|
নয়া-ফ্যাসিবাদ: একটি নোটপলিট ব্যুরো |
নয়া-ফ্যাসিবাদের মধ্যে কিছু কিছু উপাদান রয়েছে, যা বিশ শতকের গোড়ার দিককার ফ্যাসিবাদের মতেই। এগুলি হল উগ্র জাতীয়তাবাদ, যার ভিত্তি ঐতিহাসিক ভুল ও অন্যায় সম্পর্কে কল্পিত অনুভূতি, অপর-কে নিশানা করা– বর্ণভিত্তিক, ধর্মভিত্তিক কিংবা জাতিগত সংখ্যালঘু। এবং উগ্র দক্ষিণপন্থী/নয়া-ফ্যাসিবাদী দল অথবা শক্তিগুলির পিছনে বৃহৎ বুর্জোয়ার সমর্থন। ভারতে, নয়া-ফ্যাসিবাদকে নির্দিষ্ট চেহারা দিচ্ছে আরএসএস ও তাদের হিন্দুত্বের মতাদর্শ, আমাদের পার্টির কর্মসূচি অনুযায়ী যা ফ্যাসিস্ত-ধাঁচের। |
১৭-১৯ জানুয়ারি, ২০২৫-এ অনুষ্ঠিত সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পলিট ব্যুরো ‘নয়া-ফ্যাসিবাদ’ শব্দবন্ধটির ব্যবহারের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত একটি নোট প্রকাশ করেছে, যা খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাবের সঙ্গেই প্রকাশ করার কথা। যেহেতু সংবাদমাধ্যমে এই নোটটির কিছু ভুল ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়েছে, সেকারণে ওই নোটের সম্পূর্ণ অংশটি নিচে প্রকাশ করা হল। ১। খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাবে বলা হয়েছে: প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দুত্বের অ্যাজেন্ডা জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং বিরোধীশক্তি ও গণতন্ত্রকে দমন করার লক্ষ্যে কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপের মধ্যে ফুটে উঠেছে নয়া-ফ্যাসিবাদী (নিও ফ্যাসিস্ত) বৈশিষ্ট্যগুলি। জাতীয় পরিস্থিতি প্রসঙ্গে রাজনৈতিক প্রস্তাবে এই প্রথম আমরা নয়া-ফ্যাসিবাদী শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছি। ২। এর আগে ২২তম কংগ্রেসে, আমরা বলেছিলাম: কর্তৃত্ববাদী এবং হিন্দু্ত্ব সাম্প্রদায়িক আক্রমণগুলির মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিকাশমান ফ্যাসিস্ত-ধাঁচের প্রবণতাগুলি। ২৩তম কংগ্রেসে আমরা বলেছিলাম, মোদী সরকার আরএসএস-এর ফ্যাসিস্ত-ধাঁচের অ্যাজেন্ডাগুলিই কার্যকর করছে। ৩। নয়া-ফ্যাসিবাদ– এই শব্দবন্ধটির অর্থ কী? নিও মানে নতুন, কিংবা পুরোনো কোনও কিছুর সাম্প্রতিক সংস্করণ। নয়া-ফ্যাসিবাদ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়েছে বিষয়টিকে চিরায়ত (বা ধ্রুপদী) ফ্যাসিবাদ থেকে পৃথকীকরণের জন্য। চিরায়ত ফ্যাসিবাদের উত্থান হয়েছিল ইউরোপে দুটি যুদ্ধের মাঝখানের পর্বে, যেমন ইতালিতে মুসোলিনী ও জার্মানিতে হিটলারের অধীনে। এটি ছিল সেই যুগ, যখন বিশ্ব পুঁজিবাদের সংকটের পরিণতিতে ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে দেখা দিয়েছিল মহামন্দা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যেকার দ্বন্দ্ব হচ্ছিল তীব্র। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুটিই ছিল সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের পরিণতি। ক্ষমতা দখলের পর ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে উচ্ছেদ করেছিল। এবং যুদ্ধকে ব্যবহার করেছিল অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি উপায় হিসাবে। এই সব দেশে একচেটিয়া পুঁজি পুরোপুরি মদত দিয়েছিল ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলিকে। এবং সংকটকে মোকাবিলার লক্ষ্যে চরম পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য এই শক্তিগুলির ওপর নির্ভর করেছিল। ৪। নয়া-ফ্যাসিবাদের মধ্যে কিছু কিছু উপাদান রয়েছে, যা বিশ শতকের গোড়ার দিককার ফ্যাসিবাদের মতেই। এগুলি হল উগ্র জাতীয়তাবাদ, যার ভিত্তি ঐতিহাসিক ভুল ও অন্যায় সম্পর্কে কল্পিত অনুভূতি, অপর-কে নিশানা করা– বর্ণভিত্তিক, ধর্মভিত্তিক কিংবা জাতিগত সংখ্যালঘু। এবং উগ্র দক্ষিণপন্থী/নয়া-ফ্যাসিবাদী দল অথবা শক্তিগুলির পিছনে বৃহৎ বুর্জোয়ার সমর্থন। ভারতে, নয়া-ফ্যাসিবাদকে নির্দিষ্ট চেহারা দিচ্ছে আরএসএস ও তাদের হিন্দুত্বের মতাদর্শ, আমাদের পার্টির কর্মসূচি অনুযায়ী যা ফ্যাসিস্ত-ধাঁচের। বিজেপি শাসনে তারা তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে সমর্থ হচ্ছে। সংকীর্ণ হিন্দুত্বের মতাদর্শ, নয়া-উদারবাদী সংকট এবং বৃহৎ বুর্জোয়াদের স্বার্থরক্ষায় কর্তৃত্ববাদী শাসন চাপিয়ে দেওয়া– মিলিতভাবে এগুলির সবকটিই নয়া-ফ্যাসিবাদের উপাদানসমূহের আদিরূপ। ৫। নয়া-ফ্যাসিবাদ নয়া-উদারবাদের সংকটের ফসল। এবং বিষয়টি বিশ্বজনীন। নয়া-ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি বিভিন্ন দেশে মাথাচাড়া দিয়েছে এবং কয়েকটি দেশে তারা ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকের মতো সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব এখন আর তীব্র নয়, বরং স্তিমিত, আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির উত্থানের সঙ্গেই। ফলে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে নয়া-ফ্যাসিবাদী শাসকেরা এখন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে না। নয়া উদারবাদী সংকট এবং সেই সংকট থেকে জন্ম নেওয়া জনগণের অসন্তোষকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে উগ্র-দক্ষিণপন্থী ও নয়া-ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি। আর এজন্য তারা জনমোহিনী শব্দবন্ধগুলিকে ব্যবহার করছে। কিন্তু যখন তারা ক্ষমতায় আসে, তখন তারা নয়া-উদারবাদী নীতিগুলি থেকে বিচ্ছেদ ঘটায় না। বরং বৃহৎ পুঁজির স্বার্থরক্ষা করার জন্য সেই নীতিগুলিই কার্যকর করে। চিরায়ত ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আরেকটি ফারাক হল এই যে, নয়া-ফ্যাসিবাদী দলগুলি নির্বাচনকে কাজে লাগায় তাদের রাজনৈতিক প্রকল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এবং যদি তারা ক্ষমতায় আসেও, তাহলেও তারা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে তুলে দেয় না। তারা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে। কিন্তু বিরোধীদের দমন করার জন্য এবং নানা সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতিগুলি কাজে লাগায়। দীর্ঘকালীন সময়ের জন্য রাষ্ট্রের ভিতরে সক্রিয় থেকেই তারা রাষ্ট্রকাঠমোয় বদল আনতে চায়। ৬। আমরা বলেছি, বিজেপি-আরএসএসের নেতৃত্বে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি হিন্দুত্ব-কর্পোরেট কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা, যার মধ্যে ফুটে উঠেছে নয়া-ফ্যাসিস্ত-ধাঁচের বৈশিষ্ট্যগুলি। আমরা একথা বলছি না যে মোদী সরকার একটি ফ্যাসিবাদী কিংবা নয়া-ফ্যাসিবাদী সরকার। আমরা ভারত রাষ্ট্রকে নয়া-ফ্যাসিবাদী চরিত্রের রাষ্ট্র হিসাবেও চিহ্নিত করছি না। আমরা যে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে জোর দিচ্ছি তা হল, বিজেপি আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা এবং একটানা দশ বছরের বিজেপি শাসনের ফলে বিজেপি-আরএসএসের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা সংহত হয়েছে। এবং এর ফলে নয়া-ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যগুলি স্পষ্ট হচ্ছে। বৈশিষ্ট্যগুলি শব্দটির অর্থ হল, লক্ষণ বা প্রবণতা। তবে সেই প্রবণতাগুলি এখনও নয়া-ফ্যাসিবাদী সরকার এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসাবে পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়ে ওঠেনি। সুতরাং রাজনৈতিক প্রস্তাবে যা বলা হয়েছে, তা হল, হিন্দুত্ব-কর্পোরেট কর্তৃত্ববাদ যে নয়া-ফ্যাসিবাদের অভিমুখে চলেছে, সেই বিপদের কথা। আর এমনটা ঘটবে যদি বিজেপি-আরএসএসের বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে তোলা না যায়, এবং তাদের থামানো না-যায়। ৭। এই অবস্থান সিপিআই এবং সিপিআই(এমএল)-এর থেকে পৃথক। মোদী সরকার একটি ফ্যাসিস্ত সরকার, এভাবেই চিহ্নিত করেছে সিপিআই। আর সিপিআই(এমএল) বলেছে, ভারতীয় ফ্যাসিবাদ ক্ষমতায় এসেছে। প্রকাশের তারিখ: ০১-মার্চ-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |