|
শরিকদের ভোট কিনতে নেতানিয়াহুর গণহত্যাটিম মার্কসবাদী পথ |
‘যদিও যুদ্ধের পরিধি এবং সময়কাল এখনও অস্পষ্ট, তবুও সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়কে নেতানিয়াহুর পরবর্তী ৪৮-ঘন্টার গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় অ্যাজেন্ডার আগে তাঁর জোট সংকটের মুখোমুখি হওয়া থেকে আলাদা করা খুবই কঠিন।’ বলেছেন বার-এলি। যোগ করেছেন, ‘অর্থনৈতিক বিল নিয়ে নেসেটে ভোটাভুটির দিন ঠিক ছিল বুধবার। আর ২০২৫ সালের বাজেট অনুমোদনের জন্য একাধিক ভোট শেষ হওয়ার কথা সোমবার। ঘটনা হলো, এই বিলগুলি পাস করার জন্য শাসকজোটের কাছে নেই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা। যার অর্থ, বাজেট অনুমোদিত নাহলে বর্তমান নেসেটের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে এমাসের শেষে।’ |
যুদ্ধবাজ শরিকদের ভোট কিনতে প্যালেস্তিনীয়দের জীবন নিয়ে খেলছেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। সরকার টিকিয়ে রাখতে তাই নতুন করে গণহত্যা। মঙ্গলবারের কাকভোর। একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে গাজায় বেপরোয়া বোমাবর্ষণ শুরু করে ইজরায়েল। মাত্র দু’মাস আগে যে শর্তগুলি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তেল আভিভ, এই আগ্রাসী বিমান হানা তার সবচেয়ে ভয়াবহ লঙ্ঘনের উদাহরণ। যদিও এর আগে গাজা সীমান্তে সমস্ত রকমের মানবিক ত্রাণ-সহায়তা আটকে দিয়ে নেতানিয়াহুর প্রশাসন তা লঙ্ঘন করেছে। আল-জাজিরা’র শুক্রবারের খবর, গাজার স্বাস্থ্যদপ্তরের হিসেবে তিনদিনে নিহতের সংখ্যা ৫৯০। ইউনিসেফের মুখপাত্র জানিয়েছেন এর মধ্যে অন্তত ২০০ শিশু। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন করে সমরাস্ত্র সরবরাহের পর ইজরায়েলি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী মেনে চলার আর কোনও প্রয়োজন নেই। গত কয়েকসপ্তাহ ধরেই ইজরায়েল চুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছে। চুক্তির শর্ত মেনে গাজা উপত্যকা থেকে, বিশেষ করে ফিলাডেলফি করিডোর থেকে ইজরায়েলি বাহিনী সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করেনি। বিপরীতে, হামাস ইজরায়েলের এই চুক্তি লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। নতুন করে মার্কিন মধ্যস্থতার উদ্যোগ মেনে বন্দি মুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাওয়ার কোনও আগ্রহ তারা দেখায়নি। যার ফলে আলোচনা স্থগিত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু, এটিই সাম্প্রতিক হামলার একমাত্র লক্ষ্য নয়। অন্যান্য বিষয়ও রয়েছে এই সামরিক অভিযানের মধ্যে। নেতানিয়াহুর সামরিক অভিযান ফের শুরু করার ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন তাঁর জোট সংকটের মুখে, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে। আগামী দিনে ইজরায়েলের সংসদ নেসেটে তার সরকারকে পড়তে হবে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখে– বিশেষ করে ২০২৫ সালের বাজেট অনুমোদনের পর। এমনকি ইজরায়েলের দাপুটে সংবাদমাধ্যম হারেৎজ-এর মধ্যপন্থী সামরিক ভাষ্যককার অ্যামোস হারেলের মতে, ‘মনে হচ্ছে যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত নিছক একটি নিরাপত্তা পদক্ষেপ নয়।’ গাজার উপর নতুন করে আক্রমণ আসলে নেতানিয়াহুর ভঙ্গুর জোটকে জোরদার করার একটি চেষ্টা। বিশেষ করে প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের উগ্র দক্ষিণপন্থী দল ওতজমা ইয়েহুদিত-কে আকৃষ্ট করা, যিনি যুদ্ধ জারি রাখাকে তাঁর রাজনৈতিক সমর্থনের পূর্বশর্ত হিসেবে দিয়েছিলেন। দাবি করেছিলেন জ্বালানি, বিদ্যুৎ থেকে জলের মতো সমস্ত রকমের মানবিক সহায়তা ‘পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে’। রাজনৈতিক সংকটে তাঁর শাসন যখন হুমকির মুখে, তখন গাজার যুদ্ধকে নেতানিয়াহু ব্যবহার করছেন নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্বের হাতিয়ার হিসেবে। এমনকি ইজরায়েলি পণবন্দিদের জীবনের বিনিময়ে। তিনি যখন সামরিক প্রয়োজনে ফের যুদ্ধ শুরু করার প্রচার করছেন, তখন বেআব্রু হচ্ছে তাঁর আসল উদ্দেশ্য: বেন-গভির এবং তার দলকে সরকারে ফিরিয়ে আনা, বাজেট পাস করা এবং ক্ষমতাসীন জোটের উপর তার নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করা। হারেল বলেছেন: ‘এটি নিছক হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, এর আরেকটি দিক হলো নেতানিয়াহু যাতে নিরন্তর যুদ্ধের ইন্ধন জুগিয়ে তার শাসনকে মজবুত করতে পারেন। এমনকি এর মূল্য যদি আরও বেশি বিশৃঙ্খলা এবং রক্তপাতে দিতে হয়, তবে তাতেও ক্ষতি নেই।’ ইজরায়েলি প্রকাশনা দ্য মার্কার-এর ভাষ্যকার আভি বার-এলি জানিয়েছেন, আটকদের ফেরানোর আলোচনায় অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে, ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর তৈরি এই সামরিক অভিযানের ব্লুপ্রিন্টটি পেশ করা হয় গত সপ্তাহের শেষের দিকে। এবং অনুমোদিত হয়। ‘যদিও যুদ্ধের পরিধি এবং সময়কাল এখনও অস্পষ্ট, তবুও সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়কে নেতানিয়াহুর পরবর্তী ৪৮-ঘন্টার গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় অ্যাজেন্ডার আগে তাঁর জোট সংকটের মুখোমুখি হওয়া থেকে আলাদা করা খুবই কঠিন।’ বলেছেন বার-এলি। যোগ করেছেন, ‘অর্থনৈতিক বিল নিয়ে নেসেটে ভোটাভুটির দিন ঠিক ছিল বুধবার। আর ২০২৫ সালের বাজেট অনুমোদনের জন্য একাধিক ভোট শেষ হওয়ার কথা সোমবার। ঘটনা হলো, এই বিলগুলি পাস করার জন্য শাসকজোটের কাছে নেই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা। যার অর্থ, বাজেট অনুমোদিত নাহলে বর্তমান নেসেটের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে এমাসের শেষে।’ যার অর্থ ইজরায়েলে নতুন করে নির্বাচন। নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা তলানিতে। পরাজয় নিশ্চিত। দুর্নীতি ও অন্যান্য অপরাধের জন্য তখন তাঁকে পড়তে হবে বিচারের মুখে। তা যাতে না ঘটে তার জন্যে তিনি মরিয়া। আর বাজেট যদি পাস করানো যায়, তাহলে অন্তত ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নেতানিয়াহু নিশ্চিন্ত। টিকে যাবে সরকার। দু’মাস আগে যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রতিবাদে বেন-গভিরের উগ্র দক্ষিণপন্থী দল জোট থেকে বেরিয়ে যায়। আরেকটি দক্ষিণপন্থী দল আগুদাত ইজরায়েল ঘোষণা করে তাদের অন্তত দু’জন সদস্য বাজেটের বিরুদ্ধে ভোট দেবেন। এই পরিস্থিতিতে ১২০-সদস্যের নেসেটে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তখন সাকুল্যে ৬১-সদস্যের নড়বড়ে গরিষ্ঠতা। এই রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে নেতানিয়াহুর অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচকে সোমবার জিজ্ঞাসা করা হলে তিনিও এই উদ্বেগগুলি অস্বীকার করেননি। বরং জোট শরিকদের কাছে বাজেটকে সমর্থন এবং সরকারের পতন যাতে না হয়, তার আহ্বান জানান। যদিও এতে নেতানিয়াহু পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি। সরকার পতনের ঝুঁকি এড়াতে নেতানিয়াহুর কাছে একমাত্র বিকল্প ছিল দক্ষিণপন্থীদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা। যার একটি অংশ ছিল বেন-গভিরকে জোটে ফিরিয়ে আনা। বেন-গভিরের মূল্যে গাজায় ফের আক্রমণ শুরু করা। এবং কয়েকশ প্রাণের বিনিময়ে নেতানিয়াহু তার সরকারের মূল্য চুকিয়েছেন। মঙ্গলবার গাজায় হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বেন-গভির ঘোষণা করেন, তাঁর দল সরকারে ফিরছে। কারণ, যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার যে দাবি ছিল, তা পূর্ণ হয়েছে। ইতিমধ্যেই তাঁকে নিরাপত্তামন্ত্রী হিসেবে ফের নিয়োগ করেছেন নেতানিয়াহু। বুধবার ৬৫-৪৬ ভোটে সংসদ তাঁর পুনর্নিয়োগকে অনুমোদন করেছে। বেন-গভির ফেরায় এখন নেতানিয়াহুর সঙ্গে রয়েছে ৬৮-সদস্যের গরিষ্ঠতা। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে নেতানিয়াহুর চূড়ান্ত লক্ষ্য সামরিক বিজয় অর্জন করা নয়। বরং একাধিক ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধের ইন্ধনের উপর ভিত্তি করে ইজরায়েলকে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজের ক্ষমতাকে মজবুত করা। প্রধানমন্ত্রী তার সর্বশেষ বিবৃতিতে ‘সাতটি ফ্রন্টে লড়াইয়ের’ কথা বলেছেন, যা আসলে ক্ষমতায় থাকার জন্য তার কৌশলকে বেআব্রু করেছে। ইজরায়েলি পণবন্দিদের মুক্তি? অন্তত নেতানিয়াহুর তা নিয়ে কোনও মাথাব্যাথা নেই। বরং যতদিন যুদ্ধ জারি থাকবে, ততদিন তা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য কাজ করবে। অতএব তাঁদের জন্য তাঁর বিন্দুমাত্রও উদ্বেগ নেই। আর গাজার প্যালেস্তিনীয়দের জীবন-যন্ত্রণা কখনোই ছিল না তাঁর হিসেবের মধ্যে। প্রকাশের তারিখ: ২৩-মার্চ-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |