|
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মুজফ্ফর আহ্মদ – ২য় পর্বরাহুল সাংকৃত্যায়ন |
একদিন তিনি দোকানে লেনিনের লেখা দুইটি ইংরেজী বই 'বামপন্থী কমিউনিজম' ও 'বলশেভিকরা রাজশক্তি হাতে রাখিতে সমর্থ হইবে কিনা?' পান। মুজফ্ফর আহ্মদ এ বই দুইটি খুব মনোযোগের সঙ্গে পড়েন। সেই সময় জনতার মার্কস নামে একটি পুস্তিকাও তাঁর হাতে আসে। বইগুলি পড়লেও সমস্ত কথা তিনি ভালভাবে বুঝতে পারতেন না। কিন্তু তবু তাঁর মনে হত যে এটাই তাঁর পথ। বিলেতের লেবর পার্টির তরফ থেকে প্রকাশিত বইও তিনি পড়তেন কিন্তু সমস্ত কথা তাঁর কাছে সন্তোষজনক বলে মনে হত না। সেই সময় তিনি জানতে পারেন যে, সাম্যবাদ (কমিউনিজম) প্রচারের জন্য 'কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল' নামে মস্কোতে একটি সংগঠন গঠিত হয়েছে। মুজফ্ফর আহ্মদ সেই সম্বন্ধে আরও জানবার চেষ্টা করেন। |
|
বাংলা সাহিত্য পড়তে তিনি খুব ভালবাসতেন। শারীরিক দুর্বলতা তিনি মা-র থেকে উত্তরাধিকারী সূত্রে পেয়েছিলেন। খেলাধূলাতে তিনি কোনদিন অংশগ্রহণ করেন নি। ব্যায়াম করবার ইচ্ছাও কোনদিন হয় নি। ১৯০৬ সালে বাংলাদেশে তুমুল বঙ্গভঙ্গ-রদ আন্দোলনের সময় তিনি খুব মনোযোগের সঙ্গে খবরের কাগজ পড়তেন। বাংলার অন্যান্য জায়গার মধ্যে নোয়াখালিতেও সন্ত্রাসবাদ প্রসার লাভ করেছিল। ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ব-বাংলাকে একটি আলাদা প্রদেশ করা হয়। বাংলাদেশের এই অংশে বেশিরভাগ এবং বড় বড় জমিদার সমস্তই হিন্দু, কিন্তু অধিকাংশ কৃষক মুসলমান। পূর্ব-বাংলার গবর্নর ব্যামফীল্ড ফুলার জমিদারী প্রথার বিরোধী ছিলেন। স্বভাবতই হিন্দু জমিদাররা জমিদারী নষ্ট হবার ভয়ে খুব বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী ও দেশভক্ত ছিল। পূর্ব-বাংলার মুসলমান কৃষকরা বেশিরভাগ ছিল অশিক্ষিত। নতুন সরকার স্কুলের সংখ্যা বাড়াতে চায়। মুজফ্ফর আহ্মদ 'সুলতানে'র নিয়মিত পাঠক ছিলেন। 'সুলতান' বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী থাকায় স্বভাবতই তার প্রভাব মুজফ্ফর আহ্মদের উপর পড়েছিল। অন্যপক্ষে পূর্ব বাংলার মুসলমান নেতারাও চুপ করে ছিলেন না। হিন্দু জমিদারের প্রভুত্ব এবং সরকারী চাকুরিতে হিন্দু শিক্ষিতদের একাধিপত্যের কথা বলে মুসলমানদের উত্তেজিত করছিলেন। মুজফ্ফর আহ্মদও এই সত্যতাকেও অস্বীকার করতে পারলেন না। তাঁরই স্কুলের একজন শিক্ষক শুধুমাত্র মুসলমান হওয়ার জন্যই তাঁকে ঘৃণা করতেন। মুজফ্ফর আহ্মদ দোটানাতে ছিলেন। বাংলার শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল। তিনি স্বদেশী কাপড় পরতেন এবং ইংরেজদের ঘৃণা করতেন। ধর্মের প্রতি ভক্তি তাঁর ছিল, কিন্তু কঠোরতা ছিল না। রোজার মাসে তিনি উপোস করতেন। নামাজ তেমন পড়তেন না। মুজফ্ফর আহ্মদের কলেজে পড়ার ইচ্ছা হয়। বড় ভাই কিছু সাহায্য করবেন বলেন এবং বাকি টাকা টিউশনি করে জোগাড় করতে পারবেন বলে আশা ছিল। ১৯১৩ সালে তিনি আরবী, ইতিহাস ও লজিক নিয়ে হুগলি কলেজে (বর্তমানে মহসীন কলেজ) ভর্তি হন। কিন্তু কিছুদিন পরেই ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি হুগলি ছেড়ে কালকাতা বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হন। টিউশনিতে যথেষ্ট সময় ব্যয় হত এবং স্বাস্থ্যও খারাপ ছিল। উপরন্তু কলেজের পাঠ্যপুস্তক পড়ার বদলে বাংলা সাহিত্য পড়াতে তিনি তন্ময় হয়ে থাকতেন। ইসলামিক সংস্কৃতির ইতিহাস তাঁর খুব প্রিয় পাঠ্য ছিল। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির তিনি উৎসাহী সভ্য ছিলেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভ্যও তিনি ছিলেন। ১৯১৫ সালে তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই সমস্ত কাজের ফল হয় যে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাতে অকৃতকার্য হন। জীবিকার জন্য কিছু করা দরকার হয়ে পড়ে, কেবলমাত্র সাহিত্য সমিতির কাজে চলত না। ১৯১৭ সালে মুজফ্ফর আহ্মদ বেঙ্গল গভর্নমেন্ট প্রেসের সহকারী স্টোরকিপার নিযুক্ত হন এবং এক বৎসর সেই কাজে নিযুক্ত থাকেন। মুজফ্ফর আহ্মদের রাজনৈতিক জ্ঞান এতখানি হয়েছিল যে তিনি বেশিদিন ঐ কাজ করতে পারলেন না। ইংরেজ সুপারিনটেনডেন্ট মুজফ্ফর আহ্মদেরকেও তার খয়ের খাঁ হিসাবে দেখতে চাইত কিন্তু মুজফ্ফর আহ্মদের তা সহ্য হত না। দুই-তিন মাস যাবত ঝগড়া চলার পর মুজফ্ফর আহ্মদ চাকুরি ছেড়ে দেন। ১৯১৮ সাল – তখনও মহাযুদ্ধ চলছিল। মুজফ্ফর আহ্মদ রাজনৈতিক বিভাগে উর্দু থেকে বাংলা অনুবাদ করার চাকুরি পান এবং একমাস সেই কাজ করেন। তারপর তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির কাজে নিজেকে সর্বক্ষণ নিয়োগ করতে মনস্থ করেন। বাংলা সাহিত্যের চর্চায় মুসলমানদের যোগ্য অংশগ্রহণ না করা তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পরিষদের কার্যালয় ষাট টাকা ভাড়ায় নতুন এক বাড়িতে স্থানান্তরিত করেন। 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা' নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা বের হয়। এই পত্রিকার সম্পাদক নামে অন্য লোক থাকলেও সম্পাদকীয় বিভাগের সমস্ত কাজই তাঁকে করতে হত। সেই সময় বাংলা ভাষার তরুণ কবি নজরুল ইসলাম বাঙালী রেজিমেন্টে ছিলেন এবং তাঁর অনেক প্রাথমিক লেখা ও কবিতাই এই পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছিল। যুদ্ধের শেষে সমস্ত পৃথিবীতে বৈপ্লবিক চাঞ্চল্য দেখা দেয়। ভারতবর্ষেও তা দেখা দেয় খিলাফৎ ও কংগ্রেসের আন্দোলনের রূপে। মুজফ্ফর আহ্মদ শুধুমাত্র সাহিত্যিক থাকতে চাইতেন - কিন্তু তাঁর মন বিদ্রোহ করতে শুরু করে। পরিশেষে তিনি সাহিত্য দ্বারা রাজনৈতিক সেবা করার মনস্থ করেন। তখন এ কে ফজলুল হক কংগ্রেস-খিলাফতের বড় নেতা ছিলেন। মুজফ্ফর আহ্মদ তাঁর কাছে একটি পত্রিকা বের করার প্রস্তাব করেন। হক সাহেব সম্মত হন। ১৯২০ সালে 'নবযুগ' বাংলা দৈনিক প্রকাশিত হয়। নবযুগের মধ্য দিয়ে মুজফ্ফর আহ্মদ রাজনৈতিক জগতে প্রবেশ করেন। এই সময় কাজি নজরুল ইসলামের রেজিমেন্ট ভেঙ্গে গিয়েছিল। তাঁর সাব-রেজিস্ট্রারের চাকুরি হওয়ার সম্ভাবনা হয়েছিল। তাঁকে বোঝানোর পরে তিনি চাকুরিতে এগুলেন না। নজরুল ইসলাম এবং মুজফ্ফর আহ্মদ 'নবযুগ'-এর সম্পাদনা করতেন। গরম গরম লেখার জন্য সরকার 'নবযুগ'-এর এক হাজার টাকা জামানত বাজেয়াপ্ত করে। মুজফ্ফর আহ্মদ হক সাহেবকে বলে দুই হাজার টাকা জামানত দাখিল করেন। 'নবযুগ' চার হাজার ছাপা হত। নজরুলের 'অগ্নিবীণা'র রক্ত-গরম করা কবিতাগুলি 'নবযুগ'-এর সময়েই প্রথম প্রকাশিত হয়। 'নবযুগ' বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নজরবন্দী থেকে মুক্ত হয়ে এসে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ কালকাতা টাউন হলে ক্রমান্বয়ে তিনদিন ছয় ঘণ্টা করে বক্তৃতা করেন। মুজফ্ফর আহ্মদ সবসময়ে সেই বক্তৃতা শুনতে যেতেন। এই বক্তৃতাতে তিনি খুব প্রভাবান্বিত হন। রুশ বিপ্লবের প্রভাবও মুজফ্ফর আহ্মদের উপর পড়েছিল। সন্দ্বীপের বেশিরভাগ লোক জাহাজের নাবিক হওয়ায় তাদের দুঃখ শোনার সুযোগও মুজফ্ফর আহ্মদের হয়েছিল। 'নবযুগ' কৃষক-মজুরদের দাবি সমর্থন করত যদিও সমাজতন্ত্রবাদ বা কমিউনিজমের সম্বন্ধে তখনও তাঁর জ্ঞান প্রায় ছিল না বলা চলে। ১৯২০ সালে কলকাতাতে কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে অহিংসাত্মক অসহযোগের প্রস্তাব পাশ হয়। ফজলুল হক সাহেব ওকালতি ছাড়বেন কিনা এই দ্বিধায় পড়েন। এদিকে কেউ কেউ তাকে 'নবযুগ'-এর সম্পাদকদের লেখা সম্বন্ধে কিছু সত্য মিথ্যা কথা শোনালে তিনি হুকুম চালাতে চান। ফলে প্রথম নজরুল ও পরে মুজফ্ফর আহ্মদ 'নবযুগ'-এর সাথে সম্পর্ক ছেড়ে দিলে কাগজ বন্ধ হয়ে যায়। মুজফ্ফর আহ্মদ আর একটি কাগজ বের করতে মনস্থ করেন। সেই জন্য তিনি একটি কোম্পানি ঠিক করেন। কোম্পানি রেজিস্ট্রী করারও পয়সা ছিল না। সেই সময়ে (১৯২১) কুতুবুদ্দীন আহ্মদ সাহেবের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। কুতুবুদ্দিন সাহেব টাকা দেন। তাতে মুজফ্ফর আহ্মদ কোম্পানির একটি ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করেন যাতে কোম্পানির তরফ থেকে প্রকাশিত কাগজ মজুর-কৃষকের কাগজ হবে বলা হয়। এই ঘোষণাপত্রটি মুজফ্ফর আহ্মদ নিজে বাংলায় লিখেছিলেন। ইংরেজী অনুবাদক 'মজুর' শব্দের অনুবাদ প্রোলেটেরিয়েট করেন। অক্সফোর্ড ডিক্সনারী দেখে মুজফ্ফরকে প্রালেটোরিয়েটের অর্থ বুঝতে হয়। বোধ হয় ভারতবর্ষে এই শব্দের প্রথম প্রয়োগ এটাই। কোম্পানির শেয়ার বিক্রয় না হওয়ায় কাগজ বের হতে পারে না। মুজফ্ফর আহ্মদ সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকাতে লিখতেন। তাঁর সমস্ত সময় সক্রিয় রাজনীতিতে কাটত। সোভিয়েত ও মজুর-কৃষকের উপকারের দিকে বেশি নজর থাকায় এই সম্বন্ধে লিখিত বই তিনি খুঁজতে থাকেন। ইংরেজী কাগজগুলিতে সোভিয়েত সম্বন্ধীয় লেখাতে কুৎসার অংশই বেশি থাকত। একদিন তিনি দোকানে লেনিনের লেখা দুইটি ইংরেজী বই 'বামপন্থী কমিউনিজম' ও 'বলশেভিকরা রাজশক্তি হাতে রাখিতে সমর্থ হইবে কিনা?' পান। মুজফ্ফর আহ্মদ এ বই দুইটি খুব মনোযোগের সঙ্গে পড়েন। সেই সময় জনতার মার্কস নামে একটি পুস্তিকাও তাঁর হাতে আসে। বইগুলি পড়লেও সমস্ত কথা তিনি ভালভাবে বুঝতে পারতেন না। কিন্তু তবু তাঁর মনে হত যে এটাই তাঁর পথ। বিলেতের লেবর পার্টির তরফ থেকে প্রকাশিত বইও তিনি পড়তেন কিন্তু সমস্ত কথা তাঁর কাছে সন্তোষজনক বলে মনে হত না। সেই সময় তিনি জানতে পারেন যে, সাম্যবাদ (কমিউনিজম) প্রচারের জন্য 'কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল' নামে মস্কোতে একটি সংগঠন গঠিত হয়েছে। মুজফ্ফর আহ্মদ সেই সম্বন্ধে আরও জানবার চেষ্টা করেন। ১৯২১ সালের শেষভাগে এর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। এই সময় বোম্বাইয়ের শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে মার্কসবাদ সম্বন্ধে পড়াশুনা করে মজুর আন্দোলনে যোগদান করেন। মহম্মদ আলি নামে একজন কমিউনিস্ট মস্কো থেকে কাবুলে আসেন। পেশোয়ারের ইসলামিয়া কলেজের অধ্যাপক গোলাম হোসেনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। গোলাম হোসেন অধ্যাপকের কাজ ছেড়ে পান্ডাহারের মজুরদের মধ্যে কাজ করতে শুরু করেন। পরে তিনি কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মোকদ্দমায় আসামী হয়ে পুলিসের কাছে বিবৃতি দিয়ে রেহাই পান। লেখাটি প্রথম অনুবাদ আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালের শারদীয় স্বাধীনতায়। অনুবাদক: অসিত সিংহ রায়। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে গণশক্তি পত্রিকার মুজফ্ফর আহ্মদ জন্মশতবর্ষ সংখ্যায় লেখাটি আবার প্রকাশ করা হয়।
প্রকাশের তারিখ: ০৬-আগস্ট-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |