|
এক দলিত কমিউনিস্টের স্মৃতিকথা (দ্বিতীয় পর্ব)আর বি মোরে |
এরা নিজেদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কর্তব্য একনিষ্ঠভাবে পালন করত মনুস্মৃতি অনুসরণ করে, আর এদের চোখের সামনেই ছিল পেশোয়া রাজের কালে অস্পৃশ্যদের সঙ্গে কী ব্যবহার করতে হয় তার উদাহরণ। সেই সব দিনে অস্পৃশ্যদের পাথরের বাড়ি বানানো বা ছাদে টাইলস বসানোর অনুমতি টুকু ছিল না, এবং নাগরিকত্বের অসংখ্য অধিকার তাদের আয়ত্তের বাইরে ছিল। |
[কমরেড রামচন্দ্র বাবাজি মোরে (১৯০৩-১৯৭২)। দেখতেন একটা নীল আকাশ ও লাল সূর্যের স্বপ্ন। তাঁর মেমোরিজ অব আ দলিত কমিউনিস্ট (২০১৯) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে। Dalit Va Communist Chalvalicha Sashakta Duva: Comrade R.B. More [A Powerful Link between Dalit and Communist Movement: Comrade R.B. More] শিরোনামে বইটি ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। মূল মারাঠি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন বন্দনা সোলানকর। সঙ্গে রয়েছে অনুপমা রাওয়ের অসামান্য ভূমিকা। বইটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আছে কমরেড মোরের আত্মকথা, যা আসলে ১৯০৩-২৭ এই সময়ের কথা। তারপরের অংশে রয়েছে তাঁর পুত্র সত্যেন্দ্র মোরের লেখা বাবার জীবনী। দেবরাজ দেবনাথ ইংরাজি থেকেই বাংলা করছেন। ফলত এটি অনুবাদের অনুবাদ। প্রশ্ন হল কেন এই স্মৃতিকথা অনুবাদের পরিকল্পনা। যেখানে কমরেড মোরের অসমাপ্ত স্মৃতিকথায় জীবনের সামান্য কিছুদিনের কথাই রয়েছে। আসলে এই সময়ে ভারতের রাষ্ট্র চালাচ্ছে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি। যাদের হাতে সংবিধান আক্রান্ত, আক্রান্ত ভারতের বহুত্ববাদী স্বর। দিনকয়েক আগেই সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আম্বেদকর বিষয়ে মন্তব্য আমাদের সকলেই জানা। এ-পরিস্থিতিতে কমরেড মোরের জীবন-কথা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। কোন অপমান ও পীড়নের মধ্যে একজন দলিত বেঁচে থাকেন, কেমন সে-কাহিনি তাই রয়েছে এ-বইয়ে আর যে-কথা বিস্মৃত হলে প্রকৃত ভারতের খোঁজ অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে। কমরেড মোরে ছিলেন দলিত আন্দোলনের সংগ্রামী কর্মী; বাবাসাহেব আম্বেদকরের ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা। কিন্তু কিছুকাল পরে বোম্বের কাপড়-শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সংযোগ এবং কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে আলাপচারিতা তাঁকে প্রণোদিত করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশীদার হতে। কমরেড সতেন্দ্র মোরের সাক্ষ্য থেকে জানান দিচ্ছে যে, ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। যা পালটে দেয় জীবনের গতিপথ। অনুভব করেন শোষণ-মুক্তি, দলিতদের লাঞ্ছনা-পীড়ন মুক্তি সর্বপরি মানব-মুক্তির এটাই পথ। সমাজও বিপ্লব না-হলে অস্পৃশ্যতা থেকে মুক্তি নেই। এরপর থেকেই শ্রেণি-শোষণ এবং জাত-শোষণ উভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। কমরেড সত্যেন্দ্র লেখা থেকে আমরা জানতে পারি কী অমানুষিক দারিদ্র্য, কষ্ট যন্ত্রণার মধ্যে জাত ও শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে গেছেন মানুষকে। উজ্জ্বল ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও যে-বালকটিকে স্কুল জীবনে উচ্চবর্ণের শিক্ষক ও বন্ধুদের শুনতে হত “আমাকে ছুঁইয়ে দিবি না।” ছুঁতে হবে বলে শিক্ষকরা শরীরবিদ্যা ও আঁকার ক্লাস থেকে যে-বালককে বের করে দিত। সে-যোদ্ধার আত্মকথা ছুঁয়ে অপমানে সমান হওয়া অধিকার অর্জন করি আমরা। কমরেড মোরের লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। দীর্ঘজীবী হোক শ্রেণি-জাত-লিঙ্গ শোষণ মুক্তির লড়াই।— মার্কসবাদী পথ] প্রথম পর্বের পর আমি যখন বললাম যে আমার বাবা দুর্বিপাকে পড়েছেন, তাতে আমি বোঝাতে চাইলাম আগে যে ধনসমৃদ্ধি ছিল তার জীবনে তা তিনি হারিয়েছেন। তিনি হয়ে পড়েন এক গরিব কৃষক যার কাছে নিজেরটুকু চালিয়ে নেবার মতন জমিজমা ছিল। নিজের জমিতে চাষাবাদের মাধ্যমে পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হন উনি। এইভাবে আমার জীবনের আট-নয় বছর কেটে যায়। তারপর এক সুদখোরের প্রতারণার শিকার হয়ে, উনি ওনার সবটুকু নিজস্ব জমি হারান। মহাজনটি মিষ্টিকথায় ভুলিয়ে বাবাকে দিয়ে এক সাদা কাগজে সই করিয়ে নেয়, আর তারপর সেই সাদা কাগজে লিখে বসে যে আমার বাবা তার যাবতীয় জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন। মহাজনটি হয়ে বসে জমির মালিক আর আমার বাবা, জমির পূর্বতন মালিক, হয়ে পড়েন সামান্য প্রজামাত্র। অনিবার্যভাবে, জমির মালিকের মর্জির উপর নির্ভর করে যে বাবা সেই জমিতে ঠিকাপ্রজা হিসাবে চাষের কাজ করে যেতে পারবেন কি না, আর সবশেষে আশঙ্কাটাই সত্যি হয়। একদিন মহাজন বাবাকে জমি থেকে চিরকালের জন্যে খেদিয়ে দেয় আর বাবা বাধ্য হয় জমিহারা খেতমজুরের কষ্টকর জীবনে বাঁচতে। বাবার মৃত্যুর দুই তিন বছর আগে এই ঘটনা ঘটে। কারো পক্ষেই কল্পনা করে ওঠা মুশকিল যে এটি তার জীবনে কী বিধ্বংসী ধাক্কা ছিল! আমার যখন পাঁচ ছয় বছর বয়স আমি দাসগাঁওয়ের মারাঠি স্কুলে পড়তে শুরু করলাম।২ সেই সময়ে, সম্পূর্ণ কোঙ্কন উপকূলজুড়ে দাসগাঁও ছাড়া দলিতদের জন্যে কোনো গ্রামে মারাঠি স্কুল ছিল না। ব্রিটিশ শাসন টেলিগ্রাফ মেশিন, রেল ও ধনতান্ত্রিক বিশ্বের কারখানা নিয়ে এলো, এক নতুন শ্রমিক শ্রেণির জন্ম হল আর বোম্বের মতন নতুন শহরও গড়ে উঠল। ঘোষণা করা হল যে শিক্ষায় সকলের সমসুযোগ রয়েছে, কিন্তু মহারাষ্ট্রে, অন্তত কোঙ্কন অঞ্চলে, অস্পৃশ্য সমাজের মানুষের শিক্ষালাভের ন্যূনতম জায়গা তৈরি হল না। ব্রিটিশ প্রশাসনের চরম মাত্রা হিসাবে জুড়ল সাদা চামড়ার জেলা কালেক্টর আর পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট। কালেক্টরের হাতেই প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালিত হত। জেলা কালেক্টরের অধস্তনরূপে তেহসিল-স্তরের মামলেদার, মুন্সিফ আর অসংখ্য অন্যান্য অফিসার কাজ করত। কিন্তু এরা সকলেই ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী উচ্চ বর্ণ ও শ্রেণির লোক। এরা নিজেদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কর্তব্য একনিষ্ঠভাবে পালন করত মনুস্মৃতি অনুসরণ করে, আর এদের চোখের সামনেই ছিল পেশোয়া রাজের কালে অস্পৃশ্যদের সঙ্গে কী ব্যবহার করতে হয় তার উদাহরণ। সেই সব দিনে অস্পৃশ্যদের পাথরের বাড়ি বানানো বা ছাদে টাইলস বসানোর অনুমতি টুকু ছিল না, এবং নাগরিকত্বের অসংখ্য অধিকার তাদের আয়ত্তের বাইরে ছিল। এর অর্থ জেলার আসল ক্ষমতা বর্ণবাদীদের করায়ত্ত ছিল যখন প্রবঞ্চক শ্বেতবর্ণ বিদেশিরা অস্পৃশ্যতাকে খাতির করে জিইয়ে রাখে। গ্রামের স্কুলগুলিতে সকলের জন্যে অবারিত দ্বার বলে ঘোষণা করলেও অস্পৃশ্য শিশুরা আদতে ক্লাসঘরে বসতে অবধি পারত না; শিক্ষার দরজা ছিল তাদের জন্য বন্ধ। কোঙ্কনে যে অল্পসংখ্যক অস্পৃশ্য শিশুকিশোর পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলে তা মিলিটারিতে থাকবার দৌলতে। অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের ছেলেরা পুণে, বোম্বে, সাতারা’র মতন বড়ো শহরে যেত স্কুলে পড়তে। অস্পৃশ্য শিশুদের পড়বার সুযোগ দেয় এমন একমাত্র স্কুলখানি ছিল দাশগাঁওতে, এখনও তাই : অন্য কোত্থাও নয়। দাশগাঁওয়ের এই স্কুলটিতেই আমার বড়দা পড়াশোনা করে, শিক্ষক হয় আর আমার জন্মের আগেই মারাও যায়। আমার বাবার চার মামাতো ভাই এই স্কুলে পড়ে পরে শিক্ষকতার পেশা বাছে। আমি যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করি তখনও ওরা শিক্ষকতা করত। ওদের মাসিক মাইনে ছিল সাত টাকা, পরে তা বেড়ে হয় এগারো টাকা। দাশগাঁও আর দাশগাঁও-এর স্কুলটি এত গুরুত্ব পেতে শুরু করে কারণ গ্রামটি ছিল ছোটো ছোটো নৌকোর বন্দর। চারিদিকে ঘিরে ছিল খাঁড়া পাহাড়, দুরারোহ পর্বত। সেগুলি ঢাকা ছিল ঘন জঙ্গলে। বাঘসহ নানাধরনের বুনো জন্তু অধ্যুষিত ছিল সে জঙ্গল। ভীর দাশগাঁও সমেত, গ্রামদুটিতে মাহার সম্প্রদায়ের ঘনবসতি ছিল। ফলত, তাদের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্ব ও একতার ভাব ছিল ব্যাপক। কোনও বিপদের মুখোমুখি হলে, তার মোকাবিলায় এক ডাকে এক দুই শো লোক কাস্তে-কুড়ুল হাতে জড়ো হয়ে পড়ত অনায়াসে। জোটবদ্ধ এই গ্রামে, সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি ছিলেন আমার বাবার মামা ভিত্তল যোশী, বাবার সমবয়সী। জ্যোতিষশাস্ত্র আর পঞ্জিকার ব্যাখ্যা করা ছিল ওনার বংশগত পেশা। তার পাশাপাশি আধুনিক মারাঠি লিপি ও প্রাচীন মোদি লিপি দুয়েতেই তিনি ছিলেন সমান স্বচ্ছন্দ। বন্ধকীর দলিল আর জমির হস্তান্তর সংক্রান্ত পড়চা মোদি লিপিতে লিখে তিনি উপার্জন করতেন। পরবর্তীতে বনাঞ্চলের অন্যতম বড়ো ঠিকাদার হয়ে ওঠেন উনি। মিলিটারির মাহার কর্মকর্তাদের মধ্যে ওনার নাম চলতি ছিল। দাপোলি সেনাশিবির থেকে কোনো অবসরপ্রাপ্ত অফিসার বা সেনাদের কেউ পুণে, বোম্বে বা অন্য কোনো সেনাশিবিরে যেতে চাইলে, দাশগাঁওয়ের উপর দিয়েই তাদের যেতে হত। ফেরি বা হাঁটাপথে কাউকে কোথাও যেতে হলেও দাশগাঁওতে আসতেই হত। তাদের জন্যে আর পদব্রজে ভ্রমণকারী মাহারদের জন্যে, দাশগাঁওয়ের যোশীবাড়ি ছিল বিশ্রামের ঠাঁই। বাইরে থেকে আসা অতিথিরা এ-বাড়িতে যত্ন পেত। বোম্বের সঙ্গে দাপোলি সেনা ক্যাম্পের মাঝে দাশগাঁও হয়ে উঠল এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগবিন্দু। পাশাপাশি দাশগাঁও হয়ে ওঠে দাপোলির সেনাদের অবসর-পরবর্তী জীবনের ঠিকানা। দাশগাঁওতে আঞ্চলিক একতা আগে থেকেই ছিল, আর এখন সহনিবাসী উচ্চপদস্থ সেনাকর্তাদের সমর্থন থাকায়, কারোর দাশগাঁওয়ের সঙ্গে যুঝবার সাহস রইল না, ওরা যেটুকু অধিকার আদায় করেছিল তা কেড়ে নেবার ধকটুকু কারও রইল না। দাশগাঁওয়ের মাহার সম্প্রদায় ধর্ম আর পরম্পরার বেড়াজাল ভেঙে বড়ো বাড়ি বানায়, পরনের ভালো কাপড় আর অলঙ্কার ব্যবহার শুরু করে। তারা স্কুলশিক্ষা লাভ করে আর উঁচু সরকারি পদে চাকরি অর্জন করে। এই সকলের রহস্য লুকিয়ে আছে উপরের বর্ণনাতে। প্রকাশের তারিখ: ১২-জানুয়ারি-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |