তলস্তয়ের স্মৃতিকথা

ম্যাক্সিম গোর্কি
তলস্তয় মৃত। এসে পৌঁছল একটা টেলিগ্রাম। খুবই সাধারণ দুটি শব্দ লেখা: 'মৃত'। আর এই শব্দ দু'টো একেবারে আমার হৃদয়ের অন্তস্থলে গিয়ে ঘা দিল। দুঃখে-যন্ত্রণায় আমি কেঁদে ফেললাম। একেবারে অর্ধ উন্মাদের মতো হয়ে গেলাম। যেমনটা ওঁকে আমি জেনেছিলাম, যেমনটা দেখেছিলাম, সেভাবেই ওঁকে কল্পনা করতাম। ওঁর সঙ্গে কথা বলার প্রবল একটা ইচ্ছে আমাকে একেবারে মথিত করতে লাগল। কল্পনা করলাম, উনি কফিনে শায়িত, একটা স্বচ্ছ জলধারার বুকে মসৃণ পাথরের মতো শুয়ে রয়েছেন, ওঁর সেই শ্বেতশ্মশ্রু, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই রহস্যমাখা স্মিত হাসিটুকু মনে পড়ল। শেষবারের মতো হাত দুটোকে শান্তিতে ভাঁজ করে রাখা। কত সব কঠিন কাজই না করেছে ওই দুই হাত। এবার সব কাজের পালা শেষ হল।
মুখবন্ধ


লিও নিকোলায়েভিচ তলস্তয়ের সঙ্গে ম্যাক্সিম গোর্কির দেখা হয়েছিল ক্রিমিয়ায়। গোর্কি তখন থাকতেন ক্রিমিয়ার ওলেইসেতে। তলস্তয় থাকতেন গ্যাসপ্রা‌-য়। সেই সময়টা তলস্তয় গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। পরে সেরে ওঠেন। সেই পর্বে তলস্তয়ের সঙ্গে কথাবার্তা গোর্কি লিখে রেখেছিলেন একগুচ্ছ আলগা কাগজে। আরও পরে, একসময় তাঁর মনে হয়েছিল সেগুলি হারিয়ে গেছে। তবে সেই সব নোটের একাংশ খুঁজে পান। সঙ্গে ছিল তাঁর লেখা একটা দীর্ঘ, অসমাপ্ত চিঠি। ইয়াসনায়া পলিয়ানা থেকে তলস্তয়ের ‘‌চলে যাওয়া’‌ এবং তাঁর মৃত্যু– এসব ঘটনার প্রভাবে চিঠিটি লিখেছিলেন গোর্কি। সেগুলির আর কোনওরকম সম্পাদনা করতে চাননি তিনি। এই স্মৃতিকথা প্রথমে রুশ ভাষায় প্রকাশিত হয়।  পরে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এস এস কোটেলিনায়স্কি এবং লিওনার্ড ভলফ। ‘‌রেমিনিসেন্সেস অফ লিও তলস্তয়’‌ নামে বইটি ইংরেজিতে ১৯২০ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় নিউ ইয়র্ক থেকে। প্রকাশক B.W.Huebsch,INC.MCMXX। সেই স্মৃতিচারণের কিছু নির্বাচিত অংশের ভাষান্তর এখানে প্রকাশিত হল। 


গোর্কির নোটস থেকে

১ 

অন্য সবকিছুর চেয়ে যে চিন্তাটা খুবই প্রকটভাবে এবং প্রায় সর্বক্ষণ তাঁর ভিতরটা কুরে কুরে খেয়ে ফেলছিল, সেটা হল ঈশ্বর সংক্রান্ত চিন্তা। কখনও কখনও মনে হত বোধ হয় চিন্তাটা ঈশ্বর-সংক্রান্ত নয়। বিষয়টা সম্পর্কে তিনি যতটা বলতে ভালবাসেন তার চেয়েও কম বলেন। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে তাঁর ভাবনাটা সর্বক্ষণের। এই চিন্তাকে আদৌ তাঁর বার্ধক্যের  লক্ষণ– বা আসন্ন মৃত্যুর প্রাক্‌চেতনা– এমনটা বলা যাবে না। না, এই চিন্তা তাঁর মাথায় আসে তাঁর সূক্ষ্ম মানবিক অহংবোধ থেকে। তাছাড়া আরও কিছুটা আসে– একটা পরাজয়ের গ্লানি বোধ থেকে: ‌কারণ, তিনি যেহেতু লিও তলস্তয়, তাই তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের পক্ষে সামান্য একটা ব্যাকটেরিয়ার কাছে নিজের ইচ্ছাশক্তির আত্মসমর্পণ– এটা গ্লানিকর ব্যাপার তো বটেই। যদি তলস্তয় বিজ্ঞানী হতেন, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তিনি সবচেয়ে প্রতিভাদীপ্ত কোনও প্রকল্প উন্মোচিত করতেন, দারুন সব আবিষ্কার করতেন। 

ওঁর দুটো হাত ছিল দেখার মতো– সুন্দর নয়, বরং ফুলে ওঠা শিরাগুলো ছিল গিঁটপাকানো, তবু তারই মধ্যে থেকে হাত দুটো ছিল অসাধারণ ভাবব্যঞ্জক এবং সৃজনশীলতার শক্তির দ্যোতক। সম্ভবত লিওনার্ডো দা ভিঞ্চির হাত দুটো ছিল এরকমই। এমন হাতের অধিকারী হলে যে কেউ যা খুশি করে ফেলতে পারে। অনেক সময়, কথা বলতে বলতে, উনি হাতের আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করতেন, ক্রমশ ধীরে ধীরে আঙুলগুলিকে গুটিয়ে এনে হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করতেন, এবং তারপর, হঠাৎ করেই মুঠি আলগা করে দিতেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠতেন একটা চমৎকার, পুরোমাত্রায় ভাবগম্ভীর কোনও শব্দ। তিনি ঠিক যেন একজন দেবতা, বাইবেলের স্বর্গের দ্বাররক্ষক বা মাউন্ট অলিম্পাসের দেবতা নন, অনেকটা রুশ দেবতার মতো যিনি ‘‌সোনালি লাইম গাছের নীচে মেপল পাতার সিংহাসন’‌-এ বসে রয়েছেন। ততটা রাজকীয় নন, তবে সম্ভবত অন্য আর সব দেবতার চেয়ে অনেক বেশি চতুর। ‌



মনে আছে একবার তিনি আমায় বলেছিলেন:‌ ‘‌বুদ্ধিজীবীরা হল সেই প্রাচীন গ্যালিসিয়ান রাজপুত্র ভ্লাদিমিরকো-র মতো। দ্বাদশ শতাব্দীতে ভ্লাদিমিরকো বেশ সদর্পেই ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমাদের এই যুগে অলৌকিক বলে কিছু নেই।’‌ তারপর কেটে গেল ছটা শতাব্দী। সেই থেকে সব বুদ্ধিজীবীই পরস্পরকে বলে চলেছেন, ‘অলৌকিক বলে কিছু নেই, অলৌকিক কিছু ঘটার নেই।’ অথচ সেই দ্বাদশ শতাব্দীতে যেমন, তেমনি এখনও লোকে অলৌকিকের ওপর বিশ্বাস হারায়নি।’‌

‘খুব কম সংখ্যক লোকই মনে করে যে, তাদের একজন ঈশ্বরের দরকার কারণ তারা আর সবকিছুই পেয়ে গেছে। আর বেশিরভাগ লোকের একজন ঈশ্বরকে দরকার হয় কারণ তাদের কিছুই নেই।’‌ কথাটা ঠিক এভাবেই আমাকে বলেছিলেন তলস্তয়। তবে আমি কথাটা অন্যভাবে বলব। অধিকাংশ লোক ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস রাখে, কারণ তারা কাপুরুষ কিংবা ভীরু। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ঈশ্বরকে খুব কম লোকই বিশ্বাস করে। 

তুমি বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ পড়ো, আমায় পরামর্শ দিলেন তিনি। বৌদ্ধধর্ম এবং খ্রিষ্ট বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি সব সময়ই সেন্টিমেন্টাল হয়ে পড়তেন। যখন খ্রিষ্টের কথা বলতেন, তখন সর্বদাই বিষয়টার মধ্যে ছিল অদ্ভূতরকম দীনতা– কোনও উদ্দীপনা নেই, তাঁর ব্যবহৃত শব্দগুলোর মধ্যে কোনও অনুভূতি নেই, সত্যিকারের কোনও আগুনের ঝলক নেই। মনে হয়, যীশুকে উনি মনে করতেন খুবই সাদামাটা একটা লোক এবং কৃপার পাত্র। যদিও মাঝে মাঝে তিনি খ্রিস্টের প্রশংসা করতেন, তবে তাঁকে আদৌ ভালবাসতেন বলে মনে হয় না। দেখে মনে হত, বিষয়টা নিয়ে তিনি তেমন স্বচ্ছন্দ নন। যেন খ্রিষ্ট যদি রুশিয়ার গ্রামে যেতেন তাহলে তাঁকে দেখে মেয়েরা ঠাট্টা করত।

তলস্তয়কে দেখলেই আমার মনে পড়ে সেই সব তীর্থযাত্রীদের কথা, যাঁরা লাঠি হাতে হেঁটে চলেছেন এই পৃথিবীতে, এক মঠ থেকে আরেক মন্দিরে, একজন সন্তের স্মৃতিস্তম্ভ থেকে অন্যের স্মৃতিস্তম্ভে, হেঁটে চলেছেন কয়েক হাজার মাইল, নির্দয়ভাবে আশ্রয়হীন এবং এই বিশ্বের সব মানুষ ও সব জিনিসের কাছেই তাঁরা যেন অন্য গ্রহের লোক। এই বিশ্ব সেই সব তীর্থযাত্রীদের জন্য নয়, এমনকী ঈশ্বরও তাঁদের জন্য নন। ঈশ্বরের কাছে এঁদের প্রার্থনটা নিছক অভ্যাসের বশে, কিন্তু অন্তরের অন্তঃস্থলে গোপনে এঁরা ঈশ্বরকে ঘৃণা করেন– প্রশ্ন করেন, কেন তিনি তাঁদের পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন? কীসের জন্য? ‌মানুষেরা যেন তাদের চলার পথের সামনে পড়ে থাকা কাটা ধানের গোড়া, শিকড় কিংবা পাথর। কেউ কেউ তাতে হোঁচট খান। কখনও কখনও পড়ে গিয়ে সেই সব বাধায় আঘাত পান। ওঁদের ছাড়া লোকেদের চলে যেতে পারে। কিন্তু কখনও কখনও নিজের সঙ্গে তাঁদের তফাৎ, বা নিজেদের তুলনায় তাঁদের পার্থক্যটা হঠাৎ করে চোখে পড়ে গেলে মানুষ বিস্মিত না হয়ে পারে না। এবং সেই আবিষ্কারটাও একটা সুখানিভূতির মতো।

১৭

একবার উনি আমাকে তাঁর ডায়েরি পড়তে দিয়েছিলেন। সেখানে একটি আশ্চর্য সূত্র আমাকে বেশ নাড়িয়ে দিয়েছিল। সূত্রটা এরকম, ‘ঈশ্বর হলেন আমার আকাঙ্ক্ষা’‌। আজ ডায়েরিটা ওঁকে ফেরত দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কথাটার মানে কী। উনি বললেন, ‘একটা অসমাপ্ত ভাবনা।’‌ এরপর পৃষ্ঠাটির দিকে তাকিয়ে, চোখ কুঁচকে বললেন, ‘অবশ্যই আমি বলতে চেয়েছি: আমার আকাঙ্ক্ষা হল ঈশ্বরকে জানা। ...না, ঠিক তা নয়।...’ এরপরেই উনি হাসতে শুরু করে ডায়েরিটা টিউবের মতো সরু করে গুটিয়ে নিজের বিশাল পকেটটায় রেখে দিলেন। ওঁর সঙ্গে ভগবানের সম্পর্কটা বেশ সন্দেহজনক। অনেক সময় আমার মনে হয় ঈশ্বর ও তলস্তয়ের সম্পর্কটা যেন ‘একই গুহার মধ্যে দুটি ভালুক।’‌

২১

সাইপ্রেস ‌গাছগুলোর ছায়ায় একটা পাথরের বেঞ্চে উনি বসেছিলেন। খুব রোগা হয়ে গেছেন। তাঁকে ছোটখাটো, পাকা মাথার একটা লোকের মতো দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে উনি যেন জিহোভা সাবাওথ। একটু ক্লান্ত। একটা চ্যাফিনচ পাখির সুরে সুর মিলিয়ে শিষ দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ঘন পাতার অন্ধকারে বসে পাখিটা সুরেলা শিষ দিচ্ছিল। উনি একবার তাঁর তীক্ষ্ণ চোখ দুটি কুঁচকে ওপরে তাকালেন, এবং শিশুর মতো ঠোঁটটা বেঁকিয়ে শিষ দিতে লাগলেন। তবে শিষটা মোটেই জমছিল না। 

‘কী তেজি এই পাখিটা, না! মনে হয়, প্রচণ্ড রেগে আছে। আচ্ছা, কী পাখি এটা?’

চ্যাফিনচ পাখি কেমন সেটা ওঁকে বোঝালাম আমি। বললাম, ‘পাখিটা স্বভাব‌-হিংসুটে’‌।

‘সারা জীবন একটাই গান গেয়ে চলেছে ও,অথচ তবুও হিংসুটে’‌,  বললেন উনি। ‘আর মানুষের হৃদয়ে আছে হাজারো সঙ্গীত। তবু মানুষের বিরুদ্ধে ঈর্ষাপরায়ণতার অভিযোগ ওঠে’, ভাবতে ভাবতে বললেন কথাটা। ‘এটা কি অন্যায় বিচার নয়?’, যেন নিজেকেই নিজে কোনও প্রশ্ন করছেন। বলে চললেন উনি, ‘এক একটা মুহুর্ত আসে যখন একজন পুরুষ একজন নারীকে এমন সব কথা বলে ফেলে যে সেই নারীর ততটা না জানলেও চলত। পুরুষ বলে আর ভুলে যায়। কিন্তু নারী সব মনে রাখে। সম্ভবত নিজের আত্মার অধঃপতনের ভীতি থেকে আসে ঈর্ষা, না কি আসে অপমানিত ও লোকচক্ষে হয়ে হয়ে ওঠার ভয়ে? যে নারী তার কামনা‌-বাসনা দিয়ে একটা পুরুষকে শক্ত মুঠিতে ধরে রাখে সেই নারী ততটা বিপজ্জনক নয়। কিন্তু যে নারী পুরুষের আত্মাকে বজ্রমুঠিতে ধরে রাখে সেই বেশি বিপজ্জনক...’‌ 

যখন আমি ওঁকে বললাম ওনার ‘ক্রয়েটজার সোনাটা’‌ উপন্যাসে এই দ্বন্দ্বের বিষয়টা রয়েছে, তখন হঠাৎ এক ঝলক হাসি ঘন গোঁফদাড়ির ভেতর থেকে ফুটে উঠল ওঁর মুখে, এবং বললেন,

‘আমি চ্যাফিনচ নই।’‌ 

ওই দিনই বিকেলে হাঁটার সময় হঠাৎই বলে উঠলেন, 

‘ভূমিকম্প, মহামারি, রোগের আতঙ্ক, আত্মার সব যন্ত্রনা পার হয়ে যায় মানুষ। কিন্তু সবসময়েই তার সবচেয়ে যন্ত্রণাকর ট্র্যাজেডি হচ্ছে এবং হবেও– বেডরুমের ট্র্যাজেডি।’‌ 

এই বলে একটা বিজয়ীর হাসি হাসলেন। এক এক সময় উনি এমন একটা মানুষের মতো চওড়া, স্নিগ্ধ হাসি হাসেন যে দেখে মনে হয় উনি যেন বেশ কঠিন কোনও কিছু জয় করে এসেছেন কিংবা তীক্ষ্ণ, দীর্ঘ যন্ত্রনাদায়ক কোনও ব্যথা থেকে রেহাই পেয়েছেন। প্রতিটি ভাবনা ওঁর হৃদয়ে কাঁটার মতো গভীর গর্ত খুঁড়ে চলে। কখনও কখনও তিনি তৎক্ষণাৎ কাঁটাটাকে উপড়ে ফেলেন, নয়ত রক্তের মধ্যে কাঁটাটাকে চলতে দেন। এরপর যখন কাঁটার কাজ ফুরিয়ে আসে তখন আপনা থেকেই সেটা পড়ে যায়। 

একবার আমার ও সুলারের কাছে উনি ‘ফাদার সের্গেই’‌-এর ‌একটা দৃশ্য পড়ে শোনান। খুবই নির্মম দৃশ্য, ফাদার সের্গেইয়ের অধঃপতনের দৃশ্য। 

শুনে তো সুলার অস্বস্তির সঙ্গে মুখ বেঁকিয়ে ছটফট করতে লাগল।

‘কী ব্যাপার, লিভুশকা। পছন্দ হয়নি বুঝি?‌’‌ জানতে চাইলেন লিও নিকোলায়েভিচ। 

‘খুবই নিষ্ঠুর, পাশবিক। যেন দস্তয়েভস্কির লেখা। নোংরা মেয়েছেলে, বুক দুটো প্যানকেকের মতো। ফাদার পাপটা যখন করলই তখন কেন এক সুন্দরী, স্বাস্থ্যবতী নারীর সঙ্গে করল না?’‌

‘তাহলে তো পাপটার কোনও ন্যায্যতা থাকবে না। এখানে মেয়েটির জন্য দয়া দেখানোর তবু একটা ন্যায্যতা আছে। ওর মতো মেয়েকে কে কামনা করবে?’

‘আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না...’‌

‘লিভুশকা, যেটা তুমি বুঝে উঠতে পারছ না সেটাই খুব বড় ব্যাপার। তুমি ঠিক ধূর্ত নও....’‌

এরই মধ্যে এসে পড়লেন আন্দ্রেই লোভিচের স্ত্রী। এবং কথাবার্তায় ছেদ পড়ল। উনি এবং সুলার চলে গেলে লিও নিকোলায়েভিচ আমাকে বললেন, ‘আমার জানা সবচেয়ে খাঁটি লোক হল লিওপোল্ড। ওর টাইপটাও ওরকম— যদি ও খারাপ কিছু করে ফেলে জানবে তাহলে সেটা করবে কারোর প্রতি ওর দয়া দেখানোর তাগিদ থেকে।’‌ 


গোর্কির অসমাপ্ত চিঠির অংশ‌

লিও তলস্তয় মৃত। এসে পৌঁছল একটা টেলিগ্রাম। খুব সাধারণ দুটি শব্দ তাতে লেখা ‘মৃত’‌।

শব্দ দুটো একেবারে আমার হৃদয়ের অন্তস্থলে গিয়ে ঘা দিল। দুঃখে–যন্ত্রণায় আমি কেঁদে ফেললাম। একেবারে অর্ধ উন্মাদের মতো হয়ে গেলাম। যেমনটা ওঁকে আমি জেনেছিলাম, যেমনটা দেখেছিলাম, সেভাবেই ওঁকে কল্পনা করতাম। ওঁর সঙ্গে কথা বলার প্রবল একটা ইচ্ছে আমাকে একেবারে মথিত করতে লাগল। কল্পনা করলাম, উনি কফিনে শায়িত, একটা স্বচ্ছ জলধারার বুকে মসৃণ পাথরের মতো শুয়ে রয়েছেন, ওঁর সেই শ্বেতশ্মশ্রু, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই রহস্যমাখা স্মিত হাসিটুকু মনে পড়ল। শেষবারের মতো হাত দুটোকে শান্তিতে ভাঁজ করে রাখা। কত সব কঠিন কাজই না করেছে ওই দুই হাত। এবার সব কাজের পালা শেষ হল। 

মনে হল ওঁর সেই অন্তর্ভেদী দুই চোখের দৃষ্টি। চোখ দুটো যেন সবকিছুর একেবারে অন্তঃস্থলে গিয়ে দেখতে পেত। ওঁর হাতের আঙুলের সেই নাড়াচাড়া, মনে হত সবসময় যেন তিনি শূন্যে একটা কিছু নির্মাণের প্রয়াসে ব্রতী, ওঁর কথাবার্তা, ওঁর ঠাট্টা ইয়ার্কি, পছন্দের সব চাষাড়ে শব্দ, কীরকম একটা মন্ত্রমুগ্ধ করা, আচ্ছন্ন করে ফেলা কণ্ঠস্বর। আমি দেখতে পেলাম কী বিপুল এক জীবনীশক্তির আধার ছিলেন মানুষটি, এতটাই চালাক যে কোনও মানুষ তার ধারেকাছে যেতে পারবে না, কী ভয়ংকর।

একবার ওঁকে এমন একটা রূপে দেখেছিলাম আর কোনও মানুষ সম্ভবত সে ভাবে তাঁকে দেখেনি। গ্যাসপ্রায় সমুদ্রের তীর ধরে একবার ওঁর সঙ্গে হাঁটছিলাম। ইউসোপোরের এস্টেট পিছনে ফেলে বেলাভূমিতে পাথরের ফাঁকে ফাঁকে হাঁটছিলাম আমরা। ধূসর, কুঁচকে যাওয়া, অতি পুরনো একটা স্যুটে ঢাকা ওঁর ছোট্ট, নুয়ে পড়া শরীরটা। মাথাতেও একটা তোবড়ানে টুপি। দুহাতে মাথা, মুখ ধরে উনি বসেছিলেন। হাতের আঙুলের ফাঁক দিয়ে বাতাস খেলা করে যাচ্ছিল ওঁর রুপোলি শ্মশ্রুর ভেতর দিয়ে। অনেক দূরে সমুদ্রের দিকে নিবদ্ধ ছিল তাঁর দৃষ্টি। সবুজেটে ঢেউগুলো যেন একেবারে অনুগত হয়ে এসে ওঁর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ছিল। যেন কানে কানে কিছু বলছিল তাদের প্রিয় লিও নিকোলায়েভিচকে, যেন সেই বৃদ্ধ যাদুকরের কাছে চুপি চুপি উজাড় করে দিচ্ছিল তাদের সুখদুঃখের কথা। 

আকাশে মেঘ ও সূর্যের লুকোচুরি খেলা চলছিল সেই দিন। মেঘের ঘন ছায়া ঝুঁকে পড়ছিল পাথরগুলোর ওপর। ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছিল তারা। বিশাল বিশাল বোল্ডার চারপাশে ছড়ানো, স্রোত আর হাওয়ার ধাক্কায় একেবারে ফুটিফাটা। সেগুলোর গায়ের শ্যাওলা থেকে উঠে আসছিল সমুদ্রের আঁশটে গন্ধ। আর সমুদ্রে তখন জোয়ার এসেছে। আমার মনে হল, টলস্টয় যেন সেই প্রাচীন পাথরগুলোর একটা যা  হঠাৎ করে জীবন্ত হয়ে উঠেছে, যিনি জানেন এই জগতের সব জিনিসের শুরু ও শেষ কোথায়, যেন উনি জানেন এই সব পাথরগুলির শেষ পরিণতি কী হবে এবং কখন হবে, যেন জানেন এই পৃথিবীর সব ঘাসকে, সমুদ্রের জলকে, জানেন এই ছোট্ট নুড়িপাথর থেকে বিশাল সূর্যটাকে পর্যন্ত। এই সমু্দ্র যেন তাঁরই সত্ত্বার অংশ, চারপাশে যা কিছু রয়েছে সবকিছুর উৎস তিনিই, সব কিছুই যেন তাঁরই মধ্যে থেকে সৃষ্টি হয়েছে। সেই বৃদ্ধ তখন পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল, গভীর চিন্তায় ডুব দিয়েছেন। তাঁর এই মূর্তি দেখে আমার হৃদয়ে কেমন যেন একটা  নিয়তিচালিত, রহস্যময় অনুভূতি জেগে উঠল, সেই অনুভূতি প্রথমে তাঁর পায়ের নীচের সমুদ্রের গভীরের অন্ধকারে হারিয়ে গেল, তার পরমুহূর্তেই একটা সার্চলাইটের তীক্ষ্ণ রশ্মির মতো মাথার ওপরের নিঃসীম নীলিমায় ছড়িয়ে পড়ল। মনে হল যেন তিনি, তাঁর তীব্র ইচ্ছাশক্তিই, ঢেউগুলোকে তাঁর পায়ের কাছে ডেকে আনছে , আবার পরমুহর্তেই ফিরিয়ে দিচ্ছে। ওঁর সেই তীব্র ইচ্ছাশক্তিই যেন মেঘ ও ছায়াকে শাসন করছে, যেন সেই ইচ্ছাশক্তি পাথরগুলোর মধ্যে ধীর লয়ে প্রাণসঞ্চার করছে। হঠাৎ করে মুহূর্তের পাগলামি পেয়ে বসল আমাকে। হঠাৎ অদ্ভুত এক ভাবনা আমাকে অস্থির করে দিল। মনে হল,  ‘হ্যাঁ, সম্ভব। উনি উঠে বসবেন, ‘‌তিষ্ঠ’‌ বলে চেঁচিয়ে উঠে হাত নাড়াবেন সমুদ্রের দিকে চেয়ে , আর তখনই স্তব্ধ কাচের মতো হয়ে যাবে এই চঞ্চল সমুদ্র, পাথরগুলো নড়ে উঠতে শুরু করবে,ওদের গলায় স্বর ফুটবে, আর ওরা চিৎকার করে নানা কণ্ঠে নিজেদের কথা, ওঁর কথা, ওঁর বিরুদ্ধে সব কথা বলতে শুরু করবে।’‌ আমি ঠিক বোঝাতে পারব না সেই মুহূর্তে আমার আমার অনুভূতিটা ঠিক কেমন ছিল। আমার মনের মধ্যে একই সঙ্গে বয়ে চলেছিল আনন্দের ধারা ও ভয়ের স্রোত, এবং তারপর সবকিছু ছাপিয়ে হৃদয় ভরে উঠল এক অনাস্বাদিত সুখানুভূতির ভাবনায়। আমার মনে হল, ‘‌এই পৃথিবীতে যতদিন এই মানুষটা বেঁচে থাকবেন ততদিন আমি নিরাশ্রয় হবো না।’‌


ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ০৮-ডিসেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org