যুদ্ধ নয়, যুদ্ধ নয়, তোলো আওয়াজ

শংকর মুখার্জি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তির দাবিতে প্রথম মিছিল হয়েছিল ভারতে। শ্রমিকরা এই মিছিল করেছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির ডাকে। তাই শান্তির দাবিতে লড়াইতে ভারতীয়দের, বিশেষকরে কমিউনিস্টদের এবং বামপন্থীদের লড়াইয়ের ঐতিহ্য দীর্ঘ। আজ ফ্যাসিস্ট আরএসএস-বিজেপি শাসনে এই লড়াইয়ের গুরুত্ব আরও গভীর। যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে তীব্র করেই সেই ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে হবে, মোদি সরকারের  মার্কিন লেজুড়বৃত্তি করার বিরুদ্ধে হুশিয়ারি জানাতে হবে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিপর্যয়ের ঘটনা আড়াই দশক অতিক্রান্ত।  

স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় বিশ্বে যে ঠাণ্ডাযুদ্ধের পরিবেশ ছিল এসময় সম্পূর্ণরূপে তা অনুপস্থিত। সোভিয়েত সহ পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিকে নিয়ে যে ওয়ারশ চুক্তি হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিপর্যয়ের সঙ্গে সঙ্গে তারও অবলুপ্তি ঘটেছে। সমাজতান্ত্রিক শিবিরের জুজু দেখিয়ে ১৯৪৯ সালে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে যে নর্থ আটলান্টিক ট্রিট্রি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটো তৈরি হয়, তার মোকাবিলাতেই পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি ওয়ারশ চুক্তির মধ্যদিয়ে এক সামরিক জোটে মিলিত হয়। যদিও এই জোটে সমাজতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন যুগোস্লাভিয়া ছিল না। সেই ওয়ারশ চুক্তির অবলুপ্তি হলেও বহালতবিয়তেই রয়ে গিয়েছে ন্যাটো, সোভিয়েত-উত্তর আড়াই দশকে   পূর্বদিকে ক্রমশ তার সম্প্রসারণ ঘটেই চলেছে। ১৯৯০ সালের আগে ন্যাটো সদস্যভুক্ত দেশ ছিল মাত্র ১৬টি, কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাদে যারা সবই ছিল পশ্চিম ইউরোপের। আর ২০২৬ সালে এই সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ৩২। যার মধ্যে রাশিয়ার সীমান্তে থাকা পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড পূর্বতন সোভিয়েত সাধারণতন্ত্র এস্তোনিয়া, লাটাভিয়া, লিথুয়ানিয়াও রয়েছে। আরেক পূর্বতন সোভিয়ত সাধারণতন্ত্র ইউক্রেন সরকারিভাবে ন্যাটোভুক্ত না হলেও, ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর মতোই আচরণ করে। পূর্বদিকে এগোতে এগোতে ন্যাটো এখন একেবারে রাশিয়ার সীমান্তে উপস্থিত হয়েছে। ন্যাটোর উপস্থিতির অর্থ যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপদ রাশিয়ার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গত চার বছরের অধিক সময় ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধেরও প্রধান কারণ ন্যাটোর এই পূর্বদিকে সম্প্রসারণবাদী নীতি। ন্যাটোর সামরিক কাজকর্ম এখন আর ইউরোপে সীমাবদ্ধ নেই, তারা সক্রিয়ভাবে এশিয়ার ব্যাপারেও নাক গলাচ্ছে।

সোভিয়েত নেই। কিন্তু বিশ্বের দেশে দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির সংখ্যা একটাও কমেনি, এখনও পর্যন্ত  যা তথ্য সহজলভ্য, তাতে জানা যাচ্ছে এই সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের তথ্য বলছে, বিশ্বে মোট দেশ আছে ১৯৫-র মতো। সব দেশে তো আর মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই, তাহলে বোঝাই যাচ্ছে এমন অনেক দেশ আছে যেখানে একাধিক মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। আবার ভারতের মতো দেশে যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই এ কথা সত্য, কিন্তু বিশেষকরে মোদি জমানায় সমস্ত ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক সমস্ত বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘জুনিয়র পার্টনার’-এ পরিণত হয়েছে আমাদের দেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সদ্য স্বাধীন দেশগুলির মধ্যে জোটনিরপেক্ষ অবস্থান, যুদ্ধবিরোধী অবস্থান এবং বিশ্বের যেকোনও জায়গায় মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে বলিষ্ঠ অবস্থানের কারণে সারা বিশ্বে ভারতের বিদেশনীতি শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সেই ভারত এখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লেজুড়বৃত্তি করছে। দুই দেশের মধ্যে এমন অনেক চুক্তিও হয়েছে যেখানে বলা আছে, কোনও যুদ্ধের সময় ভারতের বিমানবন্দর কিংবা সমুদ্রবন্দরগুলিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবে। অন্যদিকে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও উত্তেজনা বাড়াতে অতি সক্রিয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।  বঙ্গোপসাগর, আরবসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ায় নিয়মিতভাবে অংশ নিচ্ছে ভারত,  জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। এখানে তাদের লক্ষ্য হলো সমাজতান্ত্রিক চীন। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বৈদেশিক বাণিজ্যে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাই একদিকে যেমন চীনের বিরুদ্ধে শুল্ক-যুদ্ধ চালাচ্ছে, একইসঙ্গে চীনকে সামরিকভাবে ঘিরে ফেলতে চাইছে তারা, এই পরিকল্পনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল সহযোগী হিসেবে কাজ করছে ভারত। এসব কারণে চীন সামরিক খাতে ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। যদিও এখনও সারা বিশ্বে সামরিক খাতে সম্মিলিত যা ব্যয় হয় তার অর্ধেকই করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। 

।।দুই।।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বজুড়ে এত সামরিক প্রস্তুতি, আয়োজন এবং সর্বোপরি ষড়যন্ত্র চলবে, আর পৃথিবী যুদ্ধ-মুক্ত থাকবে সেটা কখনও বাস্তবসম্মত ভাবনা নয়। তাই ঠাণ্ডাযুদ্ধের অবসান সত্ত্বেও পৃথিবী যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মুক্ত থাকেনি। আর এসময়ের যুদ্ধে নিউক্লিয় অস্ত্র ব্যবহারের বিপদের আশঙ্কা বহুগুণ বেড়েছে। ওই দশকগুলিতে দুটো উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকে সাদ্দামের শাসনের উচ্ছেদ ঘটেছে। মার্কিন আগ্রাসনে ইরাকে কয়েক লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আর সমস্ত তৈল সম্পদ যা ছিল ইরাকের সার্বভৌম, তার ওপর সম্পূর্ণ দখল কায়েম হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। কসোভো যুদ্ধে ন্যাটো যুগোস্লাভিয়াকে সাতটা ভাগে বিভক্ত করেছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আফগানিস্তানে তালিবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুখ পুড়লেও, সেখানেও লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ গিয়েছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার প্রায় দুদশক পর আফগানিস্তান ফের সেই কট্টর মৌলবাদী তালিবানদের শাসনেই ফিরে গিয়েছে। গত শতকের আশির দশকে আফগানিস্তানের বামপন্থী গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল সরকারকে উচ্ছেদের জন্য অর্থ অস্ত্র দিয়ে এই সন্ত্রাসবাদী শক্তি তৈরিতে মদত দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আফ্রিকার লিবিয়াতেও সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে গদ্দাফি শাসনের পতন নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানকার রাষ্ট্রের মালিকানায় থাকা খনিজ তেলের দখল নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলি, যে সম্পদের ওপর তাদের বহুদিনের নজর ছিল। আর আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলি সহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দখলদারি কায়েমের জন্য কত জায়গায় যে ছায়াযুদ্ধ চালিয়েছে, নয়া উদারনীতির নামে কঠিন শর্ত আরোপ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার হিসাব করা সত্যিই শক্ত।  

।।তিন।।

একেবারে বর্তমান সময়ে, একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে, ভয়াবহ কেভিড-উত্তর সময়েও সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ মদতে বিশ্বের দুটো ভূখণ্ডে যুদ্ধ চলছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কথা তো জেনেছি, যেখানে ইউক্রেনের আড়ালে ন্যাটো রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলি  বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সাহায্য করে চলেছে ইউক্রেনকে। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে  সাহায্য করেছে ১৯৫ বিলিয়ন ডলার। ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি জেলেনেস্কি এখন পুরোপুরি সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়ানকে পরিণত হয়েছেন। ইউক্রেনের বড় অংশ রশিয়ার দখলে এলেও যুদ্ধবিরতির কোনও সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না সেখানে। 

দ্বিতীয় বড় যুদ্ধ চলছে পশ্চিম এশিয়াতে, ইরানের বিরুদ্ধে এখানে যুদ্ধঘোষণা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যৌথভাবে। পশ্চিম এশিয়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি সাহায্যপ্রাপ্ত দেশ হলো ইজরায়েল। এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের অনুকূলে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  বড় হাতিয়ার হলো ইজরায়েল। আর এ পথে বড বাধা ইরান। তাই ইরানকে যেভাবে হোক পদানত করানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের বৈদেশিক নীতির এখন অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আর এর সঙ্গে রয়েছে ইরানের তেলসম্পদের দখল এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর নিরুঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ। ইরানকে দখল করা যতটা সহজ হবে ভেবেছিল মার্কিন-ইজরায়েল জোট, সেটা যে বাস্তবে হচ্ছে না তা তারা এখন উপলব্ধি করছে। তবে কার্যকরী যুদ্ধবিরতির কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

পাশাপাশি, গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ন্যক্কারজনক সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চলেছে গাজাতে। হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আড়ালে সমগ্র গাজাকে ধ্বংস করেছে ইজরায়েল। শিশু নারী সহ যে লক্ষাধিক মানুষকে যেভাবে তারা হত্যা করেছে তা গত শতকের হলোকাস্টের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। এখানেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট ২২ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছ ইজরায়েলকে। জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্সের মতো দেশও অস্ত্র রফতানি করেছে ইজরায়েলকে। সবচেয়ে লজ্জাজনক অবস্থা ভারতীয়দের। প্যালেস্তিনীয়দের মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীন প্যালেস্তাইনের পক্ষে সেই  স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলি থেকে ভারত  থেকেছে। সেই ভারতই মোদির শাসনে ইজরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু-রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। গাজায় গণহত্যা চালানোর জন্য ভারতও কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র রফতানি করেছে ইজরায়েলে। সরকারিভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও ইজরায়েল এখনও গাজা ও ওয়েস্টব্যাঙ্কে হামলা চালিয়েই যাচ্ছে। এবং যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থন রয়েছে। যেভাবে ঘটনাক্রম এগোচ্ছে, এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প যে নীতি নিয়েছে তাতে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে গাজা সহ বাকি অংশ সম্পূর্ণভাবে ইজরায়েল দখল করে নেবে।

লাতিন আমেরিকা, যেখানে বিভিন্নদেশে বিপ্লবী বামপন্থী শক্তির অগ্রগতির ফলে এ শতকের প্রথমদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা পিছু হটেছিল, সাম্প্রতিক সময়ে সেখানেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বীভৎস আগ্রাসন দেখা যাচ্ছে। ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের দখল নিতে সেখানকার বামপন্থী রাষ্ট্রপতি মাদুরো ও তার স্ত্রী-কে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইতিমধ্যে বকলমে ভেনজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব কায়েম করেছে তারা। খনিজ তেলের সমস্ত রফতানি এখন মার্কিন নির্দেশে হচ্ছে। আর ছদশকের বেশি সময় ধরে কিউবার ওপর চলা অর্থনৈতিক অবরোধকে আরও  কঠোর করেছে ট্রাম্প। এই অবরোধে বিদেশ থেকে খনিজ তেল, ওষুধ সহ সমস্ত কিছু রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি ভেনেজুয়েলার পর সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে কিউবার সমাজতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটানোরও হুমকি দিয়েছে ট্রাম্প।

।।চার।।

আজ থেকে চার দশকেরও বেশি সময় আগে ১৯৮২ সালে শ্রেণিসংগ্রামে বিশ্বাসী ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব ট্রেড ইউনিয়ন (ডব্লিউ এফটিইউ) ১ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী আন্তর্জাতিক শান্তি ও সংহতি দিবস পালনের ডাক দিয়েছিল। এই ১ সেপ্টেম্বর দিনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য আমাদের সবারই  জানি। ১৯৩৯ সালের এই দিনেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিস্ট হিটলারকে পরাজিত করতে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের লালফৌজ ও জনগণকে বিরাট মূল্য দিতে হয়েছিল। শুধু দুকোটিরও বেশি মানুষের প্রাণ গিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের, আর যুদ্ধে সেদশের সম্পত্তির ধ্বংসের কোনও হিসাব নেই। ইউরোপের বহু দেশের হাজার হাজার মানুষের প্রাণ গিয়েছিল, ঘরবাড়ি সব ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল যুদ্ধে। সেই যুদ্ধের বিপদ, প্রাণহানি সম্পত্তি ধ্বংসের হাত থেকে পৃথিবীকে, মানবসভ্যতাকে বাঁচাতেই এই দিবস পালনের ডাক।

কিন্তু এ পৃথিবীতে যতদিন পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন পৃথিবী এই বিপদ থেকে মুক্ত হবে না। তার কারণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানব সম্পদ লুঠের মধ্যেই পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রাণবায়ু নিহিত রয়েছে। মুনাফা, আরও মুনাফা এবং সম্পদের কেন্দ্রীভবন না-হলে পুঁজিবাদ বেঁচে থাকতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন বিশ্বের বিরাট ভূখণ্ডের ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ, তাই দরকার যুদ্ধ। তবে বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে দ্বন্দ্ব সেই স্তরে পৌঁছাইনি যা বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে। লগ্নিপুঁজি নিয়ন্ত্রিত নয়া উদারনৈতিক কাঠামো সারা বিশ্বে যেভাবে বিস্তৃত রয়েছে, বিশ্বযুদ্ধ তাকে বিনষ্ট করতে পারে। যা আখেরে পুঁজিবাদের অস্তিত্বকেই সংকটে ফেলবে। ২০০৮ সালে যে অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়েছিল তা থেকে পুঁজিবাদ এখনও মুক্ত হয়নি বরং সেই সংকট আরও গভীর হয়েছে। বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদরাই বলছেন, এই সংকটের গভীরতা গত শতকের ত্রিশের দশকের মহামন্দার থেকেও বেশি। সেই সংকটের বোঝাকে দূর করতেই পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদকে অন্য দেশের প্রকৃতিক সম্পদে দখল, শ্রমশক্তিকে শোষণের পথ সুগম করতে অনিবার্যভাবে আরও বেশি বেশি করে যুদ্ধের পথেই থাকতে হচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তির দাবিতে প্রথম মিছিল হয়েছিল ভারতে। শ্রমিকরা এই মিছিল করেছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির ডাকে। তাই শান্তির দাবিতে লড়াইতে ভারতীয়দের, বিশেষকরে কমিউনিস্টদের এবং বামপন্থীদের লড়াইয়ের ঐতিহ্য দীর্ঘ। আজ ফ্যাসিস্ট আরএসএস-বিজেপি শাসনে এই লড়াইয়ের গুরুত্ব আরও গভীর। যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে তীব্র করেই সেই ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে হবে, মোদি সরকারের  মার্কিন লেজুড়বৃত্তি করার বিরুদ্ধে হুশিয়ারি জানাতে হবে। ১ সেপ্টেম্বর যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তি ও সংহতির পক্ষে সোচ্চার হতে হবে।


প্রকাশের তারিখ: ০১-সেপ্টেম্বর-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org