কর্মসুরক্ষা: বিকল্পের সন্ধানে

রতন খাসনবিশ
কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি যখন একযোগে নতুন লেবার কোডের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডাকেন, তখন তৃণমূলী শ্রমিক সংগঠন পশ্চাদপসরণ করেন।  একটি শ্রমজীবী অনুমোদিত সরকার ক্ষমতায় এলে এ রাজ্যে যে বিষয়গুলি অগ্রাধিকার পেতে থাকবে সেগুলি নিম্নরূপ: সেই সরকার শ্রমকোডের বিরোধিতা করে রাজ্যে নতুন শ্রম আইন লাগু করবে যাতে শ্রমিকের ধর্মঘট করার অধিকার ন্যায্য অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি পাবে। রাজ্যে ন্যূনতম মজুরি বিধি সর্বত্র সমানভাবে চালু করা হবে। সর্বনিম্ন মজুরি বর্তমান মূল্যমান অনুসারে ৭০০ টাকা ধার্য করা হবে। সামাজিক সুরক্ষার  যে সব বিধিগুলি সরকার অনুমোদিত, তার সবগুলিই এ রাজ্যে চালু করা হবে।

ভারত সরকার প্রকাশিত পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (২০২৩-২৪) এর বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩-২৪ অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে বেকারির হার সর্বভারতীয় গড় হারের চেয়ে কম। গ্রামাঞ্চল কিংবা শহরাঞ্চল সর্বত্রই সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে বেকারত্ব কম। এ কথায় অবশ্য আত্মসন্তুষ্টির অবকাশ নেই। এ রাজ্যে মজুরি কম। যারা ভাল কাজ জানেন তারা এ রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে জীবিকার সন্ধানে অভিবাসন করেন। যে ধরনের কাজ এখানে রয়েছে অর্থাৎ, অস্থায়ী কাজ, স্থায়ী মজুরির কাজ, অথবা স্বশাসিত সংস্থার কাজ — সর্বত্রই মজুরি কিংবা আয় সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে কম। আরও যে বিষয়টি উদ্বেগজনক, তা হল, যারা এ রাজ্যে নিয়মিত কাজ পান এমনকী তাদের ক্ষেত্রেও সামাজিক অথবা নিয়োগকালীন সুরক্ষা দুটিই কম থাকে। পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভের তথ্য অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে যারা নিয়মিত বেতন বা মজুরিতে কাজ পান, তাদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ৫৪.৯ শতাংশ পুরুষ নিয়মিত কর্মীর কোনও লিখিত কাজের চুক্তি নেই। মহিলাদের ক্ষেত্রে এই শতাংশটি ৬৪.৩। সবেতন ছুটি পান না পুরুষ নিয়মিত কর্মীর ক্ষেত্রে এমন শ্রমজীবীর শতাংশ ৪৪.৯। সরকারি হিসাবে যেগুলিকে বলা হয় সোশাল সিকিউরিটি বেনিফিট পশ্চিমবঙ্গের নিয়মিত পুরুষ শ্রমজীবীর ক্ষেত্রে সেই অধিকারে বঞ্চিত ৫৬.৮ শতাংশ শ্রমজীবী। মহিলাদের ক্ষেত্রে তুলনীয় শতাংশটি হল ৭০.২। (তথ্যসূত্র: পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২৩-২৪, সারণি ৩৬)। নিয়মিত কাজের বাইরে যাদের জীবিকা খুঁজতে হয়, অর্থাৎ যারা নিয়মিত কর্মচারী নন, শ্রমজীবীদের মধ্যে তাঁরা হলেন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। পশ্চিমবঙ্গে নিয়মিত কাজের বদলে নিয়মিত মজুরি পান এমন শ্রমজীবী হলেন সমস্ত শ্রমজীবির মাত্র ২১.৪ শতাংশ। ২২.২ শতাংশ হলেন ঠিকা শ্রমিক। স্বনিযুক্ত সংস্থায় কাজ পান ৪৪.৮ শতাংশ শ্রমজীবী। ১০.২ শতাংশ শ্রমজীবী হলেন কর্ম সহায়ক যাদের সামাজিক নিরাপত্তা অথবা কর্মস্থানে কাজের নিরাপত্তা প্রদানের প্রশ্নেই ওঠে না। যে ২১.৪ শতাংশ শ্রমজীবী নিয়মিত কাজ পান তাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কতটা শোচনীয় ইতিপূর্বে আমরা তা উল্লেখ করেছি। বাকিদের অবস্থা যে আরও ভয়াবহ সমাজজীবনের সর্বত্র তার প্রমাণ পাওয়া যায়।


এই শ্রমজীবীদের জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের তত্ত্বাবধানে শুরু হয়েছিল কিছু সামাজিক সুরক্ষা বিধি। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার সেই মোতাবেকে কিছু সরকারি বিধি প্রণয়ন করেছিলেন। বিশেষত নির্মাণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করার লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি অনুকূল ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তৃণমূল শাসনে এই সমস্ত শ্রমজীবীর স্বার্থবাহী ব্যবস্থাগুলি দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সেগুলি আর কার্যকর করা হয় না। আসলে রাজ্য সরকারের শ্রমনীতি কী, সেগুলি শ্রমিককে কী পরিমাণে নিরাপত্তা দেয়, এ সম্পর্কেই স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। 

কেন্দ্রীয় সরকার চালু করেছেন চারটি শ্রমকোড। রাজ্যগুলি সেই মোতাবেক আগের আইন সংশোধন করা শুরু করেছে। তৃণমূল সরকারের ভূমিকা এক্ষেত্রে লজ্জাজনক। কেন্দ্রে যখন পুরনো শ্রম আইন বাতিল করে সেগুলিকে আরও বেশি শ্রমিক বিরোধী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তৃণমূল কংগ্রেস কখনই সেগুলিকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেনি। এমনকী প্রতিবাদের যে সংসদীয় পথগুলি খোলা থাকে, তৃণমূল সাংসদেরা এক্ষেত্রে সেগুলিও কাজে লাগানোর চেষ্টা করেননি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার কেন্দ্রীয় শ্রমকোড এখনও লাগু করেননি। আমাদের অনুমান, এ রাজ্যের বামপন্থী ঘরানার যে রাজনীতি তার প্রভাবেই এই ব্যতিক্রমটি ঘটেছে। ক্ষমতায় আসীন যে তৃণমূল সরকার তার কুশীলবদের এই সাহস নেই যে তারা এই রাজ্যে দাঁড়িয়ে মোদির শ্রম আইন চালু করবেন। এটা তোলা থাকবে বিজেপি সরকারের জন্য। তৃণমূল শুধু তার বাতাবরণটি তৈরির কাজটি নিঃশব্দে করে যাচ্ছে। এ রাজ্যে শ্রমজীবীরা আর ধর্মঘট করার সাহস রাখেন না — অন্তত তৃণমূল সে কথাই মনে করে। কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি যখন একযোগে নতুন লেবার কোডের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডাকেন, তখন তৃণমূলী শ্রমিক সংগঠন পশ্চাদপসরণ করেন। 

একটি শ্রমজীবী অনুমোদিত সরকার ক্ষমতায় এলে এ রাজ্যে যে বিষয়গুলি অগ্রাধিকার পেতে থাকবে সেগুলি নিম্নরূপ:

সেই সরকার শ্রমকোডের বিরোধিতা করে রাজ্যে নতুন শ্রম আইন লাগু করবে যাতে শ্রমিকের ধর্মঘট করার অধিকার ন্যায্য অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি পাবে। রাজ্যে ন্যূনতম মজুরি বিধি সর্বত্র সমানভাবে চালু করা হবে। সর্বনিম্ন মজুরি বর্তমান মূল্যমান অনুসারে ৭০০ টাকা ধার্য করা হবে। সামাজিক সুরক্ষার  যে সব বিধিগুলি সরকার অনুমোদিত, তার সবগুলিই এ রাজ্যে চালু করা হবে। যারা নিয়মিত কাজ পান শ্রমজীবীদের সেই ২১.৪ শতাংশ অবিলম্বে সুরক্ষাবিধির আওতায় আসবেন। অস্থায়ী কাজ বিলোপ করা হবে। সরকার পোষিত সমস্ত সংগঠনে নিয়মিত নিয়োগের ব্যবস্থা চালু করা হবে। এখন যে মডেলটি চালু রয়েছে সেখানে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অস্থায়ী, ঠিকা মজুরির কাজে নিয়োগ সৃষ্টি হয়। এই প্রথাটি বন্ধ করা হবে। অদক্ষ, অসংগঠিত শ্রমিকের ক্ষেত্রে মজুরির হারে ওঠানামা চলতে থাকে কাজের বাজারের পরিস্থিতি অনুসারে। এটা রোধ করার জন্য আনা হয়েছিল মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প। মোদি সরকার এটিকে উঠিয়ে দেওয়ার নানা চক্রান্ত করছে। তৃণমূলী দুষ্কৃতিরা এই কাজে পরোক্ষভাবে সহায়কের ভূমিকা পালন করছে। একটি জনমুখী সরকার কঠোর হাতে এগুলিকে দমন করবে এবং ১০০ দিনের কাজের পরিষেবাকে ১২৫ দিনের কাজে উত্তরণ ঘটাবে। বামফ্রন্ট সরকার তাদের শাসনের শেষ দিকে চালু করেছিলেন শহরে অদক্ষ শ্রমিকদের নিয়োগ ব্যবস্থা। বাম গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ সরকার ক্ষমতায় এলে শহরাঞ্চলে রেগার কাজের প্রসার ঘটানো হবে। একই সঙ্গে থাকবে যুব সমাজের সক্রিয় সহযোগিতায় কর্মক্ষেত্র প্রসারণের পরিকল্পনা। এই রাজ্যে বেকারির চাপ এখন মজুরি হ্রাসের চাপে রূপান্তরিতে হয়েছে। এই অবস্থাটির পরিবর্তন আনা দরকার। আর সেকারণে, আওয়াজ তুলতে হবে — মন্দির-মসজিদ নয়, বামেদের বিকল্প কর্মসূচিই বাংলাকে বাঁচাতে পারে।


প্রকাশের তারিখ: ০৯-এপ্রিল-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org