'আকাশে আজ ছড়িয়ে দিলাম প্রিয়’

অম্লান দেব
নদী আর বাজারের মাঝামাঝি সাজান মাস্টারের বাড়ি। টিনের চাল, মুলিবাঁশের বেড়া, উঠোন পেরিয়ে টালির রান্নাঘর। পেঁপে গাছের পাশ দিয়ে কলতলা। উঠোনের দিকে আর বাইরের দিকে মাটির বারান্দা। সাইকেল ধীরে ফিরছিল বাড়ির দিকে। আচ্ছা গানটা কি একতালের? নাকি কাহারবা ছিল? প্যাডেল করতে করতে মাত্রা গুণছিলেন সাজান মাস্টার। এই যে তার জীবন ভরা নজরুলের গান সেও তো এমনি এমনি নয়। কত বছর আগে, সেবার বটতলার বড়ো অনুষ্ঠান, গণ্যমান্যদের সামনে গান গেয়েছিলেন উঠতি গায়ক শাহজাহান। সে গানে মঞ্চের একদম সামনের দিকে রাখা একটি চেয়ারে জ্বলে উঠেছিল সন্ধ্যাবাতি!

এপার ওপার মিলিয়ে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে চড়া। মাঝে বড়োসড়ো খালের মতো বয়ে যাওয়া নদী।  গরমকালে চরের মাটিতে বিস্তর তরমুজ ফলে। ভ্যানে বোঝাই করে সেসব আনা হয় এক কিলোমিটার দূরের গঞ্জে। মফস্বলের এই গঞ্জে সপ্তাহে দুদিন হাট বসে। সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যানগুলোর পিছনে সব্জি বাজার।  বাজার যেখানে শেষ হয়েছে তারপর নোংরা আবর্জনা, পেচ্ছাপের গন্ধ, কাঁচা ড্রেন পার হয়ে চানমোহনের মডার্ন সেলুনকে ডান দিকে রেখে ঘুরলেই আপনি সাজান মাস্টারের দোকান পাবেন। নানা নাম রেখে রেখেছিলেন শাহজাহান, বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন এই টেইলারিং-এর দোকান। পেটের দায়ে অল্প বয়সেই শিখে নিতে হয়েছিল জামা-প্যান্টের কারিগরি। কিন্তু শুধু এ কারণেই ‘শাহজাহান’ ‘সাজান’ হননি, হননি মাস্টারও। হাটের যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই উত্তর পাবেন— “কার কথা পুছ কচ্ছেন? সাজান? অ… ওই যে পাছপাকে দোকান.... উমরায় গানের মাস্টার”। একমাত্র গায়ক না-হলেও শাহজাহান এ তল্লাটের একমাত্র সংগীত শিক্ষক নামান্তরে গানের মাস্টার। সাজানের ভালোবাসা নজরুল গীতি। সাজানের গুরুর নাম নজরুল ইসলাম। সকালে বিকালে বাড়িতে হারমোনিয়ামে, নজরুল সন্ধ্যায়, গানের টিউশনিতে, দোকানে শার্ট-প্যান্টের মাপ নিতে নিতে, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সাজাহান নজরুলের ‘কথার ফুল’, ‘গানের মালা’ ছড়িয়ে দিতে থাকেন। কেউ একজন কোনো একদিন সেসব কুড়িয়ে নেবে হয়তো এই আশায়! আসুন সাজান মাস্টারের কাছে যাই। 

বোতামের ঘর সেলাই করতে করতে সাজান মাস্টারের মনে হচ্ছিল কী আশ্চর্য ব্যাপার! জামাকাপড়ের মতো যদি কেটে বা সেলাই করে জীবনটাকেও বানিয়ে নেওয়া যেত ইচ্ছা মতো রংয়ের কাপড়ে, যদি এরকম হতো তাহলে কী হতো যদি ওরকম হতো তাহলে কী হতো? 

‘তুমি যদি রাধা হতে শ্যাম 
আমারি মতন দিবস নিশি জপিতে শ্যাম-নাম।। 
কৃষ্ণ কলঙ্কেরই জ্বালা, মনে হতো মালতীর মালা
চাহিয়া কৃষ্ণ প্রেম জনমে জনমে আসিতে ব্রজধাম।।’ 

(শিল্পীঃ যূথিকা রায়। রেকর্ডঃ এন ১৬৬৮৯, এইচ.এম.ভি। রচনা ও সুরঃ নজরুল ইসলাম)২ 

কাহারবা তালে সাজান মাস্টারের গুনগুনানিতে চিন্তা ঢুকে পড়ে। তাজ্জব ব্যাপার! মানুষের পোশাকের মাপ আছে। নিপাট নিখুঁত। অথচ এই যে জীবন, এত্ত বড়ো জীবন, মানুষের জীবন, তারই কোন মাপ নেই। নজরুলেরও কি ছিল? জীবনের মাপ?

‘আমি কুল ছেড়ে চলিলাম ভেসে বলিস্ ‌ননদীরে সই, বলিস ননদীরে 
শ্রীকৃষ্ণ নামের তরণীতে প্রেম-যমুনার তীরে বলিস্‌ ননদীরে ।।
সংসারে মোর মন ছিল না, তবু মনের দায়ে 
আমি ঘর করেছি সংসারেরি শিকল বেঁধে পায়ে 
শিক্‌লি-কাটা পাখি কি আর পিঞ্জরে সই ফেরে।।’৩ 

(কথা: নজরুল ইসলাম। সুর: গিরীন চক্রবর্তী। শিল্পী: মৃণাল কান্তি ঘোষ। রেকর্ড: এন, ৯৯৬৩, ১৯৩৭ অক্টোবর এইচ.এম.ভি।)

ভাটিয়ালি এই গান যেন নদীর পাড় থেকে সাজান মাস্টারকে ডাক দিল। সংসারে যার মন নেই সে পায়ে শেকল বেঁধে আর কতদিন সংসারে থাকবে! তাই কি কলকাতা, ঢাকা, কুমিল্লা, সৈয়দপুর, কৃষ্ণনগর দৌড়ে বেরিয়েছেন নজরুল? সাজান মাস্টার দোকান বন্ধ করে দেন। কী এক গভীর বেদনা, অপার আর্তি সাজান মাস্টারকে নজরুল গীতির দিকে এইভাবে টানে। সরু আলপথে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাজান মাস্টার কবুল করেন ব্যথা পাওয়ার আনন্দের নাম নজরুল ইসলাম!

সপ্তাহে একদিন দুই গ্রাম পেরিয়ে সাজান মাস্টার গান শেখাতে যান। বাপের আমলের তামা রং হয়ে যাওয়া একটা হিরো সাইকেল সাজানের আছে। সারেগা…রে গা মা… হয়ে যাওয়ার পর মোটামুটি দু-একটা ‘পিয়া কি নজরিয়া’ সেরেই সাজান মাস্টার তার কিশোরী ছাত্রীদের এনে ফেলেন নজরুলের লাইনে। বিডিও অফিসের কম্পিটিশনে যাবে এক ছাত্রী। তাকে নজরুলের একটি গান তুলে দিতে হবে আজ। উত্তম কুমারের দৌলতে অন্তত, বিখ্যাত এ গান। 

‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে
বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে ।।
ভুলিও স্মৃতি মম, নিশীথ স্বপন সম
আঁচলের গাঁথা মালা ফেলিও পথ প’রে।।’

(তাল: একতাল। সুর: জগন্ময় মিত্র (রেকর্ড বুলেটিন অনুযায়ী)। শিল্পী: জগন্ময় মিত্র। রেকর্ড: এন ১৭৪৪, এপ্রিল ১৯৪০, শিল্পী: সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। রেকর্ড: এন ৩০৬৭, ১৯৬৪  এইচ.এম.ভি ) 

সাজান মাস্টারের সামনে খোলা স্বরলিপি। তাতে লেখা “H.M.V.N. 17448” শিল্পী জগন্ময় মিত্র আধুনিক তাল: কাহারবা। মাস্টার বিড়ম্বনায় পড়লেন। সতীনাথের চাল আলাদা। গান শেষ করার যেন তাড়া নেই। দ্বিতীয়বার ‘স্মরণে আসে মোরে’র ‘মোরে’তে যেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায় স্মরণের দরজায় টোকা দেন। যদি আমাকে মনে পড়ে… সেই যে আমাকে…!

হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল রাখেন সাজান মাস্টার। এ কী গান? নাকি অভিমানের আকুতি? ‘শ্রাবণ রাতে’র বদলে ‘শাওন রাতে’ বললে কি বৃষ্টি আরো নিবিড় হয়ে ফোয়ারার মতো পড়ে? কিংবা শেষের দুই লাইন ‘বিজলী দীপ-শিখা’ যখন তোমায় খুঁজবে কান্না পেলে চোখ ঢেকে নিও। ইস্‌… এভাবে কাঁদে না...এরকম কাঁদতে নেই।

সাদা-কালো সুরের অক্ষরমালা ধরে সাজান মাস্টার এগোতে থাকেন। ‘ভুলিও’তে মা–পা পর্যন্ত গিয়ে আসলে ‘স্মরণ’ই এসে পড়ে। ইস্কুলের পিছনের গলিতে বেণী দোলানো সাদা নীল শাড়িকে কৃষ্ণচূড়া সাক্ষী রেখে তরুণ সাজান বলেছিলেন, “আমায় ভুলে যেও রোকসানা- আমি তোমার যোগ্য নই”। রাতে দেখা স্বপ্নের মতো ভুলে যেতে বলেছেন বটে নজরুল, আসলে কি নজরুল চেয়েছিলেন, যাকে বলছেন, তিনি ভুলে যান নজরুলকে? সাজানও কি চেয়েছিলেন? 

হায় বেদরদী!  তোমার কেবল অভিমান আর অভিমান! তুমি চাও এক বল আরেক! 

অবাক হয়ে কিশোরী ছাত্রী দেখল রবিবারের খটখটে দুপুরে বৃষ্টির গান গাইতে গিয়ে সাজান মাস্টারের নাকের পাশের তিল বরাবর নেমে আসছে জল। গলা বুজে আসছে, তবুও গেয়ে চলেছেন সাজান মাস্টার। 

নদী আর বাজারের মাঝামাঝি সাজান মাস্টারের বাড়ি। টিনের চাল, মুলিবাঁশের বেড়া, উঠোন পেরিয়ে টালির রান্নাঘর। পেঁপে গাছের পাশ দিয়ে কলতলা। উঠোনের দিকে আর বাইরের দিকে মাটির বারান্দা। সাইকেল ধীরে ফিরছিল বাড়ির দিকে। আচ্ছা গানটা কি একতালের? নাকি কাহারবা ছিল? প্যাডেল করতে করতে মাত্রা গুণছিলেন সাজান মাস্টার। এই যে তার জীবন ভরা নজরুলের গান সেও তো এমনি এমনি নয়। কত বছর আগে, সেবার বটতলার বড়ো অনুষ্ঠান, গণ্যমান্যদের সামনে গান গেয়েছিলেন উঠতি গায়ক শাহজাহান। সে গানে মঞ্চের একদম সামনের দিকে রাখা একটি চেয়ারে জ্বলে উঠেছিল সন্ধ্যাবাতি! 

‘হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে কুড়াই ঝরা ফুল একেলা আমি। 
তুমি কেন হায় আসিলে হেথায় সুখের স্বর্গ হইতে নামি।। 
 চারিপাশে মোর উড়িছে কেবল 
শুকনো পাতা মলিন ফুলদল, 
বৃথাই সেথা হায় তব আঁখিজল অবিরল দিবস যামী।৮ 

(রাগ: বাগেশ্রী, তাল: লাউনী (৮মাত্রা) কাহারবা। শিল্পী: সন্তোষ সেনগুপ্ত। রেকর্ড: এন ২৭৯৯০, সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ এইচ.এম.ভি) 

খবর নিয়ে জেনেছিলেন সাজান মাস্টার, সন্ধ্যাতারাটির নাম। তারপর থেকে রোকসানার কাছে সাজান মাস্টারের সুর, তাল, কথা গচ্ছিত রাখা আছে কিন্তু হাটের সামান্য দর্জি হওয়া যার অনিবার্য ভবিষ্যৎ, তার মতোই এই গল্পের পরিণতি। 

‘এলে অবেলায় পথিক বেভুল 
বিধিছে কাঁটা নাহি যবে ফুল 
কি দিয়ে বরণ করি ও চরণ নিভিছে জীবন, জীবন স্বামী’।। 

বড়ো অবেলায় পথের ভুলে বোধ হয় তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল রোকসানা। টিনের চালে থাকা শখের গানের মাস্টার কী দিয়ে বড়ো ঘরের রূপসীকে বরণ করবে? 

ঢাকার বন্ধু মোতাহার হোসেনের বাড়িতে থাকাকালীন ফজিলতুন্নেসার সঙ্গে পরিচিত হন নজরুল।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্কে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম বিদূষী সুন্দরী ফজিলতকে গানের খাতায় লিখে দিয়েছিলেন নয়টি গান। ‘বসিয়া নদীকূলে’, ‘নিশি ভোর হলো জাগিয়া’, ‘কেন উচাটন মন পরাণ’, ‘পরদেশী বঁধুয়া’, ‘এ বাসি  বাসরে’, ‘কে বিদেশী মন উদাসী’, ‘কেন কাঁদে পরাণ’, ‘এত জল ও কাজল চোখে’, ‘করুণ যেন অরুণ আঁখি’…। তারপর একদিন আচমকা রাতে হাজির হয়েছিলেন ফজিলতুন্নেসার ঠিকানায়, সেখানে থাকেন ফজিলত আর তার বোন শফিক। ‘আমি অনুতপ্ত কিন্তু এ কথা অস্বীকার করতে পারবো না যে আমি আপনাকে ভালোবেসেছি।’ কেন? দীর্ঘ নীরবতার পর মুখ খুলল ফজিলত; ‘কেন ভালোবেসেছেন? আপনার স্ত্রী-পুত্র-সংসার আছে, কৃষ্ণনগরে তাদের রেখে এসে আর একজনের কাছে... কোনো দায়দায়িত্ব নেই?’১০ দায়-দায়িত্বের কাছে ভালোবাসা বন্ধক রেখে ফিরে এসেছেন নজরুল। তারপরের দীর্ঘ ইতিহাস ক্ষমা চাওয়ার, গানের, সুরের ব্যথার। 

এম.এ. পাস করার পর ফজিলত যখন বিলেত যাবেন, একজন মুসলমান মেয়ের এই লড়াইকে সংবর্ধিত করল কলকাতার বিশিষ্ট মুসলমান সমাজ। শহীদ সোহরাওয়ার্দি, এস. ওয়াজেদ আলি, খানবাহাদুর আসাদুজ্জামান প্রমুখদের উপস্থিতিতে সেই সভায় প্রিয় ফজিলতুন্নেসাকে আরেকবার গান শোনানোর সুযোগ পেয়েছিলেন নজরুল। 

‘জাগিলে পারুল কি গো সাত ভাই চম্পা ডাকে 
উদিলে চন্দ্র-লেখা বাদলের মেঘের ফাঁকে।’১১

‘চলিলে সাগর ঘুরে’, ‘অলকার মায়ার পুরে’ ইত্যাদি শুভেচ্ছা তো দাদরা তাল বয়ে নিল। কিন্তু এর জন্য তো আর নজরুল নজরুল নন! নজরুল আছেন শেষ চার লাইনে— 

‘থেকো না স্বর্গ ভুলে 
এ পারের মর্ত্য কূলে 
ভিড়ায়ো সোনার তরী 
আবার এই নদীর বাঁকে।।’১২ 

বিলেতের স্বর্গে গিয়ে এই মর্ত্যবাসীকে ভুলে যেও না। বড়ো হয়ে, আরো প্রতিষ্ঠিত হয়ে ফিরে এসো, এসো কিন্তু এই নদীর বাঁকে। গানের সুরে ভালোবাসার কথা দিয়ে রাখছিলেন নজরুল। এই চার লাইনে অনুচ্চারিত আছে আসলে ‘আমি’ তোমার অপেক্ষায় থাকব। 

আর ফজিলতুন্নেসা? বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে বিলেত থেকে ফিরে এসেছিলেন মাঝপথে। জয়েন করেছিলেন ইডেন কলেজে। বিয়ে করেছিলেন খানবাহাদুর আহসানউল্লাহর ছেলে শামসুজ্জোহাকে। একমাত্র কন্যা জুলিয়াসের জন্মের সময় কলকাতার ক্যাম্পবেল হাসপাতালে তিনি সঙ্গে করে নিয়ে গেছিলেন একটি খাতা! তার বালিশের নিচ থেকে সেটা উদ্ধার করে মাহফুজুর রহমানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন শামসুজ্জোহা সাহেবের ছোটো ভাই। 

নয়খানা গান লেখা সেই গানের খাতা! নজরুলের লেখার উল্টোদিকে ফজিলতুন্নেসার হাতের লেখায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা। কোথাও লেখা— 

‘তোমারে যা দিয়েছিনু তার 
পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার
হেথা মোর তিলে তিলে দান 
করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডুষ করিয়া করে পান
হৃদয় অঞ্জলি হতে মম।
ওগো তুমি নিরুপম
হে ঐশ্বর্যবান
তোমারে যা দিয়েছিনু তা তোমারই দান।’
পরের আরেকটি পৃষ্ঠায়— 
‘তোমায় কিছু দেবো বলে 
চায় যে আমার মন
নাই-বা তোমার থাকলো প্রয়োজন।’১৩

সাজান মাস্টার বাড়ি পৌঁছালেন। ভিতরের বারান্দায় সাইকেল রাখতে গিয়ে ভাবলেন আরেকবার গান শোনানোর সুযোগ তিনিও পেতেন! কী গান শোনাতেন রোকসানাকে? ওই গানটা? 

‘আমায় নহে গো ভালোবাস শুধু ভালোবাস মোর গান 
বনের পাখিরে কে চিনে রাখে গান হলে অবসান 
চাঁদেরে কে চায় জোছনা সবাই যাচে 
গীত শেষে বীণা পড়ে থাকে ধুলি মাঝে;
তুমি বুঝিবে না বুঝিবে না...।
আলো দিতে পোড়ে কত প্রদীপের প্রাণ।’।১৪

(তাল: দাদরা। সুর: শৈলেশ দত্তগুপ্ত। শিল্পী: সন্তোষ সেনগুপ্ত। রেকর্ড: এন ২৭৩২৩, অক্টোবর ১৯৪২, এইচ. এম. ভি।)১৫

শ্রান্ত সাজান মাস্টার হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে ঢোকেন। কোলে তুলে নেন শিশুপুত্রকে। বাল্বের আলোয় চা-মুড়ি নিয়ে আসেন স্ত্রী। ইনি গরীব সাজান মাস্টারের সদাসহযোগী যথাযোগ্য তবলচি। শান্ত, অভিযোগহীন। সাজান মাস্টার টেপরেকর্ড-এর প্লাগ তুলে নেন— সুইচ অন করে অনুরোধ করেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়কে।

‘সবাই তৃষ্ণা মেটায় নদীর জলে 
কী তৃষা জাগে সে নদীর হিয়া তলে—’ 

নদীর তৃষ্ণার খবর কে রাখে? ‘বেদনার মহাসাগরের কাছে কর সন্ধান’— সাজান মাস্টারের কি দায়দায়িত্ব নেই? মুড়ি খেতে খেতে বুঝতে পারেন সাজান মাস্টার— বেদনার মহাসাগর তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সাজান মাস্টার ক্যাসেট পাল্টে দেন— 

‘খেলা শেষ হল, শেষ হয় নাই বেলা।
কাঁদিও না, কাঁদিও না— তব তরে রেখে গেনু প্রেম আনন্দ মেলা 
খেলো খেলো তুমি আজো বেলা আছে 
খেলা শেষ হলে এসো মোর কাছে,
প্রেম যমুনার তীরে বসে রব লইয়া শূন্য ভেলা।’১৬

(তাল: দাদরা। সুরকার: কমল দাশগুপ্ত। শিল্পী: জগন্ময় মিত্র ও ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র। রেকর্ড: এইচ ২২৬৬, ১৯৬৫।)১৭

সাজান মাস্টার শুনছেন ফিরোজা বেগম। গান নয় যেন কাঁদছেন ফিরোজা বেগম। ‘খেলা’ শব্দটা নিয়ে এমন খেলা আর কে খেলেছেন! তোমার নবীন বয়স, রোমাঞ্চকর জীবন, তোমার খেলার বেলা এখনও আছে। খেলা ভাঙার খেলা শেষ হলে, ফিরে এসো একদিন স্কুলের পিছনে সেই কৃষ্ণচূড়ার কাছে। 

‘যাহারা আমার বিচার করেছে— ভুল করিয়াছে জানি 
তাহাদের তরে রেখে গেনু মোর বিদায়ের গানখানি।’ 

নজরুল কি জানতেন একদিন এসবের বিচার হবে? একাধিক মহিলা নামের গসিপ-গপ্পে ঢেকে যাবে প্রেমের ফরিয়াদ। সময় শেষ হলে তো থেমে যেতে হয়। সাজান মাস্টারও থেমে গেছেন। সাজান মাস্টারের খেলা শেষ হয়েছে। আর সে লাল-বেনারসী পরে নতুন খেলার ডাকে চলে গেছে শহরের দিকে। বন্ধুদের কাছে সাজান মাস্টার সে খবর পরদিন পেয়েছেন হাটের রাস্তায়। 

‘হই কলঙ্কী, হোক মোর ভুল 
বালুকার বুকে ফুটায়েছি ফুল 
তুমিও ভুলিতে নারিবে সে কথা— হানো যত অবহেলা।।’ 

অন্ধকারে বালুর তরমুজ ক্ষেত চিকচিক করে, পেয়ারা গাছের ডাল থেকে উড়ে যায় রাতচরা পাখি। সাজান মাস্টারের শখের টেপরেকর্ডারে সতীনাথ, ফিরোজা বেগম, মানবেন্দ্র— ফুলের জলসা চলতে থাকে। মফস্বলের টিনের ঘরে সন্ধ্যা সেজে ওঠে।

তারপর রাত আসে। জৈষ্ঠ্যের গুমোট রাত। শেষ দু-তিন হপ্তায় কোনো বৃষ্টি নেই। সাজান মাস্টারের খোলা জানালায় নদীর বাতাস খেলে। আজ কি বৃষ্টি হবে? শ্রাবণ ফিরে আসে কিন্তু একবার যে যায় সে আর ফেরে না। শ্রাবণ নয় শাওন! শাওন কী নজরুলের প্রিয় লব্জ? 

‘শাওন আসিল ফিরে সে ফিরে এল না 
করুণা ফুরায়ে গেল আশা তবু গেল না।। 
ধানি রঙ ঘাঘরি, মেঘ-রঙ ওড়না 
পরিতে আমারে মাগো, অনুরোধ করো না 
কাজরির কাজল মেঘ পথ পেল খুঁজিয়া 
সে কি ফেরার পথ পেল না মা, পেল না।’ 

(তাল: কাহারবা। শিল্পী: ধীরেন্দ্রনাথ মিত্র। রেকর্ড এন ২৭৩৭৮, জুন ১৯৪৩, এইচ.এম.ভি।)১৯  

এই দুনিয়া আর কোনোদিন মেঘরঙ ওড়নায় উঠতে পারবে তুমি ছাড়া? রাস্তা চিনে ফিরে এলো মেঘ। কতদিন টিনের চালে রাতভোর বৃষ্টি ধুইয়ে গেল গানের মাস্টারের চোখের জল। নজরুলের কাছে ফিরলেন না ফজিলতুন্নেসা। ফিরবে না রোকসানাও। 

রোকসানার কোথায় বিয়ে হয়েছে সাজান মাস্টার জানেন। রোকসানার নতুন খেলার সাথী উচ্চপদস্থ মানুষ। নিশ্চয়ই উচ্চমনেরও। গান, কবিতা, নাটক, অর্থ-বিত্ত মিলিয়ে সমাজ ও সংস্কৃতির উঁচুমহলে তার যাতায়াত। হাটে দোকানদারি করতে করতে সাজান এসব খবর পেয়েছেন আগেই। অলীক, অসম্ভব তিনি জীবনে আশা করেন না। এই তো উৎসব অনুষ্ঠানে কিছু জামা-প্যান্টের অর্ডার-মাপ, কয়েকটা গানের টিউশনি। আর? আর নজরুলের গান। ঘুম না-আসা রাতে সাজান মাস্টার জানালার কাছে এসে দাঁড়ান। 

এক জীবন অন্ধকার সাজান মাস্টারকে গান শোনাতে আসে।
‘আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়, চাঁদ নেহারি প্রিয় 
মোরে যদি মনে পড়ে, বাতায়ন বন্ধ করিয়া দিও।। 
সুরের ডুবুরিতে জপমালা সম 
তব নাম গাঁথা ছিল প্রিয়তম 
দুয়ারে ভিখারি গাহিলে সে গান, তুমি ফিরে না চাহিও 
অভিশাপ দিও, বকুল কুঞ্জে যদি কুহু গেয়ে ওঠে,
চরণে দলিও সেই জুঁই গাছে আর যদি ফুল ফোটে।।’২০ 

(রাগ: মেঘমল্লার। তাল: দাদরা। সুর: সুবল দাশগুপ্ত।)২১ 

এক অভিমানের সওদাগর এক একটা ঘুম না-আসা রাতে সাজান মাস্টারের পাশে এসে বসেন। বেঁচে থাকার যন্ত্রণাকে, অভাব-অনটনের কষ্টকে কথার জাদুতে ভুলিয়ে দিয়ে যান। 

‘মোর স্মৃতি আছে যা কিছু যেথায় 
যেন তাহা চিরতরে মুছে যায় 
(মোর) যে ছবি ভাঙিয়া ফেলেছ ধূলায় (তারে) আর 
তুলে নাহি নিও’ 

নিজে বুঁদ হয়ে আছেন যে স্মৃতিতে, আরেকজনকে বলছেন সেই সব, আবার স-ও-ও-ব স্মৃতি তুমি মুছে ফেলো। ভিখারির গান, পাখির ডাক, ফোটা ফুল— যা কিছু আমার কথা মনে পড়াবে— সে-সবকে তুমি অভিশাপ দিও, পায়ে পিষে দিও। কী আশ্চর্য, কী বিচিত্র বিষয় এই মহব্বত। আরও বিচিত্র-বেফিকর বোধহয় প্রেমিক নজরুল। ফজরের আজান শুনে সাজান মাস্টার ঘোর কাটিয়ে উঠলেন। ভোর হয়ে এলো।

এমনিতে উৎসবের মরশুম ছাড়া জামা-কাপড় বানানোর চল নেই এ-গ্রামদেশে। ধীরেসুস্থে এক-পেট পান্তা খেয়ে গরমের দিনে দোকান খুললেও সাজান মাস্টারের চলে। কিন্তু আজ তিনি দোকান খুলবেন না। জৈষ্ঠ্য মাসের এই দিনে সাজান মাস্টারের দোকান বন্ধ থাকে। ভোর হয়ে আসছে। সাজান মাস্টার দরজা খুলে দিলেন। পেঁপের ডালে এসে বসল একটা বুলবুলি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাজান মাস্টার পিছন দিকে ফিরলেন। হাত রাখলেন ঘুমন্ত স্ত্রীর মাথায়, ঘুমন্ত শিশুপুত্রের গালে আদর করলেন একবার, তারপর বেরিয়ে বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন একটা বাঁধানো ফটোর সামনে, মিজানুরের দোকান থেকে এ-ছবি নিয়ে এসেছিলেন সেই কৃষ্ণচূড়া সকালে। মাঝখানে সিঁথি, দুই দিকে নেমেছে অবিন্যস্ত চুলের ঝালর। কত কথা চোখে নিয়ে তাকিয়ে আছেন নজরুল ইসলাম। আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ। নজরুলের জন্মদিন। এ-পোড়া-দেশে কতকাল আগে এক অভিমানী প্রেমিক, ব্যথাতুরদের ‘হামসুখন’ জন্মেছিলেন। পৃথিবীর জন্য রেখে যাওয়া তাঁর সুরের মণিমুক্তা এক জায়গায় জড়ো করতেই আমাদের কেটে গেছে কত কাল। আজও কি তা পরিপূর্ণভাবে করে ওঠা গেছে? কত গান, কত সুর নাম উল্লেখ ছাড়াই কিংবা অন্য নামে ব্যবহৃত হয়েছে, হয়ে যাচ্ছে অক্লেশে। দিওয়ানা নজরুলের দিওয়ানগীর দাম আমরা দিতে পারলাম কই? 

টেপরেকর্ডটা বারান্দায় এনে সেট করলেন সাজান মাস্টার। আজকের দিনে আর পাঁচজনকেও নজরুলের গান শোনানো তিনি কর্তব্য মনে করেন। বারান্দায় রোদ এসে পড়েছে। ক্যাসেটে গাইতে শুরু করলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়— 

‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব তবু আমারে দেব না ভুলিতে 
আমি বাতাস হইয়া জড়াইব কেশ বেনী যাবে যবে খুলি
তোমার সুরের নেশায় যখন 
ঝিমাবে আকাশ কাঁদিবে পবন 
রোদন হইয়া আসিব তখন তোমার বক্ষে দুলিতে’২২ 

(তাল: দাদরা। সুর: চিত্ত রায় (বুলেটিন)। শিল্পী : চিত্ত রায়। রেকর্ড : এন ২৭২৯২, ১৯৪২ জুলাই)২৩

পরম আদরে নজরুলের ছবিতে চন্দনের ফোঁটা দিচ্ছেন বহুদূর গ্রামের এক অখ্যাত নজরুল ভক্ত। বাড়ির সামনের ঝোপ থেকে তুলে এনেছেন কয়েকটা গ্রাম্য ফুল। যেন প্রেমিকাকেই সাজাচ্ছেন সাজান মাস্টার।

‘আসিবে তোমার পরোমৎসবে কত প্রিয়জন কে জানে 
মনে পড়ে যাবে কোন সে ভিখারি পায়নি ভিক্ষা এখানে 
তোমার কুঞ্জ-পথে যেতে হায় 
চমকে থামিয়া যাবে বেদনায় 
দেখিবে কে যেন মরে মিশে আছে তোমার পথের ধুলিতে।।’ 

এরকম প্রেমিক আগে দেখেছেন কখনো? একই লাইনে চিরতরে চলে যাওয়ার কথা বলছেন এবং আমাকে ভুলতে দেব না এও বলছেন। না-পাওয়ার কষ্ট এবং পাওয়ার নাছোড়বান্দা আকাঙ্ক্ষা, চলে যাওয়ার মায়া এবং থেকে যাওয়ার ভালোবাসা একই উচ্চারণে মিশে তৈরি করেছে নজরুলের গান। চলে যাচ্ছি ঠিক, কিন্তু আসলে তো আমি থেকেই যাচ্ছি। তোমার চুলের দোলায়, তোমার বুকের গন্ধে। কত উৎসব, আনন্দ তোমার জীবনে। তোমার চারপাশে প্রিয় মানুষদের ভীড়। এত শব্দ, এত চিৎকারের মাঝেও তোমার মনে পড়বে তোমার এক চাহনেওয়ালা, এক প্রেমিক তোমারই পথের ধূলায় মরে মিশে আছে। আহা! নজরুল ছাড়া এই অপরূপ দিল্লাগী আর কোথায় পাব আমরা? ফুলগুলো ছবির সামনে রাখতে রাখতে বিড়বিড় করে ওঠেন প্রতিবেশীদের প্রিয় ‘নজরুল-পাগলা’ আমাদের সাজান মাস্টার— 

প্রিয় রোকসানা, নজরুলের জন্মদিনে এই গানের সওগাত তুমি নাও।



তথ্যসূত্র:

১. কাজী কল্যাণী (সম্পা.), কাজী নজরুলের গান, সাহিত্য ভারতী পাব্‌লিকেশন্‌স্‌ প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, পৃ. ২০।

২. সেনগুপ্ত কল্পতরু (সম্পা.), নজরুলগীতি সহায়িকা, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সঙ্গীত আকাদেমি, জুন ১৯৯৭, পৃ. ২০৪।

৩. কাজী নজরুলের গান, পৃ. ৯০।

৪. নজরুলগীতি সহায়িকা, পৃ. ৪৮।

৫. কাজী নজরুলের গান, পৃ. ৩।

৬. নজরুলগীতি সহায়িকা, পৃ. ৪৩৯।

৭. দাস সুধীন (স্বরলিপিকার), নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, (প্রথম খণ্ড), নজরুল ইন্সটিটিউট, পৃ. ৬৩।

৮. কাজী নজরুলের গান, পৃ. ৬২৫।

৯. নজরুলগীতি সহায়িকা, পৃ. ৪২৩।

১০. চৌধুরী বিশ্বজিৎ, কবি ও রহস্যময়ী, প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি ২০২০, পৃ. ৫৩।

১১. কাজী নজরুলের গান, পৃ. ৪৭৯।

১২. ওই।

১৩. কবি ও রহস্যময়ী, পৃ. ১৮৮-১৮৯।

১৪. কাজী নজরুলের গান, পৃ. ১৫৫।

১৫. নজরুল গীতি সহায়িকা, পৃ. ৪৬।

১৬. কাজী নজরুলের গান, পৃ. ৩৬০।

১৭. নজরুলগীতি সহায়িকা, পৃ. ১৬৭।

১৮. কাজী নজরুলের গান, পৃ. ৮৪।

১৯. নজরুলগীতি সহায়িকা, পৃ. ৪৩৮।

২০. কাজী নজরুলের গান, পৃ. ৩০৮।

২১. নজরুলগীতি সহায়িকা, পৃ. ২৭।

২২. কাজী নজরুলের গান, পৃ. ৩৫।

২৩. নজরুলগীতি সহায়িকা, পৃ. ৫১। 


প্রবন্ধে উল্লেখিত গানগুলোর লিঙ্ক—

আকাশে আজ ছড়িয়ে দিলাম প্রিয় (প্রবন্ধের শিরোনাম)

তুমি যদি রাধা হতে 

আমি কূল ছেড়ে 

শাওন রাতে যদি 

হারানো হিয়ার

আমায় নহে গো

খেলা শেষ হলো 

শাওন আসিল ফিরে 

আধো রাতে যদি 

আমি চিরতরে দূরে 

 


প্রকাশের তারিখ: ২৬-মে-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org