বহুকাল যাবৎ, আমাদের সাতশো বছরেরও বেশিদিনের মধ্যযুগের ইতিহাসকে ‘মুসলমান ভারত’ বলে অভিহিত করা হয়ে এসেছে। এবং আজকের দিনেও এই কথাটির যথেষ্ট ব্যবহার দেখা যায়।
একাদশ বা ত্রয়োদশ শতক থেকে ভারতে যে নতুন শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতালাভ করলেন তাঁরা ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন। যদিও তাদের পূর্ববর্তী শাসকশ্রেণি ছিলেন হিন্দু। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় আমাদের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যার পিছনে এই যুক্তিই কাজ করেছে। ডঃ (রোমিলা) থাপার আগেই এই ধরনের ব্যাখ্যার অনেক গুরুতর ত্রুটি খুঁজে বের করেছেন। তাছাড়াও, এর অন্তর্নিহিত দুটি ধারণা সম্বন্ধে কিছু প্রশ্ন উঠতে পারে।
প্রথমত, রাজার জীবন, বা রাজবংশের, কী বড় জোর শাসকশ্রেণির ইতিহাসকে কি ভারতের ইতিহাস বলে ধরে নেওয়া হয়েছে, এবং এক্ষেত্রে রাজার ব্যক্তিগত ধর্মই কি সবচেয়ে বড়ো কথা?
দ্বিতীয়ত, আরব দেশ থেকে ভারতবর্ষ পর্যন্ত ইসলাম ধর্মের যে সহস্র বছরেরও বেশিদিনের ইতিহাস, তাকে কি একেবারেই পরিবর্তনবিহীন বলে মনে করা হয়েছে?
বহু শতাব্দী ধরে স্থান-কালভেদে তার যতো পরিবর্তন ঘটেছে, তা কি গ্রাহ্যই করা হয়নি?
সপ্তম শতকের আরব দেশে মুসলমান সমাজে সাম্যনীতির মৌলিক গুরুত্ব ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ত্রয়োদশ শতকের ভারতবর্ষে বা তার আগে-পরে অন্যান্য জায়গায় স্বেচ্ছাতন্ত্র ও সংকীর্ণ শাসকগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠিত হলো। যদিও তা সাম্যনীতির সম্পূর্ণ বিরোধী। তাছাড়া, ইসলাম ধর্ম বিভিন্ন মানুষের কাছে বিভিন্ন অর্থ বহন করে এনেছে। আলাউদ্দিন খলজি ও মহম্মদ তুঘলক, আকবর ও ঔরঙ্গজেব, ‘উলেমা’ ও সুফি সন্ত— এঁরা সকলে মুসলমান হলেও প্রত্যেকেই ইসলাম সম্বন্ধে বিভিন্ন ব্যাখ্যা পোষণ করতেন।
সুতরাং মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস যাকে বলা হয়, তা প্রকৃত ইতিহাসের অংশমাত্র, এবং যে দিকটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়, আসলে তার গুরুত্ব খুবই কম। সমাজ বিবর্তনের ক্রমবিকাশ আর উৎপাদন পদ্ধতির অদলবদল, এবং তার ফলে সমাজের গড়নের পরিবর্তন— এই সবই হলো প্রকৃত ইতিহাস চর্চার উপজীব্য। এইভাবে রচিত ইতিহাসই হতে পারে অতীত সমাজের সামগ্রিক ইতিহাস, এখানে শাসকের ব্যক্তিগত ধর্ম কী ছিল সেটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে যে ধরনের রাজনৈতিক ইতিহাস আমরা পড়ে এসেছি, তাও শাসকশ্রেণির বংশবিবরণী ছাড়া কিছুই নয়। শাসকশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত আঞ্চলিক ধর্মীয়, জাতিগত ইত্যাদি নানা রকমের গোষ্ঠীগুলির প্রায় কোনোরকম পর্যালোচনাই এখনও পর্যন্ত হয়নি। অথচ এগুলির দ্বন্দ্ব–সংঘাত এবং আপসের চাপেই শাসকশ্রেণির সেই সময়ের নীতি নির্ধারিত হতো।
মধ্যযুগীয় ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই ধরনের ব্যাখ্যাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে খুব সহজলভ্য তৎকালীন উপাদান। অর্থাৎ সেযুগের ঐতিহাসিকদের লেখা। এঁদের প্রায় প্রত্যেকের লেখাই হলো সেযুগের রাজদরবারের ইতিহাস, যথা জিয়াউদ্দিন বারানির তারিখ-ই-ফিরুজশাহি বা আবুল ফজলের আকবরনামা ইত্যাদি। পরবর্তী ঐতিহাসিকরা কিন্তু এইসব লেখা ব্যবহার করার আগে এদের চরিত্রের বিশেষ কোনো বিশ্লেষণ করেননি।
সে যুগের ঐতিহাসিকদের তথ্যের ওপর আমরা খুবই নির্ভর করি। তাঁদের প্রত্যেকের বিষয়েই যে কথাটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য তা হল, এঁরা প্রত্যেকেই হয় রাজ-অমাত্য, অথবা সেই পদপ্রার্থী ছিলেন। ফলে তাঁরা সকলেই রাজদরবারের কোনো না কোনো উপদলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতেন। তাই রাজদরবার ছিল তাঁদের আলোচনায় কেন্দ্রবিন্দু। তাদের লিখিত ইতিহাসের সব ঘটনাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে জড়িত থাকতো। রাজদরবারের অবস্থার সঙ্গে তাঁদের রচনার ভাষার পর্যন্ত যোগ থাকত। উদাহরণ হিসেবে খুব বিতর্কমূলক একটি শব্দ, ধরা যাক ‘হিন্দু’ শব্দটি।
‘সেযুগের ঐতিহাসিকরা অভিজাত অমাত্যশ্রেণির লোক ছিলেন বলে তারা এই শ্রেণির চরিত্রের ও কাঠামোর বা রাজার সঙ্গে এর সম্পর্কের কোনও পরিবর্তন চাইতেন না। জিয়াউদ্দিন বারানি ছিলেন চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের একজন অন্যতম তাত্ত্বিক ও পেশাদার ঐতিহাসিক। তিনি তাঁর বইটিতে এই দুটি দিকের ওপরে বিশেষ জোর দিয়েছেন। তাঁর ফাতাওয়া–ই–জাহানদারি বইটি অধ্যাপক মহম্মদ হাবিব ও বেগম আফসর খান ‘The Political Theory of the Delhi Sultanate’ নামে ইংরিজিতে অনুবাদ করেছেন। বারানি একদিকে বলেছেন যে, শুধুমাত্র উচ্চকুলজাত বিশিষ্ট ব্যক্তিরাই অর্থাৎ মুষ্টিমেয় অভিজাত শ্রেণিরাই দরবারের উচ্চপদ পেতে পারেন, যাতে তার গঠন ও চরিত্রের কোনো পরিবর্তন না হয়; অন্যদিকে তিনি একটি উপদেষ্টামণ্ডলী স্থাপন করতে বলেছেন, যার সভার সব নিয়ম সুনির্দিষ্ট থাকবে, যার সভ্যেরা সকলেই উচ্চবংশের হবেন এবং কোনও রকম ভয় বা প্রত্যাশা না রেখে তাঁদের মতামত প্রকাশ করতে পারবেন। এই উপদেষ্টামণ্ডলী স্থাপিত হলে সম্রাট ও অভিজাত শ্রেণির মধ্যেকার সম্পর্ক একটা প্রতিষ্ঠানিক রূপ নেবে, যার ফলে কোনো যথেচ্ছা সম্ভব হবে না।
এই স্থিতাবস্থার এক প্রধান বিপদ ছিলেন হিন্দু রাজারা, রাও, রাণা, জমিদাররা। আমরা পরে দেখব যে এঁরাও ছিলেন বৃহত্তর শাসকশ্রেণিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাজেই সেযুগের ঐতিহাসিকরা যখন হিন্দুদের বিনাশ কামনা করতেন, তখন তাঁরা হিন্দু বলতে এই গোষ্ঠীর কথাই চিন্তা করতেন। পুরো হিন্দু সমাজ ধ্বংস করা তাঁদের অভিপ্রায় হতেই পারে না। বিশেষ করে যেখানে হিন্দু কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করা খাজনার ওপর নির্ভর করে হিন্দু রাজা ও মুসলমান ইক্তাদারদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা নির্বাহিত হতো।
সুতরাং এই ঐতিহাসিকরা যখন ‘হিন্দু’ শব্দটি ব্যবহার করতেন, তখন তাঁরা রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ক্ষমতাশালী — হিন্দু-সমাজভুক্ত একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের কথাই মনে করতেন। এক্ষেত্রে ‘হিন্দু’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক অর্থে। ধর্মীয় অর্থে নয়। শাসকশ্রেণির অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও অস্থিরতা সেযুগের ঐতিহাসিকদের শব্দচয়নে প্রতিফলিত হয়েছে এবং এই শাসকশ্রেণির মধ্যে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই লোক ছিলেন। এই দ্বন্দ্বের সঙ্গে সামাজিক স্তরের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কোনও যোগ ছিল না।
দ্বিতীয় তদানীন্তন ঐতিহাসিকদের লেখায় তথ্যনিষ্ঠার চেয়ে ব্যক্তিগত মতামতের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। যা প্রায়শই ঘটেছে তা নিয়ে তাঁরা যত না লিখতেন, তার চেয়ে বেশি লিখতেন তাঁদের মতে যা হওয়া উচিত, সে-বিষয়ে।
আজকের দিনের ইতিহাসবিদদের অনেকেই সে যুগের ঐতিহাসিকদের ব্যবহৃত পরিভাষা থেকে তখনকার পুরো সমাজের অবস্থা বুঝে নেবার চেষ্টা করেন। তাই শাসকশ্রেণির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষকে তাঁরা মনে করেন বৃহত্তর সমাজের মধ্যেকার সংঘর্ষ। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি বিদ্রোহী হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে দমননীতি প্রযোগ করেছিলেন। তাই তিনি হয়ে দাড়িয়েছেন একজন ধর্মোন্মাদ সম্রাট, যিনি হিন্দুদের সহ্য করতে পারতেন না। আমরা মনে রাখি না যে মুসলমান ইক্তাদারদেরও (তাঁদের মধ্যে ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি অনেকেই ছিলেন, যারা কোনো অর্থেই বিদ্রোহী ছিলেন না) দমন করতেও আলাউদ্দিন কিছুমাত্র দ্বিধা করেননি। এমনকী যাঁরা রীতিমত সচেতনভাবে ধর্মনিরপেক্ষ তাঁরাও প্রায়ই এই ভুল করে থাকেন। জিয়া বারানি আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, আলাউদ্দিন তাঁর রাষ্ট্রব্যবস্থায় বা ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামীয় ধর্মনীতি একটুও মেনে চলতেন না। সেরকমই, শাজাহান বা ঔরঙ্গজেব রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি বা পরিবারকে ইসলামধর্মে দীক্ষিত করার যে চেষ্টা করেছিলেন, তাকে সমগ্র হিন্দুসমাজের ধর্মান্তরের চেষ্টা বলে দেখানো হয়।
এছাড়া, আধুনিক ঐতিহাসিকরা সেযুগের ঐতিহাসিকদের সমস্ত লেখার ওপরে এত আক্ষরিকভাবে নির্ভর করেন যে সেইসব লেখার কোনখানে যে খাঁটি তথ্য, আর কোনখানে যে ব্যক্তিগত ইচ্ছা, আশা ইত্যাদি এসে পড়েছে তা তাঁরা একেবারেই আলাদা করে দেখেন না। যে কোনও উপাদানের ওপর এতটা নির্ভরশীলতা সম্পূর্ণ অনৈতিহাসিক। তাছাড়া এটাও লক্ষণীয় যে আজকের দিনে যিনি যত গোঁড়া হিন্দু ঐতিহাসিক, তিনি ততই সেযুগের গোঁড়া মুসলমান ঐতিহাসিকদের লেখার ওপর নির্ভর করেন।
এই শতকের বিশ, তিরিশ ও চল্লিশের দশকে ‘জাতীয়তাবাদী’ ঐতিহাসিকরা এই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণের মোকাবিলা করতে ঐকাত্মিক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাঁরাও একই প্রথায় এই চেষ্টা করেছেন, অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক মনোভাবসম্পন্ন ঐতিহাসিকদের মতো তাঁরাও রাজদরবারের বাইরের বৃহত্তর সমাজ ও তার ক্রমবিকাশের ধারা অধ্যয়ন করেননি। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রদায়িক মনোভাবসম্পন্ন ঐতিহাসিকদের মতো তাঁরাও অন্য ধরনের তথ্য হয় লক্ষ্য করেননি, আর নয়তো ইচ্ছে করে এড়িয়ে গেছেন, যদিও নিঃসন্দেহে তাঁদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনেক ভালো ছিল।
‘জাতীয়তাবাদী’ ঐতিহাসিক বলতে তাঁদের বোঝানো হয়েছে, যাঁরা মনে করেন ভারতে মধ্যযুগের ইতিহাস হলো সাম্প্রদায়িক ঐক্যের যুগ, নিরবচ্ছিন্ন সাম্প্রদায়িক বিরোধের চিত্র নয়। সুতরাং সাম্প্রদায়িক বা জাতীয়তাবাদী— উভয় শ্রেণির ঐতিহাসিকদেরই আলোচনার মূল ধরন একই রকম থেকে গেছে। এর ফলে বিশেষ একটি পর্যায়ে এসে জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিককে সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকের বক্তব্য মেনে নিতে হয়েছে।
এই বক্তব্যের সমর্থনে উদাহরণ দেওয়া যাক। যেমন, এই সেদিন পর্যন্ত মনে করা হতো মধ্যযুগীয় ভারতে বিশেষ কোনো শাসকের ব্যক্তিত্বই সেসময়ের ইতিহাসের কেন্দ্রস্বরূপ ছিল, তাঁর শাসনকালের সব ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য দায়ী তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্র বা ইচ্ছা। তাই, আলাউদ্দিন খলজি কেবল তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্যই বিশাল ভূখণ্ড জয় করলেন। অথবা, মহম্মদ বিন তুঘলকের উন্মত্ত পরিকল্পনার পিছনে ছিল সামঞ্জস্যহীন, পরস্পরবিরোধী ধাতুতে গড়া চরিত্র। কিংবা আকবরের উদার ধর্মনীতি তার উদার মানসেরই প্রতিফলন। আকবরের উদার ধর্মনীতিকে যদি আমরা তার মানসিক উদারতার পরিচয় হিসেবে দেখি, তাহলে ঔরঙ্গজেবের ধর্মান্ধতাকে তার গোঁড়া ধর্মীয় নীতির কারণ বলে মেনে নিতেই হবে।
সুতরাং গোঁড়ামি বা উদারতা রাষ্ট্রনীতির নিয়ামক হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে বাস্তব রাজনৈতিক অবস্থার চাপে এবং গোষ্ঠী ও দলগত আনুগত্যের ঘাত-প্রতিঘাতে নীতি নির্ধারিত হয়, বিভিন্ন শাসকের ধর্মান্ধতা ও উদারতা দিয়ে নয়। সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকও আকবরের উদারতার যথেষ্ট প্রশংসা করতে পারেন। কারণ তাহলে অন্য সব শাসকের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধতার অভিযোগ সহজেই আনা যায়। ধর্মনিরপেক্ষ বা জাতীয়তাবাদী আখ্যা দিয়ে আকবরের প্রশস্তি করা প্রথমত অনৈতিহাসিক। কারণ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণাটি সম্পূর্ণ আধুনিক। মধ্যযুগীয় ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা (অথবা মধ্যযুগীয় অন্য যে কোনও রাষ্ট্র) স্বভাবতই ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে না। ধারণাটি এতই আধুনিক যে আমাদেরও কেউ কেউ এখনও পর্যন্ত একে নীতিগতভাবে মেনে নিতে পারেননি, বাস্তবে অনুসরণ করা তো দূরের কথা। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের প্রশস্তি করে কোনও লাভই হয় না। কারণ এর ফলে আকবরের অর্ধ শতাব্দীর শাসনকাল বাদ দিলে বাকি সাড়ে ছয় শতকের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধর্মপ্রধান বলে মনে করতে হয়। কাজেই আকবরের শাসন হয়ে দাঁড়ায় ইতিহাসের মূল সূত্র থেকে বিচ্ছিন্ন, আকস্মিক এবং অস্বাভাবিক।
আমরা যখন ইতিহাসচর্চার ধারা সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে পারব, যখন বিশেষ কোনও শাসক বা শাসকশ্রেণির ইতিহাসমাত্র না পড়ে সমস্ত সমাজের ইতিহাস পর্যালোচনা করব, একমাত্র তখনই আমাদের ইতিহাসচেতনা প্রকৃত অর্থে এবং যুক্তিযুক্তভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারবে। সমগ্র সমাজের ইতিহাস, তার চরিত্র ও গঠনভঙ্গি, যার থেকে পরস্পরবিরোধী হওয়া সত্ত্বেও কাছাকাছি সময়ে বা একইসঙ্গে জন্ম নেয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বিরোধ, সেই সম্প্রীতি ও বিরোধের ক্ষেত্র—এইসবই আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হওয়া উচিত। তাহলে ‘জাতীয়তাবাদী’ বা সাম্প্রদায়িক মনোভাবের ঐতিহাসিকদের মতো সমাজ-ইতিহাসের কোনও একটি দিকের ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করার জন্যে অন্য একটি দিক সম্বন্ধে আমাদের নীরব থাকতে হবে না।
।২।
সপ্তম শতকে আরব দেশে ইসলাম ধর্মের অভ্যুত্থান সমসাময়িক পৃথিবীর পক্ষে বিশেষ একটি প্রগতিশীল প্রভাব। যখন ধর্মগুরু মহম্মদ একেশ্বরবাদ প্রচার করলেন— এক আল্লাহ্, ছাড়া আর দ্বিতীয় ঈশ্বর নেই— তখন তিনি একটি বিরাট সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করলেন। কারণ, একেশ্বরবাদ তত্ত্বের মধ্যে সাম্যনীতিও নিহিত। যদি ঈশ্বর এক হন এবং যদি তিনি সব মানুষকে সৃষ্টি করে থাকেন তাহলে তো তাঁর কাছে সবাই সমান, যেমন পিতার কাছে সব সন্তান সমান । সেক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষই প্রত্যেক মানুষের সমান। এই মূল ধারণা থেকে মুসলমান সৌভ্রাতৃত্বের (‘মিল্লাৎ’) ধারণাটি গড়ে উঠল। এছাড়া ইসলাম ধর্মে কোথাও সংকীর্ণ শাসকগোষ্ঠী, এমনকি সংকীর্ণ কোনো পুরোহিতগোষ্ঠীরও স্থান ছিল না।
কিন্তু সপ্তম শতকের শেষ অথবা অষ্টম শতকের শুরু থেকে ইসলাম ধর্ম যখন বিরাট এক ভূখণ্ডের ওপর ছড়িয়ে পড়ল এবং প্রকাণ্ড সব সাম্রাজ্য গড়ে উঠল, তখন থেকে স্বৈরতান্ত্রিক রাজা (যিনি ঈশ্বরদত্ত অধিকারের দাবিতে রাজ্যচালনা করেন) ও তাঁর অধীনস্থ সংকীর্ণ শাসকগোষ্ঠীর আবির্ভাব হলো। বিশেষ করে, অনুন্নত সভ্যতা ও শাসনপ্রণালীর অধিকারী পারস্য সাম্রাজ্য বিজয়ের পরেই বেশি করে এই নতুন রীতি প্রবর্তিত হলো। সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক নিয়মে সামাজিক সাম্য ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হলো তার বিপরীতে। সুলতান মামুদ গজনি প্রথম বিধিসম্মতভাবে স্বীকৃত সুলতান— এই স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের মধ্যে সামাজিক সাম্যের ধারণা স্পষ্টই লোপ পেলো। তাই একাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে আমরা দেখতে পাই উচ্চাকাঙ্ক্ষী সম্রাটেরা তাঁদের সাম্রাজ্যবিস্তার করার জন্যে কেবল কাফেরদের নয়, পরস্পরেরও বিরোধিতা করেছেন। তুর্কিরা একটি সাহসী, যুদ্ধব্যবসায়ী শাসকশ্রেণি হিসেবে রাজ্যজয়ের উদ্দেশ্যে ভারতে এলেন, অসিধারী ধর্ম–প্রবর্তকের ভূমিকা নিয়ে নয়।
ভারতবর্ষে কীভাবে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠিত হলো?— বহু সংখ্যক হিন্দুকে হত্যা করে, না জোর করে তাঁদের ধর্মান্তর ঘটিয়ে? তুর্কি আক্রমণের বিরুদ্ধে যে কোনও রকম গণপ্রতিরোধ একেবারেই দেখা দিলো না তারই বা কারণ কী?
দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতকে তুর্কিরা প্রায় বারো হাজার সৈন্য নিয়ে এখানে তাঁদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেন। উন্নততর রণকৌশল ও সংগঠনের ফলেই তাঁদের জয়লাভ সম্ভব হলো, যদিও কোনও কোনও হিন্দু রাজার সামরিক বল ও অর্থনৈতিক সম্পদ তুর্কিদের চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের সমগ্রীভূত শক্তিকে পরাজিত করা আর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা এক নয়, এবং তাঁরা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছিলেন প্রথমটিই অপেক্ষাকৃত সহজ। যদি তাঁরা কেন্দ্র থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বস্তরে পূর্বতন সরকারী কর্মচারীদের পদচ্যুত করে নিজেদের লোক নিয়োগ করতেন, তাহলে তাদের যে প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হত তা পরাস্ত করার ক্ষমতা তাদের ছিল না। তাই বেশি ক্ষমতাশালী শাসকদের পরাজিত করার পর পুরোনো শাসকগোষ্ঠীর অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের ব্যক্তিদের সঙ্গে (অর্থাৎ রাজা, রাণা, জমিদার, চৌধুরি প্রভৃতি) তাঁরা একটি রফা করলেন, সেই রফা অনুযায়ী ঠিক হল যে জমিদার শ্রেণির লোকেরা তাদের পুরোনো জমি, পদমর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা সবই রাখতে পারবেন, যদি তারা প্রতি বছর সুলতানকে একটি নির্দিষ্ট খাজনা দিতে সম্মত থাকেন। যতদিন এই কর তাঁরা ঠিকমতো নির্দিষ্ট সময়ে দেবেন (কর দেওয়া মানেই সুলতানের আধিপত্য স্বীকার করে নেওয়া) এবং পরস্পরকে আক্রমণ করবেন না, ততদিন তাদের উৎখাত করা হবে না এবং তাঁদের নিজস্ব এলাকার শাসনব্যবস্থাতেও হস্তক্ষেপ করা হবে না।
কাজেই, শাসনব্যবস্থার নিম্নস্তরে হিন্দুরাই সর্বেসর্বা রয়ে গেলেন। এইভাবে তাঁরাই ভারতে তুর্কি সাম্রাজ্য পত্তনে সাহায্য করলেন এবং শাসনব্যবস্থার ভারও তাঁদের হাতেই রইলো। তাঁদের সাহায্য না পেলে তুর্কিদের বেশিদিনের জন্যে ভারতে অবস্থান কোনোমতেই সম্ভব হতো না। তাই তারাও শাসকশ্রেণিরই অংশভুক্ত রয়ে গেলেন। তুর্কিদের মতো তাঁদেরও অস্তিত্ব কৃষকের অতিরিক্ত উৎপাদনের ওপর নির্ভর করতো। আগেই বলা হয়েছে যে, বারানি প্রমুখ ঐতিহাসিকেরা ‘হিন্দু’ বলতে বুঝিয়েছেন হিন্দু সমাজের যে অংশটি শাসকশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, তাদের কথা। প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে শাসকশ্রেণির মধ্যে যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা যায়, তাকে প্রায়ই ধর্মীয় বা আদর্শগত রূপ দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে আমরা মহম্মদ তুঘলকের শাসনকালে আলি শাহ নাথুর বিদ্রোহের কথা মনে করতে পারি। নাথু নামে এক খলজিকে কিছু জমি দেওয়া হয়েছিল। তার থেকে তিনি রাজস্ব আদায় করতেন। কিছুদিন পরে ভরন নামে এক হিন্দু সরকারের কাছে নাথুর বিরুদ্ধে রাজস্বের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ আনলেন। তার ফলে নাথুর জমি ভরনকে দিয়ে দেওয়া হলো। নাথু ও তাঁর ভাইরা একজন কাফেরকে তাঁদের ওপরে বসানোর বিরুদ্ধে সুলতানের কাছে আবেদন করলেন। কিন্তু আবেদন অগ্রাহ্য হওয়ায় তাঁরা বিদ্রোহ করলেন।
রাষ্ট্র যে কখনও ব্যাপকভাবে সব হিন্দুদের মুসলমান ধর্মে দীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, বা প্রচণ্ড উৎসাহে ইসলামি আদর্শ প্রচার করেছিল, এরকম কোনও প্রমাণ নেই। ধর্মান্তরের চেষ্টা একমাত্র হয়েছে রাজনৈতিক অর্থে গুরুত্বপূর্ণ কোনও কোনও ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষেত্রে। কখনই ব্যাপকভাবে সাধারণের মধ্যে নয়। এবং আশ্চর্যের কথা হলো এই ধরনের চেষ্টাও হয়েছে মধ্যযুগীয় ইতিহাসের মাঝামাঝি সময়ে। প্রথম দিকে নয়। অথচ প্রথমদিকে এধরনের প্রচেষ্টা হলে তা আরো অর্থপূর্ণ হত। কেউ কেউ তর্কের খাতিরে বলতে পারেন যে, রাষ্ট্রের প্রত্যাশা ছিল এইসব প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পরিবার ধর্মান্তর গ্রহণ করলে তাদের অনুচররাও তাদের অনুসরণ করবেন। কিন্তু লক্ষণীয় হল শুধুমাত্র সেইসব ব্যক্তিদেরই ধর্মান্তরের কথা উঠত, যারা হয় বিদ্রোহ করেছেন অথবা রাষ্ট্রের বিরোধিতা বা অনুরূপ কাজ করেছেন। সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের ক্ষমা করা এবং তাঁদের গুরুত্বের কথা মনে রেখে তাঁদের কাছ থেকে নিঃশর্ত আনুগত্যের স্বীকৃতি আদায় করা। মধ্যযুগে ধর্মকে জীবনে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হতো বলে নিজের ধর্ম ত্যাগ করে সম্রাটের ধর্মকে গ্রহণ করাকেই আনুগত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন মনে করা হতো। তা নইলে কেনই বা অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও কর্মপটু হিন্দু রাজা, রাণা ও রাজপুত পারিষদের বেলায় ধর্মান্তর–গ্রহণের কথা বলা হত না?
কেউ এভাবে তর্ক করতেই পারেন যে, জিজিয়া কর ছিল হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়ার জন্য একরকম বাধ্যবাধকতা। মুসলমান হলেও তাঁদের ‘জাকৎ’ কর দিতে হত। এবং এই করটি কেবলমাত্র মুসলমানদেরই দিতে হত। দ্বিতীয়ত, জিজিয়া সম্বন্ধে যেসব তথ্য জানা যায় তা সবই নিতান্তই অস্পষ্ট। চতুর্দশ শতকের পর্যটক ইবন বতুতা বলেছেন যে, দক্ষিণ ভারতে এক হিন্দু রাজবংশ (‘জামোরিন’) তাদের ইহুদি প্রজাদের কাছ থেকে জিজিয়া আদায় করতেন। ভারতবর্ষের বাইরে মুসলমান শাসকরা তাদের মুসলমান প্রজাদের ওপরেও জিজিয়া কর বসাতেন বলে আমরা জানি। তাছাড়া ফিরোজ তুঘলকের শাসনকাল বাদ দিলে অন্যসব সময়ে জিজিয়ার আওতা থেকে নারী, শিশু, পঙ্গু, ব্রাহ্মণ ও সেনারা বাদ পড়তেন। তর্কের খাতিরে যদিই বা ধরে নেওয়া হয় যে জিজিয়া করের উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণই ধর্মীয়, তাহলেও একথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে হিন্দুরা তাদের ধর্ম সম্বন্ধে এমনই উদাসীন ছিলেন যে সামান্য একটা কর এড়াবার জন্যে ধর্মত্যাগ করতে পারতেন (বিশেষত যেখানে পুরোপুরি এড়াবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, কারণ মুসলমান হলেও, তাঁদের ‘জাকৎ’ কর দিতে হত)। তাছাড়া যদি মনে করতে হয় যে, হিন্দুরা কিছু টাকা বাঁচাবার জন্য ধর্মান্তর গ্রহণ করতেন, তাহলে আমরা কেনই বা ধরে নেব না যে রাষ্ট্রও শুধুমাত্র আর্থিক কারণেই এই কর বসিয়েছিল, অন্য কোনও কারণে নয়?
মন্দির ধ্বংস করার ব্যাপারেও একই কথা খাটে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে সেযুগের গোঁড়া মুসলমান ঐতিহাসিকরা যেরকম উৎসাহের সঙ্গে সেসব কথা বর্ণনা করে গেছেন, আজকের দিনের গোঁড়া হিন্দু ঐতিহাসিকরাও ঠিক একইভাবে তা বর্ণনা করেছেন। হিন্দু মন্দির ধ্বংস করার উদ্দেশ্য আর যাই হোক না কেন, হিন্দুদের মুসলমান ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করা নিশ্চয় নয়। কেননা কী করে আমরা ভাবতে পারি যে, কোনও সম্প্রদায়ের হৃদয় জয় করা যায় তাদের মন্দির ধ্বংস করে। এই ধ্বংসক্রিয়া তাদের মনে ইসলাম সম্বন্ধে প্রেম নয়, বরং ঘৃণারই উদ্রেক করতে পারে। তাহলে এধরনের কার্যকলাপের উদ্দেশ্য তাদের ধর্মান্তরিত করা নয়, নিশ্চয়ই অন্য কোনও অভিপ্রায় ছিল। এটা লক্ষণীয় যে সাধারণত কেবলমাত্র শত্রুপক্ষের এলাকার মন্দিরগুলিই ধ্বংস করা হয়েছে। মন্দিরগুলি ষড়যন্ত্র বা বিদ্রোহের কেন্দ্র হয়ে না দাঁড়ালে (যেমন ঔরঙ্গজেবের আমলে হয়েছিল) সুলতানের নিজের এলাকার মধ্যে কখনই তা ধ্বংস করা হত না। শত্রুর এলাকায় মন্দির ধ্বংস করা যেন জয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, মুসলমান আক্রমণের বহু আগেই অনেক হিন্দু শাসক তাঁদের শত্রু এলাকায় গিয়ে একই কাজ করেছেন। পারমার রাজা সুভাতবর্মন (১১৯৩–১২১০ খ্রীষ্টাব্দ) গুজরাট আক্রমণ করে দাভয় ও ক্যাম্বে অঞ্চলে বহু সংখ্যক জৈন মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। পূর্বোল্লিখিত কাশ্মীরের রাজা হর্ষ তাঁর রাজভাণ্ডার পূর্ণ করার উদ্দেশে তার নিজের রাজ্যতেই চারটি বাদে আর সব মন্দির লুণ্ঠন করেছিলেন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদ হয়নি। অথচ, আরো বেশি অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় যখন তিনি অধীন সামন্তপ্রভুদের ওপর কর বাড়িয়ে দিলেন তখন তাঁকে শ্রীনগরের পথে পথে টেনে নিয়ে ঘোরানো হয়েছিল। এবং পরিশেষে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।
ধর্মান্তকরণ যে হত একথা কেউ অস্বীকার করছেন না। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়েই তা ছিল ইচ্ছাকৃত ধর্মান্তর। কিংবা হয়তো সুফি সন্তদের জনপ্রিয়তার ফল। তাঁরা সাধারণ মানুষের মধ্যে বাস করতেন। এবং তাঁদের সঙ্গে তাঁদের ভাষাতেই কথা বলতেন। আমাদের প্রতিপাদ্য শুধু এইটুকুই যে, রাষ্ট্র কখনও গণহারে ধর্মান্তরের চেষ্টা করেনি। সেরকম কিছু করলে তদানীন্তন গোঁড়া মুসলমান ঐতিহাসিকরা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে এবং অনেক অতিরঞ্জনসহ সে তথ্য লিপিবদ্ধ করে যেতেন।
সম্রাট অশোক যদিও সর্বপ্রকারে বৌদ্ধধর্ম প্রচলন করার এবং জনসাধারণকে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টায় সরকারিভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছিলেন, তবুও আমরা তাকে একজন মহান সম্রাট বলে মনে করে থাকি। কিন্তু মধ্যযুগীয় ভারতে রাষ্ট্র কখনো ধর্ম প্রচারে কোনও আগ্রহ দেখায়নি— তবু জনমানসে তা কেবলমাত্র ইসলাম ধর্ম প্রসারের একটি মাধ্যম হিসেবেই রয়ে গেছে। এই ধারণার পিছনে আছে আমাদের সুপ্ত সাম্প্রদায়িক মনোভাব বা মুসলমান ধর্ম গ্রহণের বিরোধিতা পোষণ। এই ধরনের মনোভাবকে দমন করার জন্যে আমাদের সচেতনভাবে চেষ্টা করা উচিত।
আমরা এখানে এরকম কোনও ইঙ্গিত করছি না যে মধ্যযুগীয় ভারতে রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পূর্ণই ধর্মনিরপেক্ষ ছিল। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণাটিই সাম্প্রতিক। কাজেই মধ্যযুগে বা তারও আগে এই আদর্শের প্রয়োগ ঐতিহাসিকভাবে সম্ভব ছিল না। সুতরাং যদি কখনও রাষ্ট্র ধর্মপ্রচারে লিপ্ত হয়েও থাকে, তাহলে অশোকের ক্ষেত্রে যেমন তা হয়েছে, এক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত।
তবে মধ্যযুগীয় ভারতে রাষ্ট্রব্যবস্থা নেতিবাচকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ছিল। অর্থাৎ, রাষ্ট্র ধর্মকে রাজনীতির পরে স্থান দিত, রাজনীতির ঊর্ধ্বে ধর্মকে তুলে ধরত না। সুলতানরা উলেমাদের অনেক মাইনে দিয়ে অল্প দায়িত্বের পদে নিযুক্ত করতেন, যাতে তাঁরা সাধারণ মানুষের ওপর তাঁদের যা প্রভাব আছে তার সবটাই সুলতানদের রাজনীতিক প্রয়োজনে খাটাতে পারেন। এবং উলেমারাও অধিকাংশই সুলতানের নির্দেশ পালন করতে যথেষ্ট আগ্রহী থাকতেন এবং প্রায়ই ইসলাম ধর্মের নিয়ম–কানুন তাঁরা সুলতানের সুবিধা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতেন। সুফিরা উলেমাদের সামান্য অর্থের বিনিময়ে এই আত্মবিক্রয়ের তীব্র নিন্দা করতেন। এবং সেই নিন্দা ন্যায়সঙ্গত ছিল। এ বিষয়ে অনেক উদাহরণ থেকে একটি বিচিত্র দৃষ্টান্ত তুলে ধরলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে। বাদাউনি নামে আকবরের সমসাময়িক একজন রাজসভার ঐতিহাসিক বলেছেন যে যদিও ধর্মত একজন পুরুষের মাত্র চারজন স্ত্রী থাকতে পারেন, তবু সম্রাট আকবরের ন’জন স্ত্রী ছিলেন। আকবর উলেমাদের এক সভায় প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। সম্রাটের প্রসাদভিক্ষু একজন অতি আগ্রহী উলেমা বলে উঠলেন যে, আইন অনুসারে একজন মুসলমানের ২–২, ৩–৩, ৪–৪ জন পত্নী, অর্থাৎ সব মিলিয়ে আঠারোজন পত্নী থাকতে পারেন। অন্য কেউ কেউ তখন একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে মনে করে বললেন যে প্রকৃতপক্ষে আইনসম্মত সংখ্যা হোল ২, ৩, ৪। অর্থাৎ নয়।
।তিন।
ধর্মান্তরের (স্বেচ্ছায় অথবা বাধ্য হয়ে) সঙ্গে–সঙ্গেই নব্য মুসলমানরা যে শাসকশ্রেণির পুরোপুরি অংশ হয়ে যেতে পারতেন তা নয়। প্রকৃতপক্ষে উচ্চশ্রেণির মুসলমানেরা নিম্নশ্রেণির মুসলমানদের সর্বান্তঃকরণে ঘৃণা করতেন। বারানি একটি স্বরচিত ‘ফরমান’কে খলিফা মামুদের নামে চালিয়ে দিয়েছিলেন। ফরমানটি খলিফার নামে চলত বলে তা কেবল মুসলমানদের সম্বন্ধেই প্রযোজ্য ছিল। এটি হলো— সব ধরনের গুরুদের কঠোরভাবে আদেশ করা হচ্ছে যেন তাঁরা শূকর এবং ভল্লুকের গলায় সোনার শিকল না পরান বা কুকুরের গলায় জোর করে মণিমাণিক্য পুরে না দেন। অর্থাৎ, গরিব দীনহীন ব্যক্তিদের, দোকানদার ও নিম্নজাত জনকে তাঁরা যেন প্রার্থনা, উপবাস ইত্যাদি ব্যাপারের নিয়ম ছাড়া কিছু না শেখান।’
অন্যদিকে শাসকশ্রেণি গঠিত হয়েছিল মুসলমান ও হিন্দু, অর্থাৎ ‘ইক্তাদার’ (পরে যাদের ‘মনসবদার’ বলা হতো) এবং জমিদার উভয়পক্ষকে নিয়েই। প্রথমে ইক্তাদারদের সকলেই তুর্কি জাতীয় ছিলেন। এবং রাষ্ট্রক্ষমতার ঊর্ধ্বভাগে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে তুর্কি নন এমন কোনো ব্যক্তি ক্ষমতালাভ করতে পারতেন না। পরে অবশ্য ভারতীয় মুসলমান, এমনকি হিন্দুদের নামও উচ্চপদের তালিকায় পাওয় যেত। মোগলদের সময়ে অবশ্য রাজপুতরা এবং রাজা টোডরমল, বীরবল প্রমুখ আরও কেউ কেউ রাজ্যের সর্বাধিক ক্ষমতাশালী পদ অধিকার করেছেন। জমিদারেরা প্রত্যেকেই প্রথম দিকে হিন্দু ছিলেন। যদিও পরে কয়েকজন মুসলমান জমিদারদের নামও জানা যায়।
বিভিন্ন ব্যক্তি এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে মধ্যে ক্রমাগত বিরোধ চলতো। এবং কোনও সংঘর্ষেরই নির্দিষ্ট কোনো সীমানা (আঞ্চলিক, ধর্মীয় অথবা জাতিগত) ছিল না। মুসলমান ওমরাহগণ সুলতানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতেন। এবং নিজেদের মধ্যেও কলহ-বিবাদ করতেন। হিন্দুরাও ঠিক একই কাজ করতেন। এবং উভয় পক্ষই যেমন পরস্পরের সঙ্গে বিবাদ করতেন তেমনি নিজেদের মধ্যেও কলহ করতেন। এবং সবেরই মূলে ছিল রাজত্ব ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগ দখল। তা সত্ত্বেও দুপক্ষেরই অনেক ব্যাপারে মিলও দেখা যেত। উভয়েই কৃষকের অতিরিক্ত উৎপন্ন দ্রব্যের ওপর নির্ধারিত খাজনার দ্বারা জীবন নির্বাহ করতেন। এবং তাঁদের প্রভূত আয়কে ছাড়িয়ে যেত ভোগ-বিলাসবহুল জীবনযাত্রা। ঋণভার ছিল মর্যাদার নির্দেশক— এই পরিমাণ যার যত বেশি, তাঁর সম্মানও সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পেতো। তাদের জীবনযাত্রা ওপরওয়ালাদের অনুকরণ করে চলতো। চারুশিল্পের যে তাঁরা এতোটা পৃষ্ঠপোষকতা করতেন তা আসলে সেযুগের মূল্যবোধের একটি পরোক্ষ ফলবিশেষ ছাড়া কিছু নয়। পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে তারা তাঁদের আশ্রয়ভুক্ত কবি বা সঙ্গীতজ্ঞদের সংখ্যা বাড়াবার চেষ্টা করতেন। এবং, সর্বোপরি তাঁরা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সাধারণ লোক সম্বন্ধে গভীর অবজ্ঞা পোষণ করতেন।
এর আগে আমরা একটি প্রশ্ন তুলেছিলাম: তুর্কি আক্রমণের সময়ে, বা পরে মোগল আক্রমণের বিরুদ্ধে জনসাধারণের মধ্যে কোনও প্রতিরোধ দেখা যায় নি কেন? গণ-প্রতিরোধের যা নিদর্শন পাই, তা সপ্তদশ শতাব্দীতে, যখন মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব এবং আগ্রা-মথুরা অঞ্চলের কৃষকরা ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন।
এর দুটি প্রধান কারণ থাকতে পারে। প্রথমত তদানীন্তন সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বপক্ষে তাদের রাজপুত প্রভুদের হয়ে লড়াই করার কোনো উৎসাহ জনসাধারণ খুঁজে পেতেন না, বিশেষত যেখানে প্রভুরা আজকের দিনেও রাজস্থানের মোট লোকসংখ্যার শতকরা আট ভাগেরও বেশি নন। এমনিতেও সাধারণ লোকের কাছে তুর্কিরা মোটামুটি পরিচিত ছিলেন। কারণ রাজপুতদের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠ জ্ঞাতি সম্পর্ক ছিল। কেননা রাজপুতেরা একসময়ে একই ভূখণ্ড থেকে এসেছিলেন এবং তুর্কিদের মতো একই স্তরের সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাছাড়া তুর্কিদের মধ্যে এমন ভয়াবহ কিছু ছিল না যা তাঁরা আগেই রাজপুতদের মধ্যে দেখেননি। দ্বিতীয়ত তুর্কিরা তদানীন্তন রাজনৈতিক বা সামাজিক কাঠামোর ওপর কোনওরকম আঘাত করেননি, কেবলমাত্র ওপরদিকে সামান্য, আংশিক পরিবর্তন করেছিলেন।
কাজেই, যা কিছু বিরোধ তা শাসকশ্রেণির মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। এই সংঘাত সাম্রাজ্যের শাসকশ্রেণির অন্তর্বিরোধও হতে পারতো যেমন হিন্দু ও মুসলমান জায়গিরদারদের অসংখ্য বিদ্রোহ; আবার জুটি শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধও হতে পারতো, যেমন দেখা গিয়েছিল রাণা প্রতাপের ব্যর্থ বীরপ্রকাশে। প্রকৃতপক্ষে প্রতাপ সমগ্র ভারতবর্ষ তো নয়ই, এমনকি সমগ্র রাজপুতানার জন্যেও লড়াই করেননি। তিনি যুদ্ধ করেছিলেন শুধু তাঁর নিজস্ব রাজ্যের অংশটুকুর জন্যে।
একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার আমাদের লক্ষ্য করা উচিত, সপ্তদশ শতকে যখন মারাঠা, শিখ ও জাঠ অভ্যুত্থান দেখা দিল এবং মোগল রাষ্ট্রের সঙ্গে মারাঠা ও শিখদের প্রচণ্ড সংঘর্ষ বাধলো, তখনও কিন্তু সামাজিক জীবনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। এমনকি, ঔরঙ্গজেবের সর্বাধিক স্বৈরাচারের পর্বেও হয়নি। অথচ যদিও আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা সরকারিভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, তবুও আমাদের জীবনকালেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এত ঘন ঘন হয়েছে যে আমরা কেউ কেউ হয়তো সেগুলির অমানুষিকতা ও অন্ধ গোঁড়ামি সম্বন্ধে উদাসীন হয়ে পড়েছি। মারাঠা, শিখ ও পাঠান অভ্যুত্থানের প্রকৃত কারণ ছিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক। ধর্মীয় নয়। যদিও বিবদমান দলগুলি মুখে অন্যরকম প্রচার করতেন, তবুও বিরোধ সেইসব স্তরেই আবদ্ধ থাকতো।
এপ্রসঙ্গ শেষ করার আগে আর একটি কথা বাকি থেকে যায়: রাজপুতরা যদিও তুর্কিদের ঢের আগে ভারতে আসেন, তাঁরা কিন্তু এযাবৎ তাঁদের স্বতন্ত্র সত্তা বরাবর বাঁচিয়ে এসেছেন এবং আজ অবধি তা পরিহার করার কোন লক্ষণও দেখা যায় না। চৌহান, পরিহার, শোলাঙ্কি– অদ্যাবধি আমাদের পরিচিতমহলে এ নামগুলি শোনা যায়। কিন্তু যেসব বিরাট রাজবংশ এককালে ভারতবর্ষ শাসন করেছেন তাঁদের বংশধররা আজ কোথায়? সেই দাসবংশ, খলজিবংশ, তুঘলকবংশ, লোদিবংশ, এমনকি সেই মোগলরা, যাঁদের কেন্দ্র করে মাত্র একশো বছর আগেও বিরাট বিদ্রোহ ঘোষিত হয়েছিল, তাঁরা কোথায় গেলেন? দেখা যাচ্ছে এঁরাই ভারতীয় জীবনের মূল ধারণাটির সঙ্গে একেবারে মিশে গেছেন। এবং নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে বিসর্জন দিয়ে এই জীবন প্রবাহকে তাঁরা যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন, আর কোনও কিছুতেই তা হয়নি।
—কমিউনালিজম অ্যান্ড দি রাইটিং অব ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি, ১৯৬৯, পিপলস পাবলিশিং হাউস
প্রকাশের তারিখ: ০৪-ডিসেম্বর-২০২২ |