|
খসে পড়েছে মোদীর অজেয় ভাবমূর্তি (শেষ পর্ব)অচিন বনায়েক |
|
মোদী নিজে এক অত্যন্ত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যক্তিত্ব, যিনি কখনই, কীভাবে একটা জোট সরকার চালাতে হয় কিংবা অভ্যন্তরীণ ইস্যুতেও সমঝোতা করতে হয়, সেই দক্ষতা দেখাননি (দেখানোর দরকারও পড়েনি)। গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন, যেখানে বিজেপি-র ক্ষমতা ছিল চূড়ান্ত, সেখানে তিনি একচ্ছত্র রাজত্ব চালিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে, যেহেতু তাঁরই দলের একক গরিষ্ঠতা ছিল, তাই এনডিএ-র অন্য দলগুলিকে কার্যত তিনি তুচ্ছতাছিল্য করেছেন। তাছাড়া, মোদী হিন্দুত্বের প্রকল্পের প্রতি চূড়ান্তভাবে একনিষ্ঠ। তিনি সব সময় নিজেকে আরএসএসের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। যদিও বিজেপি সহ হিন্দুত্বপন্থী সমস্ত সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের, অর্থাৎ সঙ্ঘ পরিবারের, মাথায় রয়েছে আরএসএস। মোদী ইচ্ছাকৃতভাবেই চেয়েছেন আরএসএসের শীর্ষ নেতৃত্বকে সংযত রাখতে এবং নিজের এবং তাঁর সহযোগী অমিত শাহের অধীনস্থ করে রাখতে। অমিত শাহেরও নিজস্ব কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আরএসএস ও বিজেপির মধ্যে এখন অনেক বেশি বিক্ষোভ ও সংঘাত দেখা দেবে। এমনকী বিজেপির মধ্যেও মোদীর জোরালো অনুগামী এবং তাঁর অনুগামী নয়, এমন দু’পক্ষের মধ্যে সংঘাত তৈরি হবে। এখন এটা দেখার বিজেপি এবং এনডিএ-র মধ্যে নানা ধরনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ও সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণাম কী হয়। এছাড়া আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে নানান টানা পড়েনের, ঘাত প্রতিঘাতের পরিণাম কী দাঁড়ায় তাও দেখতে হবে। হিন্দুত্বের অ্যাজেন্ডা তাহলে এই অবস্থায় স্বল্প ও মাঝারি সময়পর্বের জন্য, সরকার পক্ষ কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে বলে আমরা আশা করতে পারি? সরকার কতদূর পর্যন্ত আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে?কোন্ কোন্ উদ্যোগকে সরকার পক্ষ আরও সতর্কভাবে নেওয়া উচিত বলে মনে করবে? নাকি ভেবে নেবে এসব ক্ষেত্রে আরও ধীর গতিতে চলা দরকার? নাকি যতক্ষণ না তারা মনে করবে যে পরিস্থিতি তাদের পক্ষে অনুকূল হয়ে উঠেছে, স্থায়ীভাবে বিষয়গুলি আটকে রাখবে? এখন বিজেপির হিন্দুত্ব প্রকল্পের লক্ষ্য কী হবে তা আমরা সংক্ষেপে এভাবে বলতে পারি: ১) নির্বাচনে যারা প্রতিযোগী তাদের সবাইকে নিশ্চিহ্ন করা এবং অধীনস্থ করে ফেলা, ২) গণতন্ত্র ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলিকে কুরে কুরে খেয়ে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলা, ৩) বিরোধিতার ইচ্ছা ও পরিসরকে সঙ্কুচিত করে ফেলা, ৪) মতাদর্শগতভাবে মিডিয়া এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে সমসত্ত্ব করে তোলা যাতে জনমানসে হিন্দু জাতীয়তাবাদ গেড়ে বসে, ৫) মুসলমান নাগরিকদের সন্ত্রস্ত, আতঙ্কিত করে তুলে ঘেটোয় আটকে রাখা। তাঁদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা এবং রাজনৈতিকভাবে অনুগত করে তোলা। প্রথম লক্ষ্যটা এখন দারুণভাবে ধাক্কা খেয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এর মানে হল, বিজেপি ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যকে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলতে এপর্যন্ত যতদূর অগ্রসর হয়েছে, এর পরেও সেই লক্ষ্যে আরও কিছু করে ফেলাটা আরও কঠিন। বিজেপির আরও কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষাও এখন থমকে গেছে। সংসদের দুই কক্ষে তাদের পক্ষে যথেষ্ট সংখ্যক সাংসদ নেই, ফলে এই পর্বে মোদী সরকার এক দেশ, এক নির্বাচন ব্যবস্থা পাস করিয়ে নিতে পারবে, এমন সম্ভাবনা নেই। এই ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় নির্বাচন ও রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনগুলি একসঙ্গে সেরে ফেলার কথা। যদিও অনেক দেরি হয়ে গেছে, তবুও জনগণনা করতে হবে। তবে একইসঙ্গে প্রতিটি ব্যক্তি সম্পর্কে বিশদে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য ন্যাশনাল পপুলেশান রেজিস্টার (এনপিআর) প্রকল্পের কাজ জনগণনার সঙ্গে করতে গেলে তা আরও বেশি বাধার সামনে পড়বে। একবার এনপিআর করা হয়ে গেলে, তার পরেই তৈরি হয়ে যাবে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস (এনআরসি)। মূলত এর লক্ষ্য হল একদল ‘সন্দেহজনক নাগরিক’ তৈরি করা যাদের নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণের যথেষ্ট প্রামাণ্য নথি নেই। অবশ্যেই ‘সন্দেহজনক নাগরিক’দের একটা বড় অংশ হবেন মুসলমানেরা। এরপর শুরু হবে ‘অবৈধ’ অধিবাসী কারা তা নির্ধারণের আইনি প্রক্রিয়া। সেটা চিহ্নিত করা হলে তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হবে এবং তাঁদের দীর্ঘকাল ধরে বন্দি শিবিরে রেখে দেওয়া হবে। সেখানে তাঁদের জোর করে কাজ করতে বাধ্য করা হতে পারে। এই পুরো কাঠামো তৈরির কাজ, যার মধ্যে প্রথমে বেশ কয়েকটি বন্দি শিবির নির্মাণের কথা, সেগুলি আগের সরকারের আমলেই শুরু হয়েছে। তবে সম্ভবত এই প্রক্রিয়াটি এখন গতি হারাবে কিংবা কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখা হবে। কারণ অনেকগুলি অ-বিজেপি রাজ্য সরকার এর বিরোধিতা করেছে। নির্বাচনের মুখে এই ধরনের বিরোধিতা আরও জোরদার হবে। গণতান্ত্রিক শাসনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করে ফেলার প্রক্রিয়ার কথা ধরলে, গত ১০ বছরে, বিজেপি এধরনের শাসনে যে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থাগুলি থাকে সেগুলিকে প্রবলভাবে নষ্ট করে ফেলেছে। এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভারত রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামো ও অঙ্গগুলির আপেক্ষিক স্বাধীন ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশন (কমিশন এই ভোটের সময় লজ্জাজনকভাবে বিজেপির হয়ে কাজ করেছে) এবং কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রের ওপরের দিকগুলিকে ইতিমধ্যেই অনেকটা নিজেদের অধীন এনে ফেলেছে বিজেপি। বেশির ভাগ আঞ্চলিক দল, তাদের সংকীর্ণ ভৌগোলিক এলাকাগত গুরুত্বকে নজর দিতে গিয়ে, এর আগে এসব বিষয়ে যা কিছু ঘটছিল তার বিরুদ্ধে আদৌ তেমনভাবে মুখ খোলেনি। অসাংবিধানিক যে পরিবর্তনগুলি ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নাটকীয়ভাবে বদলে দিয়েছে, নানা মাত্রায় জাতীয় কংগ্রেস ও অন্য দলগুলি তা মেনে নিয়েছে (এবং তারা সেগুলিকে চ্যালেঞ্জ করবে না)। এই পরিবর্তনগুলি হল কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল, বাবরি মসজিদ ধ্বংস নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে নেওয়া, এবং সেই জায়গায় রাম মন্দির প্রতিষ্ঠাকে মেনে নেওয়া। সিএএ মেনে নেওয়া, যা কি না এই প্রথম (মুসলমান মানুষের বিরুদ্ধে) ধর্মীয় বৈষম্যের নীতিকে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত একটি আইনে পরিণত করেছে। আদর্শগত সাদৃশ্য হিন্দুত্বের অ্যাজেন্ডার তৃতীয় বিষয়টি হল, পুলিশ, অন্যান্য নিরাপত্তাবাহিনী ও তদন্ত এজেন্সিগুলির পরিকল্পিত রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। বিরোধীদের শায়েস্তা করার জন্য সরকার এদের কাজে লাগিয়েছে। বিরোধী দলের নেতা থেকে নাগরিক সমাজের সংগঠন, সরকারি নীতির সমালোচক গোষ্ঠী এবং বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি, সবার বিরুদ্ধেই এদের কাজে লাগানো হয়েছে। জুলাই থেকে যে নতুন ফৌজদারি আইন চালু হওয়ার কথা তা ভারতকে আরও বেশি করে পুলিশ রাষ্ট্র করে তুলবে। বিজেপির নতুন শরিকেরা এই আইনগুলির বিরোধিতা করবে না। আমদের দেখতে হবে এগুলির বিরুদ্ধে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া ব্লক গণ জমায়েত ও প্রতিরোধ গড়ে তুলবে কিনা। যে সব মিডিয়া সরাসরি সরকারের মালিকানাধীনে ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেগুলি ছাড়া বাকি গণমাধ্যমে হাতে গোনা কয়েকটা বৃহৎ মিডিয়া হাউজেরই আধিপত্য খাটে। এই বৃহৎ মিডিয়া হাউজগুলির নিজেদের অসংখ্য টিভি চ্যানেল এবং মুদ্রিত সংবাদপত্র রয়েছে। আর্থিক এবং অন্যান্য নানা কারণে সংবাদমাধ্যমের বড় খেলোয়াড়েরা মোদী সরকারের ঘনিষ্ঠ। অন্যদিকে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যে সব ছোট মাপের পুঁজিপতিরা রয়েছেন তাঁরা বুঝে গেছেন টিকে থাকার জন্য সরকারি বিজ্ঞাপন তাঁদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক মিডিয়াগুলিকে এবং তাদের মালিকদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে আঞ্চলিক দলগুলি। কিন্তু তারা কত টাকাই বা দিতে পারে? হিন্দুত্বের ধারণা অনুযায়ী স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়স্তরে শিক্ষাগত পাঠক্রম বদলে দেওয়া হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সামনের সারিতে রয়েছে বামপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন ও শিক্ষকেরা। নরম হিন্দুত্বের ভঙ্গি বজায় রাখায় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউনিয়নগুলি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং এবিষয়ে তাদের প্রতিরোধ খুবই এলোমেলো। কয়েকটি মাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া, বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব তৈরি করতে পারে এমন কোনও দলিত ছাত্রগোষ্ঠী নেই। জাতীয় স্তরে আরএসএস ও বিজেপির নেতৃত্বাধীন ছাত্র ও শিক্ষক ফেডারেশনগুলিই অনেক বড় ও অনেক বেশি শক্তিশালী। নতুন সরকার জোটভিত্তিক। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে যে নীতি নিয়ে এতদিন চলছিল বিজেপি, তাতে কোনো বাধা পড়বে বলে মনে হয় না। ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলি মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মুসলমান ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বড়সড় দাঙ্গা করার বিষয়টি এড়িয়ে গেছে বিজেপি। তবে এই নিয়মের ব্যতিক্রম হল উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্য মণিপুর। সেখান সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিস্টান কুকি-জো পাহাড়ি উপজাতিদের বিরুদ্ধে হিন্দু এবং অ-খ্রিস্টান মেইতেই আদিবাসী গোষ্ঠীর নির্মম হামলায় মদত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার। বাড়ি তৈরি ও চাষবাস বাড়ানোর জন্য আরও বেশি পাহাড়ি জমি দখলের লক্ষ্যে এই হিংসা ঘটানো হয়েছে। একই সঙ্গে লক্ষ্য হল, অরণ্যভূমির খনিজ সম্পদ লুঠ করা। তবে এই সব উপজাতিগুলির আত্মীয়তা রয়েছে কাছাকাছি থাকা ভারতের খ্রিস্টান সংখ্যাগুরু রাজ্যগুলির সঙ্গে, রয়েছে সীমান্তের ওপারের মায়ানমারের খ্রিস্টানদের সঙ্গে। এর ফলে পাল্টা লড়াইয়ের জেরে রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা তৈরি হয়েছে। এটা কোনও বিস্ময়ের ব্যাপারই নয় যে, মণিপুরের দু’টি লোকসভা আসনই জিতেছে কংগ্রেস। কোনও না কোনওভাবে মণিপুর ইস্যু-র সমাধান করতে হবে। হয় গণনির্যাতনের মধ্যে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে নতুবা নানান ছাড় দিয়ে কেন্দ্রকে সমঝোতার পথ খুঁজতে হবে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে মুসলমানদের ওপর বড় আকারের হিংসা এখন ঘটানো হয় না। তার বদলে নিয়ম করে ছোট আকারে হিংসা ও হেনস্থা করা চলছে। কখনও কখনও তা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তখন একটা অস্বাভাবিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রশাসন তৎপর হয়। এবং এমন সব পদক্ষেপ নেওয়া হয় যেগুলিতে দোষীদের মদত দেওয়াই হয় লক্ষ্য, এবং আক্রান্তদের কোনও নিরাপত্তা দেওয়া হয় না। এই ছক কার্যকর করার ফলে স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যে একটা স্থায়ী ভীতির আবহাওয়া তৈরি করা হয় এবং তাতে মুসলমানদের আরো বেশি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সঙ্ঘের সংগঠনগুলি তাদের এই পরীক্ষিত পথ ধরেই চলবে। তবে এবার বিজেপির বিরুদ্ধে মুসলমানেরা দলে দলে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ায় তার একটা সত্যিকারের প্রভাব পড়েছে। মুসলমানদের স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন রাখার জন্য বিজেপি প্রস্তুত। এবং তাদের কাছ থেকে ভোটও চায় না। আসলে বিজেপির মতার্দশের মূল কথা এটাই। তবে সরকারে শরিক আঞ্চলিক দলগুলির দৃষ্টিভঙ্গী এমন নয়। ইন্ডিয়া ব্লকের দলগুলির অবস্থান এমন নয়। তারা একদিকে নরম হিন্দুত্বের পথে চলে। অন্যদিকে মুসলিমদের নিরাপত্তা ও সমর্থনের আশ্বাস দেয়। বিজেপি ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে বিভিন্ন শক্তির যে নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠছে, তাতে হিন্দুত্বের গড়েও মুসলিম সম্প্রদায় কিছুটা স্বস্তি পাবে। সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপির বিদ্যমান আধিপত্যকে সবচেয়ে বেশি যা বিপন্ন করে তুলতে পারে এবং তাদের পাশার দান উলটে দিতে পারে, সেটা এমন একটা বিষয় যাকে ধরাছোঁয়া শক্ত। নতুন সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীন গণ প্রতিরোধ কত দূর পর্যন্ত গড়ে উঠবে? ‘স্বাধীন’ বলা হচ্ছে কারণ, বিরোধী দলগুলি তাদের ছোট ছোট পরিসরের স্বার্থ এবং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষকার কারণে নানাভাবে বিভক্ত। তবে গণবিক্ষোভ থেকে সরে থাকা তাদের পক্ষে কঠিন হবে। কারণ বিক্ষোভগুলি তো কোনও দলের তৈরি নয়, এবং বিজেপি সরকার সেগুলিকে স্রেফ কুৎসা করে নির্মূল করতে পারবে না। এই ধরনের গণ অভ্যুত্থান কি খুব ঘন ঘন, বড় আকারে হবে? একথা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায় যে, ভারতের অর্থনীতির যা দশা তাতে বড় আকারে গণবিক্ষোভ বাড়বে এবং তা ফেটে পড়বে। যদিও মোদী কিছু সুবিধা বিলি করার চেষ্টা করবেন, তবে কাঠামোগত ঘাটতি থেকেই যাবে। যদি ভোটে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত, তবে ২০২১ সালের কৃষক বিক্ষোভ সরকারের যে নীতিকে ঠেকিয়ে দিয়েছিল, বিজেপি সেটা চালু করত। তবে তা করত আরো ধীরগতিতে ও ধাপে ধাপে। এর মানে হল, অধিকাংশ জমির মালিকানা অল্প সংখ্যক লোকের হাতে গিয়ে কেন্দ্রীভূত হবে। এর ফলে চুক্তি চাষ বাড়বে এবং কৃষি উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও কৃষি পণ্যের খুচরা ব্যবসা চলে যাবে কর্পোরেটের হাতে। এই পরিকল্পনা ধরে এগোলে ভারতীয় কৃষির মূল সমস্যার কোনও সমাধান হবে না। সেই সংকট হল, কৃষিক্ষেত্র থেকে আসে জিডিপির ১৪ শতাংশ অথচ দেশের মোট কর্মক্ষম লোকের অর্ধেকেরই আয়ের মূল উৎস কৃষি। এটা মোটেই স্পষ্ট নয় যে, কোনও পুঁজিবাদী সংস্কারের পদক্ষেপ কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে। ভারত এখনও সেই দেশ যেখানে রয়েছে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অপুষ্টিতে ভোগা নাগরিক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, গণতান্ত্রিক ফ্রন্টে, আমরা কিছু আশার আলো দেখতে পারি এই ঘটনা থেকে যে, হিন্দুত্বের শক্তি যে হারে সামনের দিকে এগোচ্ছিল এবং তাতে যেভাবে মনে হয়েছিল অনিবার্যভাবে সেই শক্তি এগিয়েই যাবে, সেই গতি থমকে গেছে। যারা মোদী সরকারের বিরোধিতা করতে তৈরি তাদের সামনে থেকে ভীতি প্রদর্শন, আইনি হেনস্থা ও শাস্তির ভয়ের সাধারণ রাজনৈতিক ছায়াটা একেবারে অদৃশ্য হয়ে যায়নি বটে, তবে তা কিছুটা হলেও হাল্কা হয়েছে। নাগরিক স্বাধীনতার ক্রমবর্ধমান ক্ষয় এবং স্বৈরতন্ত্রের দিকে একটানা গতিকে সাময়িকভাবে আটকে দেওয়া গেছে। এখন লিবারাল গণতান্ত্রিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করার একটা সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ কাজে লাগানো যায়। এবং একে কাজে লাগাতে হবে। যত দ্রুত এই অভিমুখে গতি সৃষ্টি করা যাবে, ততই সঙ্ঘ পরিবারের মতো সবচেয়ে বিপজ্জনক, অতি দক্ষিণপন্থী শক্তির বিরুদ্ধে ভারতের রাজনৈতিক সমাজের প্রতিরোধ ক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে জোরদার করার সুযোগ বাড়বে। সম্পাদিত ও সংক্ষেপিত ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস ঋণ: জ্যাকোবিন প্রকাশের তারিখ: ২৪-জুন-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |