|
মেলায় টাকা ওড়ে, ফেরে না পরিযায়ীরাচন্দন দাস |
রাজ্যের ‘মাইগ্র্যান্ট ওয়েলফেয়ার বোর্ড’-এর চেয়ারম্যান সামিরুল ইসলাম। তিনি তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ। তাঁকে যখনই প্রশ্ন করা হয়েছে, তিনি বলেছেন রাজ্যের পরিযায়ীর সংখ্যা ২৩ লক্ষ ৪০ হাজার। কিন্তু অন্য কথা বলেছেন মমতা ব্যানার্জি। মুখ্যমন্ত্রী ২০২৪-এর গত ৪ সেপ্টেম্বর আবাসন এবং নির্মাণ শিল্পের সংগঠন ক্রেডাইয়ের রাজ্য সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘৫০ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের তালিকা দিয়ে বিশেষ অ্যাপ তৈরি করছি।’ |
জানুয়ারিতে সাগর মেলা। সেই উপলক্ষ্যে সুন্দরবনের সাগর দ্বীপের কয়েকটি জায়গা সাজাবে রাজ্য সরকার। রকমারি আলো দেবে, প্ল্যাকার্ড লাগাবে। মুখ্যমন্ত্রীর মুখের ছবিও থাকবে। শুধু এই সাজানোর জন্য বরাদ্দ কত? ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। সাগর দ্বীপের ঘোড়ামারার কথা অনেকেরই জানা। ক্রমশ ভাঙছে। চারটি মাত্র বুথ। পাঁচজন মাত্র ঘোড়ামারা পঞ্চায়েতের সদস্য। ভোটার? তৃণমূলের নেতা, পঞ্চায়েতের উপপ্রধান সঞ্জীব সাগর জানালেন, ‘৩৬০০ মতো ভোটার ছিলেন। কিছু বাদ যাবে এবার। বিয়ে করে চলে গিয়েছে... এমন আর কি।’ আর পরিযায়ী শ্রমিকরা? উপপ্রধান বললেন, ‘কাজ নেই তো। পাঁচশোর বেশি পরিযায়ী আছেন আমার দ্বীপে। বেশিরভাগ কেরালায় কাজ করেন। মেলার সময় তাঁদের অনেকেই আসতে পারে না।’ সাগর মেলার জন্য কয়েকটি জায়গা সাজাতে সরকার খরচ করবে ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। বিপরীতে শুধু ঘোড়ামারাতেই পরিযায়ী শ্রমিক পাঁচশোর বেশি। গোটা সাগর ব্লকে সেই সংখ্যা কয়েক হাজার সন্দেহ নেই। তাঁদের ঘর সাজাতে সরকার কী করেছে? এর জবাব একটু পরে খোঁজা যাক। তার আগে সরকারের আরও কিছু ‘জনকল্যাণ’ দেখা যাক। রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর ২০১৮ থেকে শারদোৎসবে ‘সেরা পুজো’ বেছে পুরস্কার দেয় আয়োজক ক্লাবগুলিকে। সরকারের টাকায় দামি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ২৪টি গাড়িতে লোক লস্কর নিয়ে সরকারের পছন্দের প্রতিনিধিরা প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে ‘সেরা পুজো’ বাছেন। কত খরচ হয়? চলতি আর্থিক বছরে ‘সেরা পুজো’ বাছতে সরকার খরচ করেছে ৭৮ লক্ষ টাকা। রেড রোডে এবারও হয়েছে সরকারি বিসর্জন-অনুষ্ঠান। যাকে কার্নিভাল বলা হয়। যে-কার্নিভালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে এবারও চলচ্চিত্রের তারকা-নায়িকাদের হাত ধরে নাচতে দেখা গিয়েছে। সেই কার্নিভালের জন্য সরকারের কোষাগার থেকে উড়েছে ৯৩ লক্ষ ৭২ হাজার ৬৪৭ টাকা— অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি টাকা। ‘বিশ্ববঙ্গ শারদ সম্মান’-এর জন্য যাদের এত আয়োজন, সেই সরকারেরই আর একটি প্রকল্প ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মাইগ্র্যান্টস ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার স্কিম ২০২৩’। ২০২৩-এর জুলাইয়ে প্রকল্পটি ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য রাজ্য সরকারের মমত্ব কেমন? গত ফেব্রুয়ারিতে বিধানসভায় ২০২৫-২৬-এর বাজেট পেশ করেছে সরকার। পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত ওই প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে? উত্তর: শূন্য। হ্যাঁ, কোনও বরাদ্দ নেই। তার আগের বছরের তথ্য কী? আগের বছর মানে ২০২৪-২৫। পরিযায়ীদের জন্য ঘোষিত ওই প্রকল্পে তৃণমূলের সরকার বাজেটে বরাদ্দ করেছিল ৪ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা। রাজ্যের অর্থ দপ্তরের সংশোধিত বাজেট পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, সরকার বরাদ্দ যা-ই করুক, সংশ্লিষ্ট শ্রম দপ্তরকে দিয়েছে ১ কোটি ২৩ লক্ষ ৭৬ হাজার টাকা। যা বিধানসভায় ঘোষিত বরাদ্দের ২৭ শতাংশের কাছাকাছি। রাষ্ট্রের শোষণের চলমান প্রদর্শনী যাঁদের জীবন, তাঁদের যন্ত্রণার উপাখ্যানে তথাকথিত ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর সরকারের বঞ্চনার প্রতীক এই ছোট দুটি পরিসংখ্যান। বিজেপির ভূমিকা কী? তারা কেন্দ্রীয় সরকার চালাচ্ছে গত এগারো বছর। লোকসভা এবং রাজ্যসভায় বারবার প্রশ্ন উঠেছে পরিযায়ীদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগগুলির সম্পর্কে। প্রতিবারই কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে একশো দিনের কাজের আইন, জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা মিশনের মতো প্রকল্পগুলির উল্লেখ করা হয়েছে উত্তরে। পরিযায়ী শ্রমিকদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দিষ্ট কোনও প্রকল্প, ব্যবস্থা নেই। দেশে পরিযায়ী শ্রমিক কত? কেন্দ্রীয় সরকার জানে না। গত এপ্রিলেও এই বিষয়ে রাজ্যসভায় এক প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে শ্রম মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী সুশ্রী শোভা কারন্দলাজে জানিয়েছেন, ই-শ্রম পোর্টালে নথিভুক্ত অসংগঠিত শ্রমিকদের মধ্যেই পরিযায়ী শ্রমিকরা আছেন। নির্দিষ্টভাবে পরিযায়ী শ্রমিকদের সংখ্যা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নেই। ই-শ্রম পোর্টালে নাম নথীভুক্ত করা অসংগঠিত শ্রমিকের সংখ্যা ৩০ কোটি ৯৮ লক্ষ ৪৩ হাজার ৮২৪। স্বভাবতই প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অর্থাৎ দেশের আনুমানিক জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ অসংগঠিত শ্রমিক বলে সরকারই স্বীকার করে নিচ্ছে। সেই মন্ত্রীই গত ১১ আগস্ট লোকসভায় জানিয়েছেন, সর্বাধিক অসংগঠিত শ্রমিকের ঠিকানা উত্তর প্রদেশ— প্রায় সাড়ে ৮ কোটি। দ্বিতীয় বিহার। সেখানকার ৩ কোটির বেশি অসংগঠিত শ্রমিক। তিন নম্বরে পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা অসংগঠিত শ্রমিকের সংখ্যা ২ কোটি ৬৪ লক্ষ ৮১ হাজার ৪৫৩। অর্থাৎ রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ৩৩ শতাংশ অসংগঠিত শ্রমিক। প্রায় ৩ কোটি এই বঙ্গবাসী অসংগঠিত শ্রমিকদের মধ্যে পরিযায়ী কতজন? কতজন ভিন রাজ্যে গিয়ে কাজ করেন? রাজ্য সরকারও নির্দিষ্ট করে জানে না। তবে এই নিয়ে বিস্তর গড়মিল আছে। রাজ্যের ‘মাইগ্র্যান্ট ওয়েলফেয়ার বোর্ড’-এর চেয়ারম্যান সামিরুল ইসলাম। তিনি তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ। তাঁকে যখনই প্রশ্ন করা হয়েছে, তিনি বলেছেন রাজ্যের পরিযায়ীর সংখ্যা ২৩ লক্ষ ৪০ হাজার। কিন্তু অন্য কথা বলেছেন মমতা ব্যানার্জি। মুখ্যমন্ত্রী ২০২৪-এর গত ৪ সেপ্টেম্বর আবাসন এবং নির্মাণ শিল্পের সংগঠন ক্রেডাইয়ের রাজ্য সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘৫০ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের তালিকা দিয়ে বিশেষ অ্যাপ তৈরি করছি।’ সেখানে আবাসন নির্মাতাদের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শ ছিল, ‘ওই কর্মীদের তালিকা সরকার দিয়ে দেবে। তাঁদের বুঝিয়ে রাজ্যে ফেরাতে উদ্যোগী হন আপনারা। কর্মী প্রয়োজন হলে তালিকা থেকেই সকলকে কাজে লাগান।’ এখন আর তিনি পরিযায়ীদের রাজ্যে ফেরানোর কথা বলেন না। সরকারের অ্যাপে নাম লিখিয়ে রাজ্যে কাজ পেয়েছেন, এমন একজন শ্রমিকের কথাও মুখ্যমন্ত্রী আমাদের জানাতে পারেননি। রাজ্যের পরিযায়ীর সংখ্যা ৫০ লক্ষেরও বেশি। রাজ্য সরকারের তালিকায় দেখা যাচ্ছে রাজ্যের মানুষ সবচেয়ে বেশি আছেন মহারাষ্ট্রে— ৩,৬৩,২৫৩। দ্বিতীয় স্থানে কেরালা। সেখানে আছেন ৩,৬১,১৭৭। তৃতীয় স্থানে তামিলনাডু। সেখানে আছেন ২,১৭,৮৪৪জন। চতুর্থ স্থানে কর্ণাটক। সেখানে রাজ্যের পরিযায়ী আছেন ১,৬১,৯২৬। অর্থাৎ রাজ্যের তালিকা, যেখানে অর্ধেকের বেশি পরিযায়ী শ্রমিক নাম নথিভুক্ত করেননি, সেই তালিকা অনুসারে রাজ্যের পরিযায়ীদের সিংহভাগ আছেন দক্ষিণ ভারতের চারটি রাজ্যে। তবে রাজ্যের মানুষ কাজ করতে কাশ্মীর কিংবা মণিপুরেও আছেন। রাজ্যের তালিকা বলছে জম্মু, কাশ্মীরে আছেন ৮৫৬২জন। আবার মণিপুরে আছেন ৩১৬৩জন। লাক্ষাদ্বীপ কিংবা মিজোরামেও পশ্চিমবঙ্গের মানুজষ আছেন কাজের জন্য। তবে পার্শ্ববর্তী বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, আসামেও রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকরা আছেন। এই রাজ্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছেন ওডিশায়— ১,২১,১৫০। তাৎপর্যপূর্ণ হল কেরালা, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যের ন্যূনতম মজুরি পশ্চিমবঙ্গের থেকে অনেক বেশি। সেখানে রাজ্যের মানুষ যাচ্ছেন বেশি উপার্জনের লক্ষ্যে। কিন্তু ত্রিপুরা, বিহারের মতোও কিছু রাজ্য আছে, যেখানে ন্যূনতম মজুরি রাজ্যের থেকে কম। তবু রাজ্যের মানুষ সেখানে কাজে আছেন। পশ্চিমবঙ্গে কাজের আকাল এই পর্যায়ে যে যেখানে কাজ মিলছে মানুষ যাচ্ছেন। তবে মজুরি যেখানে বেশি সেখানে যাওয়ার প্রবণতাই বেশি। লকডাউনের পরে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন রাজ্যে ফিরে আসা পরিযায়ীদের একশো দিনের কাজের বন্দোবস্ত করবেন। রাজ্যে রেগার কাজ বন্ধই হয়ে গিয়েছে। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর সেই ঘোষণার ফলাফল নিয়ে আপাতত আলোচনা অর্থহীন। কাজ হারানো পরিযায়ীদের ৫০ হাজার টাকা করে দেবেন বলে ঘোষণা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। কিন্তু সরকার দিয়েছে মাত্র ১৮ হাজার পরিযায়ী শ্রমিককে। বিধানসভাতেই তা সরকার তা জানিয়েছিল। সেই ১৮ হাজার জনের আদৌ কতজন পরিযায়ী শ্রমিক— সেই প্রশ্ন বিধানসভাতে উঠেছিল। তুলেছিলেন তৎকালীন বামফ্রন্টের বিধায়করা। জবাব মেলেনি। প্রকাশের তারিখ: ২২-নভেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |