মেঘে ঢাকা তারা

কুমার সাহানি, সঈদ আখতার মির্জা
ঝড়ের কাছে ঠিকানা গচ্ছিত রেখেছিলেন ঋত্বিক কুমার ঘটক। অজানা সংকটময় পথে হেঁটেছিলেন এবং হাঁটতে হাঁটতে জুড়তে চেয়েছিলেন। ছিন্নমূল হওয়া এবং জুড়ে থাকতে চাওয়ার আকুতি নিয়তই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সৃষ্টি কর্মে। সেই ঝড়ের ঠিকানা-ঠিকুজির খোঁজে রত হয়েছেন দুই পরিচালক সঈদ আখতার মির্জা (জ. ১৯৪৩) ও কুমার সাহানি (১৯৪০-২০২৪)। ঋত্বিক ঘটক এবং তাঁর অসামান্য সৃষ্টি মেঘে ঢাকা তারা প্রসঙ্গে কথা বলেছিলেন তাঁরা। মেলোড্রামা, সংগীত, সুফি ঐতিহ্য,‌ দেশভাগ নানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে তাঁদের কথাবার্তায়। ঋত্বিক ঘটকের জন্মশতবর্ষে সেই কথোপকথন মার্কসবাদী পথ-এ তর্জমাকারে প্রকাশিত হল। ‘গ্রেট মাস্টার’-এর প্রতি রইল মার্কসবাদী পথ-এর শ্রদ্ধার্ঘ্য। আজ দ্বিতীয় পর্ব।

প্রথম পর্বের পর

সঈদ: ধ্রুপদী সংগীতই রবিশঙ্কর, বিলায়েৎ খাঁ বা জাকির হোসেনকে বিশ্বখ্যাত করেছে।
 
সিনেমায় সংগীতের ব্যবহার প্রসঙ্গে ফিরলে দেখা যায় নীতার ক্রমশ অবনতি, টিবি হওয়া, পর্দা তার মুখ দেখানোর পরেই ক্যামেরা উপর থেকে ছবি নেয়, টপ-অ্যাঙ্গেলের সেই শটের সাথে পিছন থেকে ভেসে আসা আলাপ। আমি গোড়ায় ক্যামেরা হঠাৎ টপ অ্যাঙ্গেল নিতে অবাক হয়েছিলাম— কিন্তু সেটা কোথায় পৌঁছে দেয় ভেবে দেখার অবকাশ আছে। 

কুমার: তিনজন মহিলা বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গাটায় রয়েছেন, সেখানেই এই টপ অ্যাঙ্গেল শটটি ব্যবহার করা হয়েছে। তিনজন মহিলা চরিত্রের ত্রিকোণ বিন্যাস দেখানোর উদ্দেশ্যে মনে হয় এটা ব্যবহৃত। আর, এই সিনে প্রত্যেকটা ক্রিয়াকলাপ কার্যত এই ত্রিভুজ কাঠামোটিকে দুর্বল করে তুলছে। 

সঈদ: আমার মনে হয় অনেক কিছুর মধ্যে দিয়েই এর ইঙ্গিত মেলে। বাবার চরিত্রটি পড়ে গিয়ে যে-আঘাত পায় এবং কর্মক্ষমতা হারায়, তার পরবর্তীতে গোটা পরিবার এই আকস্মিকতায় হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ভাবছে ভবিষ্যতের কথা। এখানেই ঘটক! বোঝা যায়, এইবার টানাপোড়েন বাড়তে থাকবে। 

কুমার: আপনি লক্ষ করে থাকবেন, ঘটক প্রায়শই গলা থেকে ছবি তুলেছেন…

সঈদ: হ্যাঁ, অনেকেই এরকম অনিয়মিত ফ্রেম বাদ দিয়ে দিত। যে-সিনে নীতা ও তার প্রাক্তন বন্ধু সনৎকে দেখা যায় নদীর ধারে, ক্যামেরা সেখানে তার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেখানোর জন্য ফোকাস করে উল্লম্বিত অক্ষ বরাবর উপর দিকে উঠছে। তারপর ক্যামেরা থেমে যায় সেই অবস্থানেই। নীতা থাকে সনৎয়ের আগে।‌ খুবই অদ্ভুত ক্যামেরার ব্যবহার, প্রায় ইম্প্রেশানিস্ট শটের মতো। কিন্তু তা নয়, কারণ পর্দায় যা দেখা যাচ্ছে সবই বাস্তবিক, ঘাস, মানুষ, ট্রেন, নদী, সমস্ত।

কুমার: আমার মনে হয় ঘরের বাইরে শুটিং করার ক্ষেত্রে, যাকে বলে আউটডোর, সেখানে সাদা কালো রঙের বৈপরীত্যকে ব্যবহার করা হয়েছে।‌ গোটা ছবিটা অত্যন্ত কম টাকায় করা। যখন শেষ কয়েকটা সিন শুট করতে শিলং যাওয়া হল, ঘটক আন্দাজ করতে পারেননি যে আকাশ এতটা মেঘাচ্ছন্ন থাকবে‌ বা আলো‌ এতটা নিয়ন্ত্রণবিহীনভাবে পেলব হয়ে আসবে। তিনি আলোর বৈপরীত্য খুঁজে থাকতে পারেন, কিন্তু এখানে ডিসলভ ব্যবহার করেছেন। প্রথম দিকে ছবির নাটকীয় বৈপরীত্য থেকে এই পেলব হয়ে আসা নরম আলোয় পরিবর্তন আসলে বলতে থাকে, যে নীতার বিয়োগান্তক এই পরিণতির অনুষঙ্গে প্রকৃতির পরিবর্তন কোনও পার্থক্যই সৃষ্টি করতে পারছে না। এই যে ইম্প্রোভাইজ করতে পারা, বা বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে নতুনভাবে কিছু বিকশিত করতে পারা, এটাও কিন্তু ধ্রুপদী সংগীতর থেকেই ঘটক নিয়েছেন, একই রাগ সেখানে প্রত্যেকবার গাইবার সময় ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। এই যে-সাংগীতিক চরিত্র সিনেমার গঠনের মধ্যে এসে পড়ে, ঋত্বিক এর কথা বারবার উল্লেখ করতেন। এরকম সৃষ্টিশীলতাই তাঁকে পথপ্রদর্শকে পরিণত করেছিল। তারপর আপনি ছবিটায় ফিরে গেলে দেখবেন, প্রত্যেকটা সংলাপের সাথে যে সংযুক্ত নেপথ্য স্বরগুলি ভেসে আসছে, সেগুলো সংলাপের পিছনে থাকা ভাবনা ও অনুভূতিকে কীভাবে আরও জোরালো মাত্রা দিয়েছে। এখানে আমরা মেলোড্রামাতে মেলোডির ব্যবহার দেখতে পাব। 

সঈদ: আচ্ছা, গোড়া থেকে এরকম একজন শিল্পীকে কেউ খেয়াল করল না কেন? তাঁর প্রাপ্য সম্মান না-পাওয়ার কারণ কী?

কুমার: তার একটা বড়ো কারণ তিনি বিশ্বব্যাপী চলমান আন্দোলনের অংশ ছিলেন। সমস্ত ধরনের অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধেই ছিলেন সরব। 

সঈদ: ফর্ম ও কন্টেন্ট উভয়ের ক্ষেত্রেই? 

কুমার: একেবারেই। জানেন, চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে বারবার ঘটক ফিল্ম-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নানাভাবে লাল সুতোর গেড়োয় পড়েছেন। বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। 

সঈদ: এই কারণেই হয়তো পরে তাকে ছিন্নমূল ভবঘুরেতে পরিণত হতে হবে। কিন্তু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তার অবদান বোঝা যায়, যখন অসংখ্য পরবর্তী প্রজন্মের পরিচালক তাকে নানাভাবে সম্মান জানান। আমি নিজেও তার একটি সাউন্ড ট্র্যাক ব্যবহার করেছিলাম, একজন মহিলার উপর নির্যাতন দেখাতে গিয়ে, তার হেরে না-যাওয়ার গল্প বলতে গিয়ে। এভাবে আমি চেয়েছি ঘটককে, তার চরিত্র নীতাকে সালাম জানাতে।‌ হয়তো আমি সরাসরি তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হইনি, কিন্তু অন্য বহু কোণ থেকে তিনি আমার উপর বহুবিধ প্রভাব বিস্তার করেছেন। 

কুমার: আমার সমস্ত ছবি সরাসরি তাঁর দ্বারা প্রভাবিত। শেষ যে-ফিচার ফিল্মটি বানাই, সেটা রবীন্দ্রনাথের শেষ উপন্যাসটি অবলম্বনে। গোটা ছবিটায় অসংখ্য খোয়াব বা ইলিউশন ব্যবহার করেছি, এদিকে ঘটকই আমায় ঠেলে দিয়েছিলেন। আমাদের সাংগীতিক ঐতিহ্যে আছে যে আমার গান যতটা আমার, ‌ততটাই আমি যার কাছে শিখেছি, সেই গুরুর। 
একবার দিল্লিতে গিয়েছি, ঘটক আমার পাশে বসে আছেন। আমরা একসাথে একটা ট্রেন আসা দেখেছিলাম, ঘটক বলেছিলেন, এই বাস্তব, যান্ত্রিক অগ্রগতি— সিনেমায় বিশেষভাবে প্রয়োগের কথা। আমরা এই বাস্তবের প্রতি সকলেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। রেললাইনটা নদীর মতো মনে হয়েছিল, আমাদের ভক্তি ও সুফি ভাবাদর্শেও নদী পেরোনোই জীবনের মূল কথা, মুক্তির কথা। ঘটক কিন্তু ভয়ানক নিয়ম-কানুন বর্জিত জীবন কাটিয়েছেন,  বেশির ভাগ সময় মদ্যপ অবস্থায় থাকতেন। আর যখনই আমি কোনও গানবাজনা সংক্রান্ত আলোচনা করতে যেতাম, প্রথম বলতেন, তা তুমি আমায় শেখাতে চেষ্টা করছ? তাই, ওর সাথে কথা বলতে গেলে একটা বিষয় গভীরভাবে জেনে যেতে হত, একটা মতামত নিয়ে চলে গেলে চলবে না। 

সঈদ: আমারও খুব অদ্ভুত লাগত। হয়তো কখনও জিজ্ঞেস করেছি, আচ্ছা, ভালো পরিচালক হতে গেলে কী করতে হয়? ওঁর পাঞ্জাবীর এক পকেটে থাকত মদের বোতল আর একটা পকেটে শৈশব। সেই সময়টাই ছিল পরীক্ষা করে দেখার, খুঁজে দেখার, ঘেঁটে নেড়েচেড়ে বোঝার। আর, সমস্যাহীন বেড়াটোপের মধ্যে না-থাকার। 

কুমার: হ্যাঁ, ঘটক বারবার বলতেন জীবনকে তার সমস্ত নগ্নতাসহ দেখার কথা, যেটা ভালো পরিচালক হওয়ার জন্য জরুরি। 

সঈদ: একবার তিনি আমাদের ক্লাসে পড়াচ্ছেন, তখন তিনি এমনিই মহীরুহে পরিণত হয়েছেন। আমাদের নাম জিজ্ঞেস করছেন। শুনে বললেন, সাংঘাতিক সব নাম! তোমরা সব সিনেমা বানাবে— তোমাদের নামের একটা ওজন থাকা দরকার! মিকেলোভিচ বা আইজেনস্টাইনের মতো। আমি হাত তুলে বলেছিলাম, স্যার আমার নাম সঈদ আখতার মির্জা, বলেছিলেন হ্যাঁ তোমার নামের একটা ওজন আছে! তিনি বোধহয় বলার চেষ্টা করছিলেন সিনেমা বানানো একটা সিরিয়াস গোত্রের কাজ, হাল্কাভাবে সেটা নেওয়া চলে না। পরিচালনা করতে হলে বিশ্বাস এবং সদিচ্ছা নিয়ে সেটা করতে হয়। 

কুমার: আমার মনে হয়, তাঁর ছাত্ররাও তাঁকে বিশাল উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।‌ তারা ছাড়া প্রাথমিকভাবে আর অন্য কেউ তার কাজকে গুরুত্ব দিতে রাজি ছিল না। 

সঈদ: পুনের ফিল্ম ইন্সটিটিউটে তার ছাত্ররা বারবার বলতেন যে আপনার কথা মনে থাকবে। আর সেখান থেকেই এই মানুষটার বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রাপ্য সম্মানের পুনরুদ্ধারের শুরুয়াৎ। তাঁর স্মৃতি এখনও ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায়। ওখানে গেলে ওঁর উপস্থিতি যেন অনুভব করা যায়, উনি ওখানে সত্যি আছেন, জানেন! … শেষ পর্যন্ত একটা প্রশ্ন করতে চাই, হঠাৎই কী এই বাউল গায়ককে ঘটক যুক্ত করেন?

কুমার: বিয়োগান্তক নাটকে কোরাসের ব্যবহারের সাথে যুক্ত এই ব্যবহার! এই বাউল গানের মধ্যে লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস ও ‘গৃহহারার বেদনাবোধ’ মিশে আছে, এই সিন অসামান্য! হঠাৎই, এই সাউন্ড ট্র্যাক আরেকটা সিনে নিয়ে গিয়ে উপস্থিত হয়। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছিলাম জানেন! 
অনেকটা আল্লার কাছে প্রার্থনার মতোই। বিশেষ করে যারা ঋত্বিকের মতো ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস রাখতেন না, তাঁরা যা বিশ্বাস করেন সুফি ভাবাদর্শে তারও কিছু স্থান আছে। সেখান থেকেও বাউল গান সংযুক্ত করার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এই আবেদনটা ধর্ম নির্বিশেষে আসলে জরুরি, সেটা জীবনের সাথে জুড়ে আছে। 
আবেদন নিজেই একটা গুরুত্ব বহন করছে— ‘দাদা, আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম!’

সঈদ: কেন্দ্রীয় চরিত্র নিজে এই আবেদন করছে— বাঁচবার আবেদন। কীভাবে এই ছবিকে পর্যায়ভুক্ত করা যায়, কুমার? নাকি মেঘে ঢাকা তারা পর্যায়ভুক্ত না-হয়ে, নিজেই একটা পৃথক পর্যায় হয়ে ওঠে?

কুমার: আবেদনটা খেয়াল করলে মনে হয়, একটা স্পষ্ট এবং নির্ভেজাল বক্তব্য ও তার উচ্চারণ প্রকট হয়েছে এখানে, আর সেটা শুধু সিনেমার শেষে নয়, গোটা ছবিতেই ছড়িয়ে আছে। এরকম ছবিকে সম্ভবত পর্যায়ভুক্ত করা যাবে না, আর সেভাবেই এ-ছবিকে দেখা ভালো হবে। 


তর্জমা- নবারুণ চক্রবর্তী


প্রকাশের তারিখ: ০৬-নভেম্বর-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org