|
মুজফ্ফর আহ্মদ কীভাবে কমিউনিস্ট হলেন (১)সুচেতনা চট্টোপাধ্যায় |
সাহিত্য জগতে বিচরণ করলেও মুজফ্ফর আহ্মদ শ্রমিকদের একাংশের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। নোয়াখালি– চট্টগ্রামের দরিদ্র্য লস্কররা কলকাতায় কাজের সন্ধানে আসতেন। মুজফ্ফর তাঁদের সমস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। আঞ্চলিকতার সূত্রে সংযোগ তৈরি হলেও ১৯২১ সালে শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাবে এই সম্পর্কগুলি ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ও সামাজিকতায় আবদ্ধ থাকেনি। কলকাতার শহরতলী ও হুগলীর দুই তটের শিল্পনগরীগুলি এই সময় সমাজের নিচুতলার মানুষের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের ঘাঁটি হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ-সচেতন বুদ্ধিজীবীরা এই আলোড়ন অগ্রাহ্য করতে পারেননি। |
ছবি: মুজফ্ফর আহ্মদ। প্রধান আসামী, মীরাট ১৯২৯, ব্যক্তিগত সংগ্রহ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ধাক্কায় তাঁদের পুরোনো সমাজ-দর্শন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব মজুর-শ্রেণির আন্তর্জাতিকতাবাদের মার্কসীয় মতাদর্শকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়। মহাযুদ্ধের বিরাট ক্ষয়ক্ষতি পুঁজির সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জনজোয়ার আনে ঔপনিবেশিক দুনিয়ার প্রায় সব শহরেই। কায়রো থেকে সাংহাই অবধি শ্রমিক আন্দোলন হয়ে দাঁড়ায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের গণভিত্তি। আন্তঃসাম্রাজ্যিক লড়াইয়ের বিধ্বংসী রূপ, দুনিয়া-কাঁপানো রুশ বিপ্লব এবং বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলনের আবহে বহু মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের দিকে ঝোঁকেন। অন্যান্য রাজনৈতিক চেতনা ও আন্দোলন সমাজের বৃহত্তর শোষিত শ্রেণির মানুষের মুক্তি আনবে না— এই বোধ তাঁদের চেতনাকে শাণিত করেছিল। ব্যক্তিগত চেতনা ও সামাজিক চেতনার দ্বন্দ্ব বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আগ্রহ জাগিয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথিকৃৎ মুজফ্ফর আহ্মদ (১৮৮৯-১৯৭৩) নিজেকে বদলে নিয়েছিলেন। ১৯১৯ সালে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির মুখপত্র ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব নেন মুজফ্ফর আহমদ। পত্রিকাটি দ্রুত উচ্চমানের সাহিত্য চর্চার খ্যাতি অর্জন করে। মুজফ্ফর খবরের পাতাগুলির ওপর বিশেষ নজর দিতেন; জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরের টুকরো খবর পত্রিকায় ছাপা হত। মুসলিম সাহিত্যিক মহলে প্রশংসিত হলেও সাহিত্য জগতে তিনি বেশিদিন আবদ্ধ থাকতে পারেননি। বাঙালি মুসলিম উদারনৈতিক সাহিত্যিকদের সাংস্কৃতিক অবস্থান ও চৈতন্য ক্রমশ বেমানান ঠেকছিল। মুসলিম ধর্মাবলম্বী শ্রমিকরা এই সময় সংগঠিত ভাবে মজুর-শ্রেণির নিজস্ব দাবি-দাওয়ার ওপর জোর দিচ্ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে সম্প্রদায় বা জাতির উন্নতিকল্পে সাহিত্যচর্চা আর গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। সাংস্কৃতিক কর্মীর জীবন থেকে বেরিয়ে এসে মুজফ্ফর আহ্মদ রাজনৈতিক সাংবাদিকতার দিকে নজর দেন। তবে সাহিত্য সমিতির কাজকর্মের মাধ্যমেই তাঁর পরবর্তী কর্মক্ষেত্র এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। ১৯১৯ সালে সমিতির আপিসে কাজ করতে গিয়েই নতুন বন্ধুদের সাথে আলাপ। তাঁদের সঙ্গে নানা আলোচনায় এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির চাপে সক্রিয় রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে। কাজী নজরুল ইসলামের সাথে পত্রালাপ শুরু হয়। ১৯২০ সালে প্রাক্তন সৈনিক নজরুল, সমিতির আপিসে উপস্থিত হন। নজরুল উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মোতায়েন ছিলেন। রোমাঞ্চের সন্ধানে যুদ্ধে যোগ দিলেও, ফ্রন্টে থাকাকালীন মহাসমরের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র তাঁর কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিল। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের ঝাপটা রুশ জ়ারতান্ত্রিক সাম্রাজ্য অধিকৃত মধ্য-এশিয়া এবং আফগানিস্তান পেরিয়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে প্রবেশ করেছিল। সেনা-ব্যারাকে অক্টোবর-বিপ্লব-পরবর্তী গৃহযুদ্ধে ইংরেজ সরকার সমর্থিত শ্বেত বাহিনির পরাজয়ের খবর ছড়িয়ে যায়। ১৯২০ সালের গোড়ার দিকে সেনা ছাউনিতেই নজরুল লেখেন ‘ব্যথার দান’। সাক্ষাত হবার আগেই পত্রালাপের ভিত্তিতে মুজফ্ফর এই কাহিনি ছাপিয়ে দেন ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য়। নজরুল লাল ফৌজকে বিপ্লবের অপরাজেয় সেনানী হিসেবে বর্ণনা করেন। ১৯১৯ সালে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে মুজফ্ফ্রের পরিচয় হয়। আজীবন বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নবীন প্রজন্মের অন্যান্য লেখকদের মতোই দুজনেই বলশেভিক বিপ্লবের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। বলশেভিকদের সমর্থন করার প্রধান কারণ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকার ও পুঁজিপতিদের বিপ্লবকে ধ্বংস করার মরিয়া চেষ্টা। তাঁরা তখন রুশ গৃহযুদ্ধে সেনা সরবরাহ করতে ব্যস্ত। প্রতি-বিপ্লবী শ্বেত বাহিনীকে তাঁদের সরব সমর্থন ঔপনিবেশিক দুনিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। শ্রমিক আন্দোলনকারী মহলে বলশেভিকদের প্রতি সমর্থন দিনে দিনে ছড়িয়ে পড়ছিল। গোয়েন্দা পুলিশের বলশেভিক আতঙ্ক কলকাতায় ঔপনিবেশিক প্রভু, বিশেষত শ্বেত সম্প্রদায়ের বিরূপ মনোভাব লক্ষ করে স্থানীয় বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক কর্মীদের একাংশ বলশেভিকদের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই প্রবণতা সে-সময় কোনো সংগঠিত চেহারা নেয়নি। কিন্তু বিপ্লব সম্পর্কে যে-কোনো উৎসাহের চিহ্ন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের চোখে হয়ে দাঁড়ায় বলশেভিকবাদের সম্ভাব্য ঈঙ্গিত। ১৯১৮ থেকে ১৯২১ সালে রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ যখন চলছে, ভারতে তখন খিলাফৎ এবং অসহযোগ আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণ-অসন্তোষের আকার নেয়। ১৯২০ সালে কলকাতার শ্রমজীবী-অধ্যুষিত শহরতলীর এক মিটিং-এ বলশেভিকদের প্রতি সম্প্রীতি ও সমর্থনের মেজাজ শাসকদের নজরে আসে। পুলিশ লক্ষ করে এক উত্তর ভারতীয় হিন্দু বক্তা উপস্থিত মুসলিম মজুরদের বলশেভিকবাদকে স্বাগত জানাতে বলছেন। পুলিশের চর সভয়ে খবর দেন শ্রমিকরা লাঠি হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁরা জোর গলায় বলছেন, গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারীদের চিনতে পারলেই গণ-প্রহার হবে। এই আচরণের নেপথ্যে বলশেভিকদের করাল ছায়া আঁচ করে কর্তারা মুষড়ে পড়েন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, আগে কখনও শ্রমিকদের এ-ধরনের উগ্র আচরণ করতে দেখা যায়নি। এরকম কিছু ঘটতে পারে এই আন্দাজে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র অবশ্য ততদিনে নানা প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির অনতিকাল পরেই কলকাতায় অবস্থিত পুলিশের দুই প্রধান দপ্তর– কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ এবং বাংলার প্রাদেশিক পুলিশের ইন্টেলিজেন্স্ ব্রাঞ্চের কর্তা-ব্যক্তিরা বলশেভিক বিভীষিকা সম্বন্ধে নানা সতর্কবাণী শুনে সজাগ হয়ে উঠেছিলেন। লন্ডন থেকে নয়া দিল্লী এবং সিমলার পথ ধরে বাংলার প্রধান সচিব এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তর একাধিক নির্দেশনামা পান। ১৯১২ সালে কলকাতা নয়া দিল্লীর কাছে রাজধানীর গুরুত্ব হারিয়েছিল। তবু এই শহরের পুলিশ-প্রশাসনের সাম্রাজ্য রক্ষার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দিল্লীর বড়ো কর্তারা সমীহ করতেন। যে-কোনো বিরোধী শক্তির উত্থান লক্ষ করলেই কলকাতার মত নেওয়া হত। ১৯১৮ থেকে ১৯২১ সালে বলশেভিকবাদ নিবারণের পদক্ষেপ সমূহ দিল্লী আর কলকাতার মিলিত প্রচেষ্টায় চূড়ান্ত চেহারা নেয়। ১৯১৯ সালের শেষে দিল্লী, সিমলা আর কলকাতার পুলিশকর্তাদের যৌথ আলোচনার ভিত্তিতে বলশেভিকদের ঠেকানোর জোরালো চেষ্টা শুরু হয়। বন্দর-নগরী এবং ঘন শ্রমিক বসতি হিসেবে কলকাতা বলশেভিক চরদের আকৃষ্ট করতে পারে– এই সম্ভবনা ছিল তাঁদের উদ্বেগের কারণ। স্থানীয় প্রশাসককুল জানতেন শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হয়ে উঠলে তবেই বলশেভিকবাদ বা বামপন্থী রাজনীতির আগমন ঘটবে। দিল্লীর কর্তারা এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অবধি অপেক্ষা করতে রাজি ছিলেন না; ‘বলশেভিক চর’দের খুঁজে বার করতে বড়োই উতলা হয়ে পড়েন। দিল্লী থেকে অতিরিক্ত উৎকণ্ঠার সঙ্গে নির্দেশ আসে প্রতি মাসে ‘বলশেভিক’ সম্ভবনাপূর্ণ ঘটনা এবং ব্যক্তিবর্গকে চিহ্নিত করে তথ্যপূর্ণ বুলেটিন পাঠাতে। কলকাতার প্রশাসকরা দ্বিমত হন। তাঁরা মনে করেছিলেন অদৃশ্য কোনো শত্রুকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া নির্বুদ্ধিতার লক্ষণ। তাঁরা সাধারণ পুলিশি বন্দোবস্তকে আরো সজাগ করে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কলকাতার সাথে দিল্লীর রফা হয়। দুজন প্রাদেশিক ইনস্পেক্টর বাংলায় ‘বলশেভিক গার্ড’ আখ্যায় ভূষিত হন। তাঁদের দায়িত্ব ছিল টুকরো খবর একত্রিত করে নিয়মিত পাঠিয়ে দেওয়া সিমলার কেন্দ্রীয় অ্যান্টি-বলশেভিক অফিসারের হাতে। ১৯২০ সাল জুড়ে বলশেভিক জুজুর ভয় ছড়াতে ভারতের গোয়েন্দা পুলিশ নানা আজগুবি রিপোর্ট রচনা করে চলেছিল। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যায়-সংকোচনের প্রকোপে এই কর্মনিপুণতায় ভাঁটা পড়ে। সেই সাথে ১৯২১ সালের ইঙ্গ-রুশ চুক্তির প্রভাবে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের বাতাবরণ মিলিয়ে যায়। তাই বিশেষ পদগুলি অবলুপ্ত হয়। কিন্তু রুশ-গৃহযুদ্ধ চলাকালীন বিশেষ ব্যবস্থার হাত ধরেই কমিউনিস্ট-দমন প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা নেয়। সাম্যবাদী রাজনীতির জন্ম নেবার পূর্ব মুহূর্তেই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কমিউনিস্টদের নিশ্চিহ্ন করার সাজসজ্জা এঁটে তৈরি হয়েছিল। বহিরাগত বিভীষিকার তকমা লাগিয়ে কমিউনিস্ট রাজনীতিকে অপরাধী কার্যকলাপের সমার্থক করতে ঔপনিবেশিক শাসক-শ্রেণি ১৯১৭ সালের পর থেকে সচেতনভাবে উদ্যোগী হন। ১৯১৯-২০ সাল নাগাদ কলকাতা শহর এবং আশেপাশের শ্রমিক অঞ্চলগুলিতে বলশেভিক প্রভাবের ক্ষীণ আভাস খুঁজে বেড়াতে বেড়াতে পুলিশের গোয়েন্দারা বাস্তব এবং কল্পনার মিশ্রণের আশ্রয় নেন। অচেনা মানুষ দেখলেই তাঁরা নড়ে চড়ে বসতেন। সাগর পেরিয়ে আসা নানা দেশের মাল্লাদের ওপর তাঁদের ছিল বিশেষ নজর। রুশ নাবিকদের বলশেভিক সমর্থক ভেবে কয়েদ করা হয়। বাঙালি মুসলমান নাবিকরা এই সংক্রামক ব্যাধির ধারক সন্দেহে জেরার মুখে পড়েন। ১৯২০ সালে ‘বলশেভিক চর’ সন্দেহে নানা বর্ণময় খবর দিয়ে পুলিশ খাতা ভরিয়ে ফেলে। যুদ্ধ শেষ হতে-না-হতেই ‘বলশেভিক আতঙ্ক’ তলা থেকে কোনো বিপ্লবী ‘বিপর্যয়’ ডেকে এনে পুঁজির সাম্রাজ্যকে খান খান করে দিতে উদ্যত, এই ভাবনা শাসকদের কন্টকিত করে। ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সালে তাঁদের উৎসাহে সাম্রাজ্যব্যাপী বেড়াজাল সত্ত্বেও কলকাতায় অন্তত কোনো বলশেভিক ষড়যন্ত্রের সন্ধান মেলেনি। তখন কলকাতায় কোনো বলশেভিকের অস্তিত্ব ছিল না। এই সময় কেউ নিজেকে কমিউনিস্ট বলে পরিচয় দিতেন না। এই প্রবণতা ১৯২১ সাল থেকে ধীরে ধীরে শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাবে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের একাংশকে প্রথম আকৃষ্ট করে। ১৯২০ সালে ‘বিশেষ ব্যবস্থা’ যখন তুঙ্গে, তেমন কাউকে না-পেয়ে পুলিশ যাকে তাকে ‘বলশেভিক চর’ সন্দেহে অনুসরণ করা শুরু করেছিল। জন-বিচ্ছিন্ন ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র বহু চেষ্টা করেও সামাজিক পরিসরে বলশেভিক জুজুর ভয় ছড়িয়ে দিতে পারেনি। বিশ্বযুদ্ধের ব্যয়ের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ায় আর্থিক তাড়নায় জর্জরিত জনতার বিশাল অংশ ঔপনিবেশিক শাসনকে ঘৃণার চোখেই দেখতেন। তাই বলশেভিক-বিরোধী সরকারী প্রচার বিশেষ সাড়া ফেলেনি। ১৯২০ সালে মৌলানা আক্রম খান সম্পাদিত ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় সরকারি প্রচেষ্টা কড়া ভাষায় সমালোচিত হয়। সমকালীন শ্রমিক আন্দোলনের সমর্থনে বলা হয় কোনো কাল্পনিক বলশেভিক চর শ্রমিকদের ধর্মঘট করতে প্ররোচনা দেয়নি। ক্ষুধা এবং নিরন্তর শোষণ তাঁদের সচেতন করে তুলেছে। বলশেভিকদের মতো তাঁরাও লড়ছেন পুঁজির সাম্রাজ্যের অত্যাচারের বিরুদ্ধে। সাহিত্য জগতে বিচরণ করলেও মুজফ্ফর আহ্মদ শ্রমিকদের একাংশের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। নোয়াখালি– চট্টগ্রামের দরিদ্র্য লস্কররা কলকাতায় কাজের সন্ধানে আসতেন। মুজফ্ফর তাঁদের সমস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। আঞ্চলিকতার সূত্রে সংযোগ তৈরি হলেও ১৯২১ সালে শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাবে এই সম্পর্কগুলি ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ও সামাজিকতায় আবদ্ধ থাকেনি। কলকাতার শহরতলী ও হুগলীর দুই তটের শিল্পনগরীগুলি এই সময় সমাজের নিচুতলার মানুষের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের ঘাঁটি হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ-সচেতন বুদ্ধিজীবীরা এই আলোড়ন অগ্রাহ্য করতে পারেননি। অনেকে খিলাফতপন্থী-কংগ্রেস-কর্মীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা মজুর সমিতিগুলির সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। শহরের ধর্মঘটী শ্রমিকদের উপস্থিতি অনুসন্ধিৎসু পথচারীদের তাঁদের আন্দোলন সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াও শ্রেণি হিসেবে আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই মজুরদের লড়াইয়ের চালিকাশক্তির কাজ করেছিল। যাঁরা নিম্নবিত্ত জীবনের দুঃখ-কষ্ট চিনেছিলেন সেই তরুণ বুদ্ধিজীবীরা সরকার-বিরোধী, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনের এই শ্রেণিগত মাত্রা আবিষ্কার করে বিস্মিত হন। মুজফ্ফর আহ্মদের বন্ধু মহলে শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি সুস্পষ্ট সমর্থন ছিল। ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটের দোতলায় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র আপিসঘরে শ্রমিক ধর্মঘট প্রসঙ্গে সাহিত্যিকরা আলোচনা করতেন। সমিতির আপিসের বারান্দা থেকে, পাশের সাঙ্গোভ্যালীর চায়ের দোকান থেকে কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথে শ্রমিকদের আত্মবিশ্বাসী সংগ্রাম, তাঁদের চোখের সামনে চলে এসেছিল। এই সময় ধর্মঘটী শ্রমিকরা ঔপনিবেশিক দাপট এবং সেই সাথে ঔপনিবেশিক শহরের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা থামিয়ে দিয়েছিল। শ্রমিকদের আন্দোলন মহানগরীর রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুন রাস্তা দেখিয়ে দেয়। ধর্মঘটী ট্রাম শ্রমিকরা কলকাতাকে অচল করে দেন। ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানির শ্রমিকরা রাস্তার সারি সারি ল্যাম্প পোস্টের বাতি নিভিয়ে দিয়ে শহরের সন্ধ্যা আর রাতগুলিকে জমাট অন্ধকারে নিমজ্জিত করেন। কলকাতা কর্পোরেশনের দলিত মেথর ঝাড়ুদাররাও কিছু কাল জঞ্জাল সাফাই বন্ধ রাখেন। কলেজ স্কোয়ার এবং শহরের অন্যান্য পার্কের জনসভায় অগণিত শ্রমিক-কর্মচারীদের ভিড়, রাস্তায় আবর্জনার পাহাড়, ট্রামহীন সড়ক, সন্ধ্যেবেলার ঘনিয়ে আসা অন্ধকার, কলেজ-পাড়ার বুদ্ধিজীবীদের নিঃসন্দেহে প্রভাবিত করে থাকবে। শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনৈতিক কর্মীসমাজ। তাঁদের বিরুদ্ধে কর্তৃত্বমূলক প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে সরকার আর পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াইয়ে নামতে শ্রমিকরা পা বাড়িয়ে থাকতেন। আন্দোলনের জটিল মুহূর্তগুলিতে শ্রমিকরা বারবার তাঁদের জঙ্গি সংগ্রামী মনোভাব প্রকাশ করতেন। শ্রমিকদের লড়াকু আত্মমর্যাদাবোধ অধিকাংশ ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী নেতাদের অনুমোদন সাপেক্ষ ছিল না। কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের একাংশ তাঁদের আত্মবিশ্বাস লক্ষ করে তাঁদের লড়াইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই পরিস্থিতিতেই মুজফ্ফর আহ্মদ প্রতিবাদের রাজনীতি বেছে নেন।
প্রকাশের তারিখ: ০৫-আগস্ট-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |