সেই কথাটা সামনাসামনি বলার কারণে, যে কথাটা আমরা আসলে আগাগোড়াই জানতাম। মূলত বিজ্ঞাপনদাতাদের যোগানো টাকায় চলা মিডিয়ার সামনে আরো অন্যান্য বিকল্পও ছিল। যদি শুধুমাত্র গ্রাহকদের নিজেদের পকেট থেকে বিজ্ঞাপনের টাকাটা যোগাতে হতো, তাহলে চড়া দামের কারণে সেটা আর গণ যোগাযোগ বা মাস কমিউনিকেশন থাকত না। সেক্ষেত্রে হয় এর পিছনে সরকারকে টাকা যোগাতে হত নতুবা ভরতুকি দিতে হত। তবে আদৌ সেই সব পন্থা কেউ অবলম্বন করেনি। উনিশ শতকের সংবাদপত্র থেকে শুরু করে টেলিভিশন পর্যন্ত, বিজ্ঞাপন বিক্রিই হয়ে উঠেছিল নতুন নতুন বাণিজ্যিক সংগঠনের প্রধান ব্যবসায়িক মডেল। মিডিয়ার আরেকটা দিকও আছে, যে বিষয়টা আমি এখানে আলোচনা করছি না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, নোয়াম চমস্কি তাঁর বই ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট-এ (সহ লেখক হারমান এডোয়ার্ডস) ওই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এই লেখাটি একেবারে কালজয়ী রচনা এবং আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক। খবর দেখানোর ক্ষেত্রে মুদ্রিত সংবাদমাধ্যম, টেলিভিশন অথবা নতুন ডিজিটাল মিডিয়া যে অভিন্ন ধরন বহন করে চলে, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় থাকলে আমাদের নজর দিতে হবে সব ধারার সংবাদমাধ্যমের প্রায় অভিন্ন প্রতিক্রিয়ার দিকে : তা সে ইরাক, আফগানিস্তান বা ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে চীনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ— যে কোনও ইস্যুতেই হোক না কেন। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, সিএনএনই হোক, কিংবা ফেসবুক বা গুগল-এর নীতিই হোক, এদের সবার অবস্থান একই। শাসকশ্রেণির পক্ষে জনমতের সম্মতি গড়ে তোলার কাজটা, পুরনো কিংবা নতুন, সব মিডিয়ারই একটা সাধারণ কাজ। যদি আরও বেশি সুরক্ষা বলয়ে থাকা ডিজিটাল বাজারের পরিসরকে বাদ দিই, যেমন চীন ও রাশিয়া একেবারে সচেতন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাদের ডিজিটাল পরিসরকে রক্ষা করে, অথবা ইরানের মতো যে বাজার আমেরিকার চাপানো নিষেধজ্ঞার মধ্যে পড়ে, এগুলো বাদ দিলে, বাকি সারা দুনিয়া জুড়ে আধিপত্যকারী সোশাল মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যম হল গুগল ও ফেসবুক। সারা বিশ্বে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন থেকে যত আয় হয়, তার ৯০ শতাংশেরও বেশি দখল করে রেখেছে এই দুই প্ল্যাটফর্ম। তাহলে প্রশ্ন হল এই দুই প্ল্যাটফর্ম ঠিক কোন জিনিসটায় তাদের একচেটিয়া দখলদারি কায়েম করেছে, এবং কীভাবে তারা এই একচেটিয়া অবস্থান অর্জন করল? কমিউনিকেশন বা সংযোগ নেটওয়ার্কের সীমানা আরও বিপুল পরিসর পর্যন্ত প্রসারিত করাটা সম্ভব হয়েছে ইন্টারনেটের কারণে। মোবাইল ফোন কিংবা ল্যাপটপের মাধ্যমেই সাধারণ লোকজন ইন্টারনেটে যুক্ত হন। এই বর্ধিত সংযোগ অডিয়েন্স বা গ্রহীতা হিসাবে আমাদের গেঁথে ফেলার এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে আমাদের পণ্য হিসাবে বিক্রি করার একাধিক বিকল্প পথের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ডেটা বা তথ্যের আগেকার রূপগুলো যা ছিল তার তুলনায় নতুন ডিজিটাল মিডিয়ার তথ্যের কাঠামোগত পার্থক্য রয়েছে। পুরনো ধরনের মিডিয়ার ক্ষেত্রে, মিডিয়া কোম্পানিগুলিই কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু তৈরি করে এবং তার ডেলিভারি নেটওয়ার্ক বা বিতরণ প্রণালী সৃষ্টি করে। কিন্তু ইন্টারনেটে, আমরা, অর্থাৎ ব্যবহারকারীরাই, অন্য সব মিডিয়া কোম্পানিগুলির তুলনায়, অনেক বেশি কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু সৃষ্টি করি। এবং এক্ষেত্রে ডেলিভারি নেটওয়ার্ক বা বিতরণ প্রণালী (অন্তত শুরুর পর্বে) হল ইন্টারনেটই, যা বিদ্যমান টেলিকম পরিকাঠামোর ওপর ভর করে চালু রয়েছে। আজকের দিনে ইন্টারনেটে বহুল পরিমাণ কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু প্ল্যাটফর্মগুলি নিজে সৃষ্টি করে না। বরং সৃষ্টি করে তারা যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এই কনটেন্টের নাম দেওয়া হয়েছে ইউজার জেনারেটেড কনটেন্ট বা ব্যবহারকারী সৃষ্ট বিষয়বস্তু। এখন ইন্টারনেটে মোট যত মানুষ যুক্ত রয়েছেন ওয়েব পেজের সংখ্যা প্রায় তার অর্ধেক। যদি আমরা ফেসবুক এবং চীনা সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ওয়েব পেজ রয়েছে এমন শত শত কোটি ব্যবহারকারীর সংখ্যা যোগ করি, তাহলে দেখা যাবে কার্যত ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকেই এক একজন প্রোডিউসার বা স্রষ্টা এবং একই সঙ্গে তারা কনটেন্ট বা বিষয়বস্তুর গ্রহীতাও (recipient)। ইউটিউব থেকে ইনস্টাগ্রাম রিলস হয়ে টিকটক পর্যন্ত, নানা ধরনের প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীরা যত ভিডিও কনটেন্ট বা দৃশ্য উপকরণ পোস্ট করেন সেই সংখ্যা যদি যোগ করি, তাহলে দেখা যাবে আজকের দিনে যে পরিমাণ ইউজার–জেনারেটেড কনটেন্ট বা ব্যবহারকারীদের নিজস্ব সৃষ্ট বিষয়বস্তু এই সব সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে তৈরি হয়, সেই পরিমাণের সঙ্গে কোনও মিডিয়া কোম্পানি পাল্লা দিতে পারবে না। নতুন ডিজিটাল একচেটিয়াগুলি কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু তৈরি করে না। বরং তারা আমাদের দেয় একটা প্ল্যাটফর্ম বা মঞ্চ এবং হাতিয়ার (tools) যা দিয়ে তাদের প্ল্যাটফর্মে আমরা কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু তৈরি করতে বা প্রকাশ করতে পারব। সেকারণেই এদের বলা হয় ‘মধ্যস্থতাকারী’ কিংবা যারা তাদের প্ল্যাটফর্মে অন্য লোকেদের কনটেন্ট উপস্থাপিত করার সুযোগ দেয়। ব্যবহারকারীদের নিজেদের তৈরি বিষয়বস্তুর সংখ্যা এখন এত বেশি বাড়ছে যে আগের যুগে নিজের জন্য জানান দেওয়া ও সকলের জ্ঞাতার্থে জানান দেওয়ার মধ্যে পরিসরের যতটা ফারাক ছিল, তা ক্রমশ ধ্বসে পড়ছে। যারা ফেসবুক বা টুইটারে কোনও কিছু পোস্ট করছেন তারা মনে করছেন তাঁরা তাঁদের নিজস্ব, ব্যক্তিগত পরিসরেই আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আসলে গোটা জিনিসটাই থেকে যাচ্ছে সর্বসাধারণের পরিসরে। ১০ একদিক থেকে গুগল ও ফেসবুকের ব্যবসা একই ধরনের— তাদের কাজ আমাদের কাছে বিজ্ঞাপন বিক্রি করা। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা এই দুই প্ল্যাটফর্মের কাছে যাই সেটা কিন্তু আলাদা। আমাদের গুগল ব্যবহারের খুব বড় কারণ সম্ভবত তথ্যের সন্ধান করা। যে তথ্য আমরা অনুসন্ধান করি সেগুলির বেশির ভাগটাই তৈরি করে দিয়েছেন আমাদের মতো ব্যবহারকারীরাই। সার্চ ইঞ্জিনের ওপর কার্যত একচেটিয়া দখলদারির কারণে একেবারে গোড়ার দিকে গুগলই শীর্ষে ছিল বিজ্ঞাপন থেকে আয় করার ব্যাপারে। এই লাভের টাকা দিয়েই গুগল, প্রথম সারির ভিডিও পোস্ট করার সাইট ইউটিউব, এবং আই-ফোন বাদে বেশির ভাগ মোবাইলের অপারেটিং সিস্টেম অ্যানড্রয়েডের মালিকানা কিনে নিতে সমর্থ হয়েছে। এবং এভাবেই তারা তাদের ব্যবসার পরিসর আরও বাড়িয়ে গেছে। অ্যানড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম (ওএস) এমন একটি প্রকরণ যা সকলেই ব্যবহার করতে পারে বা বদলাতে পারে। এর দেখভাল করে গুগল। যেহেতু এর বণ্টনের ওপর গুগলের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তার মানে বেশির ভাগ মোবাইল ফোন নির্মাতা গুগলের চাপিয়ে দেওয়া শর্তাবলী মেনে নিতে বাধ্য হয়। অপারেটিং সিস্টেমে কী কী যোগ করতে হবে এবং কোন কোন বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে, সেবিষয়েও গুগলের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয় মোবাইল ফোন নির্মাতারা। ভারতের কম্পিটিশন কমিশন ১১ এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি ১২, গুগলের এধরনের প্রতিযোগিতা-বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করেছে। চীনের ফোন নির্মাতা সংস্থা হুয়াওয়েই-এর বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জারি করার ফলে হুয়াওয়েই তাদের নিজস্ব অ্যাপ এবং অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ গুগলও হুয়াওয়েইকে তাদের প্লে স্টোর ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। এর ফলে যে সমস্ত অ্যাপের সঙ্গে বেশির ভাগ মোবাইল ফোন ব্যাবহারকারী সুপরিচিত, সেগুলি কাজে লাগাতে পারেন না হুয়াওয়েই-এর তৈরি ফোনের ব্যবহারকারীরা। যখনই আমরা গুগলের কোনও পণ্য ব্যবহার করি— গুগল সার্চ, জি মেল বা কোনও অ্যান্ড্রয়েড ভিত্তিক মোবাইল ফোন, তখনই গুগল দেখে নেয় আমরা ঠিক কোথায় রয়েছি, কোন ধরনের বিষয়ে খোঁজ নিয়েছি, কারা আমাদের বন্ধু ইত্যাদি। এগুলো সবই গুগল আমাদের প্রোফাইলে যোগ করে। এছাড়াও, অন্যান্য অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মতো, যখন আমরা সেইসব ওয়েবসাইট কিংবা প্রোডাক্ট ব্যবহার করি, গুগলও আমাদের কম্পিউটার কিংবা ফোনে ছোট ছোট ফাইল বা কুকিজ পাঠিয়ে দেয়। এই সবকিছুই বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে আমাদের আরও ভাল করে বিক্রি করার কাজে গুগলকে সাহায্য করে। এর মানে হল গুগলে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য এক টাকাও খরচ করা হলে তা অন্য যে কোনও প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দেওয়ার চেয়ে বেশি কার্যকর হয়। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম সম্ভবত ফেসবুক/মেটা। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বাজারে অন্য বৃহৎ একচেটিয়া সংস্থাটি হল ফেসবুক। এরা আবার ব্যবসা করে অন্য কায়দায়। ফেসবুক একটা পরিসর তৈরি করে দিয়েছে যেখানে আপনি নিজের বিষয়ে কোনও কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু প্রকাশ করতে পারেন এবং আপনার পরিচিত বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগসূত্র গড়ে তুলতে পারেন। ফেসবুক আমাদের তথ্যভাণ্ডারগুলির ওপর এবং ফেসবুকে আমাদের বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়পরিজনদের মধ্যে গড়ে তোলা যোগাযোগের তথ্যের ওপর নজরদারি করে। এতে করে আমাদেরকে কাজে লাগিয়ে ফেসবুক আরও দক্ষতার সঙ্গে টাকা রোজগার করতে পারে। আমাদের প্রোফাইল তৈরি করে সেগুলি তাদের উপভোক্তাদের কাছে বিক্রি করার ব্যাপারে ফেসবুক গুগলের মতোই দক্ষ। মোট শেয়ারের বাজারদর বা মার্কেট ক্যাপিটালাইজেসন হঠাৎ করে পড়ে যাওয়ার আগে, অ্যাপল, মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট এবং অ্যামাজনের মতো নামকরা কোম্পানিগুলিতে ফেসবুকের শেয়ারের মোট বাজারদর ছিল এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। শেয়ারের বাজারদরে এই পতন কিন্তু আমরা যারা এখন ফেসবুক ব্যবহার করি, বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে তাদের বিক্রি করার ব্যাপারে ফেসবুকের অক্ষমতার কারণে নয়। আসলে বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করে জুকারবার্গ যে বিপুল পরিমাণ টাকা তার প্রিয় প্রোজেক্ট মেটাভার্সে বিনিয়োগ করছেন, তাতে খুব বেশি আর লাভ হবে না। সেকারণেই মেটা/ফেসবুকের মোট শেয়ারের মোট বাজারদর কমেছে। কারণ মোট শেয়ারের মোট বাজারদর কী হবে তা নির্ভর করে বিনিয়োগ করা পুঁজির ভবিষ্যৎ মুনাফা কতটা হতে পারে সেই প্রত্যাশার ওপর। কোনও কিছুর বিষয়ে তথ্য ‘সার্চ’ বা অন্বেষণ করা যাবে কীভাবে— এই সমস্যাটা শুধু গুগল সার্চ ইঞ্জিন একাই সমাধানের চেষ্টা করেনি। তবে প্রথমদিকের দৌড়ে জিতেছিল তারাই, কারণ তাদের সার্চ ইঞ্জিনটা ছিল অন্যদের তুলনায় ভাল, সার্চ করার পর যেসব তথ্য উঠে আসতে সেগুলি একপেশে হত না এবং সম্ভবত নেহাতই ভাগ্যের শিকে ছেঁড়ার জোরে। আবার বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের লোকজনদের মধ্যে নেটওয়ার্কিং বা যোগসূত্র গড়ে তোলার ভাবনাটা সোশাল মিডিয়া কোম্পানি হিসাবে ফেসবুকই প্রথম নিয়ে আসেনি। আসলে প্রাথমিক পর্বে ফেসবুক অন্যদের তুলনায় বেশি দক্ষতা দেখিয়েছিল এবং তার জেরে সোশাল নেটওয়ার্কিং–এর নতুন সৃষ্টি হওয়া পরিসরে ফেসবুকই মার্কেট লিডার হিসাবে উঠে এসেছিল। বিজয়ীরাই-সব-পাবে— এই রকম খেলায় একটা কোম্পানিকে বিজয়ী হতেই হত। সেক্ষেত্রে যে কোম্পানিই গোড়ার দিকে এগিয়ে যেতে পারে তাদের সামনেই থাকে সংশ্লিষ্ট পরিসরে প্রথম হওয়ার সুযোগ। ঠিক এই জিনিসটাই পরে ঘটেছিল টুইটার ও টিকটকের ক্ষেত্রে। এই দুই সংস্থা এমন একটা সুরক্ষিত বাজার তৈরি করে নিয়েছিল যেখানে তারাই ছিল নেতা। কোনও মিডিয়া কোম্পানি, তা সে সংবাদপত্রই হোক কিংবা টিভি স্টেশন, তারা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা ও তা ধরে রাখার জন্য বহু টাকা খরচ করে। মূলধনী বিনিয়োগ হিসাবে সংবাদপত্রের জন্যে প্রয়োজন ছাপাখানা, খবর সংগ্রহ করা ও খবরের কাগজ বিলিবণ্টন করার জন্য চলতি খরচ। একইভাবে টিভির জন্যে জরুরি প্রোডাকশন এবং আপলিঙ্কিংয়ের জন্য বিনিয়োগ। কারণ খবর সম্প্রচারের জন্য দরকার হয় ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক কিংবা উপগ্রহ সংযোগ। সোশাল মিডিয়ায় যেহেতু আমরা উপভোক্তারাই কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু তৈরি করি, তাই কনটেন্ট তৈরি করা কিংবা বণ্টনের পরিকাঠামো তৈরি করা, প্রাথমিক পর্বে এদু’টির কোনওটার জন্যই ফেসবুক বা গুগলকে বিনিয়োগ করতে হয়নি। আমরা, ব্যবহারকারীরা জুগিয়েছি কনটেন্ট এবং সেই কনটেন্ট বণ্টনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো দিয়েছে টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক। এই দুই সংস্থার মূল কাজ ছিল সেই হাতিয়ারগুলি তৈরি করা যা ব্যবহার করে আমরা আমদের আগ্রহের কনটেন্ট খুঁজে পেতে পারি কিংবা আমাদের বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়পরিজনদের জন্য সেই কনটেন্ট পোস্ট করতে পারি। সম্প্রচার মিডিয়া থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দেওয়ার ছাঁদটাও আলাদা। সম্প্রচারের কাঠামোর বৈশিষ্ট্যই হল একটি কেন্দ্র থেকে বহুজনের কাছে সংযোগ পৌঁছনো। কিন্তু সম্প্রচারকারী জানেন না কারা এই সম্প্রচার করা বিষয়গুলি দেখছে বা গ্রহণ করছে। এই ধরনের সম্প্রচার প্ল্যাটফর্মগুলি একমাত্র যে তথ্য পায় তা হল, যেমন টিভি জানতে পারে, কতজন তাদের এই অনুষ্ঠান দেখছে এবং সেটা জানা যায় নিয়েলসনের রেটিংয়ের মাধ্যমে। টিভির অনুষ্ঠান যারা দেখেন তাঁদের সামনে বিকল্প দুটো— হয় রিমোট টিপে চ্যানেল চালু করা নয়ত টিভি না দেখা। বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গীকে বলা হয় বহুতর সম্ভাবনার দৃষ্টিভঙ্গী (scattergun approach): চারপাশে বিজ্ঞাপন স্প্রে করে ছড়িয়ে দাও এই আশা করে যে কেউ না কেউ এতে আকৃষ্ট হবে এবং সে যখন কোনও জিনিস কিনতে যাবে তখন সেই দর্শক বিজ্ঞাপনে দেখা ব্র্যান্ড বা প্রোডাক্টটির কথা মনে রাখবে। ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মগুলির পথটা আলাদা। তারা তাদের গ্রাহক বা উপভোক্তাদের খুব ভাল করেই জানে। ইন্টারনেটে চালু সাধারণ ধুয়োটা হল, তোমাকে তোমার মায়ের চেয়েও ভাল করে চেনে গুগল এবং ফেসবুক। কাউকে একেবারে সরাসরি তাক করে বিজ্ঞাপন পাঠানোর কাজটা করতে পারে ইন্টারনেট। এর ফলে অ্যাড টু কনভারশন বা বিজ্ঞাপন থেকে ক্রেতায় রূপান্তরিত হওয়ার হার, সম্প্রচারমূলক মিডিয়ায় যতটা সম্ভব, ইন্টারনেটে সেই হার অনেক বেশি। গুগল সার্চে গিয়ে আপনি যদি ভিডিও ক্যামেরার খোঁজ করেন, তখন থেকে টানা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত গুগল আপনাকে ভিডিও ক্যামেরার বিজ্ঞাপন দেখিয়ে যাবে। বা যদি আপনার বান্ধবী তার কেনা নতুন ভিডিও ক্যামেরাটি ফেসবুকে আপনাকে দেখায়, তাহলে আপনি তার ফেসবুক বন্ধু হিসাবে গুগলের কাছ থেকে ক্রমাগত ভিডিও ক্যামেরার বিজ্ঞাপন পেতে থাকবেন। সম্প্রচারভিত্তিক মিডিয়া থেকে ইন্টারনেট-ভিত্তিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের দিকে বিজ্ঞাপনের এই যে চলন, তার পরিণাম আমরা আজ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।১৩ মুদ্রিত সংবাদপত্র এত দ্রুত বিজ্ঞাপন হারাচ্ছে যে হয় কাগজ বন্ধ করে দিতে হচ্ছে কিংবা নিজেদের অনলাইন ‘পত্রিকা’য় বদলে ফেলতে হচ্ছে। টিভির বিজ্ঞাপন থেকে আয় বাড়ছে, তবে সেই বৃদ্ধির হার ডিজিটালে বিজ্ঞাপন থেকে আয়ের হারের চেয়ে কম (সারণি২)। ২০১৭ সালে সব টিভি মিলিয়ে (ব্রডকাস্ট ও কেব্ল টিভি) মোট বিজ্ঞাপনজনিত আয় যত ছিল তাকে ছাপিয়ে গেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন বাবদ আয়। ১৪ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলির মধ্যে শীর্ষে থাকা দুটি সংস্থা— গুগল ও ফেসবুক— এদের আয় ছিল মোট আয়ের ৭০ শতাংশ। (সারণি ৩) এর চার্ট থেকে আমরা দেখতে পারছি, ডিজিটাল মিডিয়া কোম্পানিগুলির বিজ্ঞাপন বাবদ আয়ের বৃদ্ধি হয়েছে একেবারে দ্রুত হারে। শুধু তাই নয়, চার্ট থেকে এটাও দেখা যাচ্ছে যে, সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন বাবদ আয় কমে যাওয়ার সঙ্গে গুগল এবং এখন ফেসবুকের বিজ্ঞাপন বাবদ আয় বেড়ে যাওয়ার একটা জোরালো আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। ১৫
সূত্র: মার্কসিস্ট, জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০২২ প্রকাশের তারিখ: ২৬-জুন-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |