মেঘে ঢাকা তারা

কুমার সাহানি, সঈদ আখতার মির্জা
ঝড়ের কাছে ঠিকানা গচ্ছিত রেখেছিলেন ঋত্বিক কুমার ঘটক। অজানা সংকটময় পথে হেঁটেছিলেন এবং হাঁটতে হাঁটতে জুড়তে চেয়েছিলেন। ছিন্নমূল হওয়া এবং জুড়ে থাকতে চাওয়ার আকুতি নিয়তই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সৃষ্টি কর্মে। সেই ঝড়ের ঠিকানা-ঠিকুজির খোঁজে রত হয়েছেন দুই পরিচালক সঈদ আখতার মির্জা (জ. ১৯৪৩) ও কুমার সাহানি (১৯৪০-২০২৪)। ঋত্বিক ঘটক এবং তাঁর অসামান্য সৃষ্টি মেঘে ঢাকা তারা প্রসঙ্গে কথা বলেছিলেন তাঁরা। মেলোড্রামা, সংগীত, সুফি ঐতিহ্য,‌ দেশভাগ নানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে তাঁদের কথাবার্তায়। ঋত্বিক ঘটকের জন্মশতবর্ষে সেই কথোপকথন মার্কসবাদী পথ-এ তর্জমাকারে প্রকাশিত হল। ‘গ্রেট মাস্টার’-এর প্রতি রইল মার্কসবাদী পথ-এর শ্রদ্ধার্ঘ্য। আজ প্রথম পর্ব।

সঈদ: কুমার, আমি মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)সম্পর্কে একটা খুব বিস্তৃত প্রশ্ন দিয়ে শুরু করব। মেঘে ঢাকা তারা ছবি-র সাথে আপনার সম্পর্ক কী? 

কুমার: আমার দেখা ঋত্বিকের দ্বিতীয় ছবি। তার আগেই অবিশ্যি ওঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। ঋত্বিক বম্বেতে এসেছিলেন
সুবর্ণরেখা (১৯৬৫) তৈরি করার পর। যদিও মেঘে ঢাকা তারা  তার আগে তৈরি হয়। আমার মনে হয়েছিল, অসাধারণ একটি ছবি। আমি কখনও কল্পনা করতে পারিনি যে ওঁর মতো একজন চলচ্চিত্র পরিচালককে আমরা ভারতে কাজ করতে দেখব। মেলোড্রামার সর্বোচ্চ পর্যায় তাঁরই সৃষ্টি। আমি খুব ইচ্ছাকৃতভাবে এই শব্দ ব্যবহার করছি। আমি সবসময় ভেবে এসেছি যে ‘মেলোড্রামা’ যদি হতে হয়, সেক্ষেত্রে তার চলন ও বিস্তার মহাকাব্যিক।‌ সংস্কৃত ও ইসলামিক প্রভাবের পাশাপাশি ব্রিটিশ প্রভাবও এর সাথে যুক্ত হয়ে গেছে, আধুনিকতা— অতীতকে প্রশ্ন করার ধারা সংযুক্ত হয়েছে। আর, এই ছবির বিষয়বস্তু সম্পত্তি না-থাকা, উপমহাদেশের বিভাজন, যার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষকে রাস্তায় ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভাজন, বিশ্বের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সীমান্ত পারাপার ও স্থানচ্যুতির ঘটনা। 

আমার শৈশবের সময়েই দেশভাগ হয়। আমার বয়স ছিল সাত যখন দেশভাগ হয়েছিল। এই ছবিতে আমি দেখেছি সেই সমস্ত অভিব্যক্তির বাঁক, তার অনুপস্থিতি; যা শরণার্থী হওয়ার কারণে আমাদের ‘হয়ে থাকার’ মধ্যে মূর্ত হয়ে ছিল। কোথায় যাওয়া হবে জানা নেই।

সঈদ: অর্থাৎ, ছিন্নমূল হওয়া?

কুমার: হ্যাঁ, পাশাপাশি স্থিতিশীলতা খুঁজে পাওয়ার জন্য কঠোর প্রচেষ্টা, আর নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার জন্য মূলের অনুসন্ধান। 

সঈদ: ছবির শুরুতেই একটা গাছ। এটা আমায় আরাম দিয়েছিল, গাছটার মধ্যে জীবন আছে। আর নীতা, ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র, সে ইতিহাসের অসহ্য চাপ কাঁধে সহ্য করে হেঁটে চলেছে। 

কুমার: ফিতেহীন জুতো পরে। আপনি জানবেন, ঋত্বিককে কিন্তু কলকাতা প্রত্যাখ্যান করেছিল, গৃহহারা ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই। বারবার তাঁকে যেখানেই থাকুন, বাসস্থান ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়। আর, বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পর থেকে তিনি বারবার মানসিকভাবে পৌঁছে যেতেন ঢাকায়।‌ আমাদের কাছে যখন এসেছেন তখনও ক্রমাগত কেঁদে গিয়েছেন।‌ যখন মেঘে ঢাকা তারা দেখি, তখন এই কান্না আসবেই, সেটাই মেলোড্রামা। 

সঈদ: একটি উদ্বাস্তু পরিবার, বাংলায়। যারা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করার জন্য। একজন স্কুল শিক্ষকের পরিবার, [যিনি] অবসর গ্রহণ করছেন, তাঁর পরিবার, স্ত্রী ও চারজন সন্তান। ক্রমে দেখা যাবে রোজগার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যিনি স্কুল শিক্ষক তাঁর এখন আর কাজ নেই।‌ যে ছেলে গান গাইতে চায়, কার্যত তাকে কোনও সাহায্য করতে পারছে না। ছোটো ছেলে খেলে, তার একটা জুতো দরকার। মা কায়মনোবাক্যে চাইছেন, চেষ্টা করছেন সংসার চালাতে।‌ আর ছোটো মেয়ে (গীতা)- চপলা, কিছুটা ইন্দ্রিয়পরবশ—যে বিদ্যালয়ে ক্রমাগত অকৃতকার্য হয়ে কার্যত পড়াশোনার সাথে সম্পর্কহীন।পরিবারের একমাত্র মেরুদণ্ড ওই মেয়েটি, নীতা। সে চাইছে যাতে সকলের ইচ্ছে ও স্বপ্নের অপমৃত্যু না-ঘটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমস্ত কিছুর জন্যে তাকেই মূল্য দিতে হয়। এটাই কাহিনি। যা পাওয়া গেল সেটা মেলোড্রামা। একে কীভাবে মহত্তর করে তোলা যাবে! এখানেই ঋত্বিক এসে তাঁর বিশেষ শৈলীর মাধ্যমে পুরো বিষয়টিকে চিরায়ত স্তরে তুলে নিয়ে যান। আবহ এবং সঙ্গীতের প্রয়োগ অভিনয় বাস্তবিকতার সীমা ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। শুধু একজন, মুখ্য চরিত্র নীতা, তাকে আগাগোড়া বাস্তবোচিত করে রাখা হয়েছে। যেন তথ্যচিত্রে ধারণ করা বাস্তব। তার চারপাশের মানুষজন, পরিবার, সকলেই তার অনুসরণকারী। বাস্তববাদের অর্থে নয়, বর্ধিত বাস্তববাদ বলা যেতে পারে একে। 

কুমার: একটি দৃশ্য আছে ছবিতে। কলেজ স্ট্রিটে। যাকে বিখ্যাত দৃশ্য বলা হয়। প্রাথমিকভাবে আমি বুঝতে পারিনি কেন এমনটা বলা হয়? কিন্তু সেটা বলা হয় আপনি এখন যেটা বলছেন তার জন্যেই। কলেজ স্ট্রিট তখন এবং এখনও কলকাতার কেন্দ্রে বিরাজ করছে, যেখানে দৃশ্যগ্রহণ প্রায় অসম্ভব। কল্পনা করুন, একটা ৩৫ এমএম ক্যামেরা নিয়ে কলেজ স্ট্রিটে দৃশ্যগ্রহণ, কেউই এই সাহস করেনি। কিন্তু ঋত্বিক এরকম একটা দৃশ্যগ্রহণ করেছেন, একেবারেই তথ্যচিত্রের মতো। সম্ভবত, এর কোনও বিশেষ আখ্যানগত প্রাসঙ্গিকতা-ও নেই, শুধু এটাই যে এটা একটি বাস্তব চিত্র। 

সঈদ: খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক আপনি বললেন। আচ্ছা, আপনার কি মনে হয়, এই বাবার চরিত্রটি ঋত্বিকের আত্মজৈবনিক রূপক হতে পারে? একজন সহায়-সম্বলহীন স্কুল শিক্ষক। 

কুমার: এই চরিত্রটি একজন বাঙালি পুরুষের, যেন মুস্কচ্ছেদন করা হয়েছে তাঁর। ভয়াবহ মন্বন্তরের সময় কেড়ে নিয়েছে সব, মহিলাদেরও। কিন্তু সাধারণভাবে যেমন মাতৃত্বের উদযাপন করা হয়, যে ব্যাপারে এই ছবিও ব্যতিক্রম নয়, তাতে মনে করা হয় যে মন্বন্তরের মূল্যবোধ হয়তো নারী চেতনার নবজাগরণ ঘটাতে পারে। আমার মনে হচ্ছে, মেঘে ঢাকা তারা ছবিতে নারীত্বের নিয়মনীতির একটি বিশেষ ত্রিকোণ দেখানো হয়েছে। একদিকে রয়েছেন, মা, যিনি সাংঘাতিক। ভীতিপ্রদও বটে। কালীর মতো। 

সঈদ: তাঁর ক্রোধ ও হতাশার যদিও কারণ জানানো হয়েছে। 

কুমার: তাঁর সন্তানেরা কুঁকড়ে যাচ্ছে, চাকরির চেষ্টা করে চলেছে। আরেকজন ছেলে বাউল ফকির, সে সারাদিন গান গায়। ঋত্বিকের সমস্ত ছবিতেই বাউল যদিও আছেই। 

সঈদ: সুফি ঐতিহ্য? 

কুমার: পাগলও বটে। অন্যদিকে আরেকজন মহিলা চরিত্র, ছোটো মেয়ে, কিছুটা ইন্দ্রিয়পরবশ।

সঈদ: আবেদনময়ী। 

কুমার: অবিশ্যি এরকম প্রকাশভঙ্গি অতিরঞ্জনের প্রভাব। 

সঈদ: একেবারেই। মেলোড্রামার গুরুত্বপূর্ণ অংশ সেটা। কারণ, এ-ছবি তো বাস্তবিক আখ্যান নয়, বাস্তবিকতার স্তরের থেকে বেশ কিছুটা উপরে তুলে আনা হয়েছে একে। 

কুমার: সংলাপও বেশ কিছু ক্ষেত্রে খেয়ালী, কিঞ্চিত অনিয়মিত। আসলে, এই অভিনয়ের ধারা অনেক বেশি দেখা যায় থিয়েটারে।

সঈদ: মায়ের চরিত্রে ফিরে এলে, ক্রোধ ও হতাশার পাশাপাশি, নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাও প্রতীয়মান হয়। এই মহিলা চরিত্র সবসময়েই চিন্তাগ্রস্ত এই বিষয়ে যে পরিবারের রোজগারের উৎস বন্ধ হয়ে যাবে, তাই তাঁকে সবসময় কৌশল করতেই হচ্ছে। আমরা হঠাৎ শুনতে পাই, জল ফুটবার শব্দ যেন পর্দা চুঁয়ে বেরিয়ে আসছে। শব্দ এখানে হয়ে ওঠে ইঙ্গিতবাহী— চরিত্রের অন্তরে নতুন কিছু‌ সৃষ্টি হচ্ছে। গভীরে গেলে বোধহয় আরও দেখা যায় যে, যখন তিনি ছোট মেয়ে, যার মধ্যে কিছুটা উচ্ছলতা আছে, তাকে বড় মেয়ের বন্ধুকে চা দিতে বলেন, সেখানেও শব্দের ব্যবহার তাৎপর্যপূর্ণ। 

কুমার: প্রথমদিকে ব্যাপারটা আমার ভালো লাগেনি, মনে হয়েছিল খুব বেশি আক্ষরিক। কিন্তু যখন অন্যত্র ব্যবহৃত শব্দের অনুষঙ্গে সংযুক্ত করে দেখা হবে, তখন এর অর্থ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

সঈদ: যখন সে বিশেষ করে হেঁটে বাড়ির বাইরে আসছে— এই ব্যবহারের কিন্তু পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে। 

কুমার: অর্থাৎ, এটা লেটমোটিফ বা কোনও একটি বিশেষ অর্থকরণের উদ্দেশ্য নিয়ে পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে, এমন শব্দ সংকেত। 

সঈদ: দেরি হয়ে গেছে, ফলত বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে তাড়াতাড়ি যাচ্ছে— এবং জলের শব্দ তার ক্ষেত্রেও পুনরাবৃত্ত হচ্ছে। 

কুমার: এছাড়াও বেশ কিছু অন্য যন্ত্রানুষঙ্গের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সেই শব্দগুলোও কথোপকথনরত। জানেন, মেঘে ঢাকা তারা দেখার পর আমি বিশেষ করে গান শিখতে চেয়েছিলাম। 

সঈদ: আমিও। 

কুমার: কিছু সাঙ্গীতিক শব্দের সাথে আমি পরিচিত ছিলাম, যেগুলো ধ্রুপদী গানবাজনার সাথে যুক্ত। তানসেনের বিখ্যাত ‘মিঁয়া কি মল্হার’ ব্যবহার করা হয়েছে এখানে— যে স্বরগুলো ব্যবহৃত হয়েছে এখানে— (গেয়ে শোনান) এই রাগ বৃষ্টির জন্য অপেক্ষার অনুভব জাগিয়ে তোলে। 

সঈদ: হ্যাঁ, যে বৃষ্টি যাবতীয় ক্লেদ ধুয়ে মুছে দেয় এবং পুনরায় উর্বরতা ফিরিয়ে আনে।

কুমার: সেই অনুষঙ্গে কিন্তু মায়ের চরিত্রটি বোঝা যায়। 

সঈদ: আর তারপর, যখন এতটা হতাশা, তখন মেয়েটি বলে ‘দাদা, আমায় একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখাবি?’

কুমার: এটা আরেকটা অসামান্য দৃশ্য। যে কারণে মেঘে ঢাকা তারা মনে গেঁথে থাকে।

সঈদ: সকলের মনে থাকবে এই ছবিতে ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে’ গানটির কথা। 

কুমার: বিশেষ করে গানটিকে আশ্চর্যভাবে ব্যবহার করার কথা— আমি সত্যিই রবীন্দ্র সঙ্গীতের এরকম অন্তহীন গভীরতাপূর্ণ ও যাতনাময় প্রকাশ আগে দেখিনি। 

সঈদ: গানটি অপার শক্তি জোগায় মেয়েটিকে। সে প্রায় ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু গানটা শেখা তাকে পুনরায় গড়ে তুলতে, জুড়ে নিতে সাহায্য করে। 

কুমার: এইটা সম্ভবত নারীসত্তার তৃতীয় আঙ্গিক। এমনকি সে যখন মারাও যাচ্ছে, তখনও। সেটাই ছবির শেষাংশটিকে এত অসম্ভব গতিময় করে তুলেছে। 

সঈদ: আমায় রবীন্দ্রনাথের গান, তার যাত্রাপথ সম্পর্কে কিছু বলুন, তার গান, বিশেষ করে বঙ্গদেশে…

কুমার: নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর সাহিত্য মানচিত্রে প্রথম ভারতের মানুষ যিনি গোটা বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। ইয়েটস তাঁর বন্ধু ছিলেন, এমনকি এজরা পাউন্ড-ও কিছু সময়ের জন্য… 

সঈদ: কিন্তু এই ছবিতে রবীন্দ্র সঙ্গীতের যাত্রাপথ, তাঁর গানের ব্যবহার কী ধরণের? 

কুমার: গানটায় রবীন্দ্রনাথ একটি বিশেষ ধ্রুপদী গড়ন ব্যবহার করেছেন, যার মূল শেকড়টা রয়ে গিয়েছে কাব্যে। 

সঈদ: অর্থাৎ, বাণীতে? 

কুমার: হ্যাঁ, আর, পাশাপাশি যদি দৃশ্যটি আরও একবার দেখেন, চিত্রগ্রহণ দেখবেন তুলনাহীন। 

সঈদ: বিশেষ করে গতিময়তায় প্রশ্নে। 

কুমার: এই যে মাদুরটা রয়েছে, পূর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তুদের যাপিত জীবনের স্মারক…

সঈদ: অর্থাৎ উদ্বাস্তু জীবনের অসম্ভাব্যতার কথা, যেখানে কিছুই নিশ্চিত নয়, যে-ঘর ঝড়ের দাপটে যে কোনও সময়ে উড়ে যেতে পারে। গোটা ছবিটাতেই সেরকম একটা কঠিন বাস্তবতা চিত্রিত করা হচ্ছে, আর সেই পরিস্থিতিতে ঘরটাও বেপরোয়া গড়নের, যা যে কোনও পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকার মানসিকতায় বেড়ে উঠেছে। 

কুমার: আর গানটাও ঝড়ের কথাই বলছে, বলছে আমি জানতে পারিনি, চিনতে পারিনি, কখন তুমি ঝড়ের মতো এলে। আশ্চর্য সুন্দর…

সঈদ: আর, অন্যদিকে গান বলতে আরেকজন ভাইয়ের গাওয়া ধ্রুপদী রাগাশ্রয়ী। কোনও ওস্তাদের কণ্ঠে প্লে-ব্যাক। 

কুমার: ভাইয়ের চরিত্রটায় সম্ভবত ঋত্বিকের আত্ম-উপলব্ধির প্রচেষ্টা জুড়ে আছে। তাঁর উপলব্ধি মনে হয়, সমস্ত কিছুর উৎস খোঁজা, যা পরে ছবিতে যুক্ত করা হবে। 

সঈদ: কিন্তু, কেন সেই ইচ্ছেটা গান শেখার মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে? কেন এই ভঙ্গি? 

কুমার: আমার মনে হয়, তার কারণ ঋত্বিক সীমান্তহীন ও সংযুক্ত একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন। বিশেষ করে বাংলাদেশ (পূর্বতন পূর্ব-পাকিস্তান) ও পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত তিনি স্বীকার করেননি। এ-প্রসঙ্গে ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীত শেখার একটা গভীর তাৎপর্য আছে, যা মধ্য-এশিয়া, আরব ও পারস্যসহ নানা স্থান থেকে বহুকাল ধরে পুষ্টি লাভ করেছে, সুফি ভাবাদর্শ ধ্রুপদী সংগীতের সংলগ্নে গড়ে উঠেছিল। 

সঈদ: একদমই, পশ্চিমা [ইউরোপ-আমেরিকা] দর্শকেরাও ধরতে পারবেন ঋত্বিকের চরিত্রের ধ্রুপদী সংগীত শেখার এই ইচ্ছের সাথে সীমান্তহীন চিরন্তন ঐতিহ্যের যোগাযোগ, ঋত্বিক সম্ভবত প্রচলিত ভারতীয় আধুনিক গানও ব্যবহার করতে পারতেন, কিন্তু তা তিনি করেননি, তাঁর আগ্রহ ধ্রুপদী সঙ্গীতে।

কুমার: মনে হয়, ধ্রুপদী সঙ্গীতের ব্যবহার ভারতের বিভাজনকে প্রশ্ন করতে চায়, এমনকি ঐতিহ্যকে আশ্রয় করে পুনরায় সংযুক্ত করতে চায় বৃহত্তর এশিয়ার সংলগ্নতায়। ধ্রুপদী সঙ্গীত  ও নৃত্য উভয়েই এই উদ্দেশ্যের প্রতি নিবদ্ধ।


তর্জমা— নবারুণ চক্রবর্তী

দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন 


প্রকাশের তারিখ: ০৫-নভেম্বর-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org