এক দলিত কমিউনিস্টের স্মৃতিকথা (পর্ব-৯)

আর বি মোরে
সেই কালে সাধারণ মানুষের বিনোদনের মূল মাধ্যম ছিল তামাশা। সিনেথিয়েটার অতটাও জনপ্রিয় ছিল না। অল্পসংখ্যক মানুষ সেকালে এসব দেখত। আমিও এর আগে মাত্র একবারই থিয়েটার দেখেছি। আমার এক আত্মীয় যে পরে সাধু বনে গিয়েছিল সে আমায় এই একবার বোম্বে থিয়েটারে ললিত কলাদর্শ কিম্বা পাটানকার থিয়েটার কোম্পানির রাজা হরিশ্চন্দ্র পালাখানা দেখাতে নিয়ে যায়।

[কমরেড রামচন্দ্র বাবাজি মোরে (১৯০৩-১৯৭২)। দেখতেন একটা নীল আকাশ ও লাল সূর্যের স্বপ্ন। তাঁর মেমোরিজ অব আ দলিত কমিউনিস্ট  (২০১৯) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে। Dalit Va Communist Chalvalicha Sashakta Duva: Comrade R.B. More [A Powerful Link between Dalit and Communist Movement: Comrade R.B. More] শিরোনামে বইটি ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। মূল মারাঠি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন বন্দনা সোলানকর। সঙ্গে রয়েছে অনুপমা রাওয়ের অসামান্য ভূমিকা। বইটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আছে কমরেড মোরের আত্মকথা, যা আসলে ১৯০৩-২৭ এই সময়ের কথা। তারপরের অংশে রয়েছে তাঁর পুত্র সত্যেন্দ্র মোরের লেখা বাবার জীবনী। দেবরাজ দেবনাথ ইংরাজি থেকেই বাংলা করছেন। ফলত এটি অনুবাদের অনুবাদ। 

প্রশ্ন হল কেন এই স্মৃতিকথা অনুবাদের পরিকল্পনা। যেখানে কমরেড মোরের অসমাপ্ত স্মৃতিকথায় জীবনের সামান্য কিছুদিনের কথাই রয়েছে। আসলে এই সময়ে ভারতের রাষ্ট্র চালাচ্ছে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি। যাদের হাতে সংবিধান আক্রান্ত, আক্রান্ত ভারতের বহুত্ববাদী স্বর। দিনকয়েক আগেই সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আম্বেদকর বিষয়ে মন্তব্য আমাদের সকলেই জানা। এ-পরিস্থিতিতে কমরেড মোরের জীবন-কথা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। কোন অপমান ও পীড়নের মধ্যে একজন দলিত বেঁচে থাকেন, কেমন সে-কাহিনি তাই রয়েছে এ-বইয়ে আর যে-কথা বিস্মৃত হলে প্রকৃত ভারতের খোঁজ অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে। 

কমরেড মোরে ছিলেন দলিত আন্দোলনের সংগ্রামী কর্মী; বাবাসাহেব আম্বেদকরের ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা। কিন্তু কিছুকাল পরে বোম্বের কাপড়-শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সংযোগ এবং কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে আলাপচারিতা তাঁকে প্রণোদিত করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশীদার হতে। কমরেড সতেন্দ্র মোরের সাক্ষ্য জানান দিচ্ছে যে, ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। যা পালটে দেয় জীবনের গতিপথ। অনুভব করেন শোষণ-মুক্তি, দলিতদের লাঞ্ছনা-পীড়ন মুক্তি সর্বপরি মানব-মুক্তির এটাই পথ। সমাজও বিপ্লব না-হলে অস্পৃশ্যতা থেকে মুক্তি নেই। এরপর থেকেই শ্রেণি-শোষণ এবং জাত-শোষণ উভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। কমরেড সত্যেন্দ্র লেখা থেকে আমরা জানতে পারি কী অমানুষিক দারিদ্র্য, কষ্ট যন্ত্রণার মধ্যে জাত ও শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে গেছেন মানুষকে। উজ্জ্বল ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও যে-বালকটিকে স্কুল জীবনে উচ্চবর্ণের শিক্ষক ও বন্ধুদের থেকে শুনতে হত “আমাকে ছুঁইয়ে দিবি না।” ছুঁতে হবে বলে শিক্ষকরা শরীরবিদ্যা ও আঁকার ক্লাস থেকে যে-বালককে বের করে দিত। সে-যোদ্ধার আত্মকথা ছুঁয়ে অপমানে সমান হওয়া অধিকার অর্জন করি আমরা। কমরেড মোরের লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। দীর্ঘজীবী হোক শ্রেণি-জাত-লিঙ্গ শোষণ মুক্তির লড়াই।— মার্কসবাদী পথ]

ওখানে যারা থাকত তার বেশিরভাগ সেনাবাহিনীর কোনও-না-কোনও কাজে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে পয়সা উপার্জন করত। আরও অনেকে ছিল যারা সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, হোয়াইটওয়ে অ্যান্ড লেইডল-এর গুদামে-বিপণিতে, হাসপাতাল আর মেডিকেল স্টোরে কাজ করত। মাসিক ১৫ টাকার বেশি ওরা আয় করত না। সেই সময়েই একজন আমায় এক চাকরির সন্ধান দিল। কাজটা ছিল মাত্র দেড় মাসের, একজনের ছুটির মেয়াদটুকু পূরণ করতে। কিন্তু মাইনে ছিল মাসিক ৪৫ টাকা করে। তবে যে চাকরিটা করবে তাকে ইংরেজি জানতে হবে, ইংরেজিতে লিখতে, পড়তে যাতে সে সড়গড় থাকে। আর ভালো পোশাক পরে আসাটাও ছিল বাধ্যতামূলক। আমাকে যে কাজের খোঁজ দিয়েছিল সে তার সাহিবকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে এমন একজনকে খুঁজে আনবে কাজটার জন্যে যে সব শর্তপূরণ করছে। এক তারিখেই কাজে যোগ দিতে হত। মাঝে সাত-আট দিন বাকি ছিল মাত্র। মূল প্রশ্নটা ছিল ভালো পোশাক কোথা থেকে জোগাড় করব! আমার একটা ধুতি আর কোট ছিল। কিন্তু ইউরোপীয়দের সামনে এতে কল্কে পাওয়া যায় না। আমায় কোট-ট্রাউজার জোগাড় করতেই হত। অবশেষে তা জোগাড় হল এক খানসামার দৌলতে। নির্ধারিত দিনে আমাকে নিয়ে গিয়ে সাহিবের সামনে দাঁড় করানো হয়।সাহিব আমাকে এক অফিসে নিয়ে গেল। সেখানে একটা ছাপা টিকিটের বই দেখাল যা দেখতে অনেকটা রসিদের মতো। উনি আমাকে বোঝালেন কোথায় তারিখ লিখতে হবে সই করে। একটা টেবিলের কাছে আমায় বসিয়ে রাখলেন যার দেরাজে রসিদ-বই আর টাকাপয়সা রয়েছে। টেবিলের বাইরের দিকটায় ছিল একখানা জানালা। সাদা চামড়ার নাবিকেরা জানালার বাইরে দাঁড়াত, পয়সা দিত আর নিজেদের টিকিট কেটে নিত। যারা টিকিট খরিদ করছিল তারা সবাই ছিল সাদা চামড়ার। একজনও হিন্দি বা মারাঠি জানত না। আমার ইংরেজিটাও অতটা ভালো ছিল না। তবু কাজে কোনও ভাঁটা আসছিল না। যখন ওরা জানালার কাছে এসে ইংরেজিতে বলত ‘ওয়ান বেড টিকিট’ কিম্বা ‘ফোর বার টিকিট’, আমি টাকাটা গুনে নিয়ে তাদেরকে টিকিট দিতাম। এইটুকু কাজই ছিল আমার। মোদ্দায়, পড়াশোনায় প্রখর জ্ঞান না-থাকলেও, মজুরির তেমন নিশ্চয়তা না-থাকলেও আমি এক সমুদ্র নাবিকের হিসাবরক্ষকের কাজ জুটিয়ে ফেলেছিলাম। 

আক্কাসহ আমার আত্মীয়রা আমি কাজ জুটিয়েছি বলে আহ্লাদিত হল। নৌসেনার নিয়ন্ত্রণাধীন এক ইউরোপীয় সমুদ্র নাবিকের অফিসে আমি কাজ করতাম। যেখানে এখন মহারাষ্ট্রের বিধানসভা ভবন, সেইখানেই আগে ছিল অফিসটা। আমাদের মতন লোকের দৃষ্টিভঙ্গিতে মাইনেটা শুধু ভালোই ছিল না, রোজ উপরি কিছু রোজগারও হত। ওইখানে জাহাজের খালাসিদের থাকবার বন্দোবস্ত ছিল, ছিল বিয়ারসহ অন্যান্য মদ বিক্রির পানশালা। আমার কাজ ছিল সবাইকে থাকবার কামরার টিকিট, পানশালায় ঢুকবার টিকিট কেটে দেওয়া আর যা টাকা উঠবে তা অফিসারকে হিসাব বুঝিয়ে দেওয়া। থাকবার কামরার টিকিটের দাম ছিল আট আনা। ধরা যাক কোনও নাবিক এক টাকা দিয়েছে টিকিটের জন্যে। আমি বাকি আট আনা ফিরত দিলে উনি যদি তা না- নেন তবে তা টাকা রাখার বাক্সে না-রেখে আমার পকেটে রাখতাম। এ-পরামর্শটা আমায় ওই অফিসেই কর্মরত আরেকটা লোক দিয়েছিল। এই পথে কোনওদিন পাঁচ টাকা, কোনও দিন দশ টাকাও কামাই হত।

  আমার বিশেষ কিছু বন্ধুই খালি জানত যে আমার রোজই কিছু উপরি উপার্জন হয়। এই পয়সাগুলো পরিশ্রম করে পাওয়া না, অসাধু উপায়ে প্রাপ্ত। এই টাকা নিজের কাছে জমিয়ে রাখা পাপ। তাই এই টাকা খরচ করতেই হবে। এই সমস্ত বন্ধুরা বিড়ি ফুঁকত, তামাক মেশানো পান চিবুত, মদ-তাড়ি খেত এন্তার, গাঁজা-ভাঙ খেত। আর এরাই একতারা, খঞ্জনি, ঢোল বাজিয়ে রাত্তির হলেই ভজন গাইত। রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া সেরে নিয়েই আমরা ধোবি তালাও বা ক্রফোর্ড বাজার অঞ্চলের তাড়িখানায় গিয়ে বসতাম। বেঞ্চে তাল ঠুকে কাওয়ালি গাইতাম আর রাতের খাবার সময় হলে হাত দুলিয়ে দুলিয়ে বাড়ি ফিরতাম। প্রায় এক হপ্তা যাবত বাড়ির কেউ এই উপরি উপার্জনের ব্যাপারে জানত না। পরের দিকে ওরা জানতে পারে। তবে ঠিক কত টাকা অতিরিক্ত রোজগার হত তা ওরা জানত না। আমার কলোনির সকলেই আমার বন্ধুদের ভয় পেত, ওদের সঙ্গে বিবাদে যেতে সাহস পেত না।

পরের দিকে, আমার ইংরেজি জ্ঞানের দৌলতে, কিছু হকার আমার বন্ধু হয়ে ওঠে। এরাই আবার ছিল এই প্রদেশের নামজাদা মস্তান। এমনকি আমার মারিআই মন্দিরের বন্ধুরাও ওদের ভয় পেত। যেহেতু বাজারের কসাইদের কেউ কেউই ফেরিওয়ালা আর হকার হত, ওদের উগ্র দেখাত বহিরঙ্গে, অন্তরে যদিও তারা স্নেহবৎসল ছিল। যদি বাজার থেকে অনেকটা দূরে কোনও কাওয়ালি বা রামলীলার অনুষ্ঠান হত, ওরা আমায় নিয়ে যেত সঙ্গে, অনুষ্ঠান মিটলে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিত। আমার আত্মীয়সহ চত্বরের বাকি বাসিন্দারা আমাকে ওদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে নিষেধ করে। কিন্তু আমি কোনও নিষেধের তোয়াক্কা না-করেই, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা চালিয়ে যাই, আগেকার মতোই শহরময় ঘুরে বেড়াই। সবাই বলতে শুরু করে যে আমি বখে গিয়েছি: আমি মাওয়ালি হয়ে উঠেছি।

আমি আমার প্রথম মাইনের ৪৫ টাকা আক্কার হাতে দিয়ে পা-ছুঁয়ে প্রণাম করলাম। বুড়ি হয়েও আক্কাকে রোজ ঘরের বাইরের কাজ করতে যেতে হত দিন গুজরানের জন্যে। ওঁর ছেলে বলে যাকে চিনতাম সে আসলে ওর মৃতা বোনের ছেলে। উনি নিজে যেহেতু নিঃসন্তান ছিলেন, বোনের ছেলেকে নিজের ছেলের মতন যত্ন করতেন। ওকে তিনখানা বিয়ে দেন। নিজের রোজগার করা সমস্ত পয়সা দাশগাঁওতে মামাতো ভাইয়ের হাতে পৌঁছে দিতেন। এই ভাইয়ের সূত্র ধরেই আমি বোম্বেতে আক্কার আস্তানায় এসে উঠি। আমি ওর পা-ছুঁয়ে প্রণাম করি। আক্কা আহ্লাদে আটখানা হয়ে ওঠে। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে হাউহাউ করে। ও ভাবল গোটা মাইনেটা ওর হাতে তুলে দেওয়াটা এক পরম আদরণীয় ব্যাপার। আমি ওকে বলি এর থেকে কুড়ি টাকা আমার খাওয়া খরচা রাখতে, পাঁচ টাকা আক্কা নিজের জন্যে রাখুক, বাকি কুড়ি টাকা দাশগাঁওতে আমার ঘরে পাঠিয়ে দিক। আক্কা আমার কথামত কুড়ি টাকা দেশে পাঠালেও, বড়োবাড়ির লোকেরা সেই টাকা আমার মায়ের হাতে দেয়নি।

আমি বোম্বে আসবার আগে দাশগাঁওতে আমার ঘর ওখানকার নতুন মাহার স্কুলের জন্যে ভাড়া দেওয়া শুরু হয়। ওই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন আমাদের পরিবারের বড়োবাড়িরই একজন। ঘরভাড়ার টাকা মায়ের হাতে পৌঁছানোর আগেই ও নিজের পকেটস্থ করে নিত। আমার স্কলারশিপের টাকা কেড়ে নেবার সময় যে-যুক্তি ওরা দেয়, এখনও নিজেদের পিঠ বাঁচাতে সেই যুক্তিই দেয়। যেহেতু আমি ওদের ভাই, আমার আয়ের টাকা সব দাদারা নেবে, আমার মায়ের ওতে কোনও অধিকার নেই! আমার বোম্বে থেকে পাঠানো টাকার কানাকড়িও ওরা মাকে দিত না। আমি এ-কথা যখন জানতে পারি আমি উপলব্ধি করি যে আমি একজন অনাথ। বড়োবাড়ির লোকেরা আমার প্রতি যে-স্নেহপ্রদর্শন করত তা আদিখ্যেতা আর ভড়ং ছাড়া কিছু না। ওতে আমার মা-বোনের ক্ষতিই হয়েছে কেবল। আমি এটা বুঝতে পারি যে আমি যত যা-ই উপার্জন করি না কেন, যতক্ষণ বড়োবাড়ির সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে সেই টাকা আমার মা-বোনের কোনও উপকারে আসবে না। তাই পয়সা কামিয়ে বড়োবাড়ির লোকেদের পকেট ভরানোর চেয়ে পুণে গিয়ে আরও পড়াশোনা করাটা বরং বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমার মনে পড়ল যে কোথাও একটা পড়েছিলাম যে পুণে শিক্ষালাভের আদর্শ জায়গা। আমার মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। আমার সাময়িক চাকরিখানার মেয়াদ ফুরোলো আর আমি ফের বেকার হয়ে পড়লাম।

আমি বন্দরে যাওয়া শুরু করি কাজের খোঁজে। যদি কেউ কাজ না-পেত, সে জাহাজের কাছে গিয়ে কিছু খাবার জোগাড়ের চেষ্টা করতে পারত অন্তত। হরেক রকমের খেঁজুর, শুকনো ফল, মিঠাই জাহাজে পাওয়া যেত। দু’পাইতে একবেলার গোটা খাবার খেতে পারত কেউ। মাঝেমধ্যে এক দিনের রোজে কেউ কাজ পেতে পারত। কেউ যদি কাজের লাইনে দাঁড়াত, তার সেদিন কাজ না-জুটলেও, সে এক আনা পেত মাস্টার কলে উপস্থিত থাকবার জন্যে। আলেক্সান্দ্রা ডকেই আমি বেশিরভাগ যেতাম। চালের বস্তা গুদামঘর থেকে মাথায় চাপিয়ে জাহাজে চাপাবার ক্রেন অবধি পৌঁছে দিতে হত। এই কাজটার নাম ছিল ‘স্ট্যাম্পিং’। এই কাজে মাঝেমধ্যে লোক দরকার হত, বিশেষত রাতে। বস্তাটা যদি ছোটো হত তাইলে একবারের যাতায়াতে এক পাই দেওয়া হত, মাঝারি সাইজের বস্তায় দুই পাই আর ডাবল সাইজের বা বড়ো বস্তায় এক পয়সা মজুরি দেওয়া হত। এই কুলির কাজ রাতের বেলা পাওয়া গেলে আমি সারারাত জেগে কাজ করতাম আর এক রাতে আট-দশ পয়সা কামাই করতাম। এই টাকা থেকেই আমি মিঠাইওয়ালার পয়সা মেটাতাম, কোনও রেস্তোরাঁয় মাটন কিমা, পাউরুটি খেতাম আর বাকি দু-আনা আক্কার হাতে দিতাম। সেই যুগে একমাসের থাকবার খরচা ছিল পাঁচ টাকা। আমি এইভাবেই সেই পয়সা মেটাতাম। লাইনে দাঁড়িয়ে, সুযোগ পেয়ে ‘স্ট্যাম্পিং’য়ের কাজ করে, রেলস্টেশনে দিনমজুরিতে কুলির কাজ করে আমি নিজের ও আমার থাকার খরচা মেটাতাম। পরে আমি হাজি বন্দরের আর্সেনাল ডিপোতে ‘মার্কার’ হিসাবে কাজ জুটিয়ে ফেললাম। টানা কয়েকমাস বেকার থাকার পরে অবশেষে এই কাজ পেলাম যেখানে মাস গেলে তিরিশ টাকা মাইনে পাওয়া শুরু করি।

কার্নাক বন্দর থেকে হাজি বন্দরগামী পোর্ট ট্রাস্ট বাষ্পচালিত ট্রেনে চেপে অন্যান্য মজুরের সঙ্গে আমিও একত্রে কাজে যেতাম। এর আগে বোম্বে শহর বলতে আমি চিনতাম খালি ধোবি তালাও, ক্রফোর্ড বাজার, প্রিন্সেস ডক, আলেক্সান্দ্রা ডক, কার্নাক বন্দর, বোরি বন্দর, জাদুঘর আর কোলাবা রেলওয়ে স্টেশন।

তবে হাজি বন্দরে কর্মসূত্রে যেতে গিয়ে আমি বোম্বে শহরের অনেক অচেনা জায়গা চিনতে শুরু করি। এর মধ্যে প্রধান ছিল গ্রান্ট রোড আর ফোরাস রোড। পরের দিকে আমি এইসব চত্বরে আরও বেশি করে যাওয়া শুরু করি। এর কারণ ছিল আমার তিনজন নতুন পাতানো বন্ধু সদ্য চালু হওয়া কমলেশ্বর ড্রামা কোম্পানিতে অভিনয় করছিল। ওরা যখন আমায় অনুরোধ করে, আমি সানন্দে রাজি হয়ে পড়ি। নাচগান তো আমার বরাবরই পছন্দের ছিল। 

একবার মাহাদের স্কুলের এক অনুষ্ঠানে আগেভাগে তৈরি করে রাখা বক্তৃতা করেছিলাম মঞ্চে দাঁড়িয়ে। আর দাশগাঁওয়ের স্কুলের হোলি উৎসব চলাকালীন তামাশাতে তাতিয়াবাপুর ভূমিকায় মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। তাই একখানা নাটকে অভিনয় করবার হাতেগরম সুযোগ পেয়ে অত্যন্ত খুশি হই আমি। ড্রামা কোম্পানি ফোরাস রোডে বাতাতিয়াচি চালার কোণে একটা বাড়ির দোতলায় ত্রিকোণাকৃতি একখানা ঘরভাড়া নিয়েছিল। তবলা, হারমোনিয়াম আর অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র ওখানে থাকত। প্রতিসন্ধ্যেয় কাজ সেরে আমি ‘থিয়েটার রুমে’ যেতাম। আমার কাজটাও ছিল আরামদায়ক: হাতে কাজ থাকলে করো, নইলে ঢিলেমি দাও, ক্ষতি নেই। কাজটা ছিল আর্মির প্রয়োজনীয় কোনও চালের বস্তা বা অন্যান্য সামগ্রীর উপরে স্টেনসিল রেখে কালিমাখানো ব্রাশ বুলিয়ে ছাপ লিখে দেওয়া। হপ্তায় তিন-চার দিন এই কাজই চলত। প্রথমে কুলি বস্তা এনে গুমটিতে লাইন করে সাজিয়ে রাখত। এই কাজ যখন চলত আমরা নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করতাম। তারপর শুরু হত মার্কা মারবার কাজ। আমরা যারা মার্কা মারবার লোক ছিলেন, তাদের মধ্যে একতা ছিল ভীষণ। আমরা নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে ঠিক করে নিতাম দিনের দিন কতটা কাজ সারব আর কতটা পরের দিনের জন্যে বাকি রাখব। গুমটিতে মার্কা মারবার লোক ছিলাম আমরা পাঁচজন। একজন ছাড়া বাকি সবাই নাটক ভালবাসত। কাজ মিটিয়ে আমরা থিয়েটার রুমে যেতাম, সেখানে সময় কাটিয়ে তবেই ঘরে ফিরতাম: এই ছিল আমাদের রোজকার রুটিন। কেউ চাইলে সেখানে তবলা, হারমোনিয়াম শিখতে পারত, যদিও আমার কখনও কোনওটাই শেখা হয়নি। ড্রামা কোম্পানির পরিচালক ছিলেন মোরেশ্বর। আমি ওর সম্বন্ধে বিন্দুবিসর্গ জানতাম না, কিন্তু এটা স্পষ্ট মনে হত যে শিল্পের প্রতি ওঁর নিষ্ঠা অতুলনীয়। ওঁর একটা নাটক ছিল মনোবিজয়।এই নাটকে ষড়রিপুকে চরিত্রায়িত করা হয়েছিল- কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ(নেশা), মোহ, মাৎসর্য প্রত্যেকে ছিল আলাদা চরিত্র। এছাড়াও নাটকের আরেকটা চরিত্র ছিল নৈতিকতা। মূল নায়ক যেহেতু লোভ চরিত্রে অভিনয় করছিল না, সেই ভূমিকায় আমি অভিনয় করি। এছাড়াও নৈতিকতার চরিত্রেও আমি অভিনয় করি। নাটক মঞ্চস্থ হবার আগে অবধি রোজ থিয়েটার রুমে মহড়ায় যেতাম।   

আমাদের থিয়েটার ঘরখানা যে বাতাতিয়াচি চালার ভিতরে ছিল, সেই চাউলখানা ছিল সফেদ লেনে (সাদা গলি)। আর এই সফেদ লেন ছিল পতিতালয়ের বিরাট বড়ো ঠিকানা। ওই অঞ্চলের সমস্ত চালাতেই অগুনতি গণিকা ছিল। বাতাতিয়াচি চালার কিছু ঘরে গণিকারা থাকত আর বাকি ঘরগুলোতে তামাশার অভিনেতা ও অন্যান্যরা থাকত। শিবশম্ভা কাভালাপুরকারের তামাশা সেযুগে ছিল নামকরা। বোম্বে আসার আগেও আমি একবার ওদের পালা দেখেছিলাম। আমি দুই ভাইকেই চিনতাম। বিখ্যাত তামাশা গায়ককবি বাপু পাত্থেরাও আর নর্তকী পাভালি-ও ছিল আমার চেনাজানা। এরা বাতাতিয়াচি চালার ঘরভাড়া করেই থাকত। এই দোতলা বাড়িটার রাস্তামুখো জানালা ছিল বাইরের দিকে আর ভিতরের দিকে ছিল বারান্দা, সিঁড়ি আর ঘরগুলোর আলাদা আলাদা দরজা। দোতলার একদম দূরের কোণে ছিল আমাদের থিয়েটারের ঘরখানা। যে মুহূর্তে আমি বাড়িতে পা রাখতাম আর যে মুহূর্তে থিয়েটার ঘরে পৌঁছাতাম, তার মাঝে বেশকিছু ঘর পেরিয়ে যেতে হত যেখানে গণিকারা থাকত। শিবশম্ভা কোম্পানির দখলে থাকা ঘরখানাও রাস্তায় পড়ত। আমরা মাঝেমধ্যে সেখানে থেমে কুশল বিনিময় করতাম। আমাদের আসা যাওয়ার মাঝে কয়েকজন বেশ্যা আমাদের পিছু লাগত, টিপ্পনী কাটত, ঠাট্টা করত। আমার বন্ধুরা আমাকে ওদের গায়ে ঠেলে দিত; আমি যেহেতু ছিলাম বয়সে সবথেকে ছোটো ওরা আমাকে এভাবেই খেপাত। এই পরিবেশের মধ্যে আমি ছোটো হলেও যথেষ্ট সামলাতে থাকতাম। আমার কিছু বয়সে বড়ো বন্ধুরা তো বেশ্যা-মদ দুইয়ের পাল্লা থেকেই গা বাঁচিয়ে চলত।

সেই কালে সাধারণ মানুষের বিনোদনের মূল মাধ্যম ছিল তামাশা। সিনেথিয়েটার অতটাও জনপ্রিয় ছিল না। অল্পসংখ্যক মানুষ সেকালে এসব দেখত। আমিও এর আগে মাত্র একবারই থিয়েটার দেখেছি। আমার এক আত্মীয় যে পরে সাধু বনে গিয়েছিল সে আমায় এই একবার বোম্বে থিয়েটারে ললিত কলাদর্শ কিম্বা পাটানকার থিয়েটার কোম্পানির রাজা হরিশ্চন্দ্র পালাখানা দেখাতে নিয়ে যায়।এই সাধু নিজে আগে একজন গুণ্ডা ছিল। ১৮৯৮ সালের প্রথম হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় যোগ দিয়ে এই সাধু জেল খেটেছিল। পরে উনি ধর্মগ্রন্থ পড়তে শুরু করেন আর তপস্বীর মতন জীবন কাটাতে শুরু করেন। দাশগাঁওতে আমি ওর সঙ্গ পেয়ে বহু বই পড়ি— হরিবিজয়, রামবিজয়, ভাগবত, শিবলীলামৃত, আগমনিগম, মহাভারতের গল্প। এর পাশাপাশি রোজ পুজো করতাম আর দু-ঘণ্টা করে ধ্যানমগ্ন থাকতাম। আমি পাণ্ডুরাগ স্তোত্র, ভেঙ্কটেশ স্তোত্র, ১০১ মন্ত্র মন থেকে জানতাম। এই সাধুই আমাকে এই থিয়েটার পালা দেখায়। এই সময়েই আমি জীবনে প্রথম ফোনোগ্রাফিক রেকর্ড শুনি: ‘বোম্বের টিকিট আমায় কেন কেউ দেবে না?’ সেকালে ফোনোগ্রামের রেকর্ডকে লোকে বলত ব্যাঙ্গাদিচা বাজা, বালাবাজিয়ে; এ ছিল নতুন চমক। একজন ফোনোগ্রামের সামনে বসে ফানেল কানে লাগিয়ে গান, বাজনা, সুরে মেতে যেত। এইভাবেই আমি আমার জীবনের প্রথম রেকর্ড করা গানটা শুনি।

 

টীকা 

ব্রিটিশ অফিসার আর বণিকেরা মাহারদের প্রায়ই খানসামার কাজে নিযুক্ত করত।  

রাজা হরিশ্চন্দ্র ছিল এক মারাঠি সিনেমা, বলা হয় এটিই প্রথম সিনেমা, ১৯১৩ সালে তৈরি।   

 

অনুবাদ ও টীকা- দেবরাজ দেবনাথ 


প্রকাশের তারিখ: ১১-মে-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org